লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যায়
রাশিয়ার নভেম্বর বিপ্লব-এর পর ১০৮ বছর কেটে গেছে। নভেম্বর বিপ্লব মানব সমাজের উপর যে প্রভাব ফেলেছে, পৃথিবীর আর কোন সামাজিক ঘটনা সেই প্রভাব ফেলতে পারেনি। নভেম্বর বিপ্লবের আগে বুর্জোয়ারা মার্ক্স এঙ্গেলসকে পাগল ও মার্ক্সবাদকে পাগলের প্রলাপ বলে অবজ্ঞা করতে পারতো। কিন্তু নভেম্বর বিপ্লবের পরে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ তাদের কাছে একটা হুমকি একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এলো যা তাদের রাস্তায় বসাতে পারে। তাই সেই সময়কার ইউরোপের ইতিহাস আমরা আবার ফিরে দেখব এই প্রবন্ধে।
নভেম্বর বিপ্লবের পরে পরেই ইউরোপে একের পর এক ব্যর্থ বিপ্লব হয়। ১৯১৮-১৯ সালে পরপর কয়েকটি দেশে বিপ্লব হয়। এগুলো সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। তাই এই বিষয়ে আমরা আলোচনা করব।
রুশ বিপ্লবের দেখাদেখি সাম্রাজ্যবাদী রাজতন্ত্রী জার্মানীতেও স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব শুরু হয়। বিপ্লবী রাশিয়া থেকে যে সৈনিকরা জার্মানীতে ফিরে আসে, তারা সঙ্গে করে বিপ্লবের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। ১৯১৮ এর অক্টোবরে জার্মানীতেও স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব শুরু হয়। রাজা কাইজার উইলিয়াম কে দেশ ছেড়ে হল্যান্ডে পালাতে হয়। কিন্তু বলশেভিক পার্টির মতো জার্মানীতে কোনো সংগটিত কমিউনিস্ট পার্টি ছিল না। কমিউনিস্ট নেতৃত্ব রোজা লুক্সেমবার্গ, কার্ল লিবনেখট্, ক্লারা জেটকিন, প্রমূখ তাদের স্পার্টাকাস লিগ নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেন বিপ্লবকে নেতৃত্ব দেবার। কিন্তু সম্ভব হয়নি। জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি রাজতন্ত্রী জেনারেলদের সাথে আপোষ করে ক্ষমতা দখল করে। জার্মানীর বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল না। জার্মানীর জনগণেরও সেই সচেতনতা ছিল না। ফলে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবেই জার্মানী থেমে গেল। ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকদের দমন পীড়নে স্পার্টাকাস লিগ হেরে যায়। ফ্রিডরিক ইবার্ট ও গুস্তাভ নস্কের সরকার রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবনেখট্ কে ধরে গুমখুন করে। এক বছর পরে তাদের বিকৃত লাশ আবিষ্কার হয়। স্পার্টাকাস লিগ ও পরবর্তীতে জার্মানীর কমিউনিস্ট পার্টিকে অত্যাচার চালিয়ে দমন করা হয়। বাকি নেতাদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য জার্মানীতে বিপ্লব ব্যর্থ হয় ও হিন্ডেনবুর্গের সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে হিটলারের ফ্যাসিবাদকে ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করে।
প্রায় ওই একই সময়ে হাঙ্গেরীতে অভ্যুত্থান ঘটে। বেলা কুনের নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা ১৯১৯ সালে ক্ষমতা দখল করে। সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র কায়েম হয়। কিন্তু সমগ্র হাঙ্গেরীতে অভ্যুত্থান ঘটেনি। ফলে ১৩৩ দিনের মধ্যেই প্রতিক্রিয়াশীলরা সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেয়। বিপ্লব প্রতিহত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মদতে রোমানিয়ার ফ্যাসিস্ট সরকার হাঙ্গেরী আক্রমণ করে। বুদাপেস্তের শিশু সোভিয়েত সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেনি। হাঙ্গেরীতে ফ্যাসিস্ট একনায়কত্ব কায়েম হয়।
ফিনল্যান্ড ছিল জারের সাম্রাজ্যের অধীন। লেনিনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী রাশিয়া ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাসেই ফিনল্যান্ডকে স্বাধীনতা দেয়। সেই প্রভাবে ১৯১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ফিনল্যান্ডেও বিপ্লব শুরু হয়। বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি সোভিয়েতও তৈরি হয়। কিন্তু তারপর এপ্রিল মাসে বিপ্লব পরাজিত হয়। হাজার হাজার কমিউনিস্ট, বিদ্রোহী শ্রমিক ও সৈনিকদের হত্যা করা হয়। কার্ল গুস্তাফ ম্যানেরহাইমের নেতৃত্বে দক্ষিণপন্থীদের চরম প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক একনায়কত্ব কায়েম করা হয়।
১৯১৮ সালের ৭-ই নভেম্বর রুশ বিপ্লবের দেখাদেখি ব্যাভেরিয়াতেও বিপ্লব শুরু হয়। প্রথমে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং পরে কমিউনিস্টরা ও অ্যানার্কিস্টরা বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়। কিন্তু জার্মান সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্যে প্রতিক্রিয়াশীল ফ্রেইকর্পস বাহিনী রক্তের বন্যায় ব্যাভেরিয়াতে বিপ্লব ব্যর্থ করে দেয়। রাজতন্ত্র বিদায় নেয় এবং স্বাধীন ব্যাভেরিয়া রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়।
উত্তর ইতালিতে কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট ও অ্যানার্কিস্টদের নেতৃত্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেই বিভিন্ন শহরে ও শ্রমিক মহল্লাগুলিতে একাধিক অভ্যুত্থান ঘটে। প্রায় দু-তিন বছর ধরে শ্রমিকদের ধর্মঘট ও অভ্যুত্থান চলতে থাকে। তুরিন, মিলান প্রভৃতি শহরে শ্রমিকরা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড করে কারখানা দখল করে নেয়। গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা জমিদারদের জমি দখল করতে শুরু করে। কিন্তু সংশোধনবাদী সমাজতান্ত্রিক নেতারা প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির বাহিনীর আক্রমণের মুখে আপোষ করতে শুরু করে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা ‘বিশৃঙ্খলা’কে ঠান্ডা করার জন্য শাসক শ্রেণী ফ্যাসিস্ট মুসোলিনিকে ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করে। মুসোলিনি কড়া হাতে ‘লাল’দের বিদ্রোহ দমন করে।
এছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কমবেশি শ্রমিকরা ধর্মঘট করে আন্দোলন করে। কিন্তু ১৯২২ সালের পরে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় বিপ্লবী রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নকে সঙ্গ দেবার জন্য আর কোন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখন স্থাপন সম্ভব নয়। ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ – স্তালিনের উদ্ভট কল্পনা নয়। এটা তখনকার বাধ্যবাধকতা।
ইউরোপের একের পর এক দেশে শ্রমিক শ্রেণীর সক্রিয়তা শাসকদেরও বাধ্য করে কড়া হাতে সবকিছু ঠান্ডা করতে। তাই ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব তৎকালীন বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://communist.red/wp-content/uploads/2016/03/russianrevlenin-wide.jpg [Retrieved On: 04/02/2026]
