ভারতের বেকার সমস্যা – একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এই সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেকারত্ব যে মোদি সরকারের আমলে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে তাতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। ধনী আর দরিদ্রদের মধ্যে আয় ও সম্পদের ব্যবধানকেও প্রসারিত করে চলেছে এই ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। তাই ওড়িশার জাজপুর জেলায় অপুষ্টিতে শিশু মৃত্যুর খবর এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিলিয়নেয়ারদের মধ্যে আদানির জায়গা করে নেওয়ার খবর একই সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। নতুন উৎপাদনশীল ক্ষমতা বা পরিকাঠামোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে চাকরি তৈরির জন্য নরেন্দ্র মোদী সরকার তার সমস্ত ভরসা রেখেছিল বড় বড় ব্যবসার উপর। দাবি করা হয়েছিল যে ব্যবসাগুলোকে সহজে ঋণ দেওয়া হলে, এবং তাদের কর ছাড় ও ঋণ মকুবের ব্যবস্থা করলে সহজে ব্যবসার বৃদ্ধি হবে। কিন্তু এই কৌশলটা যে আসলে শুধুমাত্র দেশের কয়েকটা পরিবারের বৃদ্ধিতেই অবদান রেখেছে সেকথা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। বেকারত্বের হার আবারও ৮% অতিক্রম করেছে, এবং যুব সম্প্রদায়ের বেকারত্ব অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সের জন্য, কর্মরত লোকজনের সংখ্যা ২০১৭ সালের মার্চ মাসে প্রায় ২১% থেকে ২০২২ সালের মার্চ মাসে প্রায় ১০%-তে নেমে এসেছে; অর্থাৎ পাঁচ বছরে অর্ধেক। অন্যদিকে, ২০১৬-১৭ এবং ২০২১-২২ এর মধ্যে, কর্মক্ষম জনগণের মধ্যে পড়ুয়াদের অংশ ১৫% থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩%। এর মধ্যে বেশিরভাগেরই বয়স ১৫-২৪ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, শিক্ষিত কর্মহীন যুব সম্প্রদায় চাকরির সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে প্রশমিত করার জন্য কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের তরফ থেকে ছদ্ম-জাতীয়তাবাদী বড় বড় কথা, ধর্মান্ধতা এবং যুদ্ধ-যুদ্ধ রব তোলা ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই।

২০২২ সালের জানুয়ারী থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে বিশ্লেষণ করা একটা তথ্যে দেখানো হয়েছে যে স্নাতকদের মধ্যে সেই সময় বেকারত্বের মাত্রা ছিল ১৭.৮%, যা ২০১৭ সালের প্রায় ১১%-এর তুলনায় ছিল অনেকটাই বেশি৷ রাজস্থান, বিহার এবং অন্ধ্র প্রদেশ এর মতো কিছু রাজ্য নিজেদের স্নাতকদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যকদের জন্য চাকরি দিতে পারেনি৷ শিক্ষার স্তর যত উপরের দিকে উঠছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্বের পরিমাণও। দেশের দুটো সর্বাধিক জনবহুল রাজ্য – বিহার আর উত্তর প্রদেশ এর ক্ষেত্রে এটা আরও স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। ভারতের কর্মহীন জনগণের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই দুই রাজ্যের। যেসমস্ত কোর্স এই দুই রাজ্যে পড়ানো হয় তার সাথে চাকরির বাজারের যে কোনো সংযোগ নেই সেই বার্তারই প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় এই পরিসংখ্যান থেকে। অ-প্রযুক্তিগত/পেশাগত [নন-টেকনিক্যাল/প্রফেশনাল] কোর্সে ভর্তির হার বিহারে ৯৬% শতাংশ এবং উত্তর প্রদেশে ৮৫ শতাংশ – যা ভীষণ মাত্রায় বেশি। তাই ১২৫ লাখ প্রার্থী ভারতীয় রেলওয়েতে অ-প্রযুক্তিগত জনপ্রিয় বিভাগে ৩৫,২৮১-টা চাকরির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন – এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই। এখান থেকে দেশের শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের ছবিটাই ফুটে ওঠে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও ছবিটা আলাদা কিছু নয়। প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকে পরীক্ষা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৬% শিক্ষার্থী পাশ করেছে। তাদের অধিকাংশই শিক্ষিত বেকারে পরিণত হয়েছে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পলিটেকনিক ইত্যাদি স্তরে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী যোগ্যতা অর্জন করছে। কিন্তু তারা শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের জন্য চাকরিক্ষেত্রে কোনো খালি পদ নেই। মোট বেকার কর্মীবাহিনীর প্রায় ৩৯%-ই উচ্চশিক্ষিত। সমসাময়িক পশ্চিমবঙ্গে, যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে এবং তার মধ্যে উচ্চশিক্ষিতদের সংখ্যা সবথেকে বেশি। গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে, প্রতি ১০০ জন যুবক-যুবতীর মধ্যে ১২ জন বেকার, এবং শহরাঞ্চলে এই সংখ্যা ১০ জন। আমরা যদি ২০১১ সালের কর্মসংস্থানের অবস্থার সাথে তুলনা করি (যখন TMC ক্ষমতায় এসেছিল), তাহলে গত দশকে আমরা প্রায় ৯ লাখ চাকরি হারিয়েছি, এবং সেটাও শুধুমাত্র রাজ্যের মহিলাদের মধ্যে। অজস্র বিজ্ঞাপনের সাথে বিভিন্ন নামে একাধিক কল্যাণমূলক প্রকল্প সম্পর্কে ফাঁকা বুলি বিস্ময়কর প্রভাব ফেললেও রাজ্যের দরিদ্র মেহনতি শ্রেণীর মধ্যে চাকরি হারানো নিয়ে তীব্র উদ্বেগ রয়েছে। কর্মহীন শ্রমবাহিনীর গঠনকে যখন আমরা ভেঙে নিয়ে বিচার করতে যাই তখনই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দৃশ্যটা চোঝের সামনে চলে আসে। পশ্চিমবঙ্গে ১৫-৫৯ বছর বয়সের মধ্যে যাঁরা বেকার এবং সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছেন, তাঁদের মধ্যে ৭৬%-ই হলেন ১৮-৩০ বছর বয়সী। একটা জনসংখ্যাগত লাভ বা অর্থনীতির সুবিধা হিসাবে যে অপেক্ষাকৃত তরুণ কর্মীবাহিনীকে দেখতে পাওয়া উচিত ছিল, সেই অংশটাই আজ রাজ্যে কর্মহীন। রাজ্যের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে গত দশকে যে ছবিটা দেখা গিয়েছে সেটা হলো কর্মক্ষম জনগণের জন্য মোট বেতনযুক্ত ও নিয়মিত চাকরির মধ্যে সরকারী চাকরির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া। ২০১১-১২ সালে, গ্রামীণ এলাকায়, সমস্ত বেতনযুক্ত চাকরির ৩৭% ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায়; শহর এলাকায় এর পরিমাণ ছিল ৩১%। কিন্তু বিগত এক দশকে সরকারী ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের পরিমাণ ভীষণভাবে কমে গিয়েছে। সমস্ত গ্রামীণ বেতনভুক্ত চাকরির মাত্র ৩০% এবং শহুরে বেতনযুক্ত চাকরির মাত্র ২৩% সরকারী ক্ষেত্রে রয়ে গিয়েছে। সরকারী ক্ষেত্রের চাকরিগুলোতে কর্মী নিয়োগ যদি এইভাবে ক্রমাগত কমে যেতে থাকে, তাহলে এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরেও বেকার কর্মীবাহিনীকে রাজ্যের বাইরে চাকরি খুঁজতে যেতে হবে।

পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে মহামারী। ২০২১ সালে বেকার স্নাতকদের সংখ্যা ছিল ১৯.৩% (২০১৯ সালের ১৪.৯% এবং ২০২০ সালে ১৫.১%-এর তুলনায়)। এই সময়ে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক তাঁদের নিজ নিজ শহরে ফিরে আসায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছিল সেটা এই বৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করতে পারে। সঙ্কটের অবস্থা বেশ গুরুতর এবং পশ্চিমবঙ্গ এখনও দক্ষ ও অদক্ষ উভয় কাজের ক্ষেত্রেই অভিবাসী শ্রমিকদের একটা উৎসস্থল হিসাবে রয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পুনরায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার জন্য একটা নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কাজেই, বিভিন্ন ‘প্রকল্প’-এর নামে ফাঁকা বুলির পরিবর্তে, একটা কর্মসংস্থান নীতি আনতে হবে, যার লক্ষ্য হবে বেকার কর্মীবাহিনীকে লাভজনকভাবে ‘উপযুক্ত চাকরি’ প্রদান করা, সরকারী ক্ষেত্রের কর্মসংস্থানকে তার আগের জায়গায় নিয়ে আসা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে রাজ্যের মহিলা ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।


লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার মে ২০২৩ সংখ্যায়


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://thewire.in/government/indias-jobless-rate-rises-to-16-month-high-of-8-30-in-december-cmie [Retrieved On: 21/05/2023]

Leave a Reply