লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
অগাস্ট ২০২৫ সংখ্যায়
গত জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের অভিযোগ ছিল যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। এই যুদ্ধকে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধাপরাধী সরকারের এই অঞ্চলের সর্ব সাম্প্রতিক সামরিক আগ্রাসন হিসাবে দেখা যায়। এই আগ্রাসন শুরু হয়েছে গত দুই বছরে গাজায় ৫৫,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর—যার মধ্যে ১৮,০০০ শিশু। আর এই সবটাই সংঘটিত হয়েছে “ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার” এর নামে। ইরানের বিরুদ্ধে একতরফা আক্রমণ চালানোর পিছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারের “শাসন পরিবর্তন” এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী। এটা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (IAEA) নিশ্চিত করেছে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি আসলে মিথ্যা। এজেন্সির নিয়মিত তদারকিতে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) লঙ্ঘনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যার স্বাক্ষরকারী ইরান। IAEA-র মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি ১৯ জুন বলেছেন, “আমাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার প্রমাণ নেই।” যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ভয়াবহভাবে তীব্র করেছে, যা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ২৫ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থানকে বিপাকে ফেলেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রের গল্পটি সম্পূর্ণ বাজে কথা। আসল কারণ হলো, ইরান ডলারে তেল বিক্রি করছে না এবং বাজারের দামের চেয়ে প্রায় ত্রিশ শতাংশ সস্তা দরে তেল সরবরাহ করছে। আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলো তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হচ্ছে। আমেরিকা যখন ইরাক আক্রমণ করেছিল, তখনও একই যুক্তি দিয়েছিল। তারা বলেছিল সাদ্দাম হুসেনের কাছে গণবিধ্বংসী রাসায়নিক অস্ত্র আছে, কিন্তু আসল কারণ ছিল সাদ্দাম ডলারে তেল বিক্রি করতে অস্বীকার করেছিল। গাদ্দাফি শুধুমাত্র ইউরোতে তেল বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। তার পরিণতিও সাদ্দামের মতোই হয়েছিল। আমেরিকান ইহুদি মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা সর্বাধিক করার জন্য সংগ্রাম করছে, যেখানে ইরান একটি বড় বাধা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো চীন ও ভারত। উভয়েই এখন মূলত ইরান ও রাশিয়া থেকে তেল কিনছে। আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলো ঠিক এটাই বন্ধ করতে চায়। এজন্যই তারা ইসরায়েলকে ইরান আক্রমণে উস্কে দিচ্ছে। ইসরায়েল প্রথমেই ইরানের তেল রপ্তানির টার্মিনালে হামলা চালিয়েছে, যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে তাদের লক্ষ্য হলো ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করা। কিন্তু দুই সপ্তাহের ইসরায়েলি ও আমেরিকান বোমাবর্ষণের পরও ইরানের তেল উৎপাদন বেড়েছে। উপগ্রহ চিত্র ও অন্যান্য শিপিং ডেটা থেকে জানা যায়, এই হামলার পরও ইরানের তেল উৎপাদন সাত বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে—প্রতিদিন ৩৫ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি।
ভারত তার আমেরিকাপন্থী অবস্থান বজায় রেখেছে এবং শাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর সেই বিবৃতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে, যেখানে ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের নিন্দা করা হয়েছিল। এসসিও ইসরায়েলি হামলাকে “সিভিলিয়ান টার্গেটে আগ্রাসী কর্মকাণ্ড” আখ্যা দিয়ে বলেছে যে এটি “ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষতি করছে এবং বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে।” স্পষ্টতই, এই সংঘাতের পিছনে তেলের বাজার ও মুদ্রার নিয়ন্ত্রণই মুখ্য, পারমাণবিক অস্ত্রের গল্প শুধুই একটি অজুহাত।
ইসরায়েলের হামলা, যার পেছনে মার্কিন সমর্থন রয়েছে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা নয় বরং এটি একটি বৃহত্তর অস্থিতিশীলকরণ কৌশলের অংশ। এই কৌশলের লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভূগোলকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ করে পুনর্বিন্যাস করা। ইরানের উপর এই হামলা আঞ্চলিক সংঘাতকে তীব্র করার একটি প্রচেষ্টা। যেসমস্ত সরকার মার্কিন-নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদের কাঠামোয় মিশে যেতে চায় না, তাদেরকে এবং আঞ্চলিক আন্দোলনগুলিকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করাই হল এই হামলার মূল উদ্দেশ্য। পশ্চিমা মিডিয়া ও কূটনৈতিক মহলে যে প্রচলিত বর্ণনা রয়েছে, তাতে ইরানের আঞ্চলিক জোটগুলোকে কেবল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকসহ সমগ্র অঞ্চলে যেসব রাজনৈতিক ও প্রতিরোধ শক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশী হস্তক্ষেপ ও দখলদারিত্বের বিরোধিতা করে আসছে, তাদের বৈধতাকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এই আন্দোলনগুলিকে “প্রক্সি” হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনে একটি আদর্শগত কৌশল কাজ করছে, যার লক্ষ্য স্বাধীন রাজনৈতিক এজেন্সিকে অবৈধ করে তোলা এবং বিদেশী আগ্রাসনকে ন্যায্যতা দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ততক্ষণ সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের কাঠামোর সাথে মৌলিকভাবে সম্পর্কচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং সামরিকবাদ ও বিদেশী নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এই সংকটের সমাধান কেবল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দলন, আন্তর্জাতিক সংহতি, ন্যায়ভিত্তিক কূটনীতি এবং অঞ্চলের জনগণের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই সম্ভব।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://thewire.in/world/iran-israel-missiles-long-range-west-asia-photo [Retrieved On: 10/08/2025]

One thought on “ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চক্রান্ত”