মেঘালয়-এর নিম্নগামী অর্থনৈতিক অবস্থা, বিধায়কদের দুর্নীতি ও দান-খয়রাতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকরির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য মাঝেমাঝেই “স্থানীয় বনাম বহিরাগত” ইস্যুর মতো একটা সংবেদনশীল বিষয়কে উস্কে দেওয়া – ইত্যাদি নিয়ে আগেই একটা লেখায় আলোচনা করা হয়েছিল। এখন নির্বাচন শেষ, ফলাফলও বেরিয়ে গিয়েছে। আঞ্চলিক দল NPP, UDP হোক বা জাতীয় স্তরের BJP, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস – সমস্ত দলই এই বছর নির্বাচনে এককভাবে লড়েছিল। যদিও কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে সরকার গড়তে পারেনি। ৬০-টা আসনের মধ্যে ক্ষমতায় থাকা NPP জিতেছে ২৬-টা। যে BJP দল নির্বাচনের দুদিন আগে পর্যন্ত NPP দলের লাগামছাড়া দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে ভীষণ রকম সরব হয়েছিল, দিল্লী থেকে মোদী-শাহ বারবার শিলং-এ এসে দুর্নীতি-বিরোধী ভাষণ দিয়ে সেখানকার ঠাণ্ডা আবহাওয়াকে গরম করে তুলেছিলেন – সেই BJP দলই নির্বাচনের ফলাফল বের হওয়ার পর সবথেকে আগে নিজের জয় করা ২-টো আসন নিয়ে NPP-কে সরকার গঠনে সমর্থন করে! কয়েকদিন ধরে বিস্তর নাটকের পর, বিভিন্ন মন্ত্রীত্ব পদ নিয়ে দর-কষাকষির পর, কিছু আঞ্চলিক দলেরও সমর্থন সমেত পুনরায় মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসেন NPP-র কনরাড সাংমা।
নির্বাচনের আগে আর পরে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকান্ড যে বড় বড় সার্কাস দলগুলোকেও লজ্জায় ফেলে দিতে পারে, সেটা সকলেরই কমবেশী জানা, তাই সেই বিষয়ে বাক্যব্যয় করে আর লাভ নেই। বরং যেটা বলা প্রয়োজন সেটা হলো – এইসব নাটকের মাঝেই মেঘালয়-এর নির্বাচনী রাজনীতিতে একটা বিকল্প সম্ভাবনা দানা বেঁধে উঠছে, যার দিশারী হলো “কাম মেঘালয়” নামক একটা রাজনৈতিক মঞ্চ। নির্বাচনের প্রায় এক বছর আগে থেকেই মেঘালয় রাজ্যের বিভিন্ন প্রগতিশীল মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এই মঞ্চ। “কাম” কথাটার অর্থ এখানে কাজ। এই মঞ্চ এমন একটা সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে যেখানে কাজকে এবং যাঁরা কাজ করেন সেই শ্রমজীবী জনতাকে সম্মান করা হবে। মেঘালয় রাজ্যের সার্বিক দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যেসমস্ত লক্ষ্য পূরণে এই মঞ্চ কাজ করতে চায় সেগুলো হলো – ১) স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন নিশ্চিত করা, ২) জমি, পরিবেশ ও কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ৩) মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাত থেকে অর্থনীতির কেন্দ্রীভবন দূর করে সেটাকে গণতান্ত্রিক করে তোলা, ৪) সুলভ এবং গুণমানসম্পন্ন স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষা নিশ্চিত করা, ৫) তরুণ প্রজন্মের জন্য দুর্নীতিমুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, ৬) শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা, ৭) লিঙ্গ সমতা এবং নারী ও যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, ৮) ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধিতা করা, ৯) জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের শান্তি, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, এবং ১০) ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ও বহুত্ববাদী চরিত্রকে রক্ষা করা।
এককথায় মানুষের বিভিন্ন মৌলিক অধিকারের জন্য চলমান ও ভবিষ্যত লড়াইগুলোর সাথে নির্বাচনী রাজনীতির একটা সংযোগ স্থাপন করতে চায় কাম মেঘালয়। নিজেদের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী এই মঞ্চ বিশ্বাস করে –
নির্বাচনী রাজনীতিটা ধনী, অপরাধী, ও তাদের বন্ধুদের খেলার মাঠ নয়, বরং এমন একটা ক্ষেত্র যেখানে প্রত্যেকে নিজেদের পছন্দমতো ভবিষ্যৎ তৈরি করার কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাজনীতি শুধুমাত্র কিছু স্বতন্ত্র নেতার উপর নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে পারে না। কেবলমাত্র শ্রমজীবী জনগণের পূর্ণ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এই রাজনীতি টিকে থাকতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কাম মেঘালয় মঞ্চের সদস্যদের মধ্যে আলাপ-আলোচনায় ঠিক হয় যে মঞ্চের তরফ থেকে তিনজন নির্দল প্রার্থী হিসাবে ২০২৩-এর বিধানসভা নির্বাচনে লড়বেন, যথা – কং অ্যাঞ্জেলা রঙ্গদ, কং ওয়ানপিনহুন খারসিনতিউ, এবং কিরসইবর পিরতু (খাসি ভাষায় “কং” শব্দটা মহিলাদের ক্ষেত্রে সম্মানজনক সম্বোধন হিসাবে ব্যবহৃত হয়)। সমাজকর্মী কং অ্যাঞ্জেলা দীর্ঘ দুই দশক ধরে রাজ্যের বিভিন্ন গণ-আন্দোলনের সাথে যুক্ত। গার্হস্থ্য হিংসা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া মহিলাদের জন্য ন্যায়বিচার এবং তাঁদের জন্য কল্যাণমূলক ব্যবস্থার দাবির মাধ্যমে এই রাজ্যের নারী আন্দোলনে তাঁর পথ চলা শুরু হয়। মেঘালয় রাজ্য মহিলা কমিশন তৈরির লড়াইতেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তথ্যের অধিকার আইন বা RTI-এর দাবিতে একবিংশ শতকের গোড়াতেই দেশব্যাপী যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেখানে মেঘালয় রাজ্য থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রগণ করেছিলেন তিনি। শ্রমজীবী মানুষদের অধিকারের লড়াইতেও তিনি যুক্ত; Thma U Rangli Juki (TUR) নামক শ্রমিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। একইভাবে, কং ওয়ানপিনহুন-এর পথ চলা শুরু হয় গৃহপরিচারিকাদের অধিকার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। ন্যাশনাল ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স মুভমেন্ট-এর সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে RTI আন্দোলন, খাদ্যের অধিকার, ন্যূনতম মজুরির অধিকার ইত্যাদি আন্দোলনেও সামিল হন তিনি। অন্যদিকে, খাসি স্টুডেন্ট্স অ্যাসোসিয়েশন-এর মাধ্যমে মেঘালয়-এর ছাত্র-রাজনীতিতে হাতে খড়ি হওয়া কিরসইবর-ও AFSPA-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বেলাগাম খনিজ সম্পদ লুঠ-বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত একাধিক লড়াইয়ের সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তাঁদের ক্ষেত্রে নতুনত্ব শুধু এখানেই ছিল যে রাস্তার লড়াইয়ের পাশাপাশি এই বছর নির্বাচনী লড়াইতেও তাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।
নির্বাচনের ফল যদিও আশানুরূপ হয়নি। নিজ নিজ আসন থেকে তাঁরা কেউই জিততে পারেননি। একমাত্র কং অ্যাঞ্জেলা-র ফল তাও তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রে লড়াইটাও ছিল কঠিন। তাঁর ১৯-সাউথ শিলং নির্বাচনী এলাকায় মূল প্রতিপক্ষ ছিল BJP-এর সানবর সুল্লাই, যিনি বহুদিন ধরে এই এলাকার বিধায়ক হিসাবে জিতে আসছেন, এবং এই বছরও তিনিই জিতেছেন। অর্থাৎ, BJP যে মাত্র ২-টো আসনে জিততে পেরেছে তার মধ্যে একটা এখানে। সানবর যেখানে প্রায় ৬৬% ভোট পেয়ে এই আসন থেকে জিতেছেন সেখানে অ্যাঞ্জেলা প্রায় ৮% ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছেন। অ্যাঞ্জেলা-র প্রাপ্তি এটাই যে প্রথমবার নির্দল প্রার্থী হয়ে লড়াই করে, বাকি বড় দলগুলোর মতো কোনো রকম দান-খয়রাতি না করে, কাম মেঘালয়-এর উপরিউক্ত লক্ষ্যগুলোর কথা ব্যাখ্যা করে তিনি কংগ্রেস ও তৃণমূল-এর থেকে বেশী ভোট পেয়েছেন। ভোটের হিসেবনিকেশে মানুষের দৃষ্টি সেভাবে আকর্ষণ করতে না পারলেও এই তিনজনের প্রচারের মধ্যে সরলতা যেমন ছিল তেমনই ছিল অভিনবত্ব। সেই বিষয়ে দু-চার কথা না বললেই নয়।
কাম মেঘালয় মঞ্চের এই তিনজন নির্দল প্রার্থী যে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বা ইস্তেহারগুলো তৈরি করেছিলেন সেগুলো একতরফা ছিল না। নির্বাচনী এলাকায় প্রচারের সময় অসংখ্য পাব্লিক মিটিং বা স্ট্রীট মিটিং ছাড়াও আলাদা করে প্রতিটা পরিবারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কাম মেঘালয়-এর বার্তা নিয়ে। রাজ্যের সামগ্রিক সমস্যা থেকে শুরু করে এক একটা এলাকার নির্দ্দিষ্ট সমস্যা পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনগণের সাথে আলোচনা করা হয়েছিল, তাঁদের বক্তব্য শোনা হয়েছিল, এবং সেইসব বক্তব্যের উপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছিল “পিপল্স অ্যাকশান প্ল্যান” বা “জনগণের কর্ম পরিকল্পনা”, এবং সেটাও তিনটি নির্বাচনী এলাকার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ভাবে। এই পরিকল্পনাগুলোর ক্ষেত্রে যে তিনটে মূল বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল সেগুলো হলো – ১) উন্নয়ন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ জনগণের অধিকার, বিধায়ক বা সরকারের দয়া-দাক্ষিণ্য নয়; ২) গণতান্ত্রিক কাঠামোতে কোন নীতিটা বা প্রকল্পটা স্থির ও বাস্তবায়িত হবে সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার অধিকার প্রত্যেক মানুষের আছে; ৩) একজন বিধায়ক কোন খাতে কি খরচ করছেন সেটা জানার অধিকার এবং সেই ব্যাপারে প্রশ্ন করার অধিকার নাগরিক হিসাবে প্রত্যেক মানুষের আছে। এই অধিকারগুলোকে নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ইস্তেহারে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে লোক-দেখানো সাংবাদিক সম্মেলন করে ঝাঁ-চকচকে মলাট সমেত নিজেদের ইস্তেহার প্রকাশ করেন, সেখানে ঠিক তার উল্টো পথে হেঁটে আড়ম্বরহীনভাবে, দৈনিক সংবাদপত্রের মতো সস্তা সাধারণ কাগজে, ইংরাজি-হিন্দি-খাসি এই তিনটে ভাষায় আলাদা করে এই ইস্তেহার ছাপা হয়েছিল; ঘরে-ঘরে, রাস্তাঘাটে, বাজারে-দোকানে বিলি করা হয়েছিল; বোঝানো হয়েছিল এটা জনগণের অর্থাৎ আপনাদেরই ইস্তেহার, আপনাদেরই মতামতের উপর ভিত্তি করে তৈরি। জনগণ অবাক হয়ে শুনেছিলেন, যেন প্রথমবার এমন কিছু একটা শুনছেন; সংবাদপত্রের মতো মেলে ধরে সেই ইস্তেহার পড়েছিলেন; মৌখিকভাবে স্বীকারও করেছিলেন যে – হ্যাঁ, একটা পরিবর্তন প্রয়োজন; কারণ কেউই সুখে নেই, বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার যে কোভিডের সময়ে শাসক দল দুর্নীতি করে বিপুল টাকা নিজেদের পকেটে ভরেছিল। এই দুর্নীতির একটা ছোটো কিন্তু তাৎপর্য্যপূর্ণ অংশকে জনসমক্ষে ফাঁস করে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন স্বয়ং কং অ্যাঞ্জেলা। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য কোভিড-ত্রাণ হিসাবে আসা টাকা যাতে যথাযথভাবে তাঁদের দিয়ে দেওয়া হয় তার দাবিতে তিনি সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং-এর মেন গেটের ঠিক বাইরে বেশ কয়েকদিন ধরে অবস্থান বিক্ষোভ করেছিলেন। ফুটপাথে বসে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করা হকার ভাইবোনদের উপর পুলিশের জুলুমবাজি শিলং-এ একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তাঁদের সুরক্ষার জন্য একটা আইন আনার ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক অতীতে কং অ্যাঞ্জেলা এবং তাঁর TUR সংগঠনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গোটা দেশে যখন NRC-CAA-NPR-বিরোধী আন্দোলন চলছে তখন উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে একটা জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সেই আন্দোলনের চরিত্র ছিল CAA-বিরোধী, কিন্তু NRC-র পক্ষে। কিন্তু সেই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই TUR সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল NRC-CAA-NPR-বিরোধী। শুধু তাই নয়, TUR-এর তরফ থেকে কিরসইবর (কাম মেঘালয় মঞ্চের আরেক প্রার্থী) এবং মান্ত্রে পাস্সা CAA আইনের সাংবিধানিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতে পিটিশন দাখিল করেন। এই পিটিশনের মূল বক্তব্য ছিল –
সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীদের জীবনযাপনের বাস্তবতাকে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে এই আইন, কারণ তাঁদের মধ্যে অনেকেই আদিবাসী সংস্কৃতি বা ধর্ম মেনে চলেন এবং যে ছয়টা ধর্ম-সম্প্রদায়কে [হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, খ্রিষ্টান] এই আইনে নির্বাচন করা হয়েছে সেগুলোর কোনোটাই তাঁদের পরিচয় বহন করে না।
কিন্তু এইসব সত্ত্বেও নির্বাচনের ফল আশানুরূপ হলো না কেন? আগামী দিনে কাম মেঘালয় মঞ্চের তরফে নিশ্চই সেটার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে যে কয়েকটা পয়েন্টের উল্লেখ করা যেতে পারে সেগুলো হলো –
- শিলং-এ নির্দল প্রার্থীর জেতার ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব-দেশ-রাজ্য রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। জনগণ হয়তো নির্দল প্রার্থীকে শক্তিশালী বিকল্প হিসাবে বিবেচনা করছেন না। এক্ষেত্রে কাম মেঘালয় মঞ্চ যদি ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ পার্টি আকার ধারণ করে তাহলে হয়তো জনগণের থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলতে পারে।
- কাম মেঘালয় মঞ্চের প্রার্থীরা অতীতে বিভিন্ন অধিকার-আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকলেও এবং সেখান থেকে কিছু বড় সাফল্য লাভ করলেও সেগুলো ইস্যুভিত্তিক সাফল্য হয়েই থেকে গিয়েছে। সেখান থেকে দৃঢ় গণ-সংগঠন গড়ে তোলা হয়নি, বা হলেও সাংগাঠনিক কাজকর্মে দুর্বলতা থেকে গিয়েছে; যে কারণে এমনকি সেইসব আন্দোলন থেকে উপকৃত মেহনতি জনগণের একটা বড় অংশের কাছে নির্বাচনী বিকল্প হিসাবে তাঁরা বিবেচিত হননি। এক্ষেত্রে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের পাশাপাশি দরকার জনগণের মধ্যে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী কাজকর্ম। ইস্তেহারে এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী ইতিমধ্যেই যেসমস্ত প্রস্তাবের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো নিয়ে অবিলম্বে এই মঞ্চের তরফে কাজ শুরু করা দরকার।
- একদিকে দেশের অন্যত্র খ্রিষ্টানদের উপর BJP-র আক্রমণ ও মেঘালয়-এ শাসক দল NPP-র সাথে BJP-র ঘনিষ্ঠতা, এবং অন্যদিকে নতুন দল VPP-র স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও খ্রিষ্টান ধর্ম-কেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক প্রচারে রাজ্যের ধার্মিক খ্রিষ্টান জনগণ ও শিক্ষিত এলিটদের একটা বড় অংশই VPP-র পক্ষে প্রভাবিত হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে কাম মেঘালয়-এর নির্দল প্রার্থীদের তুলনায় পরিবর্তনকামী ভোটারদের কাছে নতুন দল VPP বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। VPP ১৮-টি আসনে লড়াই করে তার মধ্যে ৪-টিতে জিতেছে। এক্ষেত্রে, নিজের মতাদর্শের সাথে আপোষ না করে কিভাবে BJP-বিরোধী, NPP-বিরোধী প্রধান মুখ হয়ে ওঠা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে কাম মেঘালয়-কে।
- দান খয়রাতির রাজনীতির সম্মুখে জনগণের সামগ্রিক চেতনার একটা অবক্ষয় ঘটেছে। সামান্য স্ট্রীট মিটিং-এ লোক টানতে বড় বড় দলগুলো (আঞ্চলিক ও জাতীয় উভয়েই) মাথাপিছু ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছে। নির্বাচনের জন্য ভোট কিনতে তাহলে তারা কিরকম খরচ করছে সেটার একটা আন্দাজ করাই যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে কাম মেঘালয়-এর অবস্থান হলো এই দান খয়রাতির রাজনীতির সাথে আপোষ না করে সেটাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো। চটজলদি এই সমস্যার কোনো সমাধান হয়তো হবে না। তবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়ে জনগণের মধ্যে প্রচার চালিয়ে এই সমস্যার মোকাবিলা করা যেতে পারে।
তবে এই বছর নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন মেঘালয়-এর নির্বাচনী রাজনীতিতে কাম মেঘালয় মঞ্চ যে একটা নতুন পথ দেখাচ্ছে সেকথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। এই মঞ্চের উদ্যোক্তারা মনে করেন গণ-আন্দোলন আর নির্বাচনী রাজনীতি দুটো আলাদা ক্ষেত্র হলেও এই দুটোর মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়োজন আছে; এবং সেক্ষেত্রে একটাকে অন্যটার চেয়ে বেশি কার্যকরী ভাবা, বা সেই অনুযায়ী একটার উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করে অন্যটাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। যদিও এই কথাটাও তাঁরা স্বীকার করছেন যে এই দুটো ক্ষেত্রকে একসাথে ম্যানেজ করা সহজ কাজ নয়, এবং এই দুইয়ের মধ্যে উপযুক্ত ব্যালেন্স বজায় রাখাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জকে এই মঞ্চ কিভাবে সামাল দেবে সেটা আগামী দিনগুলোতেই বোঝা যাবে। আপাতত এই সামাজিক পরীক্ষা চলুক। কাম মেঘালয়-এর জন্য থাকুক সংহতি ও অনেক শুভেচ্ছা।
