পুঁজিনিবিড় শিল্পের রমরমা সময়েও যদি কোনো শ্রমনিবিড় শিল্পের কথা বলতে হয় তা হলে কোন শিল্পের কথা মনে আসবে? যেখানে শ্রমিকেরা আজও মাস গেলে উপার্জন করতে পারেন খুব বেশি হলে ১০০০০-১২০০০ টাকা। যেটি আবার এই রাজ্যের বহু পুরোনো, অন্যতম সংগঠিত শিল্প এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। অনেক অজুহাত আর সমস্যার গাল-গল্প শোনা গেলেও শ্রমিক শোষণের অন্যতম কেন্দ্র চটশিল্পের কথা বলা হচ্ছে এখানে। বর্তমানে চটশিল্প শ্রমিক শোষণের অন্যতম পরীক্ষাগার। এই লেখায় তারই একটি রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।
এমনিতেই সমস্ত চটকলেই যত জন শ্রমিক প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রমিক নিয়ে রাখা হয়। কারণ অস্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ এবং অত্যধিক কাজের চাপে খুব কম শ্রমিকই মাসে ২৬ দিন কাজ করতে পারেন। যাতে উৎপাদনে ঘাটতি না পড়ে তাই বাড়তি শ্রমিক নিয়ে রাখা। এই বাড়তি শ্রমিক নিয়ে রাখার ফলে যারা জুনিয়র শ্রমিক তারা কবে কাজ পাবেন আর কবে কাজ পাবেন না, তা তারা নিজেরাও জানেন না। তার সাথে যখনই উৎপাদন কমানোর প্রশ্ন আসে তখনই প্রথম কোপ পড়ে জুনিয়র শ্রমিকদের কাজে। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের সুযোগটাও চটকলগুলি ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। অজস্র বাড়তি শ্রমিক নিয়ে রেখেছে তারা নিজেদের উৎপাদন মাত্রাকে সুরক্ষিত রাখতে। এবং একই সাথে এই বাড়তি শ্রমিক নীতি শ্রমিকদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলনের পথেও বাধা সৃষ্টি করেছে। কারণ মিল ম্যানেজমেন্টের কথার অবাধ্য হলেই কাজ থেকে বসিয়ে দিয়ে বাড়তি শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার রাস্তাটি খুলে রেখেছে তারা। কাজ থেকে দুম করে বসিয়ে দেওয়ার রাস্তা আরও সুগম হয়েছে স্থায়ী শ্রমিক স্তরটিকে প্রায় মুছে ফেলার জায়গা থেকে। স্থায়ী শ্রমিকদের বেতনহীন ভাবে বসিয়ে দিতে হলেও শো-কজ, চার্জশিটের ব্যবস্থা থাকত। এখন মিল থেকে বহিষ্কার করতে হলেই ম্যানেজমেন্ট একমাত্র চার্জশিট ব্যবহার করে।
চটশিল্পে স্থায়ী শ্রমিক স্তরটি প্রায় উঠেই গেছে। যারা প্রায় অবসরের মুখে তাদের মধ্যেই কয়েকজন স্থায়ী শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। এখন চটশিল্পে তিন ধরণের শ্রমিক আছেন। চটকলের ভাষায় ‘খাতার লোক’ (মিলহ্যান্ডস), ‘ঠিকার লোক’ (কনট্রাক্টচুয়াল), ‘ক্যাজুয়াল লেবার’ (ভাউচার শ্রমিক)। এদের মধ্যে মিলহ্যান্ডস যারা তাদের মাসিক ৪ দিন সবেতন ছুটি, বছরে একবার লাইন ছুটি (বছরে ২৪০ দিন কাজ থাকলে) বরাদ্দ। কিন্তু এরা স্থায়ী শ্রমিক নন। কারণ এরা সাপ্তাহিক ছুটির দিনটা বাদে কোনো কারণে কোনো একদিনও কাজে না আসতে পারলে সেদিনের মজুরি কাটা যায় এদের বিল থেকে!! এদের দৈনিক ৪০০ টাকা থেকে ৫৪০ টাকার মধ্যে থাকে। কন্ট্রাক্টচুয়ালদের লাইন ছুটির সুবিধা নেই, দৈনিক মজুরি সাধারণত ৩৬০ টাকা থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে হলেও ২৪০-২৫০ টাকাতেও কাজ করানো হয়!!! এদের মাসে চারটে সবেতন ছুটিও নেই। তার সাথে কাজে না এলে সেদিনের মজুরি কাটা যায়। ভাউচার শ্রমিকরা হলেন অদৃশ্য শ্রমিক। এদের অনেকেই অন্যান্য বন্ধ চটকলের শ্রমিক। তারা দৈনিক ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় কাজ করেন। সপ্তাহের শেষে হাতে মজুরি পেয়ে যান। কিন্তু এদের ইএসআই-পিএফের কোনো অধিকার নেই। মিলের মধ্যে এদের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মিল তার দায় এড়িয়ে যেতেই পারে।।। প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে একটু বলে রাখা ভাল যে কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা নতুন শ্রমকোড স্থায়ী শ্রমিক বিষয়টিকেই উঠিয়ে দেবে কিন্তু এই রাজ্যে তা কার্যকর না হতেই অন্তত চটশিল্পে স্থায়ী শ্রমিক স্তরটি প্রায় ইতিহাসের খাতায় চলে গেছে। অনেক চটকলই মিলহ্যান্ডস শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে এনে ৭০% – ৯০% কন্ট্রাক্টচুয়াল শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো সম্ভব হচ্ছে। আর ভাউচার শ্রমিক হলো মিল মালিকদের কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। একে মজুরি কম তার উপর আবার ইএসআই-পিএফের দায় নেই।
এর সাথে আছে টানা শিফ্টের অস্ত্র। এখন চটকলগুলিতে প্রথম এবং দ্বিতীয় শিফ্টে তিন ধরণের শিট চলে। টানা আট ঘন্টা, বা কাটা (পাঁচ ঘন্টা তারপর তিন ঘন্টা বিরতির পর আবার তিন ঘন্টা, বা তিন ঘণ্টা কাজের পর তিন ঘন্টা বিরতির পর পাঁচ ঘণ্টা), আর কিছু মিলে কিছু শ্রমিকের জন্য কাটা শিফ্ট কিছু শ্রমিকের জন্য টানা শিফ্ট। রাতের শিফ্ট টানা আট ঘণ্টাই হয়। আগে সমস্ত চটকলেই কাটা শিফ্টে কাজ হতো। কিন্তু কাটা শিফ্টের জন্য পাঁচবার শ্রমিকদের ঢোকা-বেরোনো, লাইন সাজানোর জন্য প্রোডাকশন কম হতো। যাকে মিল ম্যানেজমেন্টের ভাষায় বলা হতো প্রোডাকশন ল্যাগ। টানা শিফ্ট সেই ল্যাগকে তিন বারে নামিয়ে এনে মুনাফা বাড়িয়ে দেয় চটকল মালিকদের। ফলে অনেক চটকলেই টানা শিফ্ট চালু করা হয়েছে। যে মিলগুলিতে এখনও কাটা শিফ্ট চালু আছে সেখানেও টানা শিফ্ট চালু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিল ম্যানেজমেন্ট। সম্প্রতি আইজেএমএ চটশিল্পে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য একরকম শর্তই রেখেছে সমগ্র চটশিল্পে টানা শিফ্ট চালু করার। টানা শিফ্ট নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। প্রথমত টানা শিফ্ট মালিকের মুনাফা বাড়াবে কিন্তু শ্রমিকের মজুরি একই থেকে যাবে, যা শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মেনে নেওয়া অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, এমনিতেই চটকলে প্রায় কোনো শ্রমিকের পক্ষেই মাসে ২৬ দিন কাজ করা সম্ভব হয় না চটকলের কাজের প্রকৃতি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য টানা শিফ্টে কাজ করলে শ্রমিকরা আরও কম দিন কাজ করতে পারবেন মাসে। তাতে মালিকের ক্ষতি নেই, কারণ বাড়তি শ্রমিক (জুনিয়র), ভাউচার শ্রমিকে জোগান আছে। তাদের দিয়ে অনেক কম মজুরিতে কাজ করিয়ে নিজেদের মুনাফার পাহাড় বাড়িয়ে চলবে মিল মালিকেরা কিন্তু শ্রমিকদের পেটে লাথি মারা হবে। তৃতীয়ত, কাটা শিফ্টের প্রথম ভাগে কাজে গেলেই সেটাকে হাজিরা হিসাবে ধরা হয়, পরের ভাগে কোনো বিশেষ কারণ বশতঃ যেতে না পারলেও “নো ওয়ার্ক নো পে”-এর চক্করে পড়া থেকে বেঁচে যান শ্রমিকরা, সেটুকু স্বাধীনতাও শ্রমিকরা হারাবেন। অনেক মিলে তা হারিয়ে বসেও আছেন। যে মিলগুলিতে টানা এবং কাটা শিফ্ট একসাথে চলেছে সেখানে জুনিয়র শ্রমিক এবং ভাউচার/ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের ভাগে পড়ছে টানা শিফট। ফলে কম মজুরির সাথে প্রোডাকশন ল্যাগ কাটিয়ে নেওয়া মুনাফা বাড়াচ্ছে মালিকদের, এবং শ্রম চুরি যাচ্ছে শ্রমিকদের।
এর সাথে আছে পূর্ণ নিয়োগ থেকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিয়মের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে শ্রমিক শোষণ। লার্নার হিসেবে কেউ নিযুক্ত হয় ৮০-১০০ টাকা মজুরিতে। তারপর দু’ধাপ পেরিয়ে পুরোপুরি নিযুক্ত হতে হয়। এক একটা ধাপ পেরোনোর কোনো স্পষ্ট মাপকাঠি না থাকায় পরের ধাপে উঠতে এবং মূলতঃ শেষ ধাপ পেরিয়ে নিয়োগ পেতে শ্রমিকদের বছর দেড় বছর পেরিয়ে যায়!!! অর্থাৎ খুব কম মজুরিতে এদের অনির্দিষ্টকালের জন্য খাটিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে আবার মিল মালিকদের চাপ লাঘব করতে রাজ্য সরকার এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত বেকারদের চটকলে লার্নার হিসেবে কাজে ঢোকার জন্য ২০০ টাকা করে ভাতা দিচ্ছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন কোনো লার্নারকে প্রায় কিছু মজুরি না দিয়ে খাটিয়ে নেওয়ার সুযোগ সরকার করে দিচ্ছে মিল মালিকদের। নিয়োগের পর অদক্ষ শ্রমিক থেকে আধা দক্ষ, দক্ষ এবং অতি দক্ষের স্তরে আসার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা কাজ করে। ফলাফল সেই শ্রমিক শোষণের মাধ্যমে মালিকের মুনাফা বুদ্ধি।
আজকের চটশিল্পে এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য বর্তমান। একদিকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শ্রমিক, এবং তার সাথেই একজন শ্রমিকের ওপর মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপ। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা আলোচনা করা যাক। কোনো একটি মিলে একজন শ্রমিককে ববিন ডিপার্টমেন্টে ১৪-টি মেশিন দেখতে হয়, আবার সেই ডিপার্টমেন্টরই একজন শ্রমিক ১৫ দিনে দু’দিন কাজ পেয়েছেন!!! এই বৈপরীত্য অদ্ভুত লাগলেও এও এক শ্রমিক শোষণের কৌশল। একজন শ্রমিককে নিংড়ে নেওয়া এবং মজুত বাহিনী তৈরি রাখা যাতে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে সমস্যায় পড়ে।
আরেকটি বিষয় আলাদা করে উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে। সেটা হলো মহিলা শ্রমিকদের কথা। সমস্ত মিলে না হলেও কিছু মিলে এখনও মহিল শ্রমিকরা কাজ করেন। তবে যখনই শ্রমিক সঙ্কোচন বা ছাঁটাইয়ের প্রশ্ন আসে তখনই প্রথম কোপটা পড়ে মহিলা শ্রমিকদের উপর। মহিলা শ্রমিকরা রাতের শিফ্ট ছাড়া বাকি দু’টি শিফ্টে কাজ করেন। তাদের মজুরির সাথে পুরুষ শ্রমিকদের মজুরির বৈষম্য রয়েছে চোখে পড়ার মতো। ৪১৫ টাকার বেশি দৈনিক মজুরি কোনো মহিলা শ্রমিক পান না। মহিলা শ্রমিকদের মিলহ্যান্ডস হিসেবে নিয়োগ এখন বন্ধই আছে। তার সাথে বিশাখা গাইডলাইন অনুযায়ী আভ্যন্তরীণ অভিযোগ কেন্দ্র কোনো মিলেই নেই। মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকার নেই। সমস্ত মহিলা শ্রমিকই “নো ওয়ার্ক নো পে”-র আওতায় সে ‘নো ওয়ার্ক’ যে কারণেই হোক!! শৌচাগার মহিলা শ্রমিকদের জন্য আলাদা হলেও তা যথেষ্ট সংখ্যায় নেই। শৌচাগারের অপ্রতুলতা অবশ্য পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সমস্ত শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আইজেএমএ বর্তমানে মহিলাদের রাতের শিফ্টে কাজ করার অনুমতি চাইছে রাজ্য সরকারের কাছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে ছাঁটাইয়ের প্রশ্নে প্রথম শিকার হন মহিলারা, যখন পুরুষ শ্রমিকদেরও কাজের নিরাপত্তা সুরক্ষিত নয় সেখানে মহিলা শ্রমিকদের রাতের শিফ্টেও কাজ করানোর প্রশ্ন আসলে শুধুমাত্র কম মজুরি দিয়ে মুনাফা কামানোর রাস্তা বাড়ানো, সেটা খুব পরিষ্কার।
পাটের বার্ষিক ফলন রেকর্ড গড়ে তোলার পরেও চটকলগুলি উৎপাদন কাছে ‘কাঁচা পাটের অভাব’-এর জন্য। চটকল মালিকদের সংগঠন আইজেএমএ জানাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার রবিশস্যের সময় সমস্ত শস্য প্লাস্টিকের বস্তায় সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় চটকলগুলি সমস্যার মুখে পড়বে। এরই মধ্যে বেশ কিছু চটকলে সাপ্তাহিক আঠেরো শিফ্টে উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে একুশ শিফ্টের বদলে। রেকর্ড ফলনের পরেও কাঁচা পাটের অভাবের কারণ নাকি জুট কমিশনারের বেঁধে দেওয়া রেটে পাট পাওয়া যাচ্ছে না বাজারে!!! বাঁধা রেটের বেশি দামে চটকলগুলি পাট কিনতে পারবে না আর বাঁধা রেটে পাট বিক্রি করতে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করার চেষ্টাও সরকারের তরফ থেকে নেই। চটকল মালিকদের পক্ষ থেকেও সে বিষয়ে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার খুব একটা সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। হয় সরকার এবং চটকল মালিকদের অপদার্থতায় সঙ্কট তৈরি হচ্ছে চটশিল্পে অথবা এই সঙ্কট পরিকল্পনা করেই গড়ে তোলা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার নাকি চটের বস্তার অভাবের জন্য প্লাস্টিকের বস্তায় খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করতে চায়। এই খবর চটকলগুলিতে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই মিল ম্যানেজমেন্টের লোকেরা আরও একটা খবর হাওয়ায় ভাসাতে শুরু করেছেন যে চটকলের বাজার সুরক্ষিত রাখতে উৎপাদন বাড়াতেই হবে, তাই উচ্চ উৎপাদনশীল মেশিন আনা দরকার। যেগুলি চটকল শ্রমিকদের ভাষায় ‘চায়না মেশিন’। সেগুলি উচ্চ উৎপাদনশীল এবং শ্রমিকদের উপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপায়। যে মিলগুলিতে সপ্তাহে একুশ শিফ্টের জায়গায় আঠেরো শিফ্ট চালানো হবে (অর্থাৎ সপ্তাহে একদিন পুরো বন্ধ) বলে ঘোষণা হয়েছে সেখানে আবার পুরো বন্ধের দিন প্রথম/দ্বিতীয় শিফ্ট চালানো হবে টানা আট ঘন্টা ওভারটাইম হিসাবে!!! এদিকে শোনা যাচ্ছে কাঁচা পাটের অভাবে উৎপাদন কমানো হচ্ছে অন্যদিকে আবার টানা শিফ্ট চালানো হচ্ছে। এই বৈপরীত্যের কারণ কি? মিল ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে উচ্চ উৎপাদনশীল মেশিনের প্রয়োজনীয়তা প্রচার করা, তার সাথে এই একদিন টানা শিফ্টের ওভারটাইম সন্দেহ তৈরি করছে যে এই “কাঁচা পাটের অভাব” আর “চটের বস্তার অভাবে প্লাস্টিকের বস্তায় খাদ্যশস্য সংরক্ষণ”-এর অজুহাত আসলে পূর্ব পরিকল্পিত।
শেষের কথা হিসেবে শ্রমিক শোষণের আরেক নক্কারজনক ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। বছরের শেষে ডিএ ঘোষণা হতে চলেছে। ডিএ বাড়লো বলে সরকার এবং মিল মালিকদের থেকে চেঁচামেচি শুরু হবে বলেই ধারণা। কারণ ডিএ বাড়ার সম্ভাবনাই শতকরা ৯৯ শতাংশ। কারণ বছরের প্রথম ডিএ কমেছিল ২০ টাকার সামান্য কিছু পয়সা কম!! যা চটকলের ইতিহাসে সর্বাধিক। তারপর দ্বিতীয় ডিএ-এর সময় বেড়েছে তিন টাকা। এবারও হয়ত তার কিছু কমবেশি বাড়বে। অর্থাৎ ডিএ বাবদ এই বছরে শ্রমিকদের লোকসান থাকছে ১৩ টাকার কিছু বেশি। দৈনিক ১৩ টাকা !!
– নীলিম বসু
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার নভেম্বর ২০২১ সংখ্যায়
এই প্রবন্ধের লেখক নীলিম বসু আজাদ গণ মোর্চা-র কার্যকরী কমিটির সদস্য ও যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ২০২১ সালের ৩০-এ অক্টোবর রাত ১-টা নাগাদ ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। ছাত্রাবস্থায় বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে যুক্ত থাকা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে হাওড়ার বাউরিয়াতে জরি শ্রমিক ও জুটমিক শ্রমিকদের সংগঠিত করা, এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি-র (এপিডিআর) উলুবেড়িয়া শাখা গড়ে তোলা ইত্যাদি একাধিক ক্ষেত্রে নীলিম-এর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভূমি পত্রিকার তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান লেখক। নীলিম-এর মৃত্যু আজাদ গণ মোর্চা-র কাছে একটা বিশাল বড় ক্ষতি।
কমরেড নীলিম বসু অমর রহে
আমরা, আজাদ গণ মোর্চা-র পক্ষ থেকে তার অবদানকে চিরদিন স্মরণে রাখব। তার শোক-বিধ্বস্ত পরিবারের প্রতি গভীর ও আন্তরিক সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি সর্বদা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব। তার সহকর্মী শ্রমজীবী জনতার সহযোগিতায় এবং অংশগ্রহণে নীলিমের শুরু করা কাজ ও লড়াই জারি রাখার এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।
সংগ্রামী অভিনন্দন সহ
কার্যকরী কমিটি, আজাদ গণ মোর্চা
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.telegraphindia.com/india/in-a-viral-a-revival-jute-mills-telangana-and-punjab/cid/1768026 [Retrieved On: 02/02/2023]
