নেপালের Gen-Z বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা

আনন্দ তেলতুম্বে

প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় Outlook পত্রিকায়, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে।
লিঙ্ক – https://www.outlookindia.com/international/deciphering-the-gen-z-revolution-in-nepal
কভার ফটো – Prakash Timalsina
প্রবন্ধটির গুরুত্ব অনুধাবন করে আমরা তার একটা বাংলা তর্জমা প্রকাশ করলাম


ভাষান্তর – বিতান দে

হিমালয়ের চেন অব মাউন্টেন, ফ্লরা আর ফনায় ঠাসা অরণ্য এবং বহু ঐতিহাসিক যুদ্ধের উপেক্ষিত নায়ক – সরল, সাহসী গোর্খা জনজাতি – এক কথায় নেপাল বলতে এই ছবিটাই আমাদের মনে ভেসে ওঠে। ভারতবর্ষের প্রতিবেশী সেই দেশ আজ সামাজিক ও রাজনৈতিক গণ-অভ্যুত্থানের আগুনে ফুঁসছে। এই বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে জেনারেশন-জেড (Gen-Z) বয়ঃসীমার যুবাদের বহুদিনের পুঞ্জীভূত হাতাশা, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি বিতৃষ্ণা। এক দশক আগে, তারা নেপালে রাজতন্ত্রের পতন এবং গণ-প্রজাতন্ত্র গঠনের সাক্ষী। ২০১৫ সনের সেই দিনগুলি জনমানসে যে স্বপ্নময় উচ্চাশার সঞ্চার করেছিলো, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক আপাদমস্তক শুন্য সম্ভাবনার, প্রতারণার রঙ্গভূমি ছাড়া কিছুই নয়।

প্রাথমিকভাবে দেখতে গেলে, নেপাল সরকারের তরফে ২৬-টা সামাজিক মাধ্যম-কে (social media platform) নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। সরকারের তরফে এই মাধ্যমগুলোর বিপক্ষে সরকারি প্রতিবিধান না মানাকে এগুলো নিষিদ্ধ করার কারণ বলে দাবি করা হলেও আসল কারণ অন্য। ফেসবুক, টিকটক বা ইন্সটাগ্রাম নেপালের শহুরে যুবকদের কাছে বিনোদনের মাধ্যম কম, বরং সরকার-বিরোধী ক্ষোভ প্রকাশ এবং জনমত গড়ে তোলার প্লাটফর্ম হয়ে উঠেছিল বেশি। দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সঞ্চিত ক্ষোভ হঠাৎই একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য পেল — এমন একটা রাষ্ট্র, যে শুধু সুযোগ-সুবিধা দিতে ব্যর্থ নয়, বরং নাগরিকদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়ারও চেষ্টা করছে। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা ছড়িয়ে থাকা ক্ষোভকে রূপান্তরিত করল উন্মুক্ত প্রতিবাদে। পরিণতি ছিল সারাদেশে দ্রুত, ব্যাপক বিক্ষোভ। সরকার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ১৯ জন প্রতিবাদীকে হত্যা করে এবং আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট ও মন্ত্রীদের বাসভবনে আগুন লাগানো হয়, মন্ত্রীদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়, তাড়া করে মারধর করা হয়। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং সামাজিক দুর্দশা

নেপালের বর্তমান দুরবস্থার প্রধান কারণ হলো এর ভঙ্গুর অর্থনীতি। অকিঞ্চিৎকর শিল্প উৎপাদন, বিদেশী আমদানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, এবং সর্বোপরি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) একটি বড় অংশ প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে টিকে থাকা তারই সাক্ষ্য দেয়। সরকারি পরিসংখ্যানে নজর রাখলে দেখা যায় যে নেপালের ১৫ শতাংশেরও বেশি যুবক বেকার, আর প্রায় ৪০ শতাংশ যুবক তাদের যোগ্যতার তুলনায় কম মানের চাকরির সাথে যুক্ত; হয় অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীন কাজের উপর নয়তো বিদেশে মরশুমি শ্রমের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। নেপালের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বেকারত্ব ২০১৭-১৮ সালে ছিল ১১.৪ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ সালে বেড়ে ১২.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে ১৫-২৪ বছর বয়সী যুবকদের বেকারত্ব ২২.৭ শতাংশে দাঁড়ানোয়। বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুব বেকারত্বের হার ২০.৮ শতাংশ।

এই প্রেক্ষাপটে, তরুণ প্রজন্ম হতাশ, সরকারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। বছর বছর নেপালি শ্রমিকদের গণপ্রস্থান অব্যাহত রয়েছে — প্রতিবছর ৬ লক্ষাধিক মানুষ চাকরির সন্ধানে উপসাগরীয় দেশগুলো, মালয়েশিয়া, এবং কোরিয়া ও জাপানে পাড়ি জমাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে একটি বিস্ময়কর প্রবণতাও দেখা গেছে যে হতাশ তরুণরা এমনকি অর্থ ও স্থায়ী আবাসনের প্রলোভনে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধেও অংশ নিচ্ছে। এই অভিবাসন কেবল চাকরির অভাবকেই নয়, বরং নেপালের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাশাকেই তুলে ধরে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১,৭০০ জন মানুষ কাজের খোঁজে দেশ ছাড়ছে। শিক্ষা ব্যবস্থারও তথৈবচ হাল — প্রতিবছর কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী বিদেশে সম্ভাবনার খোঁজে দেশ ত্যাগ করছে (সূত্র: অন্নপূর্ণা এক্সপ্রেস)।

এদিকে, সম্পদের বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে। ২০১৯ সালের “Fighting Inequality in Nepal: The Road to Prosperity” (Oxfam, HAMI) শীর্ষক এক গবেষণা অনুযায়ী, নেপালের প্রথম ১০% ধনী লোক দেশের দরিদ্রতম ৪০% মানুষের সম্পদের তুলনায় ২৬ গুণ বেশি সম্পদের মালিক। একই গবেষণায় দেখা গেছে, শীর্ষ ১০% আয়ের দিক থেকেও দরিদ্রতম ৪০% মানুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি উপার্জন করে। আয়ের বৈষম্য, যা গিনি সহগ (Gini coefficient) দ্বারা পরিমাপ করা হয়, তা ২০১০-১১ সালে ০.৪৯ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ০.৫৮-তে পৌঁছেছে (Asia Today)। সম্পদের বৈষম্য আরও প্রকট — ২০১০-১১ সালে সম্পদের গিনি সহগ ছিল প্রায় ০.৭৪, যা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভূত হিয়এ থাকারই ইঙ্গিত দেয় (Nepal Economic Forum)।

দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে, তবে খুব শ্লথগতিতে। নেপাল লিভিং স্ট্যান্ডার্ডস সার্ভে (NLSS) ২০২২-২৩ অনুসারে, এখনও ২০.২৭% নেপালি জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, যা ২০১১ সালের ২৫.১৬% থেকে সামান্য কমেছে। Oxfam-এর হিসাব অনুযায়ী, এখনও ৮.১ মিলিয়নের বেশি নেপালি দারিদ্র্যে বসবাস করছে। গ্রাম ও শহরের বিভাজন এই দৈন্যদশাকে আরও জটিল করে তোলে — গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ২৪.৬৬%, যেখানে শহরাঞ্চলে এটি ১৮.৩৪%। প্রাদেশিক স্তরেও বৈষম্য অত্যন্ত স্পষ্ট। অর্থনৈতিক স্থবিরতা আরও বেড়েছে মানব উন্নয়ন সূচকের পতনের কারণে: শিক্ষা ব্যবস্থায় অগ্রগতি স্থবির, স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশা, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, ভূমিকম্প), এবং খাদ্য ও আবাসন ব্যয়ের মুদ্রাস্ফীতি প্রান্তিক পরিবারগুলোর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

দুর্নীতি এবং স্বজনপোষণ

বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রধান ক্ষোভের কারণ হয়েছে দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, যা কখনোই সুবিচারের আওতায় পৌঁছায় না বলে মনে করা হয়। একটি উদাহরণ হলো ২০১৭ সালের এয়ারবাস চুক্তি, যেখানে নেপাল এয়ারলাইন্স দুটি A330 ওয়াইড-বডি জেট কেনে; তদন্তে ১.৪৭ বিলিয়ন রুপি (প্রায় ১০.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রধান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তবে অনেকেই মনে করেন বিচার ছিল লোকদেখানো, কার্যকর নয়। রাজনৈতিক শ্রেণীটা—যা নেপালি কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফাইড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) বা সিপিএন-ইউএমএল এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী কেন্দ্র) নিয়ে গঠিত—এই দলগুলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং মাওবাদের পতাকায় লড়াই করলেও, বাস্তবে সব দলের মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। সিদ্ধান্তগুলো গোপনে নেওয়া হয়, দলীয় নেতারা নিজেরাই সেগুলো জানতে পারে না, এবং রাষ্ট্রের সম্পদ পৃষ্ঠপোষকতার জন্য হরিরলুট হয়।

দুর্নীতি যে কী হারে ব্যাপক হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ মেলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘কোরাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্স’ নিয়মিতভাবে নেপালকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ কর্মক্ষমতার মধ্যে স্থান দেওয়ায়। চাকরি পাওয়া থেকে শুরু করে মৌলিক পরিষেবায় পৌঁছানো পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে ঘুষের রমরমা। এ কারণে যুব সমাজের মধ্যে এই ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, এত কষ্টে মানুষের ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত গণতন্ত্রটি আজ খালি একটি খোলস মাত্র। মাওবাদীরা একসময় বিপ্লবী পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, এখন সবচেয়ে ঠকবাজ হিসেবে প্রতিপন্ন।। তারা তাদের বৈপ্লবিক লক্ষ্যগুলোকে শিকেয় তুলে দিয়ে সেই ব্যবস্থাটিরই অংশ হয়েছে, যেটির তারা একসময় নিন্দা করত। তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি শুধু বিশ্বাসঘাতকতা নয়—এটি এক প্রতারণা।

দুর্নীতির সবচেয়ে ঘৃণ্য রূপ যা Gen-Z সবচেয়ে ঘৃণা করে তা হলো “নেপো-কিড্‌স” বা নেপালের অভিজাতদের সন্তানরা—মন্ত্রী, সাংসদ, প্রশাসকদের সন্তান—ফ্ল্যাশি ইন্সটাগ্রাম রিলে যাদের গাড়ি চালাতে দেখা যায়, যারা বিদেশে পড়াশোনা করে, রিসর্টে ছুটি কাটায়, অথচ তাদের পিতামাতার সমবয়সীরা লাইন ধরে অপেক্ষা করে। এই অবজ্ঞা গভীর এবং স্পষ্ট।

তরুণদের অবজ্ঞা

উপেক্ষিত তরুণরা তাই আজকের অশান্তির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তারা শিক্ষিত কিন্তু বেকার, সামাজিক মাধ্যমে সংযুক্ত অথচ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের বিক্ষোভগুলো, বিশেষ করে রাজধানী এবং অন্যান্য শহরে, দাবি জানানোর জন্য নয় বরং খাঁটি ক্রোধ প্রকাশ করার জন্য—সব রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে, সব রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে, এবং সেই রাজনীতির মডেলের বিরুদ্ধে যা নেপাল কয়েক দশক ধরে সহ্য করছে। এই স্পষ্ট কোনো সমাধান না থাকা অনেক বিশ্লেষককে বিভ্রান্ত করেছে, তবে এটি আরও একটি গভীর সত্য প্রকাশ করে যে—মতবাদ, নির্বাচনী ঘোষণাপত্র বা প্রতিশ্রুতির উপর থেকে তরুণ প্রজন্মের বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।

এই মুহূর্তটিকে যেটা অনিশ্চিত করে তোলে সেটা হলো নেপালের সাম্প্রতিক সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাস। মাওবাদী অভ্যুত্থান (১৯৯৬-২০০৬) চলাকালে, লক্ষ লক্ষ কার্যকরি সদস্য প্রশিক্ষিত হয়েছে, বৈপ্লবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে এবং তারা সমাজে অন্তর্ভুক্ত হলেও সেটা ঘটে আংশিকভাবে। অস্ত্র ত্যাগ করার পরও, অনেক প্রাক্তন যোদ্ধা রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়নি। তারা চলমান অস্থিরতায় কী ভূমিকা রাখবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তারা হতাশ তরুণদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি বিষণ্ণতায় নিমজ্জিত হয়ে যাবে? এর উত্তরটাই নির্ধারণ করে দেবে যে Gen-Z’র বিপ্লব শুধুমাত্র অসন্তোষের বিক্ষোভ হয়েই থিক যাবে, নাকি এটি আরও সংগঠিত ও বিপজ্জনক কোনো কিছুকে রূপ দেবে।

রাজতন্ত্রের ছায়া

বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো রাজতন্ত্রপন্থী কণ্ঠস্বরের পুনরুত্থান। নেপালের কিছু অংশের সমাজ—বিশেষত পাহাড়ি অঞ্চলে এবং প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে—রাজতন্ত্রকে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং জাতীয়তাবাদের পরিচয় হিসেবে মনে করা হয়। প্রজাতন্ত্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায়, রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলি ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করেছে, সমাবেশ আয়োজন করছে এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হচ্ছে ।

২০০৮ সালে রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়, যখন রাজা জ্ঞানেন্দ্র-র প্রত্যক্ষ শাসন (২০০১-২০০৬) গণ-অভ্যুত্থানের চাপে ভেঙে পড়ে। তবুও, ২০২৫ সালে, অতীতের স্মৃতি আবার কড়া নাড়ছে। বিগত মার্চ মাসে, হাজার হাজার মানুষ রাজধানীতে সমবেত হয়ে সাংবিধানিক হিন্দু রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি-র (RPP) মতো দল এবং যৌথ গণ-আন্দোলন কমিটি-র (JPMC) মতো মঞ্চ ছিল এগুলোর মধ্যে অন্যতম উচ্চকণ্ঠ সমর্থক। তাদের আবেদনের একটা ঝলক পাওয়া যায় RPP-র একটা লিফলেটে, যেখানে লেখা হয়েছিল: “রাজার আমলে অন্তত আমাদের সম্মান ছিল।”

এখন প্রশ্ন হলো রাজতন্ত্রপন্থীরা কি অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে? বর্তমানে, পরিস্থিতি তেমন অনুকূল নয়। নিরাপত্তা বাহিনী এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রজাতন্ত্রের প্রতি অনুগত, তরুণ নগরবাসীদের মধ্যে রাজতন্ত্রপন্থী সমর্থন ক্ষীণ, এবং অভিজাতদের মধ্যেই নানারকম বিভাজন এই রাজতন্ত্রপন্থী অভ্যুত্থানের ধারণাকে প্রান্তিক করে রেখেছে। তবুও, রাজতন্ত্রপন্থী মনোভাবকে অস্বীকার করা যায় না—শাসক দলগুলির দুর্নীতি, অতীতের স্মৃতি এবং সুযোগসন্ধানী অভিজাতরা এই অনুভূতি উস্কে দিচ্ছে। তবে, যুবসমাজ রাজতন্ত্রের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে না; তাদের ক্ষোভ অতীত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেয়ে বর্তমানকে প্রত্যাখ্যানের দিকে বেশি। তবুও, যদি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা অব্যাহতভাবে ব্যর্থ হয়, রাজতন্ত্র পুনরায় আবির্ভূত হতে পারে—তবে জনগণের দাবি হিসেবে নয়, বরং মোহভঙ্গ হওয়া অভিজাত বা বাইরের শক্তির দ্বারা একটি বিকল্প হিসেবে, যা নেপালকে স্থিতিশীল করতে চাইবে।

ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ

এইবার নেপালের বর্তমান অস্থিরতাকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যাক; যেহেতু এটি দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনীতির ভেতরে ঘটছে। ভারত ও চীনের মাঝে অবস্থিত নেপাল, এবং ক্রমবর্ধমানভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নজরবন্দী, এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।

চীন ধারাবাহিকভাবে তার প্রভাব বাড়িয়ে তুলছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে—পরিকাঠামো প্রকল্পে লগ্নি করছে এবং নেপালের কমিউনিস্ট দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে। তবে এর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। শাসক অভিজাতরা চীনা ঋণ ও বিনিয়োগকে স্বাগত জানালেও, সাধারণ নেপালি জনগণ প্রকল্পগুলোর স্থবিরতা, ঋণের ঝুঁকি বৃদ্ধি, এবং সার্বভৌমত্বের উপর ধীরে ধীরে নেমে আসা এই হুমকির বিষয়ে অবগত।

অন্যদিকে, ভারত ঐতিহাসিকভাবে নেপালের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার—যে ভূগোল, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির মাধ্যমে নেপালের সাথে বাঁধা। কিন্তু ২০১৫ সালের সীমান্ত অবরোধের পর থেকে তার প্রভাব অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে—একটি ঘটনা যা নেপালের স্মৃতিতে গভীর ক্ষত রেখে গেছে। তবুও, দিল্লি এখনও নেপালকে তার গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরিধির অংশ হিসেবে দেখে এবং চীনের প্রভাব প্রবেশ নিয়ে সতর্ক থাকে। নেপালের রাজতন্ত্রপন্থী ধারাকে ভারতের কিছু গোষ্ঠী কখনও কখনও নীরবে উৎসাহিত করে যায়, যারা মাওবাদী চরমপন্থা ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিকল্প হিসেবে রাজতন্ত্রকে স্থিতিশীল শক্তি মনে করে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র নেপালকে তার বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে। মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশন (MCC) কমপ্যাক্টের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও ভূরাজনৈতিক আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে, যার কারণ মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ। এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে, নেপালের অস্থিরতা কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সংকট নয়—এটি এমন এক ক্ষেত্রও, যেখানে বহিঃশক্তিগুলো নীরবে তাদের বিকল্পগুলো পরীক্ষা করতে পারে—সেটা ভারতপন্থী নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা হতে পারে, বেইজিংয়ের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে, অথবা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডকে জোরদার করাও হতে পারে।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং মানবাধিকার সংগঠনের মতো পশ্চিমা পক্ষগুলোও হস্তক্ষেপ করেছে, প্রতিবাদে নিহতদের তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং গণতন্ত্র রক্ষার দাবি জানিয়ে।

প্রশ্ন হলো রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতার সরাসরি প্রমাণ কি আছে? এখনো কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। রাজতন্ত্রের প্রতি আকর্ষণ মূলত দেশীয়ভাবেই তৈরি হয়েছে, যদিও কিছু প্রভাবশালী অভিজাত—বিশেষ করে বিদেশি সংযোগযুক্ত ব্যবসায়ী মহল—এতে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেখতে পায়। বেইজিং, দিল্লি, কিংবা ওয়াশিংটন এই ধরনের পরিবর্তনকে প্রকাশ্যে সমর্থন করবে—এমনটা এখনো সন্দেহজনক; আপাতত তাদের মূল আগ্রহ অস্থিরতার পরিবর্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে, গোপন সম্পর্ক এবং পরিবর্তনশীল রাজনীতির বৈশিষ্ট্য থাকা এই অঞ্চলে, বাইরের প্রভাবকে কখনো পুরোপুরি বাতিল করা যায় না।

নেপালের জেনারেশন-জেড (Gen-Z) বিপ্লব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি নেতৃত্বহীন, দাবি-বিহীন এবং আপসহীন। এটি কোনো সুস্পষ্ট কর্মসূচিসম্পন্ন আন্দোলনের চেয়ে বরং পুরো রাজনৈতিক শ্রেণির সঙ্গে এক ধরনের বিচ্ছেদ। এটি বিলীন হয়ে যাবে নাকি আরও সংগঠিত আকার নেবে—তা নির্ভর করবে নেপালের অভিজাত শ্রেণি এবং তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো বহিঃশক্তিগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তার ওপর।

তবে একটি বিষয় অস্বীকার করা যায় না – নেপালের যুবসমাজের ক্ষোভকে সহজে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি যদি ২৫ বছরের নিচে হয়, তবে প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা নির্ভর করছে শাসনব্যবস্থায় আস্থা পুনর্গঠন ও বাস্তব সুযোগ সৃষ্টির ওপর। যদি দুর্নীতি ও অবহেলা অব্যাহত থাকে, তবে এই অস্থিরতা সহজেই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারে—যা কেবল অভ্যন্তরীণ পতনই নয়, বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপকেও আহ্বান জানাতে পারে।

অতএব, নেপাল এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এটি হয় তার ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে নতুন করে প্রাণ দিতে পারে—অস্থির যুবকদের কথা শুনে, নয়তো গড়িয়ে যেতে পারে স্বৈরাচারী পরীক্ষার দিকে—হোক তা রাজতন্ত্রের পুনর্জাগরণ, সামরিক প্রাধান্য, অথবা “স্থিতিশীলতা”-র বিদেশি আরোপিত মডেল।

কিন্তু এই অস্থিরতার শিক্ষা কেবল নেপালেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি বিস্ময়করভাবে একই রকম—বিভ্রান্ত যুবসমাজ, ফাঁপা গণতন্ত্র, এবং সুরক্ষিত জীবনযাপন করা দায়িত্ববিহীন পুঁজিপতি শ্রেণী। ভারত এমন দুটো দেশের সাথে সীমানা ভাগ করে নেয় যেখানে Gen-Z’র বিপ্লব শাসক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তাই আত্মতুষ্টিতে ভোগাটা ভারতের ক্ষেত্রে শোভা পায় না। দিল্লির শাসকগোষ্ঠী বারবার সীমা অতিক্রম করেছে, এটা ধরে নিয়ে যে ভারতের বিশালতা ও বৈচিত্র্য অসন্তোষের বিস্ফোরণ থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখবে। কিন্তু যদি শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটে, তাহলে ভারতের এই বিশালতাই যে তাদের পতনটাকে বহুগুণে তীব্র করে তুলতে পারে সেটা ভুলে  যাওয়া উচিত নয়।

এখান থেকে শিক্ষাটা যথেষ্ট স্পষ্ট – জনগণের কথা শোনো, সার্বভৌমত্ব বজায় রাখো। Gen-Z’র কথা শোনো, যারা দেশের ভবিষ্যতের রূপকার। তাদের অবজ্ঞা করার মানে হলো গণতন্ত্রের ভিত্তিগুলোর সাথেই জুয়া খেলা।


মূল প্রবন্ধ এবং কভার ফটো সৌজন্যেhttps://www.outlookindia.com/international/deciphering-the-gen-z-revolution-in-nepal [Retrieved On: 28/09/2025]

 

One thought on “নেপালের Gen-Z বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা

Leave a Reply