এক নজরে কেন্দ্রীয় বাজেটের জনস্বার্থ বিরোধী চরিত্র

লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৪ সংখ্যায়

তৃতীয়বার ক্ষমতায় বসার ঠিক পরেই মোদী সরকার তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কেন্দ্রীয় বাজেটে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে বঞ্চিত করা এবং বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করার মধ্যে দিয়ে নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দিয়েছে। স্বামীনাথন কমিশন-এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী সকল শস্যের ক্ষেত্রে শস্য উৎপাদনের জন্য খরচের উপরে ৫০% লাভ হিসেব করে যে এমএসপি-র আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিলেন দেশের কৃষকেরা। কিন্তু সেই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে এই বাজেটে। কৃষি ঋণ মকুব করা, কৃষকদের জন্য পেনশন এবং কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিগুলোও উপেক্ষিত হয়েছে এই বাজেটে। বাজেটে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য ১.৫২ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের মাত্র ৩%। ২০২২-২৩ সালের বরাদ্দের তুলনায় কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ ২১.২% কমিয়ে দেওয়া হয়েছে; শস্য দেখভাল ও সারের জন্য বরাদ্দ কমানো হয়েছে যথাক্রমে ২৪.৭% এবং ৩৪.৭%। টাকার হিসেবে বরাদ্দ কমেছে ৮৭,২৩৮ কোটি টাকা। এতে স্বাভাবিকভাবেই কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটা ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। কৃষিক্ষেত্রের প্রতি কেন্দ্র সরকারের অজ্ঞতার একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায় এই পরিসংখ্যান থেকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোতে লগ্নীকৃত সম্পত্তি থেকে থেকে প্রায় ৪৩,০০০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে সেখানে অবাধ বিলগ্নীকরণের রাস্তা অব্যাহত রাখা হয়েছে এই বাজেটে। একইসাথে প্রতিরক্ষা, বিমা এবং ই-কমার্স ক্ষেত্রে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই-এর পরিমাণ বাড়িয়ে সেটাকে ৪৯%-তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রেলওয়ে, সড়ক ও বন্দরের ক্ষেত্রে বিশাল পরিকাঠামোগত যে খরচ আছে সেটাকে বরাদ্দ করা হয়েছে পিপিপি কাঠামোতে, যা নিঃসন্দেহে কর্পোরেটদেরই উপকার করবে। বাজেটে কর্পোরেট ট্যাক্স ৪০% থেকে কমিয়ে ৩৫% করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এফডিআই পরিচালনার জন্য যেসমস্ত নিয়ম আছে সেগুলোর সরলীকরণ করা হবে। “স্টার্ট আপ”-এর জন্য এঞ্জেল ট্যাক্স প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর্পোরেটদের থেকে আদায়ীকৃত ট্যাক্স যেখানে ৪.২৮ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০.২ লক্ষ কোটি টাকা, সেখানে ইনকাম ট্যাক্স বা আয়করের পরিমাণ ২.৫ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১১.৮ লক্ষ কোটি টাকা; অর্থাৎ যা কর্পোরেট ট্যাক্সকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। এর সাথে যুক্ত করুন জিএসটি এবং অন্যান্য ট্যাক্স থেকে আদায় করা অর্থকে – অর্থাৎ দেশের নিম্নবিত্ত এনং মধ্যবিত্ত মানুষের উপার্জনের সিংহভাগই সরকার বিভিন্ন ট্যাক্সের অছিলায় কেড়ে নিচ্ছে!

শ্রমিক, কৃষক ও সমস্ত সাধারণ মানুষ মূল্যবৃদ্ধির কারণে জর্জরিত। সমস্ত পরিসংখ্যান এই দিকেই ইঙ্গিত করে যে দেশে আর্থিক সঙ্কট একটা গভীর আকার ধারণ করেছে। অথচ MNREGA ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো যে বিষয়গুলো দেশের গরীব মানুষদের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে এই বাজেট একেবারে নীরব। তীব্র মূল্যবৃদ্ধির পরেও বছরের পর বছর ধরে MNREGA-র জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি এবং বর্তমান বাজেটও সেই একই নীতি অনুসরণ করেছে। এই MNREGA-এর জন্য বাজেটে বরাদ্দ করা হয়েছে ৮৬,০০০ কোটি টাকা, যা গত বছরে এই খাতে যা খরচা করা হয়েছিল তার তুলনায় কম। তার মধ্যে এই বছরের প্রথম চার মাসের মধ্যেই ৪১,৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে; অর্থাৎ বাকি আট মাসের জন্য রয়েছে মাত্র ৪৪,৫০০ কোটি টাকা। স্পষ্টতই এই স্বল্প পরিমাণ বরাদ্দ গ্রামীণ ভারতের পাহাড়প্রমাণ বেকারত্বের সঙ্কটকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষানবিশি, ইন্টার্নশিপ ও ইত্যাদি আরও কিছু প্রকল্পকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে; কিন্তু চাকরি তৈরি করা না গেলে এইসব প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরেও তরুণদেরকে বেকারত্বের জ্বালায় ভুগতে হতে পারে। জন-দরদী মুখোশের আড়ালে কর্পোরেট লাভকে ত্বরাণ্বিত করাই হলো এইসব প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য। প্রসঙ্গত, এটা মনে রাখা উচিত যে শিক্ষানবিশ আইন-টাকে মোদী সরকারই শিথিল করেছিল, যার ফলে শিক্ষানবিশির নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর কোনও সংস্থাই এখন আর চাকরি দিতে বাধ্য নয়। বরং শিক্ষানবিশদের এক বছরের সময়কালের জন্য ন্যূনতম মজুরির থেকেও কম বেতনে বাকিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এই স্কিল প্রোমোশান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পাওয়া তরুণ-তরুণীদের মাত্র ১৮ শতাংশ একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পেরেছে। মজুরি ও নিরাপত্তার কথা বললে, প্যারা-শিক্ষক, ASHA, অঙ্গণওয়ারী ও অন্যান্য গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কর্মীদের একটা বিরাট কর্মীবাহিনীকে সরকারি কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে এই বাজেট। নিরাপত্তাহীন, অস্থায়ী চাকরির যে মডেল দেশের যুব সম্প্রদায় ও মহিলাদের শোষণ করে চলেছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার গুণমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেই মডেলটাই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মোদী সরকার। যে MSME সেক্টরটা শিল্পক্ষেত্রে বৃহত্তম চাকরিদাতা হওয়ার ক্ষমতা রাখে এবং GST, বিমুদ্রাকরণ ও লকডাউনের পর যে সেক্টরটা আজ গভীর সঙ্কটের সম্মুখীন, সেই MSME সেক্টরের সমস্যাকে সমাধান করার ক্ষেত্রেও যে বৃহৎ ঋণ দানের প্রস্তাব এই বাজেটে দেওয়া হয়েছে সেটাও আসলে এই সেক্টরটাকে কর্পোরেট কর্তৃক অধিগ্রহণের পথেই ঠেলে দেবে।

স্কুলশিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই বাজেটে বরাদ্দ টাকা ভীষণ রকম অপর্যাপ্ত এবং দেশের যুব সম্প্রদায়ের প্রতি মোদী সরকারের যে বিন্দুমাত্র কোনও উদ্বেগ নেই, সেই ছবিকেই ফুটিয়ে তোলে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি এবং স্কুলের অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর মতো কঠিন সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, এই বাজেটে স্কুলশিক্ষা ও স্বাক্ষরতার জন্য বরাদ্দকে খুব সামান্যই বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা ১%-এরও কম; ৭২,৪৭৪ কোটি টাকা থেকে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭৩,০০৮ টাকা। শিশুদের পুষ্টি ও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গণওয়াড়ির বাজেট ১.৫% কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা এই প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো চালিয়ে যাওয়াটাকেই কঠিন করে তুলেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে। ২০২৩-২৪ সালের জন্য সংশোধিত বাজেটের হিসেব ছিল ৫৭,২৪৪.৪৮ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ সালের বরাদ্দ টাকার পরিমাণ ৪৭,৬১৯.৭৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যণীয়ভাবে ১৬.৮% কম। উচ্চশিক্ষার জন্য বাজেটে যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে সেটা NEP ২০২০-কে ঘিরে করা যাবতীয় হৈচৈ-এর ধারকাছ দিয়েও যায় না। অ্যাকাডেমিক ফর অ্যাকশান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড দিল্লী টিচার্স অ্যাসোসিয়েশান (AADTA) নামক সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ এরকম ভীষণ মাত্রায় কমিয়ে দেওয়াটা আসলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দুর্বল করারই একটা বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে সেন্টার্স অফ এক্সেলেন্স ইন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ন্যাশনাল মিশন ইন এডুকেশন থ্রু ইনফরমেশান অ্যান্ড কমিউনিকেশান টেকনোলজি ইত্যাদি নতুন উদ্যোগের জন্য তহবিল সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। ইউজিসি তহবিলও আগের বছরের সংশোধিত হিসেব ৬,৪০৯ কোটি টাকা থেকে সরাসরি ৬০.৯৯% কমিয়ে ২,৫০০ কোটি টাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। পাঁচটা নতুন IIT-র জন্য এই বাজেটে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা; এদিকে মোদী-র গুজরাট সরকারের সাদরের প্রকল্প – সর্দার প্যাটেল-এর একটা মূর্তি নির্মাণ করা, যেটা এখন কেন্দ্র গ্রহণ করেছে, সেটার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। একইভাবে ৫-টা রাজ্যে ৫-টা নতুন AIIMS-এর মতো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য বাজেটে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা।

বাজেট ২০২৪-এ স্বাস্থ্য পরিষেবাকে জাতীয় অগ্রাধিকার থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোর একটা অত্যন্ত অবহেলিত ক্ষেত্রের দিকে মনোযোগ আবদ্ধ করার জন্য কিছু মনভোলানো কথাবার্তা আছে বাজেটে। কিন্তু তহবিলের সামান্য বৃদ্ধি নিয়ে ন্যাশনাল হেল্‌থ মিশন নিজেই যখন ব্যাহত, তখন কিভাবে সেগুলো কার্যকরভাবে অর্জন করা যাবে সে সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট কৌশল উল্লেখ করা হয়নি। বরং সেই উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য যেটা অপেক্ষা করে আছে সেটা হলো আরও উচ্ছেদের আশঙ্কা, কারণ বাজেটে ২৫-টা গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উপর থেকে শুল্ক বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, যা উপজাতীয় অঞ্চলগুলোকে লুট করার ক্ষেত্রে কর্পোরেটদের নিঃসন্দেহে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলবে। এই পদক্ষেপের পিছনে অজুহাত দেওয়া হয়েছে যে এটা পারমাণবিক শক্তি, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, মহাকাশ, প্রতিরক্ষা, টেলিযোগাযোগ এবং উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্সের মতো ক্ষেত্রগুলোকে নাকি শক্তিশালী করবে। কিন্তু এগুলোর ফলে বাস্তবে একদিকে কার্বন নির্গমন যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনই বাড়বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ।

সংক্ষেপে, এই বাজেট মোদী-র জনবিরোধী ও কর্পোরেটপন্থী নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর ওদিকে সংসদে বিরোধীদের কান্নাকাটি দেখলে মনে হবে যেন মঞ্চাভিনয় চলছে! অবশ্য এই গোটা সংসদীয় গণতন্ত্রের নাটকটা ভালো করে মঞ্চস্থ করতে গেলে তাদের সেটুকু ভূমিকা পালন করতেই হবে!


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://newspaperdesign.in/2024/07/24/visual-storytelling-how-indian-newspapers-illustrated-the-union-budget-2024/ [Retrieved On: 15/09/2024]

One thought on “এক নজরে কেন্দ্রীয় বাজেটের জনস্বার্থ বিরোধী চরিত্র

Leave a Reply