বাজেট ২০২৬

বাজেট ২০২৬: দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের কিছুই পাওয়ার নেই

বাজেট ২০২৬ – অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থনৈতিক বছরের কেন্দ্রীয় বাজেট প্রকাশিত হয়েছে। এই বাজেট যে কতবড় জুমলা সেই নিয়ে চারিদিকে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করব কীভাবে এই বাজেট ভারতের দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বঞ্চিত করে শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকজন পুঁজিপতি বা কর্পোরেট বন্ধুদের স্বার্থরক্ষা করেছে।

মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ এবং করের বোঝা

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য কোনো সুখবর দিতে পারেননি। আয়করের স্ল্যাব বা হারে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি এবং স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশনের পরিমাণও একই রাখা হয়েছে। অথচ জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। মধ্যবিত্ত মানুষ আশা করেছিলেন হয়তো আয়করে কিছুটা ছাড় পাবেন, কিন্তু তা ঘটেনি।

উল্টো বেশ কিছু ক্ষেত্রে করের বোঝা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের অন্যতম জায়গা ছিল শেয়ার বাজার এবং মিউচুয়াল ফান্ড। এই বাজেটে ডেরিভেটিভ্‌স লেনদেনের ওপর ‘সিকিউরিটিজ ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্স’ বা STT বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফিউচারস ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে এই কর ০.০২% থেকে বাড়িয়ে ০.০৫% এবং অপশনস ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে ০.১% থেকে ০.১৫% করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের খরচ অনেক বেড়ে যাবে।

শুধু তাই নয়, স্বর্ণ বন্ড বা Sovereign Gold Bonds (SGB)-এর ক্ষেত্রেও করের নিয়ম বদলে দেওয়া হয়েছে। আগে ম্যাচিউরিটির সময় এই বন্ডের লাভ করমুক্ত ছিল, কিন্তু এখন শুধুমাত্র প্রাথমিক বাজার থেকে সরাসরি কেনা বন্ডের ক্ষেত্রেই এই সুবিধা থাকবে। সেকেন্ডারি মার্কেট বা এক্সচেঞ্জ থেকে কেনা বন্ডের লাভে এখন ১২.৫% দীর্ঘমেয়াদী মূলধনী লাভ কর (LTCG) দিতে হবে। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা কর্মীদের যে বিশেষ প্রতিবন্ধী পেনশন (disability pension) করমুক্ত ছিল, সেই সুবিধাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

দরিদ্র মানুষের প্রতি অবহেলা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সংকট

ভারতের দরিদ্রতম মানুষদের একমাত্র ভরসা ছিল মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন বা MGNREGA। কিন্তু বর্তমান সরকার এই ঐতিহাসিক আইনটিকে রদ করে তার পরিবর্তে ‘বিকশিত ভারত – গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ বা VB-G RAM G নামে একটি নতুন প্রকল্প নিয়ে এসেছে। যদিও দাবি করা হচ্ছে যে এতে ১২৫ দিনের কাজের গ্যারান্টি দেওয়া হবে, কিন্তু আসলে এটা একটা ‘জুমলা’; কারণ তার জন্য যেখানে প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল, সেখানে সরকার বরাদ্দ করেছে মাত্র ৯৫,৬৯২ কোটি টাকা! 

কৃষকদের অবস্থাও তথৈবচ। পিএম-কিসান (PM-KISAN) প্রকল্পের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়নি, বরং মুদ্রাস্ফীতির হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত মূল্য কমে গিয়েছে। ফসল বিমা যোজনার (PMFBY) বরাদ্দ করা হয়েছে ১২,২০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের বরাদ্দের তুলনায় ৬৭ কোটি টাকা কম তো বটেই, এমনকি ২০২৪-২৫ সালে এই প্রকল্পে মোট খরচের নিরিখে দেখলে (১৪,৪৭৩ কোটি টাকা) ১৫.৭% কম। সারের ভর্তুকিতেও বড় কোপ পড়েছে। ২০১৫-১৬ সালে মোট ব্যয়ের ৪.০৪% সারের ভর্তুকি ছিল, যা এখন কমিয়ে ৩.১৯% করা হয়েছে।

আবাস যোজনার (PMAY) ক্ষেত্রে খাতা-কলমে বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবে সরকার সেই টাকা খরচ করতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। যেমন, গত বছর জল জীবন মিশনের জন্য ৬৬,৭৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে মাত্র ১৬,৯৪৪ কোটি টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ সরকার ঘোষণা করে অনেক কিছু, কিন্তু সাধারণের হাতে সেই সুবিধা পৌঁছায় না।

বাজেট ২০২৬ আসলে কর্পোরেটদের কথা ভেবেই করা

বাজেটের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো যে, ভারতের কর কাঠামোর ভার এখন কোম্পানিদের চেয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বেশি। সরকারি আয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত আয়কর থেকে আসছে ২১% রাজস্ব, যেখানে কর্পোরেট কর থেকে আসছে মাত্র ১৮%। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা লাভ করা কোম্পানিগুলোর তুলনায় সাধারণ মানুষ সরকারকে বেশি কর দিচ্ছে।

revenue share

বিগত কয়েক বছরে কর্পোরেট কর ৩০% থেকে কমিয়ে ২২% করা হয়েছে, এমনকি নতুন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির জন্য তা মাত্র ১৫%। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য পেট্রোল, ডিজেল বা নিত্যপণ্যের ওপর GST-র বোঝা কমানোর কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো বিদেশী বড় কোম্পানিগুলোকে ভারতে ‘ডেটা সেন্টার’ খোলার জন্য ২০ বছরের ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন এক দিন আয়কর জমা দিতে দেরি করলে হাজার হাজার টাকা জরিমানা গুনছে, তখন এই বড় কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর কর না দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বেহাল দশা

উন্নত দেশের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিপুল বরাদ্দের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ভারতের চিত্র ভিন্ন। কোঠারি কমিশন ১৯৬৪ সালেই বলেছিল শিক্ষা খাতে GDP-র ৬% খরচ করা উচিত। কিন্তু বর্তমান সরকার ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষা নীতিতে শিক্ষার বেসরকারিকরণের পথ আরও প্রশস্ত করে দিয়েছে। শিক্ষা খাতে ২০১৫-১৬ সালে মোট ব্যয়ের ৩.৮% বরাদ্দ ছিল, যা এখন কমে ২.৬% হয়েছে। গত ১০ বছরে ভারতে প্রায় ১ লক্ষ সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও শোচনীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে স্বাস্থ্য খাতে GDP-র ৫% খরচ হওয়া উচিত, কিন্তু ভারতের বাজেট সেখানে মাত্র ২.১% পড়ে আছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ৮০% ঘাটতি রয়েছে। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছে এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অথচ বাজেটে জনস্বাস্থ্যের চেয়ে বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল এবং ‘মেডিকেল টুরিজম’-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ ও কর্মসংস্থান: অবাস্তব স্বপ্ন

বাজেটে সাতটি হাই-স্পিড রেল করিডোর বা বুলেট ট্রেনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই বিলাসিতা কি সাধারণ মানুষের জন্য? যেখানে সাধারণ ট্রেনের টিকিট পাওয়া দুষ্কর এবং পরিস্থিতি শোচনীয়, সেখানে এমন ট্রেনের কথা বলা হচ্ছে যার ভাড়া হবে বিমানের সমান। এটি মূলত উচ্চবিত্তের সুবিধা দেবে এবং পরিকাঠামো নির্মাণের নামে বড় বড় করপোরেট ঠিকাদারদের পকেট ভরাবে।

পরিবেশ রক্ষার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এই বাজেটে নেই। উত্তর ভারত যখন দূষণে শ্বাসকষ্টে ভুগছে, তখন দূষণ নিয়ন্ত্রণের বাজেট কমানো হয়েছে। উল্টো কয়লা মন্ত্রকের বাজেট ৩.৫ গুণ বাড়ানো হয়েছে, যা আমাদের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

বেকারত্ব ভারতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলেও সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরির কোনো বড় পরিকল্পনা নেই। স্কিল ইন্ডিয়া বা মেক ইন ইন্ডিয়া-র মতো পুরনো স্লোগানগুলো আবারও নতুন মোড়কে পরিবেশন করা হয়েছে, যেগুলোর আগের ফলাফল ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই বাজেট তথাকথিত ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবে এটি দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ওপর জুলুম করার একটি দলিল। পুঁজিপতিদের কর ছাড় এবং পরিকাঠামোর নামে মেগা প্রজেক্টের উপহার দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এটা সম্পূর্ণ ব্যর্থ, আগের মতোই। তথ্যের নিরিখে বিচার করলে এটি একটি জনবিরোধী বাজেট, যা সাধারণের পকেট কেটে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

3 thoughts on “বাজেট ২০২৬: দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের কিছুই পাওয়ার নেই

Leave a Reply