পশ্চিমবাংলার যে ক’টি শিল্প মহিলাদের আত্মনির্ভর হতে সাহায্য করেছে তার মধ্যে বিড়ি শিল্প উল্লেখযোগ্য। রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রচুর কারখানা আছে, যেখানে গিয়ে পুরুষ শ্রমিকরা বিড়ি বাঁধে। দিনের শেষে অথবা সপ্তাহে মজুরি নিয়ে থাকে।
বিড়ির পাতা সংগ্রহ হয় মূলত ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, মহারাষ্ট্র থেকে। এই কটি রাজ্যে যে বিশাল বনভূমি আছে সেখান থেকে আমরা বছরের বিশেষ কিছু সময় কেন্দু পাতা বিড়ির পাতা রূপে পেয়ে থাকি। তামাক মূলত ভিন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। রাজ্যে এই পাতা মশলার প্রচুর দোকান আছে। সেখানে সাদা ফেটি সুতা, গুলি সুতাও পাওয়া যায়, এগুলি বিড়ি বাঁধতে লাগে। বিড়ির কোয়ালিটি নির্ভর করে তামাক এর মিশ্রণ এর উপর। কতটা জংলী তামাক, নেপানি তামাক ও কাঠি দেওয়া হবে তার উপর। কোয়ালিটি আর একটা বিষয়ের উপর নির্ভরশীল সেটা হলো পাতার রং আর পরিপক্ক পাতা। তামাকের মিশ্রণ কোনো বিড়ি ব্যাবসায়ী অন্যকে জানায় না। এটা অনেকটা বর্ধমান, হুগলীর আলু চাষের মতো, বাবা ছেলেকে বীজ দেবে না। অন্যান্য রাজ্য থেকে মেশিনে তৈরি বিড়ি আসলেও ধূমপায়ীরা মেশিনের বিড়ি পছন্দ করেনি। আগুনে শ্যাঁকা বিড়ির ক্ষেত্রে কিছু আধুনিকতা ঢুকেছে।
পাতা – বড়ো তাড়ি, ছোট তাড়ি – দুই রকম ভাবেই আসে। কুলো অতীতকাল থেকে বাঁশ দিয়েই হতো, আজও তাই, কিছু ডিজাইন পাল্টেছে। বিড়ি বানানোর পরে বিড়ির মুখ মারতে বাঁশ এর কঞ্চি নিয়ে এই কাঠি বানাতে হয়। এই পদ্ধতি মুর্শিদাবাদের কারিগররা চাকু দিয়ে করে থাকে। আর লাগে ঘুঁটের ছাই, যাতে বিড়ির পাক ভালো হয় ও কাজ দ্রুত হয়।
মুর্শিদাবাদের কান্দির বিড়ি শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য থাকার জন্য গড়ে উঠেছে সমবায়। তারাই ঠিক করে বিড়ির মজুরি কি হবে, পাতা কত, তামাক কত লাগবে যা মহাজনদের দিতে হবে। এর বাইরে কিছু শ্রমিক আছেন যারা কোনো চা, পান বিড়ির দোকানে বিড়ি বাঁধেন। এটা দক্ষ অভিজ্ঞ শ্রমিকরাই করে থাকেন। এদের মজুরি কান্দিতে সব চাইতে বেশি। মুর্শিদাবাদের কারিগরদের ২০০০ সালের দিকে বিড়ি শ্রমিক কার্ড দেওয়া হয়। এর আগে অবশ্য বিড়ি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মহাজনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে। শ্রমিকরা আজও জানতে পারল না তাদের অল্প সুদে গৃহ নির্মাণ লোন, বিনা পয়সায় চিকিৎসা কোথায় হবে। অনেকটা ঘোড়ার ডিমের মতো। এই শিল্পের শ্রমিকদের অধিকাংশ জনের একটা বয়স এর পরে টিবি রোগ হয়ে থাকে। অপুষ্টি বিড়ি শ্রমিকদের এই অবস্থার একটি প্রধান কারণ।
কালনায় অনেকগুলি বিড়ি মালিক আছে। কালনার মহিলারা তিনটে পেশায় বিভক্ত, বিড়ি শ্রমিক, রাখি শিল্পের শ্রমিক এবং ধান থেকে চাল তৈরির শ্রমিক।
সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির সবগুলি উপাদান আছে এই শিল্পে। প্রথমত, মালিক নিজে থেকে কখনো বিড়ির মজুরি বাড়ায় না। মজুররা প্রতিবাদ করলে কিংবা অন্য জেলায় দাম বাড়লে তখন বাড়ায়। পুরুষ ও মহিলা শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি বৈষম্য ব্যাপক হারে আছে, অন্তত হাজারে ৫০ টাকা কম বেশি। এইসবকে পিছনে ফেলে মহাজন যে শোষণটা মজুরদের ওপর করে সেটা হলো – প্রতি ১ হাজারে পাতা লাগে ৫০০ গ্রাম, মহাজনরা দেবে ৩০০ গ্রাম; প্রতি ১০০ ঘাটতিতে ১২ টাকা করে মজুরি থেকে কেটে নেবে, আর প্রতিবাদ করলেই ছাঁটাই। ফলে হিসাব করলে দেখা যাবে ঘুরিয়ে ১০০ টাকা মজুরিতেই তারা কাজ করাচ্ছে। এই সব জালিয়াতি করতে পারার কারণ, মহাজনগুলি সব সময় শাসক পার্টিগুলির সামনের সারিতে থাকে। বোনাসের বিষয়টা অতীতে বিড়ি শ্রমিকদের আন্দোলনের দাবি হিসাবে থাকলেও এটা দাবি হিসাবেই থেকে গেছে। প্রতিবার আন্দোলনের পরে অনেক মজুর কাজ হারিয়েছেন। মহাজনদের মধ্যে একে অপরকে টপকে যাবার প্রবণতা থাকলেও, মজুরদের শোষণের প্রশ্নে সবাই একই সারিতে আছেন, যে ঐক্যটা মজুরদের মধ্যে নেই। এটাই হয়তো বিড়ি শ্রমিকদের সমস্যার মূল কারণ। এছাড়াও কিছু মহাজন বিড়িতে জল দাগ, লাল পাতা, বেশি তামাকের জ্যাম ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে সেগুলিকে বাদ দিয়ে, পরে সেগুলিকে অন্য প্যাকেট এর সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
লকডাউন এর সময় শ্রমিকরা সপ্তাহে ২/৩ দিন করে কাজ পেয়েছে। মুর্শিদাবাদের বিড়ি কারখানাগুলো স্যোশাল ডিসট্যান্সিং এর নামে বন্ধ ছিল। বাড়িতে বসে কাজ করা শ্রমিকরা সপ্তাহে দু- তিনদিন কাজ পেয়েছিল। খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে। মহাজনদের পক্ষ থেকে সেই অর্থে কোনো সাহায্যই পায়নি এই শ্রমিকরা। বলা যায় অর্ধাহারে চলতে হয়েছে তাদের। অথচ মজুরি ডাকাতি তো বটেই, এছাড়াও এই মহাজনরা এক লক্ষ বিড়ি বেচে সরকারকে এক হাজার দেখিয়ে কর ফাঁকি দিয়ে থাকে। এই শিল্প নিয়ে কোনো সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আন্তরিকতা দেখা যায়নি। অথচ বিরাট সংখ্যক শ্রমিকরা জীবিকা নির্বাহ করে এই শিল্পের মাধ্যমে ।
সরকার, মহাজন, শাসক পার্টির অশুভ আঁতাতকে ধ্বংস করতে হলে সমস্ত বিড়ি শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে তাদের বাধ্য করতে হবে দাবিগুলি মানতে। বিড়ি শ্রমিকদের মধ্য থেকে যে দাবিগুলো উঠে আসছে সেগুলি হলো –
- ১) বিড়ি শ্রমিকদের মজুরি হাজারে ৩০০ টাকা করতে হবে।
- ২) প্রতি হাজার বিড়িতে ৫০০ গ্রাম পাতা দিতে হবে।
- ৩) কোনো রকম ঘাটতি মজুররা দেবে না।
- ৪) প্রতি বছর বোনাস দিতে হবে।
- ৫) এই শিল্পের শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে।
- ৬) এই শিল্পে কর্মরত বাসস্থানহীন শ্রমিক সহ সবার নাম নথিভুক্ত করে বাসস্থান, চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে।
- ৭) মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মজুরি বাড়াতে হবে, নারী-পুরুষ মজুরি বৈষম্য অবিলম্বে তুলে দিতে হবে।
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার মে ২০২৩ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://ruralindiaonline.org/en/articles/নোটবন্দির-আগুনে-বিড়ি-শ্রমিকদের-জীবনে-অনিশ্চয়তার-ধোঁয়া/ [Retrieved On: 26/05/2023]
