সাহানারা খাতুন
(শিক্ষিকা, অধিকার আন্দোলনের কর্মী এবং এপিডিআর-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য )
একটা চরম সংকট আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। প্রাত্যহিক সংবাদ শিরোনামে বিষয়টি প্রতিদিনই স্থান পাচ্ছে – শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষানীতি। একটা বিষয় প্রতিদিন সংবাদ শিরোনামে আসার অর্থ, বহুচর্চিত, বহু আলোচিত হওয়ার অর্থ সেটা হয় খুব সুফলপ্রসূ, নয়তো সংকটে আছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই হয়েছে। শিক্ষা যে সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে গত বছর ধরে আমরা বেশ উপলব্ধি করতে পারছি । কারণ অতিমারীজনিত সংক্রমণের দোহাই দিয়ে যখন দিনের পর দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ করে রাখা হলো আমরা তখনই বুঝে গিয়েছিলাম আমরা যাঁদের নির্বাচিত করে লোকসভা বিধানসভায় পাঠিয়েছি তাঁরা চান না শিক্ষা সার্বজনীন হোক; রাষ্ট্র তার নাগরিকের শিক্ষার দায়িত্ব নিক। যদি চাইতেন তাহলে স্বাধীনতার ৭৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও; গালভরা নাম স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পালন করার পরেও শিক্ষা মৌলিক অধিকারের তালিকার আওতায় রাখা হত। বাইরে রাখা হত না।
শিক্ষার অধিকারের ১০০ বছর যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো– ব্রিটিশ সরকার যেমন বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষার দায়িত্ব নিতে চায় নি। তেমনই আমাদের সংবিধান সভা/ সংবিধান সভার কমিটি/ সংবিধান সভার পরামর্শ কমিটি স্বাধীন ভারতে বিনাব্যয়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের দাবি থেকে বাতিল করে। শিক্ষার অধিকারকে অবিচারযোগ্য মৌলিক অধিকারের তালিকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। যা পরে রাষ্ট্রের পরিচালক নীতি (৪৫ নং ধারা) হিসেবে পরিচিত হয় । শুধু তাই নয়, সংবিধান সভায় বিতর্কের সময় ৩৬ ধারার প্রথম লাইনটি পাল্টে দেওয়া হয়। প্রথমে ঐ লাইনটি ছিল– “প্রতিটি নাগরিকের বিনা ব্যয়ে প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো……ইত্যাদি।” রাষ্ট্রের কর্তব্যের জায়গায় লেখা হল ” রাষ্ট্র চেষ্টা করবে”। বদলে দেওয়া হলো প্রাথমিক শিক্ষা শব্দটিও। সংবিধানের ১৮ ধারায় রাখা হল ১৪ বছরের কম বয়সী কোন শিশুকে যদি খাটানো না হয় তাহলে তারা ঐ সময়টা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সময় কাটাবে। রাষ্ট্র চেষ্টা করবে যাতে এই সংবিধান চালু হওয়ার ১০ বছরের মধ্যে ১৪ বছরের কমবয়সী সব শিশুকে বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষা দেওয়া যায়। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরল। শিক্ষা আর বিচারযোগ্য বিষয়ও থাকল না। আর আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র তার পূর্ণ দায়িত্ব পালন করল না। রাষ্ট্রে শিক্ষাকে অবাধ সার্বজনীন করার জন্য আজ পর্যন্ত স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি করল না। শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য বা ১৯৮৬-র জাতীয় শিক্ষানীতি রূপায়নের জন্য দেদার অর্থ সহায়তা নিল এমন সব সংস্থা থেকে যাদের কাছে আমার রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার টিকি বাঁধা হয়ে গেল।
১৯৯৩ সালের উন্নিকৃষ্ণান ও অন্যান্যরা বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য মামলায় সুপ্রীম কোর্ট ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের শিক্ষার অধিকারকে একটি অধিকার হিসেবে গণ্য করে বলেন “এদেশের নাগরিকদের শিক্ষার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ২১ ধারা থেকে এই অধিকার জন্মায়। কিন্তু এটি চরম অধিকার নয়। এর অন্তর্বস্তু ও প্রয়োগ ৪৫ এবং ৪১ ধারা দ্বারা নির্ধারিত। অন্য কথায় প্রতিটি শিশু/নাগরিক ১৪ বছর বয়স অবধি বিনা ব্যয়ে শিক্ষা পাওয়ার অধিকারী। তবে তা রাষ্ট্রের আর্থিক সঙ্গতির উপর সীমাবদ্ধ।” এরপর দেশব্যাপী শিক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করার দাবি উঠলে ২০০২-এর ৮৬-তম সংশোধনী গৃহীত হয়। যুক্ত হয় নতুন ধারা ২১ (ক)। তাতে বলা হয় রাষ্ট্র ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সব শিশুর বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এমনভাবে করবে যা রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে স্থির করবে। ৪৫ ধারার জায়গায় নতুন অন্তর্ভুক্তি হলো – রাষ্ট্র ৬ বছরের কমবয়সী শিশুদের শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
ফাঁক থেকে গেল এখানেই। চেষ্টা করা, আইনের দ্বারা স্থির করার ফাঁক গলেই বেরিয়ে এল আজকের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি। যা লাগু করার জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক এবং স্বয়ং রাজ্যপাল মাঠে নেমে পড়েছেন। ইউনিভার্সিটি গুলোর দরজায় দরজায় ঘুরছেন ২০২৩ থেকেই চালু করার আবেদন নিয়ে। ২০২০-তে যে নতুন শিক্ষানীতি আসবে তা ২০০৩, ২০০৪, ২০০৫ শিক্ষার অধিকার বিলে ইঙ্গিত দেওয়া ছিল। আমরা ধরতে পারিনি। ২০১০-এর ১-লা এপ্রিল থেকে বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয় তাতে ২০২০ পর্যন্ত একটা মানে/কাঙ্খিত মানে পৌঁছানোর কথা ছিল। এরপর কী হবে বলা ছিল না। সেই না বলা বাণীর ঘন যামিনীর মধ্যেই লুকিয়ে বেড়িয়ে এলো নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি। UDA, SIDA, WORLD BANK এর টাকায় চলা শিক্ষা নীতি ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণের পথে চলে গেল। যে রাষ্ট্র লোকসান দেখিয়ে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি করে দেয় সে অর্থের অসঙ্কুলান দেখিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মাথা থেকে হাত তুলে নেবেই। UDA, SIDA WORLD BANK এর টাকায় গড়ে ওঠা খোড়ো ঝড়ো স্কুলবাড়ি গুলো আজ চকচকে হয়েছে। ওগুলো ওদের দোসরদের হাতে যাবেই। ৮২০৭-টা স্কুল আজ তালিকা ভুক্ত। আগামী দিনে বাকিগুলোও হবে। কারণ ২০১০ RTE Act অনুযায়ী চার ধরনের স্কুলের কথা ছিল। ১) সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের টাকায় চলে এবং তাদের পরিচালিত। ২) বেসরকারি কিন্তু সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাহায্য প্রাপ্ত। ৩) বিশেষ ধরনের স্কুল যেমন কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, নবোদয় বিদ্যালয়, সৈনিক স্কুল, ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশ স্কুল এবং এই ধরনের স্কুল। ৪) বেসরকারি স্কুল যারা সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনো সাহায্য পায় না। এও বলা ছিল সরকারি বা সরকারি সাহায্য প্রাপ্ত স্কুল থাকবে। তবে তার মাত্র দশ শতাংশ স্কুলকে উন্নীত করা হবে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় বা নবোদয় বিদ্যালয়ের মতো। যা আজকের জাতীয় শিক্ষানীতির cluster school। প্রাইভেট স্কুল স্থাপনের ব্যাপারে সংবিধানের ১৯ সি এবং জি ধারাকে মান্যতা দেওয়া হয়েছিল – “সভা সমিতি গঠনের অধিকার” এবং “যে কোনো পেশা অনুসরণ করা বা ব্যবসা বাণিজ্য করার অধিকার” নাগরিকের আছে। আইনের ফাঁক গলে গড়ে উঠল ব্যাঙের ছাতার মত বেসরকারি স্কুল। সৈনিক স্কুলের নামে নিজস্ব এজেন্ডা পূরণের লক্ষ্যে সংঘীয় স্কুল। ‘রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অভিযান’ এর নাম করে স্কুলের সব সম্পত্তির মালিক এখন সরকার বা রাষ্ট্র। তাই তো নামখানার স্কুল বিক্রি হয়ে যায়। এক একটা সময় আসে এক এক বিষয় নিয়ে হৈচৈ করে আমরা ঝিমিয়ে পড়ি। আর ঝিমোনোর সুযোগে বিক্রি হয়ে যায় আমার অধিকার।
ম্যাজিক দেখেছেন ম্যাজিক। বাংলায় যাকে বলে ইন্দ্রজাল। চোখ ঝলসানো আলোয় ততোধিক ঝকঝকে পোশাকের ম্যাজিসিয়ান কথার ফুলঝুড়িতে মাতিয়ে, হাতের কারসাজিতে একের পর এক খেলা দেখিয়ে যান। আমরা চোখ, কান, মন এই ত্রিবিধের একত্র মেলবন্ধন ঘটাতে না পেরে হতভম্ব হয়ে যাই। ঘোর কাটিয়ে যুক্তি খুঁজতে থাকি। আর তখনই এসে যায় আরেকটা খেলা রেশ কাটতে না কাটতেই। আমাদের সব কিছু গুলিয়ে যায়। আমাদের বর্তমান সরকার আজ এই ম্যাজিসিয়ানের ভূমিকা নিয়েছে। গত নয় বছরে দেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে। যখন তখন হুকুম জারি। রাতারাতি বদল নিয়ম কানুনের। কখনও ঘুরপথে। কখনও সরাসরি। বদলে দিয়েছে একাধিক আইন। নীতি আয়োগ এনেছে নয়া নয়া নীতি। সেই নীতি তাঁদের ভাষায় জনমোহিনী, জনরঞ্জিনী। কিন্তু আম জনতার মরণফাঁস। টের পাচ্ছি যখন তখন কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কিছুই নেই। এরকমই এক জনমোহিনী জনরঞ্জিনী নীতি – জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০। যা প্রথম পড়লে মনে হবে শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ। এতো ভাবনা আর কোনো সরকারই ভাবেনি। এত ভালো জাতীয় শিক্ষানীতি আর আসেনি। ভাষার তোড়ে ভেসে যাবেন। ভাষার মায়াজাল সরালেই বেরিয়ে পড়বে নগ্নরূপ। বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যীকিকরণের রাজপথ। শিক্ষার অধিকার হরণের রাষ্ট্রীয় দলিল।
কেন এ হেন মন্তব্য? নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনা করলেই বেরিয়ে আসবে এর উত্তর। তবে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে কী আছে আলোচনার আগে আমি পিছনের ইতিহাস সংক্ষেপে একটু বলে নিতে চাই। কারণ কোন আইনের ফাঁক গলে আর কার প্রোপাগান্ডা পূরণ করতে আজকের জাতীয় শিক্ষানীতি এলো তা জানাটাও জরুরী।
‘বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার’ অধিকার প্রথম দাবি করেন গোপাল কৃষ্ণ গোখলে ১৯১০ সালে ইম্পেরিয়াল লেজিস্লেটিভ কাউন্সিলে। তার সেই প্রস্তাব বা বিল প্রত্যাখ্যাত হয়। অনেক লড়াইয়ের পর ১৯১৭ সালে বিঠলভাই প্যাটেল বাধ্যতামূলক শিক্ষার উপর আইন পাশ করাতে সক্ষম হন। যা প্যাটেল আইন নামে পরিচিত। ব্রিটিশ ভারতের প্রতিটি প্রদেশের আইনের বইতে বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার হারটগ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপ্তিকে ব্যাহত করে। এই কমিটি শিক্ষার সার্বজনীনতা অগ্ৰাহ্য করে গুণগত মানের উপর জোর দেয়। Quantity নয় Quality-ই ছিল মূল লক্ষ্য। ফলে শিক্ষার হার বাড়ল না। ক্রমান্বয়ে শিক্ষার অবনতি দেখে গান্ধিজী ১৯৩৭ সালে সার্বজনীন শিক্ষার আবেদন করেন। উত্তরে ব্রিটিশ সরকার বলেন এর জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা সংগ্ৰহ করতে হলে মদ বিক্রি বাড়াতে হবে। অর্থাৎ হয় গান্ধিজী কে মদ নিষিদ্ধকরণের দাবি ছাড়তে হবে নতুবা রাষ্ট্রীয় সহায়তায় সার্বজনীন শিক্ষার দাবি ছাড়তে হবে। হতাশ গান্ধিজী হরিজন পত্রিকায় লেখেন – “নতুন সংস্কারের নিষ্ঠুরতম তামাশা এটাই যে আমাদের শিশুদের শিক্ষা দেবার জন্য সরকারের হাতে মদের রাজস্ব ছাড়া আর কিছুই নেই।” পরে তিনি তাঁর “নই তালিমে” শিক্ষার ধাঁধার সমাধান করেন জনগণের নিজস্ব অর্থে। ইতিহাসের কী আশ্চর্য সমাপতন দেখুন – যখন করোনা অতিমারীজনিত সংক্রমণের দোহাই দিয়ে দিনের পর দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ ছিল তখন খোলা ছিল মদের দোকান, রেস্তোরাঁ, বার, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স। আর স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরে, সাড়ম্বরে স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পালন করার পরেও একটা স্বাধীন রাষ্ট্র তার শিশুর/নাগরিকের জন্য সার্বজনীন শিক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করতে পারল না। জোর দিল জনগণের নিজস্ব অর্থে। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে বারেবারে বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলা হলো।
এতো গেল ব্রিটিশ ভারতের কথা। স্বাধীন ভারতে কী হলো? সংবিধান সভা কাজ শুরু করল। দশ বছরের মধ্যে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে যে সম্পদ লাগবে তার উৎস সন্ধানের জন্য সম্পদ কমিটি (Ways & Means) গঠিত হলো। সংবিধান সভার সাব কমিটি “বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা”-কে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ জানাল। কিন্তু সংবিধান সভার পরামর্শদাতা কমিটি বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের তালিকা থেকে বাতিল করল বেশি খরচের কারণ দেখিয়ে। পাঠানো হলো অ-বিচারযোগ্য মৌলিক অধিকারের তালিকায়। পরে “রাষ্ট্রের পরিচালক নীতি” সমূহের মধ্যে। সংবিধান সভায় বিতর্কের সময় ২৩ নং ধারার এই লাইনটি বদলে দেওয়া হয়। আগে ছিল “প্রতিটি নাগরিকের বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রের কর্তব্য হল সংবিধান চালু হওয়ার দশ বছরের মধ্যে চোদ্দ বছরের কম বয়সী সব শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক ও নিঃশুল্ক শিক্ষা চালু করা।” ৩৬ ধারায় গিয়ে ‘রাষ্ট্রের কর্তব্য’ এর জায়গায় লেখা হল ‘রাষ্ট্র চেষ্টা করবে’। রাষ্ট্র ৭৫ বছর ধরে চেষ্টা করছে। বিচার যোগ্য বিষয়ের বাইরে থাকার জন্য আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও গেল না। যদি বিচার যোগ্য বিষয়ের মধ্যে থাকত তাহলে রাষ্ট্র তার সম্পদের ব্যবস্থা করত। কে. টি শাহ ৪৫ ধারার বিরোধিতা করে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। আম্বেদকর ঘুর পথে বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদি ১৪ বছরের কমবয়সী কোনও শিশুকে খাটানো না হয় অর্থাৎ শিশু শ্রম বন্ধ হলে শিশুরা ঐ সময়টা শিক্ষাঙ্গনে কাটাবে। আম্বেদকর বুঝতে পারেননি ক্ষিদের দাউদাউ আগুনে শিক্ষা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আইনের বাধ্য বাধ্যকতা না থাকলে আইন লঙ্ঘিত হয়ে যায়।
যাই হোক স্বাধীন ভারতে শিক্ষা বিস্তারে কমিশন গঠিত হলো। এলো রাধাকৃষ্ণন কমিশন (১৯৪৮-৪৯), মুদালিয়র কমিশন (১৯৫২-৫৩)। দশবছর পর কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬)। ভারতে শিক্ষাবিস্তারের ইতিহাসে কোঠারি কমিশন একটা মাইলস্টোন। এ যাবৎকাল শিক্ষার যা উন্নতি যা রূপরেখা সব কোঠারি কমিশন ধরে। অধ্যাপক কোঠারি বুনিয়াদি শিক্ষার বিষয়ে দুটি মূল্যবান পরামর্শ দেন। একটি সার্বজনীন বিদ্যালয় গঠন । আরেকটি হল ৪৫ ধারার নির্দেশিকাকে পালন করা। তিনি বলেছিলেন আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের মধ্যে সারা দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সার্বজনীন বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। এই বিদ্যালয়ে আশেপাশের সব শিক্ষার্থী ভর্তি হবে। আর্থিক, সামাজিক, ধর্মীয় কোনো রকম ভেদাভেদ থাকবে না। সারাদেশে মোটামুটি একই পাঠক্রম থাকবে। তবে স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী কিছু বদল হতে পারে। বিদ্যালয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক থাকবে। থাকবে পানীয় জল, শৌচাগার, খেলার মাঠ, গ্ৰন্থাগার। বিদ্যালয়গুলোক এতটাই উন্নতমানের করতে হবে যে মানুষ প্রাইভেট স্কুলের দিকে ঝুঁকবে না।আর তা হলেই প্রাইভেট স্কুল গুলোও ধীরে ধীরে সার্বজনীন হয়ে যাবে। আজকের জাতীয় শিক্ষানীতি বলছে এর সম্পূর্ণ উল্টো কথা। এই শিক্ষানীতি চালু হলে সরকারি স্কুলগুলো ধীরে ধীরে প্রাইভেট হয়ে যাবে। আমাদের পশ্চিমবঙ্গ সরকার চুপিসাড়ে প্রাথমিক শিক্ষায় পিপিপি মডেল আনতে চলেছে সম্ভবত পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকেই। এ বিষয়ে আদানি এবং বিভিন্ন এনজিও-র একপ্রস্থ আলোচনাও হয়ে গেছে। অধ্যাপক কোঠারি আরো সুপারিশ করেছিলেন GDP-র অন্তত ৬% শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে হবে। যার ২/৩ অংশ খরচ হবে স্কুলশিক্ষায়। বাকিটা উচ্চ শিক্ষায়। প্রয়োজন অনুযায়ী অনুপাত পরিবর্তিত হতে পারে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা। যদি একান্তই সম্ভব না হয় তাহলে ঐ এলাকার প্রধান যে ভাষা সেই ভাষায় শিক্ষা দিতে হবে। তবে মাতৃভাষার দাবি সবার আগে। এই কমিশন আরো বলেছিল যেহেতু ৪৫ নং অনুচ্ছেদে ১৪ বছর পর্যন্ত সব শিশুর বাধ্যতামূলক শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত সেহেতু রাষ্ট্র তার বইখাতা পোশাক-আশাকের দায়িত্ব নেবে। ইন্দিরা সরকার এই শিক্ষানীতি গ্ৰহণ করেন এবং বলেন পাঁচ বছর অন্তর কতটা কার্যকর হলো তা দেখভাল করা হবে। পাঁচ বছর পর দেখা গেল কোনো নীতিই কার্যকর হয়নি। আঙুল ওঠে রাজ্যের দিকে এরপর আসে জরুরী অবস্থা। ১৯৭৫ সালে ৪২-তম সংশোধনীতে শিক্ষা যুগ্ম তালিকা ভুক্ত হয়। কেন্দ্রের দায়িত্বহীনতার দায় থেকে মুক্তি পায়।
এরপর রাজীব সরকারের সময় দেখা গেল প্রায় তিন দশক কেটে গেলেও কোঠারি কমিশনের নীতি গুলো কার্যকরী হয়নি। কেন কার্যকর হয়নি? চাপান উতোরে বেরিয়ে এল এটা নেহাতই নির্দেশিকা। মানতে হবে এমন কথা নেই। আর মানতে হলে অর্থের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেই ব্যবস্থা করা হল World Bank-এর টাকায়। একদিকে ১৯৮৬ সালে প্রথমে রামমূর্তি কমিটির মাধ্যমে এলো জাতীয় শিক্ষানীতি কোঠারি কমিশনের ছায়া অনুসারে। আর সেই সমস্ত নীতিকে মান্যতা দিতে World Bank-এর সহায়তা। ২৫ কোটি শিশুকে বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতায় আনতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা নেই। বাজেটে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। অর্থের যোগানদার হিসেবে ডাকা হয় WORLD BANK কে। প্রথমবার ঢুকলো। প্রাথমিক শিক্ষার বাজার খুলে দেওয়া হলো। নবোদয় বিদ্যালয়, মডেল স্কুল স্থাপিত হলো। যা ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে আগাতে আগাতে নিয়ে এলো খাদের কিনারায়। ১৯৮৬ এর জাতীয় শিক্ষানীতির রেশ এখনো আছে। এই শিক্ষানীতির অনেক গুলো দিক আছে। যেটা পরিষ্কার করে আলোচনা না করলে আজকের জাতীয় শিক্ষানীতি কোন ফাঁক গলে বেরিয়ে এল বোঝা যাবে না। এই শিক্ষানীতিতে বলা হল একুশ শতকে পৌঁছানোর আগেই সমস্ত শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা বিধান সুনিশ্চিত করতে হবে। সেই শিক্ষা হবে বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক। যা Operation Blackboard নামে পরিচিত। সেই লক্ষ্যে এর আটটি যোজনা মুখ স্থির করা হয় বলা হয় ০-৬ বছরের শিশুদের শিক্ষা হবে আনুষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক। যার লক্ষ্যে অঙ্গনওয়াড়ী ও ICDS । এরপর ১৯৯৪ সালে DPEP প্রকল্প। অঙ্গনওয়াড়ী ও ICDS থেকে আগত শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উপযোগী করা বা পিছিয়ে পড়া শিশুদের অর্থাৎ ৬-১০ বছর বয়সীদের শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে। ২০০১ সালের সমীক্ষায় দেখা গেল সারা দেশে ২৫ কোটি শিশু শিক্ষাঙ্গনের বাইরে। তাদের শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে অর্থাৎ ২০০৭ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা ও ২০১০ সালের মধ্যে উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে গঠিত হল সর্বশিক্ষা মিশন। যা পরে শিক্ষার অধিকার আইন RTE ACT ২০০৯ অনুসারে সর্বশিক্ষা মিশন। বর্তমানে ২০১৮-২০১৯ এর কেন্দ্রীয় বাজেটের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অভিযানের সাথে যুক্ত হয়ে সমগ্ৰ শিক্ষা অভিযান (SSA) নামে পরিচিত। সর্বশিক্ষা অভিযানের লক্ষ্য ছিল সমস্ত শিশু বা শিক্ষার্থীর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা সমাপন হবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে। সর্বশিক্ষা মিশন হল মাধ্যমিক পর্যন্ত। আর সমগ্ৰ শিক্ষা অভিযান প্রকল্পে বিদ্যালয় শিক্ষা প্রাক-প্রাথমিক দ্বাদশ শ্রেণি এক ছাতার তলায় চলে এল। এত কথা বলার কারণ – স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরে সকল শিশুর শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে সরকার UNICEF, WORLD BANK, UDA, SIDA থেকে অর্থ সাহায্য নিলো। পরিকাঠামো রচিত হলো সেই টাকায়। RTE ACT লাগু করতে দ্বিতীয় বার এলো WORLD BANK।
১৯৯১ সালে নরসিংহ রাও প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেখলেন কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি জনার্দন রেড্ডি কমিটি গঠন করে আরেকটি নতুন শিক্ষানীতি আনলেন। এই দুটি শিক্ষা নীতি কোঠারি কমিশনের বাইরে কিছুই বলেনি। কেন শিক্ষা নীতি লাগু করা হলো না? কীসের অসুবিধে? কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল এটা নেহাতই নির্দেশিকা। মানতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। শিক্ষার অধিকার কী মৌলিক অধিকার? প্রশ্ন ওঠে। আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ১৯৯৩ সালে উন্নিকৃষ্ণন ও অন্যান্যরা বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য মামলায় সুপ্রীম কোর্ট ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার অধিকারকে একটি “অধিকার” হিসেবে গণ্য করে বলেন, “এ দেশের নাগরিকদের শিক্ষার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ২১ ধারা থেকে এই অধিকার জন্মায়। কিন্তু এটি চরম অধিকার নয়। এর অন্তর্বস্তু ও প্রয়োগ ৪৫ এবং ৪১ ধারার দ্বারা নির্ধারিত। অন্য, এ দেশের প্রতিটি শিশু/নাগরিক ১৪ বছর বয়স অবধি বিনা ব্যয়ে শিক্ষা পাওয়ার অধিকারী। তারপর তার শিক্ষার অধিকার রাষ্ট্রের আর্থিক সঙ্গতির দ্বারা সীমাবদ্ধ।” এই রায়ের পর শিক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করার জন্য দেশব্যাপী দাবি ওঠে। সংবিধান সংশোধন করে ২০০২ সালে ৮৬ তম সংশোধনীতে নতুন ধারা যুক্ত হয়। ২১ (ক) ধারা। এই ধারায় বলা হয় – “রাষ্ট্র ৬-১৪ বছর বয়সী সব শিশুদের বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এমন ভাবে করবে যা রাষ্ট্র আইনের দ্বারা স্থির করবে।” এই আইনই হল RTE ACT। যা বলবৎ হয় ২০১০ সালের ১ লা এপ্রিল থেকে। এই আইন দ্বারা স্থির করবে – আইনের এই ফাঁক গলেই বেরিয়ে এল আজকের জাতীয় শিক্ষানীতি। ৪৫ ধারার নতুন অন্তর্ভুক্তি হল। “রাষ্ট্র ৬ বছরের কমবয়সী শিশুদের শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করবে।” নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে ৩ বছর থেকে পড়াশোনা শুরু। তার কথাই বলা আছে। বলা নেই ০-৩ বছরের কথা। রাষ্ট্র কী তার শৈশবকালীন যত্নের দায়িত্ব নেবে? ৬৬ পাতার জাতীয় শিক্ষানীতির কোথাও বলা নেই। এক্ষেত্রে ৪৫ ধারার নতুন কোনো অন্তর্ভুক্তি এল কী? আমার জানা নেই।
এতক্ষণ আমরা যে নীতি এবং জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনা করলাম তার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। লাগু করা হয়নি সরকারি উদাসীনতায়। বা যতটা করা হয়েছিল মোটামুটি ভাবে তা সুফলপ্রসূ হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতি এই আইনের ফাঁকফোকর গলে এমন একটি কাঠামো খাড়া করেছে যা লাগু হলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সম্পূর্ণ উৎপাটিত হয়ে যাবে। ২০৩০ সালের পর সরকারি স্কুল আণুবীক্ষণিক হয়ে যাবে। ২০৩৩ পর থাকবেই না। এই শিক্ষানীতির সর্বাঙ্গ ভালো ভালো শব্দের মোড়কে ঢাকা। শুরুতেই আমি ম্যাজিকের কথা বলেছিলাম। এই সেই ম্যাজিক। শব্দের ম্যাজিক। কথার কারিগরিতে ভেসে গেলে আপনি অন্ধভক্ত বনে যাবেন। শব্দের মায়াজাল কাটাতে পারলেই দেখবেন শিক্ষা একেবারে খাদের কিনারে। শুধু টোকা মারার অপেক্ষা। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি এই টোকার কাজ করবে।
এবার দেখি কী আছে এই জাতীয় শিক্ষানীতিতে। এই শিক্ষানীতিতে বর্তমানে প্রচলিত ১০+২ স্কুল শিক্ষাকে ভেঙে ৫+৩+৩+৪ করা হল। প্রথম পাঁচ হল ভিত্তিস্থাপক শিক্ষা (foundational)। এর নাম দেওয়া হয়েছে ECCE – Early Childhood Care and Education। তিন বছর বয়সে শিক্ষা শুরু। শেষ ক্লাস টুতে। পরের ৩ বছর ক্লাস থ্রী থেকে ফাইভ। বয়ঃক্রম ৮-১১। প্রস্তুতি করণ শিক্ষা (preparatory)। তারপরের তিন বছর ক্লাস সিক্স থেকে এইট। মধ্যবর্তী শিক্ষা (middle) বয়ঃক্রম ১১-১৪। শেষ চার বছর নবম থেকে দ্বাদশ মাধ্যমিক। বয়ঃক্রম ১৪-১৮। নতুন শিক্ষানীতি অনুসারে তিন বছর হলেই শিশুকে ভর্তি করতে হবে অর্থাৎ স্কুলে পাঠাতে হবে। কোন স্কুল? না অঙ্গনওয়াড়ী। পড়াবে কে? ICDS কর্মী। ক্লাস টুতে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলে প্রাইমারী সেকশনে ভর্তি হবে। তিন বছর সেখানে পড়ে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলে সিক্সে ভর্তি হবে। এই টার্মে শুরু হবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা। কোন বৃত্তি? শিশুর এলাকায় যেটা available। সেই এলাকায় যেটা বহুল প্রচলিত। অষ্টম উত্তীর্ণ হলে মাধ্যমিক শিক্ষা। এখানে শিশু বিষয় নির্বাচনের সুযোগ পাবে। নিজের পছন্দ মত যে কোনো বিষয় পড়তে পারবে। দ্বাদশে ফাইনাল পরীক্ষা। তবে ৬ মাস অন্তর NTA পরীক্ষা নেবে। সেটা optional। সবাই দিতে নাও পারে। আপনি বলবেন ঠিকই তো আছে। অসুবিধা কোথায়? অসুবিধা – (১) ECCE তে কে পড়াবেন? ICDS কর্মী (পড়ার কথা ‘বালবাটিকা’-য়। কিন্তু তা এখন বিশ বাঁও জলে। অতএব?) প্রশ্ন উঠবে তিনি কী পড়ানোর যোগ্য? বা শেখানোর কৌশল তাঁর জানা আছে কি? না নেই। তাঁকেও শিখতে হবে। তাঁদের মধ্যে যাদের ১০+২ শিক্ষাগত যোগ্যতা তাদের অনলাইন ট্রেনিং নিতে হবে। যাদের নেই তাঁরা ছ’মাসের বিশেষ কোর্স করবেন। এই কোর্সের ফিজ কত? ১.১০- ১০ লাখ। কে দেবে টাকা? ICDS কর্মীরা যে পরিমাণ মাইনে পান তাতে এঁদের উপর বাড়তি চাপ নয় কি? প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার এঁদের শেখানোর জন্য মানে ট্রেনিং করানোর জন্য ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া কমিটির সদস্য অনুরাগ বেহার একটি ECCE Training centre খুলেছেন। মুম্বাই, মিরাট, জলন্ধরে ECCE TRAINING CENTER হয়েছে। আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও হয়েছে। এটা কোন রাঘব বোয়ালের, সে নাম জানা যায়নি। দরাদরি করে ভর্তি কনফার্ম হলে তবেই সাক্ষাৎ মিলবে। এই ECCE-র পাঠ্যক্রম ও পাঠপদ্ধতি পঠন-পাঠনের দায়িত্ব NHRD (National Human Resource development)। এর সদস্য কারা। Promoter, builder, real estate developer। আর রাজ্যের ক্ষেত্রে MSME এবং NGO। ব্যবসার নতুন দিগন্ত। (২) আপনি যদি শিক্ষিত এবং আর্থিক সঙ্গতিপূর্ণ হন আপনি কি অঙ্গনওয়াড়ীতে পাঠাবেন? সোজা কথায় খিচুড়ি স্কুলে পাঠাবেন না। অতএব কোথায় যাবে? – KIDZEE, EUROKIDS, LITTLE MILLENNIUM, KIDS CAMPUS, SEASAME, MOUNT LITERA. বেসরকারিকরণের খোলা পথ। (৩) যত পরিমাণ শিশু তত কি কর্মী আছে? এর উত্তর না? কোথায় পাওয়া যাবে? শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের যাদের ১০+২ যোগ্যতা আছে তাদের ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করানো হবে। কারা নেবেন ট্রেনিং? বাছাই করবে কে? স্থানীয় রাজনৈতিক দল। স্বেচ্ছাসেবক বেছে নেওয়া হবে? গন্ধ পাচ্ছেন? Pear Tutoring , one to one শিক্ষার ব্যবস্থা হবে। ‘একল’ স্কুলের নাম চোখে ভাসছে? ECCE CADRE তৈরির/নিয়োগের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। কারা হবেন ECCE CADRE। ১০+২ পাশ করা ব্যক্তি। বিশেষত যারা সদ্য সদ্য পাশ করেছে। এদের নিয়োগ দেওয়া হবে। সোজা কথায় সিভিক টীচার। শাসক ঘনিষ্ঠ। এই সুযোগে RSS CADRE-রাও চলে আসবে। কোমলমতি শিশুদের মধ্যে ঘৃণার, বিদ্বেষের বীজ বুনে দেবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে টাকা পয়সার লেনদেনও চলতে পারে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে যা হলো। বা যা হচ্ছে। আদিবাসী এলাকায় আশ্রমশালা ও বিকল্প বিদ্যালয় ফরম্যাট চালু করা হবে (১.৮ জা.শি) । কেমন বিদ্যালয়? অবশ্যই সঙ্ঘীয়। কেননা UDA-এর টাকায় আগেই বহু সৈনিক স্কুল, বর্ডার স্কুল তৈরি হয়ে গেছে। আরো হবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর আশ্রমশালা তৈরি। বিশ্বাস না হয় আদিবাসী অধ্যুষিত জঙ্গল এলাকা গুলো দেখুন।
(৪) এতো গেল শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । কী শেখানো হবে প্রথম পাঁচ বছরে। মৌলিক সাক্ষরতা, মাতৃভাষার ধারণা আর সংখ্যা জ্ঞান। আরো দু’একটি ভাষা। কারণ UNESCO গবেষণা করেছে ৩-৮ বছরে শিশুর মস্তিষ্ক অনেক উন্নত থাকে। বিবেকানন্দ বলেছেন – “Education is manifestation of perfection already in man”। শিশুর অন্তরাত্মার উপর জোর দেওয়া হবে। তার ইচ্ছাশক্তি, প্রেরণাটাই আসল। তাই এই সময়ে থাকা অবস্থায় শিশুকে অনেকটা ধারণা দিয়ে দিতে হবে। এর জন্য তৈরি হচ্ছে DIKSHA (digital insfructer for knowledge sharing) – জাতীয় জ্ঞান ভান্ডার । সেই জ্ঞান ভান্ডারে থাকবে আধুনিক ধারণা নয় জাতির প্রাচীন/ অতীত ঐতিহ্যময় ইতিহাস। ‘ব্যাদে সব ছিল’ এই ধারণা থেকে অনুপ্রেরণা মূলক বই রচনা করা হবে ( জা শি ২.৮)। জাতীয় পুস্তক প্রচার নীতি প্রস্তুত করা হবে। জাতীয়তার একেবারে ছড়াছড়ি। একদেশ একশিক্ষা এই ভাবনা থেকেই তৈরি হবে সিলেবাস। বলা আছে সমস্ত ভারতীয় ভাষায় বইগুলো অনূদিত হবে। পরক্ষণেই বলা আছে সম্ভবপর হলে। গন্ডগোল এখানেই। সম্ভব হবে না। খরচের অজুহাত দেখানো হবে। অতএব চলবে একদেশ একশিক্ষা একভাষা। হিন্দীতে পড়তে হবে। প্রস্তুতিকরণ শিক্ষায় ক্লাস থ্রী থেকে ফাইভ বিষয় ভিত্তিক বিমূর্ত ধারণা শিক্ষা দেওয়া হবে। প্রথাগত পাঠ। এখন যেমন আছে। কিন্তু তৃতীয় স্তরে ক্লাস সিক্স থেকে এইট এই সময় চালু হবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা। ২০১২-২০১৭ দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেখা গেছে ভারতীয় শ্রমজীবীদের মধ্যে পাঁচ শতাংশেরও কম প্রথাগত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। যেখান USA, জার্মানিতে ৫০%-৭৫% । ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতকেও এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। তাই মিডল স্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষা আবশ্যিক। এখানে শিক্ষার্থী বই ব্যাগের ভার কমিয়ে দশদিনের জন্য ইন্টার্ণশিপ করবে(জা শি ৪.২৬)। প্রশ্ন এখানেই। এই স্তরে শিক্ষার্থী কী শিখবে না রাজ্য ও স্থানীয় স্তরে ঠিক করে দেওয়া এবং স্থানীয় দক্ষতার অনুসারে। তাহলে কী দেখা গেল? চাষীর ছেলে চাষী। কামারের ছেলে কামার। চটকল সমৃদ্ধ এলাকায় ঐ কাজ। বজবজ মেটিয়াব্রুজে দর্জিশিল্প। দশদিনের ইন্টার্ণশিপের অর্থ শিক্ষার্থী বিনা পয়সায় শিক্ষানবিশি করতে গিয়ে একদিকে বেকার শ্রম দেবে। অন্যদিকে মা বাবার হাতের কাজের যোগানদার হবে। ছেলে কাজের লায়েক হলে দুটো পয়সার আশায় মা বাবা আর তাকে পরবর্তী ধাপে পাঠাবে না। ঘরে ঘরে সস্তার অদক্ষ মজুর তৈরি হবে। বহুজাতিক কোম্পানি গুলোর জয়জয়কার। আর NRC হলে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভরে জাহাজ ভর্তি করে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে পেটভাতায় খাটতে পাঠাবে। বিদেশের বাজারে সস্তা মজুরের যোগানদার হবে ভারত। সমীক্ষা বলছে ২০৩০ সালে ভারতে সব থেকে বেশি কর্মক্ষম যুবক থাকবে। অতএব দাস ব্যবসার নতুন দিগন্ত। অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, কাজ চাই বলে কোনও আন্দোলন থাকবে না। সুখে রাজ্যপাট চালানো যাবে। জাতির মাজা ভাঙার নির্ভুল পরিকল্পনা। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী বিষয় নির্বাচনের সুযোগ পাবে। একই সাথে ইতিহাস বিজ্ঞান পড়তে পারবে। দশম দ্বাদশ বোর্ডের পরীক্ষা থাকবে। তবে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার জন্য সেমেস্টার ভিত্তিক পরীক্ষা হবে। এই পরীক্ষা নেবে কে? NTA। বর্তমান কোচিং সংস্কৃতিকে সরাতেই এই ব্যবস্থা। জাতীয় ধাঁচে পরীক্ষা হলে, আর সেই পরীক্ষায় পাশ করতে হলে শিক্ষার্থীকে পাড়ার কোচিং সেন্টার ছেড়ে বাইজুস, টিউটোপিয়া-তে নাম লেখাতেই হবে। সব দিক দিয়ে সাধারণ মানুষকে হাতে না মেরে ভাতে মারার ব্যবস্থা। NTA পরীক্ষা তো নেবে? মাধ্যম কী হবে? হিন্দি অথবা ইংরেজি, এটা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে। পারবে আমার আপনার মতো সাধারণ বাড়ির ছেলেমেয়েরা। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। এছাড়াও ত্রিভাষা শিক্ষানীতির নামে পড়ানো হবে সংস্কৃত। বাধ্যতামূলক মাতৃভাষার শিক্ষা শুধুমাত্র ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত। তারপর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি যেমন চাইবেন। আমরা তো জানি পরিচালনা কমিটি সব সময় শাসক ঘনিষ্ঠ। অতএব হিন্দীর জয় জয়কার। তাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিয়েই ছাড়বে।
এতো গেল পড়ার কথা। পাশ ফেলের কী হবে? RTE ACT অনুযায়ী কোন শিক্ষার্থীকে কোন ক্লাসে ডিটেইন করানো যায় না অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এই ব্যবস্থায় পরীক্ষা হবে ক্লাস টু, ক্লাস ফাইভ, ক্লাস এইটে। একটা ধাপে পাশ করলে তবেই যাবে পরবর্তী ধাপে। ফেল করলেও চিন্তা নেই। স্কুলে গিয়ে না পড়ো পয়সা ফেলে ডিসট্যান্স লার্নিং করতে পারো। প্রথম প্রজন্মের ভুরি ভুরি শিক্ষার্থী ফেল করবেই। সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী কমবে। কমবে বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা। আস্তে আস্তে সরকারি স্কুলগুলো উঠে যাবে। শিক্ষার্থী কমলে শিক্ষক নিয়োগও করতে হবে না। কোন দোষ নাম ছাড়াই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সরকার হাত তুলে নেবে। Drop Out এর হিসেব থাকবে না। Multiple entry, multiple exit এই গালভরা নাম দিয়ে বৃহত্তর একটা অংশকে শিক্ষার আঙ্গিনা থেকে ছিটকে যেতে বাধ্য করা হবে। ২০১৭ সালেই নীতি আয়োগের শীর্ষকর্তা অমিতাভ কান্ত ফিকি-র সম্মেলনে বলেছিলেন এইসব স্কুল, কলেজ চালিয়ে সরকারের কোনও লাভ হচ্ছে না। এগুলো বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়াই ভালো। আর সংবিধানে তো শিক্ষা ব্যবস্থা চালানোর জন্য সরকার আইন আনতে পারে একথা বলা আছে। আইন আনতে কতক্ষন। খাঁচা তো রেডি। ধাঁচায় ফেললেই হলো। যে কথা বলছিলাম – শুধু ডিসট্যান্স লার্নিং নয় প্রয়োজনে বাড়ি বসেও শিখতে পারে। শুধু লেখাপড়া শিখতেই হবে এমন কথা কে বলেছে? শেখার আরো কত কিছু আছে। ৬৪ ভারতীয় শিল্পকলা আছে। মেয়েরা এর পাঠ নেবে। অঙ্গসজ্জআ, গৃহসজ্জা, ফুলের বিছানা, গৃহস্থালির হরেকপাঠ নারী শিখবে। তার সংসার ধর্ম ও সন্তান পালনের বাইরে বেশি কিছু শেখার কি দরকার? ফতোয়া জারি হবে। তালিবানি সঙ্ঘীয় ফতোয়া। উত্তরপ্রদেশে যেমন হচ্ছে দলিতদের উপর অত্যাচার। যে পাশফেলের কথা শুরু করেছিলাম ইতিমধ্যেই তার কাজ কিছুটা শুরু হয়েছে। SAS – State Achievement Survey করে ডিটেনশনের কথা রাজ্যগুলো কে বলা হয়েছিল। SAS চালুও হয়েছে। কিন্তু পাশফেল বা স্কুল লেভেলে ডিটেনশন চালু হয়নি এ রাজ্যে। যদিও এক হাস্যকর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ SAS এর মূল্যায়নে প্ল্যাটিনাম এওয়ার্ড পেয়েছে। তবে জাতীয় শিক্ষানীতি চালু হলে SAS এবং NAS হবে সরকারি স্কুল থাকা না থাকার মাপকাঠি।
৬৬ পাতার জাতীয় শিক্ষানীতিতে আলোকপাত করা, এর জৌলুসময় ভাষার খোলস ভেঙে সঠিকটা বের করা আচ্ছে দিনের মতোই অসম্ভব। তবে আমরা ঘরপোড়া গরু। তাই একে শিক্ষাঘাতী দলিল ছাড়া আর কিছুই বলতে পারছি না। আশাকরি অনেকটা খোলস ভাঙতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আরো পারব।
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৩ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.socialnews.xyz/2022/04/05/new-delhi-protest-against-new-education-policy-gallery/ [Retrieved On: 10/09/2023]
