জয়শ্রী সরকার
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
অগাস্ট ২০২৫ সংখ্যায়
ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায় আদালতের এমন সুপ্রীম আদেশ থাকা সত্ত্বেও, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী/ কেন্দ্রীয় সরকারের জানুয়ারি ২০২৫, ‘এন্ডিং লেফ্ট উইং এক্সট্রিমিজম বাই মার্চ ২০২৬’ শীর্ষক যে কৌশলপত্র মাওবাদ প্রভাবিত রাজ্যগুলিতে পাঠানো হয়েছে – সেখানে ত্রিমুখী পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে – ১) নিরাপত্তা অভিযান তীব্রতর করা, ২) দ্রুত উন্নয়নমূলক কাজ, ৩) কৌশলগত পুনর্বাসন-পুনর্স্থাপন কর্মসূচি। এই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সামরিক অভিযান ‘অপারেশন কাগার’ শুরু হয়েছে সারা মধ্য ভারত জুড়ে। এই অপারেশন প্রায় ৮০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলছে। এতে সামিল হয়েছে সিআরপিএফ, এলিট কোবরা ব্যাটেলিয়ান, ডিআরজি, স্পেশাল টাস্ক ফোর্স এবং ছত্রিশগড় ও তেলেঙ্গানা পুলিশের প্রায় ৩৪ হাজার সদস্য। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যেই বামপন্থী উগ্রবাদ নির্মূলের জন্য ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে রোডম্যাপ তৈরি করেছেন তাতে ‘অপারেশন কাগার’ প্রধান ভূমিকা নিয়েছে।
সিপিআই মাওবাদীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে সরকার অপারেশন কাগার চালাচ্ছে। গোটা বনাঞ্চলকে পুলিশ ক্যাম্পে পরিণত করা হয়েছে। ছত্রিশগড় রাজ্যের বিজাপুর, সুকমা, নারায়ণপুর, বস্তার জেলার রাস্তার বাঁকে বাঁকে দেখা যাবে পুলিশের ক্যাম্প। হাজার হাজার আধা সামরিক বাহিনী ও গ্রে হাউন্ড বাহিনী সারা দণ্ডকারণ্য চষে বেড়াচ্ছে, আধুনিক অস্ত্র দিয়ে বনাঞ্চলের প্রতিটি ইঞ্চি খুঁজে দেখছে। ছত্রিশগড় রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতে মূলত আদিবাসী/ বনবাসী জনজাতির বাস। এই অপারেশনে আদিবাসীদের গ্রামগুলিকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, গ্রামগুলিকে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভূয়ো সংঘর্ষের নামে শয়ে শয়ে মাওবাদী আদিবাসীদের হত্যা করে সবুজ বনভূমিতে রক্তের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। মাওবাদী ও নিরীহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে।
“অস্ত্রহীন ও নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে অহিংসার মাধ্যমে প্রতিবাদ করা বৃথা। শাসকশ্রেণী কখনো অহিংসার ভাষা বোঝে না, তাদের বোঝাতে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়।”
– ভগৎ সিং
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া অপারেশন কাগারে সরকারি হিসেবেই প্রায় ৫০০ জন মাওবাদী নিহত হয়েছেন, যার থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। মাওবাদী অধ্যুষিত গ্রামগুলির উপর ড্রোন নজরদারি, বিমান থেকে বোমাবর্ষণ, তীব্র তল্লাশি ও ভুয়ো এনকাউন্টার চলছে। সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে হত্যা করে তাদের দেহ জলপাই সবুজ ইউনিফর্ম পরিয়ে, পাশে রাইফেল রেখে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রচার করা হচ্ছে। এক কথায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক অত্যাচারের চরম নিদর্শন তৈরি করেছে। ছত্রিশগড়ের ইন্দ্রাবতী ন্যাশনাল পার্কের বনাঞ্চলে ৩০০০০ কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী ও ছত্রিশগড় রাজ্য পুলিশ মাওবাদীদের ঘিরে গুলি চালানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এই অপারেশন কাগারে নিহত কয়েকজন শহীদের পরিচয়ই বলে দিতে পারে সাধারণ মানুষকে লোভ দেখিয়ে, গুপ্তচর বৃত্তিতে নিয়োগ করে সংগঠনটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের গতিবিধির খোঁজ পাওয়া কিভাবে সম্ভব হয়েছে। যেমন – ৭১ বছর বয়সী নাম্বালা কেশব রাও (বাসব রাজ)—ভারতের সর্ববৃহৎ বিদ্রোহী সংগঠন, সিপিআই (মাওবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক—শহীদ হন ২১ মে ২০২৫। কিছু বিশ্বাসঘাতক/ আত্মসমর্পণকারীদের সাহায্যে অমিত শাহের পুলিশ পৌঁছে যায় ছত্রিশগড়ের আবুঝমাড় অঞ্চলের জঙ্গল অধ্যুষিত, পাহাড় ঘেরা গুন্ডাকোট গ্রামে গত ১৭/১৮ মে তারিখে। ১৯ মে সকাল থেকে শুরু হয় তীব্র লড়াই। ২১ মে সকালে মরণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেও শহীদ হন ওই সময় উপস্থিত সব গেরিলা যোদ্ধারাই। তারই মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সর্বোচ্চ পদাধিকারী – অসম সাহসে যুদ্ধ করে অবশেষে শহীদ হন তিনি। বাসব রাজ ছাড়াও এই সময়কালের মধ্যে শহীদ হন মাওবাদী নেত্রী কমরেড রেনুকা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড গজরালা রবি, সোধি কান্না সহ অনেক বীর যোদ্ধা। প্রসঙ্গত বস্তারে একটি আদিবাসীদের সংগঠন আছে – তার নাম মূলবাসী বাঁচাও সংঘ। যারা এই আদিবাসী এলাকায় নিপীড়ন ও হিংসা বন্ধের জন্য এবং জোর করে ক্যাম্প স্থাপন ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ও নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে ছত্রিশগড়ের কারেগুন্ডা পর্বতে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৩১ জন নিহত হয়েছেন, যা মানব সভ্যতার কলঙ্ক।
কিন্তু কেন শুধু ছত্রিশগড়েই অপারেশন কাগার নামান হল?
মধ্য ভারত জুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ রাজ্যগুলির ওপর কর্পোরেট দালালদের চোখ অনেকদিন ধরেই। কত খনিজ সম্পদ এখানে আছে তার প্রকৃত অনুসন্ধান করা না গেলেও, হীরা, কয়লা, লোহা, চুনাপাথর, ডলোমাইট, বক্সাইট, টিন প্রভৃতি খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ ছত্রিশগড় রাজ্যটি। সমগ্র ভারতের মধ্যে ছত্রিশগড়ই একমাত্র রাজ্য যেখানে টিন উৎপন্ন হয়। লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, সিমেন্ট এখানে খনিজ নির্ভর প্রধান শিল্প। এই রাজ্যে প্রায় ৪০৩১ মিলিয়ন টন উৎকৃষ্ট মানের হেমাটাইটিক লৌহ আকরিক আছে। ফলে মাওবাদী/ আদিবাসী উচ্ছেদ করে সেই সব খনিজ পদার্থপূর্ণ অঞ্চল কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়াই একমাত্র লক্ষ্য এই ফ্যাসিস্ট শক্তির। মাওবাদী বিরোধী অভিযান কর্পোরেট লুটপাটের পথ প্রশস্ত করেছে। ভৌগোলিক দিক থেকে দেখতে গেলেও ছত্রিশগড়ের বৈচিত্র্য বিদ্যমান। রাজ্যটি ছয়টি রাজ্যের সীমানায় অবস্থিত। অঞ্চলটির জনঘনত্বও কম। রাজ্যটির অর্থনীতিতে খনিজ সম্পদ খনন প্রধান আয়ের উৎস। পিট হেড বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কম। তার কেন্দ্রীয় অবস্থান বিদ্যুৎ উৎপাদন সহজতর করে। রাজ্যটির শ্রমিক সম্পর্ক দৃঢ় ও শ্রমিক দক্ষতার দিক থেকেও প্রথম স্থানে। ফলে এমন রাজ্যে কর্পোরেটদের আবাসস্থল করে দেওয়া তো সহজ কাজ!
“প্রজাতন্ত্র তার নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে না।”
– সুপ্রীম কোর্ট
কেন্দ্রীয় সরকার উন্নয়নের নামে আদিবাসী/ মাওবাদীদের কী কী ভাবে ক্ষতি করছে?
কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য ৪/৬ লেনের সড়ক নির্মাণ করছে। এর ফলে উত্তোলিত খনিজ পরিবহনেরও সুবিধা হচ্ছে। কর্পোরেট মাইনিং ও কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সারা অঞ্চলে দ্রুত নিরাপত্তা শিবির তৈরি হচ্ছে। আপাতভাবে মনে হতে পারে এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য রাস্তা তৈরি হচ্ছে অথবা তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হচ্ছে। কিন্তু এই সমগ্র কাজটি করা হচ্ছে কর্পোরেটদের স্বার্থরক্ষায়। বনাঞ্চল কেটে এই আপাত উন্নয়নের ফলে যেমন পরিবেশ রক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে, ঠিক তেমনভাবেই জঙ্গল থেকে যে কাঠ, মধু, কেন্দু পাতা সংগ্রহ করে আদিবাসী/ মূলবাসী জীবন ধারণ করত, তাতেও কুঠার চালানো হচ্ছে। একদিকে রুটি রুজির টান, অন্যদিকে পুলিশী আক্রমণ – এই অবস্থার মধ্যে পড়েও সাধারণ আদিবাসী মানুষ জল, জঙ্গল, জমি রক্ষা করার জন্য যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তাকে কুর্নিশ। দেশের সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বিএসএফ, এসএসবি, আইটিবিপি বাহিনীকে আজ দেশের অভ্যন্তরে বিশেষ করে মধ্য ভারতের বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন করা হয়েছে। সারা মধ্য ভারতে যুদ্ধের পরিস্থিতি। সাধারণ অস্ত্রহীন আদিবাসী মানুষের সাথে ভারত সরকার আজ যুদ্ধে নেমেছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার তার ১১ বছর রাজত্বের মধ্যে দিয়ে মনুবাদী ফ্যাসিস্ট চরিত্রের সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, স্বেচ্ছাচারী শক্তিকে আরো বলিষ্ঠ করেছে। বর্তমান সরকার সারা মধ্য ভারত জুড়ে পঞ্চম তফশিল ও বন অধিকার আইনগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন করছে না। মাওবাদ দমনের নামে সরকার সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন, মানবতা, মানবাধিকার এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। গত বছর জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অপারেশন কাগার সরকারি হিসেবেই যে সংখ্যায় মাওবাদী/ আদিবাসী নিধন করেছে, তার থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা অনুমান করা যায়। এই আক্রমণ গণতন্ত্র ও সংবিধান ব্যবস্থার উপর একটি কলঙ্ক। এমনকি মাওবাদীদের হত্যা করার পরও অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি – এমন গুরুতর অভিযোগের সত্যতাও আজ প্রমাণিত। আদিবাসী এলাকায় নিপীড়ন ও হিংসা বন্ধের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে নাগরিক, আদিবাসী, অধিকার কর্মী সংগঠনগুলির আবেদন গৃহীত হয়নি। আবেদনে বলা হয়েছে – “অবিলম্বে হিংসা বন্ধ করে কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র সাথে আলোচনায় বসতে হবে”। যদিও কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) শান্তি আলোচনায় অংশ নেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তবুও এখনো পর্যন্ত মাওবাদী নির্মূল অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://frontline.thehindu.com/the-nation/operation-kagar-chhattisgarh-adivasi-violence-rights-bastar-security-forces/article69403236.ece [Retrieved On: 17/09/2025]

One thought on ““অপারেশন কাগার” ও ছত্রিশগড়ে চলমান গণহত্যা”