লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যায়
নেপালের গণবিদ্রোহে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল যুবক-যুবতীরা। যেকোনো গণবিদ্রোহে তেমনটাই হয়। এটাই ঐতিহাসিক সত্য। এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, এক্স হ্যান্ডেল, থ্রেডের যুগে বিষয়টা অতীতের যে কোন সময় থেকে বেশি প্রচার পাচ্ছে আর সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচার মাধ্যম ঢাক পিটিয়ে চলেছে – জেন জি, জেন জি!
নেপালে বিগত দেড়শ বছরের ইতিহাসে বহুবার গণবিদ্রোহ হয়েছে। কখনো কোনো সংগঠিত শক্তি নেতৃত্ব দিয়েছে, কখনও নেতৃত্ব ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র নেতৃত্বে স্বৈরতান্ত্রিক জ্ঞানেন্দ্র শাহীর বিরুদ্ধে দেশজোড়া রাজতন্ত্র বিরোধী গণ বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে নেপালে রাজতন্ত্র বিদায় নেয়। যদিও রাজপরিবার এখনো নেপালের অন্যতম ধনী পরিবার এবং প্রভূত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। অতীতে সুযোগ পেয়েও মাওবাদীরা সশস্ত্রভাবে কাঠমান্ডু দখল করেনি। বরং দেশজোড়া গণঅভ্যুত্থানের ঘাড়ে চেপে ভোটে জিতে নেপালের ক্ষমতা দখল করে। অর্থাৎ নেপালের গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সংবিধান সভায় একটা গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান পাশ করাতে গেলে যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, মাওবাদীদের তা না থাকায় সেই সংবিধান পাশ করাতে পারেনি। বরং ক্ষমতায় আসার পর প্রভূত অর্থ সামনে দেখে বাকি দলগুলির মত নিজেরাই বদলে যায়। ক্ষমতালোভী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পার্লামেন্টে এমপি কেনাবেচার খেলায় জড়িয়ে পড়ে। জ্ঞানেন্দ্র শাহীর মতোই জনগণ গণতন্ত্রহীন অবস্থায় থেকে যায়। রাজনীতির ময়দানে প্রধান খেলোয়াড়রা, যথা নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন (ইউএমএল) ও মাওবাদীরা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল। অবস্থা রাজতন্ত্রের সময় থেকেও খারাপ হয়ে পড়ে।
লাগামছাড়া দূর্নীতি এবং নেপালের গণবিদ্রোহ
ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকার মতো দেশগুলিতে বিশ্বায়নী অর্থনীতি বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে। শাসক শ্রেণী লক্ষ্য করে যে পুরনো সামন্ত জমিদারী প্রথায় এত টাকা আসছে না যে বিশ্বায়িত দুনিয়ার সব সুখ অনন্তকাল ভোগ করা যাবে। ফলে সাম্রাজ্যবাদীরা এই দেশগুলোতে তাদের শোষণের প্রধান বাহন বানিয়েছে দালাল আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতি শ্রেণীকে। যদিও তাদের শোষণের ধরন সামন্ততান্ত্রিকই রয়ে গেছে, যাকে বলা যায় অর্থনীতি বহির্ভূত শোষণ বা বলপ্রয়োগে জনগণকে শোষিত হতে বাধ্য করা। এই শ্রেণী আমাদের মত দেশগুলিতে যা উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো থেকে যে বিশাল ঋণের টাকা আসছে, দুটোই বলপ্রয়োগে দূর্নীতি করে নিজেদের পকেটে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। ব্যাপারটা এমন – আমার টাকার বৃদ্ধি হচ্ছে এবং তা চুপিচুপি হচ্ছে না। সব ক্ষমতা আমার হাতে। জনগণকে ট্যা ফুঁ করতে দিচ্ছি না। সুতরাং বৈভবের নির্লজ্জ প্রকাশ তো ঘটতে থাকবেই। দু তিনটে উদাহরণ দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে। কাঠমান্ডুর সবথেকে বড় উঁচু লাক্সারি পাঁচ তারা হোটেল- হোটেল হিলটন (৮০০ কোটি টাকা দামী) এর মালিক নেপালি কংগ্রেসের নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেওবার ছেলে। মাওবাদী নেতা ও প্রাক্তন গেরিলা যোদ্ধা প্রচন্ডর নাতি বিদেশে কেনাকাটা করছে এবং তার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছে। আর বিদ্রোহের সময়কার প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির পুরো জ্ঞাতিগুষ্টি নেপালের জনগণের টাকা চুরি করছে এবং বিদেশে বসে ফূর্তি করছে আর তার ভিডিও পোস্ট করছে। এবং জনগণ যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে নামছে, বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট হাসিনার কায়দায় প্রতিবাদী জনগণকে গুলি করে মেরে ঠান্ডা করার চেষ্টা করছে।
বিপ্লব? নাকি শাসক পরিবর্তন?
ফলে বিদ্রোহ হলো ভয়ংকর। পুরনো ব্যবস্থার উপর যুবকদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলো। একদিনের মধ্যে জনগণের রাগের বস্তু হিসেবে চিহ্নিত যে প্রতীকগুলো, সেগুলো গুঁড়িয়ে গেলো বা আগুনে ভস্মীভূত হলো। যুবকরা প্রাসাদ, পার্লামেন্ট, সুপ্রিম কোর্ট, জেলখানা, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি, প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাড়ি ও প্রকাশ্য সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দিল। কম বয়সী ছাত্র যুবদের অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটলো। যে নেতারা পালাতে পারলো, তারা বেঁচে গেলো। যারা পালাতে গিয়ে জনগণের হাতে ধরা পড়লো, তারা আক্ষরিক অর্থেই গণ-ক্যালানি খেলো। হেলিকপ্টারের দড়িতে ঝুলে ঝুলে রাজনৈতিক নেতারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে বা যে যে পুলিশ অফিসাররা জনগণের উপর গুলি চালিয়েছে, জনগণ তাদের পিটিয়ে মারছে – এসব দেখে আমাদের মত দেশগুলোর শাসক শ্রেণীর হাড়ে কাঁপন ধরলো। ফলে শাসক শ্রেণীর প্রধান স্তম্ভ সেনাবাহিনী আসরে নামলো। তারা তৃতীয় দিন থেকে সমস্ত কিছুর দখল নিলো। গণবিদ্রোহ যেহেতু স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, জনগণ কোনো রাজনৈতিক দল বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা চালিত হয়নি বলেই দুদিন পর থেকেই রাজনীতির ময়দানে গৌণ শক্তি হয়ে গেল। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা বাংলাদেশের মতোই নেপালেও স্রেফ ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ‘শাসক পরিবর্তন’ই সম্ভব হলো। এবং আমাদের জন্য রেখে গেল ভুলে যাওয়া কিছু শিক্ষা।
গণবিদ্রোহের শিক্ষা
আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত বামপন্থী দল ও বুদ্ধিজীবীরা দেখলো যে নেপালে ক্ষমতাসীন তাদের স্বগোত্রীয় নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট) জনগণের হাতে মার খাচ্ছে। সুতরাং তারা যুক্তি খুঁজে বের করলো যে বাংলাদেশ ও নেপালে নব্য যুব সম্প্রদায়ের (তথাকথিত জেন জি) আন্দোলনটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মস্তিষ্কপ্রসূত এবং সিআইএ দ্বারা চালিত! এই কুযুক্তি মেনে নিলে বলতে হয় নেপালে কোন শোষণ দমন দূর্নীতি ও জনগণের ক্ষোভ বলে কিছু ছিল না! সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল! কিন্তু এরকমটা আদৌ নয়। আমরা গল্পরাজ্যে বাস করি না। আমরা বাস্তবে বাস করি। আমরা আমাদের চারপাশ দেখে বুঝতে পারি বাকী অঞ্চলে মানুষ কেমন থাকতে পারে। এতদিন আমরা জেনে এসেছি সিআইএ মিলিটারি দিয়ে ক্যুদেতা ঘটায় ও গুম খুন করে। এখন এরা আমাদের শেখাচ্ছে যে সিআইএ গণবিদ্রোহও ঘটায়! ঠিক যেমন রুশ বিপ্লবের সময় রাশিয়ার সংশোধনবাদীরা বলেছিল যে রুশ বিপ্লবটা জার্মানির ষড়যন্ত্র আর লেলিন জার্মানির গুপ্তচর! হাস্যকর!!
জনগণের হাতে মার খেয়ে নেপালের মাওবাদীদের কিছু হুঁশ ফিরেছে বলেই মনে হয়। তারা প্রকাশ্যে আত্মসমালোচনা করেছে এবং নেপালের সংবিধানের কী কী গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চেয়েছিল কিন্তু অন্যান্য সংসদীয় পার্টিগুলির আপত্তিতে করতে পারেনি, যার ফলে নেপালের গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, সেগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে জনগণের মধ্যে প্রচার শুরু করেছে। তারা নেপালের যুব বিদ্রোহকে ন্যায় সঙ্গত বলেছে। পার্টির পুরনো কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের চেষ্টায় আছে। মাওবাদীদের যে বিপ্লবী অংশ নেত্র বিক্রম চাঁদের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সামিল হয়নি, প্রচন্ড তাদের সঙ্গে ঐক্যের প্রস্তাব করেছে এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চাঁদের নাম প্রস্তাব করেছে। দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে পরবর্তী ১০০ বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের একটা লহর গেছে। তার শিক্ষা মার্কস-এঙ্গেল্স এবং লেলিন সংকলিত করে আমাদের সামনে রেখে গেছেন। যাঁরা সমাজ বদলের জন্য সত্যিই কাজ করতে চান, তাদের এই শিক্ষাকে অধ্যয়ন করতে হবে এবং বাস্তব অবস্থার প্রকৃত বিশ্লেষণ করে সৃজনশীল ভাবে মার্কসবাদকে প্রয়োগ করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ, দালাল আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্ততন্ত্রের শোষণ দমনে জনগণ ছিবড়ে হয়ে যাচ্ছে। যার থেকে বেরোবার কোন উপায় জনগণ খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। যার পুরো ফায়দা তুলছে ধর্মীয় ফ্যাসিস্টরা, বকলমে শাসক শ্রেণী, বকলমে সাম্রাজ্যবাদীরা।
আজকে আমাদের মতো দেশগুলিতে কমিউনিস্টদের জনগণের উপর কোন প্রভাবই নেই। যে ক’গাছা কমিউনিস্ট এদিক ওদিক ছিটিয়ে আছে, তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতেই ব্যস্ত। তাদের বেশিরভাগই মতান্ধ ও বাস্তব ভাবনাচিন্তা রহিত। মার্কসবাদী পরিভাষায় যাকে মাউন্টেন টপ মেন্টালিটি বলা হয়। তারা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে দুনিয়াকে দেখে। দুনিয়াকে দেখে তারা রণকৌশল ঠিক করে না। এ অবস্থায় শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের মতো ঘটনা আরও ঘটার সম্ভাবনা আছে। স্বতঃস্ফূর্ত জনতার মধ্যে সঠিক রাজনীতি নিজে থেকে থাকবে না। সঠিক রণকৌশলকে গুরুত্ব দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহগুলোকে যাতে সঠিক দিশায় চালনা করা যায়, তার জন্য আমাদেরই প্রস্তুত হতে হবে।
মূল প্রবন্ধ এবং কভার ফটো সৌজন্যে – https://frontline.thehindu.com/columns/nepal-gen-z-anti-nepotism-protests-2024-south-asia-youth-revolts/article70037093.ece [Retrieved On: 14/01/2026]
