স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন

স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) এবং রাজ্যবাসীর হয়রানি

তনবীর আদিত্য


লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
এপ্রিল ২০২৬ সংখ্যায়

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গেছে। কিন্তু এই ভোটে কারা ভোট দিতে পারবেন আর কারা পারবেন না – সেই তালিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)  স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) (২০২৫-২০২৬) কে ২১ বছর পর ভোটার তালিকাকে “বিশুদ্ধ” করার একটি  প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের জন্য এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি উদ্বেগ, কষ্ট এবং নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার হরণের আশঙ্কায় রূপান্তরিত হয়েছে। রাজ্যের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রায় ৭.৬৬ কোটি ভোটারকে যাচাই করার এই বিশাল প্রক্রিয়াটি গত তিন চার মাস ধরে সাথে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বিস্তর দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।

স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন : ২০০২ সালের বেঞ্চমার্ক ও ব্যাপক বিভ্রান্তির সূত্রপাত

SIR-এর প্রযুক্তিগত মূল ভিত্তি হল “ম্যাচিং-ম্যাপিং” (matching-mapping) প্রক্রিয়া, যেখানে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে সরকারি মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে । প্রতিটি ভোটারকে তাদের বর্তমান নাম অথবা তাদের পূর্বপুরুষের নাম সেই ২৩ বছর পুরনো তালিকার সাথে লিঙ্ক করতে বলা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি শুরু হয়েছে  নির্বাচন কমিশনের তথ্য দিয়ে। এই তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৩২% ভোটার ২০০২ সালের তালিকার সাথে সফলভাবে মিলেছেন (Matched)। এর ফলে এক বিশাল সংখ্যক অর্থাৎ ৬৮% ভোটার (৫.২ কোটিরও বেশি) “অ-মিল” (Unmatched) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এই “Unmatched” তকমাটি কেবল প্রযুক্তিগত কোনো শব্দ নয়; এটি একটি  যাচাই প্রক্রিয়া যেখানে নাগরিকত্ব প্রমাণের সমস্ত দায়ভার গিয়ে পড়ে সাধারণ নাগরিকের ওপর । বিশেষ করে ১৮ থেকে ৪১ বছর বয়সী তরুণ ভোটারদের জন্য, যারা ২০০২ সালে ভোটার হওয়ার উপযুক্ত ছিলেন না, তাদের কাছে এই নিয়মটি একটি ফাঁদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছেন কারণ অনেক আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতা এই প্রক্রিয়াটিকে “নাগরিকত্ব প্রমাণের মতো কঠিন বোঝা” হিসেবে অভিহিত করেছেন। “Unmatched” থেকে “যোগ্য” ভোটার হওয়ার জন্য অনেক সময় ভোটারদের শুনানিতে (Hearing) ডাকা হচ্ছে, যেখানে তাঁদের ১২টি “নির্দেশক নথিপত্র” (indicative documents)-এর মধ্যে যেকোনো একটি দেখাতে হচ্ছে ।

এই প্রক্রিয়া দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর সবথেকে বেশি বোঝা হয়ে চেপেছে। ১৯ জুলাই ১৯৮৭-এর আগের জমির রেকর্ড বা শিক্ষাগত শংসাপত্রের মতো পুরনো নথি জোগাড় করা সাধারণ মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিক এবং মহিলাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ। যদিও নির্বাচন কমিশন আধার কার্ডকে ১২ নম্বর নথি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে আধার কেবল পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হবে, নাগরিকত্ব বা বাসস্থানের প্রমাণ হিসেবে নয়। এটি ভোটারদের মধ্যে এক গভীর আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাস্তবত এই SIR- যে প্রচ্ছন্ন NRC তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নোবেল জয়ী থেকে শয্যাশায়ী বৃদ্ধা : হয়রানিতে বাদ নেই কেউ

এই কষ্ট কেবল কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজ্যের সবথেকে পরিচিত মুখদের গল্পগুলোও সিস্টেমের ত্রুটি তুলে ধরছে। যেমন, নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকেও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শুনানির জন্য তলব করা হয়েছিল, কারণ সিস্টেমটি তাঁর এবং তাঁর পিতামাতার বয়সের ব্যবধানে “যৌক্তিক অসঙ্গতি” (logical discrepancy) খুঁজে পেয়েছিল । যদি একজন বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতকেও নিখুঁত নথি থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তবে সাধারণ ও নিরক্ষর নাগরিকদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

SIR-এর লাইনে কাঁপছে অশীতিপররা
SIR-এর লাইনে কাঁপছে অশীতিপররা | ছবি সৌজন্য – https://tv9bangla.com/elections/assembly-elections/old-woman-and-man-are-in-sir-line-for-hearing-in-west-bengal-1270527.html

অন্যদিকে, পূর্ব বর্ধমানের ৯০ বছর বয়সী শয্যাশায়ী বৃদ্ধা মুক্তিবালা প্রামাণিকের দুর্দশা এই ব্যবস্থার অমানবিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠোর যাচাইকরণ নিয়মের কারণে তাঁকে সরকারি অফিসে বহন করে নিয়ে যেতে হয়েছিল কেবল নথিতে সই করার জন্য। জনরোষের পরেই নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য বাড়িতে গিয়ে যাচাইকরণের অনুমতি দেয়।

বিবেচনাধীন মামলার স্তূপ: অনিশ্চয়তায় ৬০ লক্ষ জীবন

প্রক্রিয়াটি শেষের দিকে আসার সাথে সাথে ভোগান্তির ব্যাপকতা সংখ্যাতত্ত্বে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ভোটারের সংখ্যা কমে ৬.৪৪ কোটিতে দাঁড়িয়েছে, যা শুরুতে ছিল ৭.৬৬ কোটি। ভোটার সংখ্যা কমার একটি বড় কারণ হলো মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের বাদ দেওয়া, কিন্তু নির্বাচন কমিশন ৬০.০৬ লক্ষ মামলাকে “সন্দেহজনক এবং বিচারাধীন” (doubtful and pending) হিসেবে চিহ্নিত করে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারবিভাগীয় বিবেচনার অধীনে রেখেছে। এছাড়াও চূড়ান্ত তালিকায় ৫ লক্ষ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ উল্লেখ না করেই।

এই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্ব এখন অনিশ্চিত। তাদের গণতান্ত্রিক পরিচয় এখন বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এই মামলাগুলোর একটি বিশাল অংশ মূলত মুর্শিদাবাদ (১১ লক্ষ), মালদা (৮.২ লক্ষ) এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলোতে কেন্দ্রীভূত, যা নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। যাদের নাম বাদ গেছে বা ‘বিচারাধীণ’ তালিকা থেকে আগামীদিনে যাদের নাম বাদ যাবে, তাদেরকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি দ্বারা গঠিত একটি ট্রাইব্যুনালের কাছে পুনরায় নাম তোলার জন্য আবেদন করতে হবে। এই প্রক্রিয়া খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমাদেরকে আসামের এনআরসি-র কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে এমন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে যা রাজ্যের জনতাত্ত্বিক ইতিহাস বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। সিস্টেমের অ্যালগরিদম যখনই মা-বাবার সাথে সন্তানের বয়সের ব্যবধান ১৮ বছরের কম বা ৪৫ বছরের বেশি দেখছে, তখনই তাকে “সন্দেহজনক” হিসেবে চিহ্নিত করছে । অথচ পশ্চিমবঙ্গের পুরনো প্রজন্মের মধ্যে অল্প বয়সে বিবাহ এবং দ্রুত সন্তান জন্মদানের হার ছিল সাধারণ বিষয়, যাকে বর্তমানের অ্যালগরিদম ভুল হিসেবে গণ্য করছে। যে সমস্ত পিতা মাতার ৬ এর অধিক সন্তান, সেই সন্তানদেরকেও ‘সন্দেহ’ এর তালিকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এছাড়া, ডিজিটাল পরিকাঠামোর ব্যর্থতাও সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলেছে। সিইও (CEO) পশ্চিমবঙ্গ ওয়েবসাইটের সার্ভার ক্র্যাশ করা বা অকেজো হয়ে থাকার ফলে সাধারণ মানুষ তাঁদের নাম বা ২০০২ সালের পুরনো তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখতে পারছেন না। যার নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁর কাছে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকা মানেই চরম উৎকণ্ঠার সময়।

কেবল ভোটাররাই নন, বুথ স্তরের আধিকারিক বা বিএলও (BLO)-রা, যারা মূলত স্কুল শিক্ষক বা সরকারি কর্মচারী, তাঁরাও প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছেন। ১০০% শারীরিক যাচাইকরণ এবং লক্ষ লক্ষ ফর্ম ডিজিটালি আপলোড করার কাজ তাঁদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে তুলেছে। এমনকি অত্যধিক চাপের কারণে রাজ্যে বেশ কয়েকজন বিএলও-র মৃত্যুর খবরও পাওয়া গিয়েছে।

রাজনৈতিকরণ এবং জনতাত্ত্বিক সংকট

SIR এমন এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে প্রতিটি প্রশাসনিক ভুলকে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক চক্রান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। অনেক “Unmatched” ভোটারের কাছে এই প্রক্রিয়াটি এখন আর কেবল ভোটার তালিকার সংশোধন নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের এই মানসিক যন্ত্রণা অত্যন্ত গভীর—যেখানে ২০ বছর পুরনো কোনো নথিতে বানানের সামান্য ভুলও তাঁদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে, তাঁরা এই আশংকায় রয়েছেন, যেটা একেবারেই অমূলক নয়।

বনগাঁয় প্রতিবাদ | ছবি সৌজন্যে – https://www.aajkaal.in/elections/west-bengal-assembly-election/news/sir-in-west-bengal-out-of-186-voter-183-were-excluded-from-the-suplimentary-list-in-bangaon-435502

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি পরিযায়ী শ্রমের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, যেখানে প্রায় ২২ লক্ষেরও বেশি মানুষ রাজ্যের বাইরে কাজ করেন। SIR প্রক্রিয়াটি ধরে নেয় যে ভোটাররা সবসময় বাড়িতেই থাকেন, যা এই পরিযায়ী শ্রমিকদের বাস্তবের সাথে মেলে না। বিএলও-র পরিদর্শনের সময় অনেক শ্রমিক বাড়িতে না থাকায় তাঁদের ফর্মগুলো “অসংগৃহীত” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং ফলে চূড়ান্ত তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ পড়েছে।

এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়, যেমন নমশূদ্র বা মতুয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকায় (বাগদা, কল্যাণী ইত্যাদি) ভোটার তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম কাটা যেতে দেখা গিয়েছে। একইভাবে কলকাতার কিছু এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিকদের পদবি দেখে তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

উপসংহার: গণতন্ত্রের ওপর এক ভারী বোঝা

পশ্চিমবঙ্গের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রমাণ করেছে যে জনতাত্ত্বিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলে তথাকথিত প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাও যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। যদি একথা ধরেও নিই নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য তালিকা “বিশুদ্ধ” করা, কিন্তু এই বিশুদ্ধতার মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের—চরম মানসিক চাপ এবং “রাষ্ট্রহীন” হয়ে পড়ার আতঙ্ক। শুনানিতে হাজিরা দেওয়া এবং পুরনো নথি সংগ্রহের জন্য শারীরিক ও আর্থিক হয়রানি। প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের জন্য ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকি, যারা বর্তমানে “বিবেচনাধীন” তালিকায় রয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, এই ৬০ লক্ষ “Under Adjudication” ভোটারদের লড়াই SIR-এর সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দেখা দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের নাগরিক পরিচয় ধরে রাখা এখন এক চরম পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেটা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কাম্য নয়।


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://scroll.in/latest/1091938/bengal-sir-95-of-deleted-voters-in-nandigram-are-muslims-shows-study [Retrieved On: 20/04/2026]

Leave a Reply