জুট মিলগুলিকে বাদ দিয়ে হাওড়া জেলায় শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ৬ নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ে (বোম্বে রোড) এর দুপাশে ছড়িয়ে থাকা ধূলাগড় অঞ্চল। এখানে কর্মরত শ্রমিকদের এলাকায় ফ্যাক্টরি শ্রমিক হিসেবে দেখা হয়। ৫০-৭০ হাজার শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র ধূলাগড় শিল্পাঞ্চল জেলায় দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র (জড়ি শিল্প ৪ লাখ শ্রমিকের জীবিকা, জুট মিল ৩৫-৪০ হাজার শ্রমিকের)। এখানে সাঁকরাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, সৃজন লজিস্টিকাল হাবের উদ্বোধন হয়েছিল অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে। ‘আম্বুজা সিমেন্ট’ এবং ‘ফ্রিটোলে’ এখানকার দুই পুরনো ফ্যাক্টরি। কয়েক বছর আগে ‘আইটিসি’ বিশাল জায়গা নিয়ে ফ্যাক্টরি খুলেছে, গড়ে উঠেছে ‘বেঙ্গল ব্রেওয়ারিশ লিমিটেড’ এর বিয়ার ফ্যাক্টরি। সদ্য গজিয়ে ওঠা দুটি ছোট জুটমিল এবং ‘রাজলক্ষ্মী কটন মিল’-ও এখানেই। এর বাইরে আছে অজস্র ছোট ফ্যাক্টরি এবং ‘ফ্লিপকার্ট’, ‘আমাজন’-এর হাব।
এখানে ‘ফ্রিটোলে’ আর ‘আম্বুজা সিমেন্ট’ সবচেয়ে পুরনো আর বড় ফ্যাক্টরি। দুটিতেই তিন শিফট মিলিয়ে যথাক্রমে ৪ হাজার এবং ৬ হাজার শ্রমিক কর্মরত। এখানে দুটি পদ্ধতিতে নিয়োগ হয়। কোম্পানির কন্ট্রাক্ট আর কন্ট্রাকচুয়াল। প্রথমটির ক্ষেত্রে ৫ মাস থেকে ১০ মাসের চুক্তিতে কোম্পানি শ্রমিকদের নিয়োগ করে, দ্বিতীয়টিতে ৩ মাসের চুক্তিতে নিয়োগকর্তা হলেন কোনো কন্ট্রাক্টর।কন্ট্রাক্টরদের মজুরি দৈনিক ৪০০-৫০০ টাকা, কন্ট্রাকচুয়ালদের ২৪০-৩০০ টাকা দৈনিক। অর্থাৎ রাজ্য সরকার নির্ধারিত অভিন্ন ন্যূনতম মজুরি-র (৩৫৩ টাকা দৈনিক) চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করেন কন্ট্রাকচুয়ালরা। ‘অম্বুজা সিমেন্ট’ এর থেকে ছড়ানো পরিবেশ দূষণ নিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের বহু দিনের ক্ষোভ আর কাজের পরিবেশ নিয়ে একইরকম ক্ষোভ শ্রমিকদের। এই দুই ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকদের ইএসআই-পিএফ রয়েছে। যদিও ফ্যাক্টরি-ভিত্তিক কোনও ইউনিয়ন নেই। বাম জমানাতে বা তৃণমূল জামানাতে কোনও শাসক দলই ইউনিয়ন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়নি, অন্যরাও হয় চেষ্টা করে সফল হয়নি, নয়ত চেষ্টাই করেনি। এই ইউনিয়ন না থাকাটা শুধু একটি ফ্যাক্টরি নয়, পুর শিল্পাঞ্চলটিরই একটি বৈশিষ্ট্য।
এই দুই ফ্যাক্টরি বাদ দিয়ে সমগ্র শিল্পাঞ্চলটিতে উৎপাদন ভিত্তিক কর্মক্ষেত্র হাতে গোনা। বিয়ার ফ্যাক্টরি, দুটি ছোট জুটমিল, রাজলক্ষ্মী কটন মিল, কিছু গেঞ্জি কারখানা আর বেশ কয়েকটি ঢালাই কারখানা হল উৎপাদনভিত্তিক। এই সবকটি জায়গাতেই শ্রমিকের সংখ্যা সমগ্র শিল্পাঞ্চলটির নিরিখে কম।
এই শিল্পাঞ্চল প্রধানত উৎপাদনভিত্তিক নয়, ‘ওয়্যারহাউস’ (গোডাউন) ভিত্তিক। যেখানে শ্রমিকরা সিংহভাগই নিযুক্ত মাল লোডিং-আনলোডিং এর কাজে। এই শিল্পাঞ্চলের প্রধান কর্মসংস্থানের জায়গা এই কাজেই। ‘আইটিসি’, ‘ফ্লিপকার্ট’, ‘আমাজন’-এর শ্রমিকরা বেশিরভাগ কোম্পানি পে-রোল এবং কন্ট্রাক্টর-এর অধীনে ইএসআই-পিএফ এবং অভিন্ন ন্যূনতম মজুরির আওতায় আছেন। যদিও অনেক শ্রমিকই রয়ে গেছেন এর বাইরে। তাদের মজুরি দেওয়া হয় হাতে হাতে ক্যাশ টাকায় দৈনিক ২০০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা। এর বাইরে আরও বিভিন্ন কোম্পানি ‘ওয়্যারহাউস’ ভাড়া নিয়ে রেখেছে এখানে। সেখানে পুরোপুরি কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করে কাজ চালানো হয়। মজুরি দেওয়া হয় হাতে হাতে ক্যাশ টাকায়। এই ‘ওয়্যারহাউস’ গুলোতে মজুরি ১৮০ টাকা থেকে ২৪০ টাকা দৈনিক। শ্রমদিবস ১২ ঘন্টার। দু’শিফটে কাজ হয়। ‘ফ্লিপকার্ট’, ‘আমাজনে’-এ পুজো, দেওয়ালির মত সময়গুলোতে ৩০-৪৫ দিন টানা কাজ করতে হয় সাপ্তাহিক কোনও ছুটি ছাড়াই। ‘আইটিসি’-তে শ্রমিক সংখ্যা দেড় হাজার, ‘ফ্লিপকার্ট’, ‘আমাজন’-এ ১ হাজার করে।
এছাড়া যে যৎসামান্য উৎপাদন ক্ষেত্র আছে তার মধ্যে রাজলক্ষ্মী কটন মিল ছাড়া অন্য কোথাও শ্রমিকরা ইএসআই-পিএফ, অভিন্ন ন্যূনতম মজুরির আওতায় নেই। এমনকি এখানেও ২০ শতাংশ শ্রমিক এর বাইরে। ‘ওয়্যারহাউস’ গুলোর মতোই তাদের হাতে ক্যাশ টাকায় মজুরি দেওয়া হয়। মজুরি ঘোরাফেরা করে ২৪০-৩০০ টাকা দৈনিকের মধ্যে। যে শ্রমিকেরা ইএসআই-পিএফ, অভিন্ন ন্যূনতম মজুরির আওতায় আছেন তাদের মজুরি ৩৬০-৪০০ টাকা দৈনিক। এদের নিয়োগ হয় কোম্পানি পে-রোলে চুক্তি ভিত্তিতে বা কন্ট্রাক্টর এর মাধ্যমে। রাজলক্ষ্মী কটন মিলে ১২ ঘন্টা শ্রম দিবসে দু’শিফটে এখানে কাজ হয়। শ্রমিক সংখ্যা ১ হাজার। এখানে কন্ট্রাক্টররা বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা থেকে ১০ মাসের চুক্তিতে শ্রমিকদের নিয়ে আসেন। তারা মিলের ভেতরেই থাকেন। এই ছবি এখানকার দুটি জুটমিলেও দেখা যায়। জুটমিল দুটিতে সমস্ত শ্রমিক কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে নিযুক্ত হন। এরা কেউই ইএসআই-পিএফ এর সুবিধা না পেলেও দৈনিক মজুরি থাকে ৪০০-৪৫০ টাকার মধ্যে। এখানেও ১২ ঘন্টা শ্রম দিবস চালু করার চেষ্টা হলেও শ্রমিকদের চাপেই সেটা করতে পারেনি মিল কর্তৃপক্ষ। এখানে ৮ ঘণ্টা করে ৩ শিফটেই কাজ হয়। দুটি মিলেই শ্রমিক সংখ্যা ৪০০-৫০০ করে। ধূলাগড় শিল্পাঞ্চলে একমাত্র এই দুটি জুটমিলেই শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার একটি প্রবণতা আছে।
কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করে চলে ঢালাই কারখানা, বিয়ার ফ্যাক্টরি এবং গেঞ্জি কারখানাগুলি। তিনটি ক্ষেত্রেই শ্রম দিবস হয় ১২ ঘন্টার। ঢালাই কারখানা গুলিতে মজুরি থাকে ২২০-৩০০ টাকা দৈনিক। মজুরি দেওয়া হয় ক্যাশ টাকায় হাতে হাতে। প্রত্যেকটি ঢালাই কারখানাই ছোটো। ৪০-৫০ জন শ্রমিক নিয়ে চলে। বিয়ার ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের সংখ্যা ৪০০। তার মধ্যে বেশ কিছু মহিলা শ্রমিক আছে। যাদের মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের থেকে কম হয়। এখানে মজুরি থাকে ৩০০-৩৫০ টাকার মধ্যে। সাপ্তাহিক মজুরি দেওয়া হয় ক্যাশ টাকায়। গেঞ্জি কারখানাগুলিও ছোট। ৩০-৫০ জন শ্রমিক নিয়ে কাজ চালানো হয় এখানে, যার বেশিরভাগটাই মহিলা শ্রমিক। মজুরি থাকে ২২০-২৮০ টাকা দৈনিক, সাপ্তাহিক মজুরি হয় ক্যাশ টাকায়। বিয়ার ফ্যাক্টরি এবং গেঞ্জি কারখানায় মহিলা শ্রমিকদের নিরাপত্তার কোনো ব্যাবস্থা নেই।
যদি হিসাব করে দেখা যায় তাহলে হয়ত দেখা যাবে এই শিল্পাঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের ৬০-৭০ শতাংশ শ্রমিকেরই কোন আইনি স্বীকৃতি নেই। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তারা থেকেও নেই। ঠিক যেমন নামে শিল্পাঞ্চল হলেও এখানকার অল্প কাজই উৎপাদন ভিত্তিক। এ এক ভৌতিক শিল্পাঞ্চল। যাকে সম্ভবত দেশে চালু থাকা শ্রম আইন, প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলি এড়িয়ে চলে কোনো এক অজানা বা জানা কারণে।
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার মার্চ ২০২১ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.downtoearth.org.in/news/pollution/smoke-from-cement-factory-leaves-toddlers-gasping-for-air-in-howrah-77036 [Retrieved On: 23/08/2023]
