অলোক দেবনাথ
হুগলি, বর্ধমান জেলার মূল অর্থকারী ফসল হচ্ছে আলু। এছাড়াও বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা, বীরভূমের ময়ুরেরশ্বর, মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমার বড়োয়া থানার সীমান্ত এলাকা আলুচাষ এর উপযোগী অঞ্চল। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার জেলার বিভিন্ন অংশে প্রচুর পরিমাণে আলু চাষ হয়। এখন গোটা রাজ্যেই কমবেশি সব জেলায় আলু চাষ হচ্ছে।
আলু বাঙালির পাতে এমন ভাবে মিশে আছে যে আলু ছাড়া রেসিপি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। দোকানে বিরিয়ানীতে আলু মানুষ আলাদা ভাবে কেনে। ফুচকা, টিকিয়া, চপ র মতো জনপ্রিয় খাবার আলু ছাড়া হয় না। বিভিন্ন দেশি বিদেশি কর্পোরেট সংস্থাগুলি আলুর চিপ্স প্যাকেটজাত করে ফিল্মষ্টার, ক্রিকেট খেলোয়াড়দের সামনে রেখে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেদার ব্যবসা চালাচ্ছে, ফলে প্রচুর বাণিজ্য করে ফুলে ফেঁপে উঠছে। আমাদের আশেপাশের বাচ্চা থেকে বড়ো এই চিপ্স খাচ্ছে, অথচ আলুচাষীরা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মতো বেশির ভাগ রাজ্যেই আলু চাষ করে কৃষকরা, বিশেষত পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ উল্লেখযোগ্য। কয়েক বছর ধরে এই দুই রাজ্যের আলু কম দামে আসায় আমাদের রাজ্যের কৃষকরা লোকসানের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় দাম পাচ্ছে না। আবার বাঁকুড়ার উৎপাদিত আগুরে আলুও জেলাগুলিতে এসে সমস্যার সৃষ্টি করছে। এইসব ক্ষেত্রে আবহাওয়া, মাটি ফলনের একটা কারণ হিসাবে কাজ করছে।
আমাদের রাজ্যে বিঘায় গড়ে ৯০ প্যাকেট (বিঘা =৩৩ শতক, ১ প্যাকেট = ৫০ কেজি) আলু উৎপন্ন হয়। রাজ্য সরকারগুলি বিদেশে রফতানি না করতে পারলে এই সমস্যার থেকে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। মাঝে বাংলাদেশ, শ্রীলংকাতে আলু রফতানি হবে শোনা গেলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকারগুলি।
আলুচাষ করতে গেলে প্রথমেই প্রয়োজন দোঁয়াশ মাটিওয়ালা জমি, বীজ, জল। শীতকালের আবহাওয়া আলু চাষের উপযোগী। এলাকাভেদে বিঘা প্রতি প্রায় ২৫০০০-৩০০০০ টাকা চাষে খরচ হয় (চাষী এবং তার পরিবারের সদস্যদের শ্রমের মূল্য ধরে)। শীত যত বেশি সময় নিয়ে থাকে আলু ততো ভালো হবে। আমাদের রাজ্যে পোখরাজ, জ্যোতি, চন্দ্রমুখী, সুপার সিক্স, কে ২২ এবং পেপসি আলু চাষ হয়। পোখরাজ আলু শীতের আগে লাগিয়ে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আলু বাজারে নিয়ে আসা যায়, তাই একটা বড় সংখ্যক কৃষক এই পোখরাজ আলু চাষ করে থাকেন। আলু চাষে প্রচুর পুঁজি লাগে, তাই বাধ্য হয়ে লোনের দিকে ঝোঁকে কৃষকরা। লোন বলতে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেওয়া, সোনা বন্ধক দিয়ে লোন নেওয়া, নয়তো সুদের কারবারিদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০% হারে সুদ নিয়ে চাষ করে। ‘আশায় বাঁচে চাষা’- এই স্বপ্ন নিয়ে চাষে যায়।
নিম্নচাপ এর কারণে, শীত কম হবার কারণে ফসল নষ্ট হলে কৃষক আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটে চলে বর্ধমান, হুগলিতে। সরকার এটা আত্মহত্যা হিসাবে কখনোই মানতে চায় না। আবার কৃষকদের স্বার্থে শস্য বিমার ব্যবস্থাও করে না, যাতে ফসল আবহাওয়ার কারণে নষ্ট হলে কৃষক ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। এটাও একটা ইস্যু হতে পারে আন্দোলনের, এর সঙ্গে ফসলের লাভজনক দাম না পাওয়ার কারণটাতো আছেই। এর সঙ্গে মাঝে মাঝেই ফসল চাষের সময় সারের কালোবাজারি বিরাট সমস্যা হিসাবে কাজ করে, যেটা উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এটাও আন্দোলনকারীদের মাথায় রাখতে হবে। এই ইস্যুটাও যাতে আন্দোলনে উঠে আসে।
এক বিঘা আলু চাষ করতে গেলে প্রথমে চারটে চাষ দিতে হবে। যার বাজার মূল্য ২০০০ টাকা। জমির আল জুড়তে ৫০০ টাকা খরচ । ইউরিয়া এক প্যাকেট ৩৯০ টাকা। দশ ছাব্বিশ চার বস্তা ৭২০০ টাকা। আলু বীজ কাটতে চারটে মুনিষের মজুরি ১০০০ টাকা (কোনো কোনো অঞ্চলে মুনিষের দৈনিক মজুরি ৩০০-৩৫০ টাকাও আছে)। সার ছিটাতে দুজন মুনিষ লাগে, খরচ ৫০০ টাকা। আলু বসাতে ৮ জন মুনিষ লাগে, তাদের মজুরি ২০০০ টাকা। বীজ ৬০০০ টাকা (১ বিঘা জমি চাষ করতে ৫ প্যাকেট বীজ লাগে, ১ প্যাকেট = ৫০ কেজি)। জলের জন্য খরচ ১৫০০ টাকা (রিভার পাম্প থাকলে ), শ্যালো থেকে নিলে ৩০০০ টাকা (আলু চাষের জন্য জমিতে ৬-৭ বার পাহন দিতে হয়)। ভুঁই কোপাতে ১০ জন মুনিষ লাগে, খরচ ২৫০০ টাকা। কানি মারতে (মাটি সাজাতে ) মুনিষ খরচ ১৫০০টাকা। কীটনাশক ২০০০ টাকা লাগে।
চাষীদের ধারাবাহিক ফসলের দাম না পাওয়ার কারণ বেশ কয়েকটা আছে। এক, যেহেতু সরকারি ঋণ মধ্য ও গরিব চাষীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পায় না, তাই তাদের বাধ্য হয়ে দাদন, মহাজনী সুদের উপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ব্যবসাদার, সুদের কারবারি, মহাজনরা সুযোগ বুঝে চড়া সুদে, চক্রবৃদ্ধি হারে কিংবা তার কাছে আলু বিক্রি করবে এই শর্তে ঋণ দেয়। এইসব মহাজন, সুদের কারবারিদের সাথে ক্ষমতাসীন দলের এক অশুভ আঁতাত বহুকাল ধরে কৃষক সমাজে পরগাছার মতো রয়েছে। এরাই আলুর মতো ফসলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে যে, ফসল ওঠার ঠিক আগে আগেই বাজার নামিয়ে দেওয়া হবে, আবার ফসল ব্যবসাদারদের কাছে চলে গেলেই দাম চড়তে শুরু করবে। কৃষক বাধ্য হয়েই বিক্রি করতে বাধ্য হয়, যাকে বর্ধমান জেলায় অভাবী বিক্রি বলে। কৃষক সমাজ এই সত্যটা জানার পরও অল্প সংখ্যক ধনী কৃষকই পারে কোল্ড স্টোরেজগুলিতে আলু রাখতে। সমস্যা হলো চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ মেটাতে ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আলু বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হয়। নয় তো মহাজন, ব্যবসায়ীদের কাছেই ফসল তুলে দিতে হয় – পরের বছর চাষে যাবার সময় ঋণ, দাদন পাবার গ্যারান্টি পেতে।
রাজ্যে আলু রাখার জন্য কোল্ড স্টোরেজের প্রয়োজন হুগলি, বর্ধমান জেলাতে আছে। বস্তা (৫০ কেজি) পিছু বছরে প্রায় ৬৫-৭০ টাকা লাগে। অতীতে কালোবাজারি হলেও আজকে এই সমস্যা বিশেষ একটা নেই, তবে মাঝে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য আলু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার দলের নেতাদের অশুভ আঁতাত নিয়ে তোলাবাজির অভিযোগ তুললে দলের বিষ নজরে পড়েন। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। আজও সেই ধারা সমানে চলছে।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://nagorik.net/economics/nobody-thinking-about-distressed-potato-farmers/ [Retrieved On: 09/01/2024]
