লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায়
গত ৩ জানুয়ারি ভোরবেলায়, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস-সহ বিভিন্ন শহরে আমরা মার্কিন আগ্রাসনের ছবি দেখতে পাই। প্লেন থেকে বোমাবর্ষণ চালায় আমেরিকা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। যে আমেরিকা পৃথিবীর কোনও আইন-কানুনেরই তোয়াক্কা করে না, সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টই ঘোষণা করেন যে, মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যেই নাকি এই পদক্ষেপ!
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দস্তুর
ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কিছুদিন ধরেই হুঙ্কার দিচ্ছিল যে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো মাদক পাচারের সাথে যুক্ত। যদিও এই অভিযোগের স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের এটাই দস্তুর। তাঁরা আমেরিকার অপছন্দের বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ আনেন, তারপর সেই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করার জন্য সামরিক আগ্রাসন চালায় কোনও রকম প্রমাণ ছাড়াই, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই। অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ একই রকম ভাবে ‘গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র’ মজুত করার অভিযোগ এনে ইরাককে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে; হত্যা করে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনকে। যদিও, গোটা ইরাক খুঁজেও কোনও ‘গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র’ সেদিন খুঁজে পায়নি মার্কিন সেনারা!
নিঃসন্দেহে, ডোনাল্ড ট্রাম্পও সেই জর্জ বুশের দেখানো রাস্তাতেই হাঁটছেন। বাইরের দেশকে জানানো তো দূরের কথা, এমনকি, নিজের দেশের মানুষের কাছেও ভেনেজুয়েলা আক্রমণ সংক্রান্ত তথ্য গোপন করছে হোয়াইট হাউস। ডেমোক্র্যাট সেনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ বলেছেন, “এই হামলার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত কারণ এখনও আমাদের কাছে নেই। এখনই আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত এবং এই ধরনের বোকা বোকা সামরিক অভিযানে না জড়ানো উচিত।” ভেনেজুয়েলার ঠিক কী ঘটছে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আমেরিকাবাসীর সামনে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন শ্যাটজ। ওদিকে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেজ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো বলেছেন, তাঁরা সর্বশক্তি দিয়ে মার্কিন সেনার আগ্রাসন প্রতিরোধ করবেন। কিউবা সহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন, এমনকি ইজরায়েল পর্যন্ত ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হামলার নিন্দা করেছে। একমাত্র ভারত সরকার এবং নরেন্দ্র মোদী পুরোপুরি চুপ।
ভেনেজুয়েলাই কেন?
আমেরিকার কুনজর আসলে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের ভান্ডারের ওপর। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী খনিজ তেল রয়েছে ভেনেজুয়েলার মাটির নীচে, যার পরিমাণ এমনকি আরব দেশগুলোর থেকেও বেশী! ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য এই প্রাকৃতিক সম্পদকে দখল করা, যে দখলদারি আমেরিকা সারা বিশ্ব জুড়েই চালিয়ে যাচ্ছে। তার জন্যেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো’র বিরুদ্ধে মাদক পাচারের বাহানা খাড়া করে সেই দেশে সামরিক আগ্রাসন চালালো আমেরিকা, যা তারা অতীতেও বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে বারংবার করেছে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা করেছে যে তারা ভেনিজুয়েলার তেলের দখল নিচ্ছে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোকে দরপত্র দিতে বলেছে। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে এই হামলার বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মানুষ পথে নেমেছেন। কিউবা, ভেনিজুয়েলাতেও অসংখ্য মানুষ মাদুরোর মুক্তি চেয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আগ্রাসনের পর্বটা হঠাৎ করে শুরু হওয়া বা ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়। এটা একটা দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারার অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই সব দেশকে নিজের অধীনতায় আনতে চায় যারা তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্যের কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করে। এই আগ্রাসনের মূলে রয়েছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নবউদারবাদী ব্যবস্থার কাছে ভেনেজুয়েলার সম্পূর্ণভাবে নতি স্বীকার করতে না চাওয়া। বলিভারিয়ান বিপ্লবের পর থেকে ভেনেজুয়েলা নিজের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর, বিশেষত তেলের ওপর, জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং পুনর্বণ্টনমূলক সামাজিক নীতি অনুসরণ করতে চেয়েছে। জ্বালানি সম্পদের ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণকে প্রতিহত করার এই প্রচেষ্টাই ভেনেজুয়েলাকে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের বহু আগেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ওয়াশিংটনের প্রধান অস্ত্র। এসব নিষেধাজ্ঞাকে প্রায়ই “লক্ষ্যভিত্তিক” বলা হয়, কিন্তু সাধারণ ভেনেজুয়েলাবাসীর ওপর এর বাস্তব প্রভাব হয়েছে ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত করা, তেল বিক্রি করে আয়ের পথ বন্ধ করা এবং বিদেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করেছে। ওষুধ, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যত সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে কাজ করে—অভাবকে অস্ত্র বানিয়ে সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক ভাঙন সৃষ্টি করে। আর যখন মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে, তখন ওয়াশিংটন সেটাকেই সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখায়।
বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদী রণকৌশল
এই কৌশলটা একটা বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদী রণকৌশলের প্রতিফলন। সরাসরি উপনিবেশ শাসনের বদলে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর করে অর্থনৈতিক যুদ্ধ, গণমাধ্যমের বয়ান এবং প্রক্সি রাজনৈতিক শক্তির ওপর। সমান্তরাল সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে মদত করা এবং নিয়মিত হস্তক্ষেপের হুমকি—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরোধিতা করা সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোকে অবৈধ প্রমাণ করার হাতিয়ার। এই ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা ব্যতিক্রম নয়।
এই আগ্রাসনকে স্বাভাবিক করে তুলতে মার্কিন গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত প্রতিবেদনগুলো প্রায় সর্বত্রই সংকট ও ব্যর্থতার ফ্রেমে উপস্থাপিত হয়। খুব কমই স্বীকার করা হয় সেই বহিঃচাপগুলোর কথা যা এই পরিস্থিতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। নিষেধাজ্ঞাকে পটভূমির বিষয় হিসেবে দেখানো হয়, আর অভ্যন্তরীণ কুশাসনকে অতিরঞ্জিত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করা হয়। এই নির্বাচিত বয়ান যুক্তরাষ্ট্রের নীতির দায় মুছে দেয় এবং অর্থনৈতিক হোক বা সামরিক—যেকোনো রকম হস্তক্ষেপকেই প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর হিসেবে উপস্থাপন করে। এটা একটা আদর্শগত যুদ্ধ, যার উদ্দেশ্য সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপের জন্য সম্মতি তৈরি করা।

এটা স্বীকার করা জরুরি যে ভেনেজুয়েলা গুরুতর অভ্যন্তরীণ সমস্যার মুখোমুখি। দুর্নীতি, অদক্ষতা ও নীতিগতভাবে ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এই অস্থিরতায় অবদান রেখেছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বহিঃআগ্রাসনের প্রেক্ষাপট থেকে এসব সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা ঠিক নয়। প্রশ্নটা এই নয় যে ভেনেজুয়েলার সরকার নিখুঁত কি না, বরং এটা আজ জোরের সঙ্গে বলা দরকার যে ভেনেজুয়েলার জনগণের বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার আছে।
ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে, এবং এই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ সবসময়ই একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। নিষেধাজ্ঞা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে, বেসরকারিকরণকে আরও সম্ভাব্য করে তোলে, এবং সংকট-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন থেকে বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো লাভবান হওয়ার সুযোগ পায়।
উপসংহার
এখানে এটা বলা জরুরী যে মার্কিন চাপ সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা আত্মসমর্পণ করে ভেঙে পড়েনি। তৃণমূল স্তরের সংগঠন, কমিউন কাউন্সিল এবং শ্রমিক আন্দোলনগুলো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সামাজিক জীবন টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখে চলেছে। তাদের সংগ্রাম শুধু অর্থনৈতিক ভাবে টিকে থাকার জন্য নয়, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের জন্য। এই প্রতিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। অতএব ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ও জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলমান একটা বৃহত্তর বিশ্বব্যাপী সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। বামপন্থীদের কাছে ভেনেজুয়েলার প্রতি সংহতি মানে কোনো সরকারের প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়। এর অর্থ হলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা, সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করা এবং জনগণের নিজেদের পথ নিজে নির্ধারণের অধিকারকে সমর্থন করা।
