আমরা যদি গত দুমাসের রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করি আমরা দেখতে পাব যে কি শোচনীয় অবস্থার মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। শাসক বা বিরোধীরা কেউই কম যায় না। যারা সরকারে আছেন, সংবিধান ছুঁয়ে শপথ করেছেন রাজ্যের মানুষের স্বার্থে, রাজ্যের জন্যে ভাল কাজ করবেন। আবার বিরোধীদের মধ্যে যারা বিধায়ক তারাও শপথ নিয়েছিলেন মানুষের “সেবা” করবেন বলে।
আমরা যদি পর্যাযয়ক্রমিকভাবে বিভিন্ন দিকগুলি ভাগ করি আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? প্রথমে যদি আমরা সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পগুলির বিষয় আলোচনা করি, আমরা দেখব প্রত্যেকটা প্রকল্পের লক্ষ্য হল উৎকোচ দিয়ে সাময়িক অনদুানের মাধ্যমে গরীব মানুষকে তাঁবেদার বানানো, যাতে প্রত্যেকটা ব্যাপারে দলের কথায় মানুষ সায় দেয়। পঞ্চায়েত ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল, গ্রামীণ মানুষের প্রয়োজনের নিরিখে গ্রামীণ আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য গ্রামের মানুষই ঠিক করবে গ্রামের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করা এবং সেই অনযুায়ী অর্থ খরচ করা। কিন্তু যেটা হয়, কোটি কোটি টাকা পঞ্চায়েতে আসে – দলের নেতারা সব ঠিক করে, শুধু পঞ্চায়েত সদস্যদের দিয়ে সই করিয়ে নেওয়া হয়। এই ব্যাপারে পঞ্চায়েত সদস্যর মতামতের কোন ধার ধারে না নেতারা। যে টাকা পঞ্চায়েতে আসে তার অধিকাংশ নেতাদের পকেটে ঢোকে, তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়ে। আর কিছুটা উচ্ছিষ্ট পঞ্চায়েত সদস্যরা পায়। গ্রামের কোন উন্নতি হোক বা না হোক কারোর কিছু বলার নেই। সাময়িক আর্থিক অনুদান দিয়ে প্রান্তিক মানুষের অধিকার বোধকে ভোঁতা করে দেওয়া হয়, সব কিছু মাথা নত করে মেনে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। পঞ্চায়েত ভোটের এত হাঙ্গামা, এত খুনের লক্ষ্য, কে কত দেশসেবা করবে তার প্রতিযোগিতার জন্য নয়। কার হাতে কত ক্ষমতা থাকবে, কে পাঁচ বছর ধরে কত বড়লোক হবে তার জন্য। আর গরীব মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে কোন দলে গেলে পাঁচ বছর ধরে ছিটেফোঁটা অনুদান বা খয়রাতি পাবে। খুনের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে গ্রামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যারা অপেক্ষাকৃত বেশি আর্থিক ভাবে দুর্বল তারাই বেশি মরিয়া এই মারণযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়তে। একটা বিষয় নজর করলে দেখা যাবে সব দলের নেতারা সব সময় বলে আইন হাতে তুলে নেবেন না, পুলিশ আছে, আইন আদালত আছে কোন সমস্যা হলে তারাই সব ঠিক করে দেবে, সবাই গ্রামে শান্তি বজায় রাখবেন। যে কোনো ভোট এলেই এত উৎকোচ, এত অনদুান দেবার পরেও সাধারণ ভোটারদের উপর শাসক, ভরসা বিশ্বাস রাখতে পারে না, প্রয়োজন হয় পেশির জোর, অস্ত্রের জোর, ক্ষমতার একচেটিয়াকরণের জন্য লেঠেল বাহিনীর দরকার হয়। যার কাছে যত অস্ত্র, যত গুন্ডা, তার তত ভোটে জয়ের গ্যারান্টি। পাঁচ বছর ধরে লুটেপুটে খাবার গ্যারান্টি। ক্ষমতা দখলের জন্য সব রকম অনৈতিক কাজ তারা করে। ছাপ্পা ভোট, বুথ দখল, মানুষ খুন, মহিলাদের উপর অত্যাচার, কোন কিছুতেই তারা পিছপা হয় না। বর্তমান পঞ্চায়েত ভোটে সব দল মিলিয়ে ৬৫ জন মারা গেলেন। কোর্টের নির্দেশকে তোয়াক্কা না করে সাধারণ মানুষকে ভয়ে, সন্ত্রাসে দমন করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে খুন সন্ত্রাসের জোরে নিজেদের কাজ হাসিল করা হলো। সাধারণ মানুষের বুক ফাটলেও মুখ খোলার কোন উপায় নেই। হাজারো না পাওয়া, তার উপর জলুম অত্যাচার, মুখ বুঝে সহ্য করা। প্রতিবাদের, প্রতিরোধের কোন প্রশ্নই ওঠে না।
লালগড় আন্দোলনের পর সব ঠান্ডা। তখন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সশস্ত্র ভাবে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যদিও সেই আন্দোলন টিকে থাকেনি। তারপর থেকে ভাঙড় আন্দোলন এবং এনআরসি, সিএএ বিরোধী আন্দোলন ছাড়া সেই রকম উল্লেখযোগ্য কোন গণ আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে এই রাজ্যে জনতার উপর যতই দমন পীড়ন চলকু না কেন, তাকে প্রতিরোধ করার মত কোন শক্তি নেই। রক্ত খাওয়া বাঘের সামনে হাত জোড় করে প্রাণ ভিক্ষা করে কোনো লাভ নেই। সংবিধানকে হাতিয়ার করে খেটে খাওয়া মানুষের উপর দমন পীড়ন না করলে যাদের মুনাফার পাহাড় বাড়বে না, তাদের কাছে আবেদন নিবেদনে কোনো লাভ নেই। মুখ্যমন্ত্রীকে সামান্য সারের দাম বাড়ল কেন প্রশ্ন করায় একজন প্রান্তিক মানুষকে যে ভাবে হেনস্তা করা হয়েছিল, সেখানে যে কোনো দাবি দাওয়ার আন্দোলনকে সরকার বিরোধী বলে দাগিয়ে দিয়ে পুলিশ ও গুন্ডা বাহিনী দ্বারা আক্রমণ করলে অবাক হবার কিছু নেই, খুন পর্যন্ত করতে পারে, যেমনটা আনিশ খান-কে খুন করা হলো। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে শাসক যখন সংবিধান, আইনের তোয়াক্কা না করে আক্রমণ করে, তখন সব কিছু থেকে বঞ্চিত মানুষ নিজেদের জীবন জীবিকার আন্দোলনে যদি অস্ত্র ধরে তাহলে দোষ কোথায়? আজকের দিনে এটা ভাবার সময় এসেছে শাসকের আক্রমণের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ করার সাহসে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে, প্রস্তুত না করতে পারলে সংগঠন বা লড়াই কোনটাই দানা বাঁধবে না।
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৩ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.anandabazar.com/west-bengal/miniscule-violence-in-panchayat-election-claims-tmc/cid/1443565 [Retrieved On: 29/08/2023]
