লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যায়
ভারতকে নকশালবাদ থেকে মুক্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। প্রথম অবস্থায় “নকশালবাদ মুক্ত ভারত” বলতে মাওবাদীদের নেতৃত্বে পরিচালিত সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামকে ধ্বংস করার কথা বললেও, পরবর্তীতে অমিত শাহ পরিষ্কার করে দিয়েছে যে তাদের কাছে “অস্ত্রধারী” এবং “কলমধারী” নকশাল, উভয়েই সমান ‘বিপজ্জনক’। কেন? তার ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন – সশস্ত্র নকশাল সংগ্রামকে দমন করা গেলেও, যদি সমাজে নকশালপন্থীদের আদর্শ প্রচার করার এবং সেই আদর্শের ভিত্তিতে জনগণকে সংগঠিত করার লোক থেকে যায়, তাহলে আবার নকশালবাদের বীজ দেশের কোনও না কোনও অংশে ছড়িয়ে পড়ে চরম আকার নিতে পারে। শাসক শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অমিত শাহ’র বক্তব্যে কোন ফাঁক নেই। কিন্তু কেন অমিত শাহ’রা এইরকম খ্যাপা ষাঁড়ের মতো নকশালপন্থীদের পেছনে আদা জল খেয়ে নেমেছে?
প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ এবং জনগণের প্রতিরোধ
২০০৪ সালে বাজপেয়ীকে হঠিয়ে মনমোহন সিং ক্ষমতায় বসার পরই সংসদে এক বিবৃতিতে বলেন যে দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাম চরমপন্থা হলো একক সর্ববৃহৎ বিপদ। বিশ্ব ব্যাংকের প্রাক্তন আমলা মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী থাকার সময়ই ভারতে খোলাবাজার অর্থনীতির খুল্লমখুল্লা যাত্রা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী হবার পর মনমোহন সিং তার প্রভুদের নির্দেশে দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদগুলো দেশী ও বিদেশী কর্পোরেটদের কাছে বেচার কাজ শুরু করে।

কিন্তু মুশকিল হলো, এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর অধিকাংশই দেশের যেসমস্ত অঞ্চলে সঞ্চিত রয়েছে, সেগুলো ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল বলে চিহ্নিত, যেমন – উত্তর-পূর্ব ভারত, কাশ্মীর, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, ছত্রিশগড়, মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলী ইত্যাদি। পূর্ব ও মধ্য ভারতের বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে মাওবাদী বিপ্লবীদের উপস্থিতি এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ সেই সময় যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির সাথে মউ চুক্তি সাক্ষরিত হলেও, কোন অঞ্চলেই কোম্পানীগুলো প্রাকৃতিক সম্পদের বাস্তব দখলদারি হাতে পেল না। যে কটা জায়গায় গায়ের জোরে ভারত রাষ্ট্র জমি দখল করতে যায়, প্রত্যেক জায়গাতেই মানুষের প্রতিরোধে তাকে পিছু হটতে হয়।
কংগ্রেস জমানা: ইউএপিএ থেকে অপারেশান গ্রীণ হান্ট
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সরকারকে ১০ বছরের সময়সীমা দিয়েছিল, মউ চুক্তি গুলো বাস্তবায়নের জন্য। কেন্দ্রের ইউপিএ সরকার কোমর বেঁধে নামে মাওবাদী মুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে। বিশ্ব ব্যাংকের আরেক দালাল, চিদাম্বরম, যে মনমোহন মন্ত্রীসভায় অর্থমন্ত্রী ছিল, তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে নিয়ে আসা হয়। সোনিয়া গান্ধী – মনমোহন – চিদাম্বরম মিলে মাওবাদী দমনের ব্লু প্রিন্ট তৈরি করে। ইন্দিরা গান্ধী’র আমলের ইউএপিএ আইনকে সংশোধিত রূপে ফিরিয়ে আনা হয়। মাওবাদী প্রভাবিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে সমন্বয় টীম এবং পুলিশ কর্তাদের নিয়ে আলাদা সমন্বয় টীম তৈরি করা হয়। সিআরপিএফ-এর বিশেষ বাহিনী, কোবরা গঠিত হয়। প্রত্যেক রাজ্যে বিশেষ মাওবাদী দমন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মার্কিন ও ইজরায়েলী সামরিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এসে কাঙ্কেরে জঙ্গল ওয়ারফেয়ার ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়, ভারতের সেনা ও আধা সেনাকে লো ইনটেনসিটি কনফ্লিক্ট (এলআইসি) যুদ্ধনীতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
আদিবাসীদেরকে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা অনুযায়ী ছত্রিশগড়ে সালওয়া জুড়ুম এবং ঝাড়খন্ডে সেন্দ্রা অপারেশন চালানো হয়। মাওবাদীদের শহুরে নেটওয়ার্ক এবং সমর্থক নেটওয়ার্ককে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিনায়ক সেন থেকে জি.এন সাইবাবা, জিতেন মারান্ডী থেকে স্বপন দাশগুপ্ত, সোনি সোরি থেকে হিমাংশু কুমার, গোবিন্দন কুট্টি থেকে গৌর চক্রবর্তী – অসংখ্য প্রকাশক, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, গান্ধীবাদী, গণ-আন্দোলনের কর্মীদের ২০০৪-১৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে জেলবন্দী করা হয়, ইউএপিএ চাপানো হয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, নির্যাতন চালানো হয়, এমনকি হত্যাও করা হয়।

সমস্ত রাজনৈতিক দল—বিজেপি, সিপিএম, তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল—সবাই মাওবাদী দমনের প্রশ্নে কংগ্রেস সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৯ সালে চিদাম্বরম-এর ব্রেন চাইল্ড “অপারেশন গ্রীণ হান্ট” শুরু করা হয়, পাশাপাশি মাওবাদীদের শহুরে নেতৃত্বকে খতম করার জন্য শান্তি আলোচনার প্যারালাল ট্র্যাক-ও খোলা হয় – যার পরিণতিতে ২০১০ সালে মাওবাদী নেতা আজাদকে গ্রেফতার করে ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গেও সেই সময় জঙ্গলমহলের আন্দোলন চলছে; বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কেন্দ্র সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে নির্বিচারে ইউএপিএ আইন প্রয়োগ করা শুরু করে; অপারেশন গ্রীণ হান্ট, ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যার ঘটনা ঘটতে থাকে। ২০১১-তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় বসার পরও একই ট্রাডিশন অব্যাহত থাকে, মাওবাদী নেতা কিষেণজী-কে ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যা করা হয়।
বিজেপি জমানা: ভীমা কোরেগাঁও থেকে অপারেশান কাগার
২০১০ সাল থেকেই মাওবাদীরা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। কিন্তু এতবড় দেশব্যাপী একটা সংগ্রাম যেহেতু ছিল – ফলে সেই দূর্বলতার প্রকাশ পেতে কিছু সময় লাগে। ইতিমধ্যে ২০১৪ সালে সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজি ও দেশীয় কর্পোরেটদের একচ্ছত্র আশীর্বাদ পেয়ে নরেন্দ্র মোদী কেন্দ্রের ক্ষমতায় বসে। মোদী, অমিত শাহ’রা মাওবাদী দমনের ক্ষেত্রে মনমোহন চিদাম্বরমের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখে। দেশী বিদেশী কর্পোরেটরা তাদের সাক্ষরিত মউ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিতে থাকে।
তারা প্রথমে টার্গেট ঠিক করেছিল ২০১৯ সালের মধ্যে মাওবাদী আন্দোলনকে ধ্বংস করবে। প্রথম উড়িষ্যার মালকানগিরি, মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলী এবং ঝাড়খন্ডের সারান্ডা বনাঞ্চলকে মাওবাদী মুক্ত করার লক্ষ্যে অপারেশন চালানো হয়। মালকানগিরি এবং গড়চিরোলী-তে একের পর এক গণহত্যা চালানো হয়। মাওবাদী সমর্থক বুদ্ধিজীবী এবং যারা মোদী সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে গলা চড়াচ্ছিলেন, সেই সব বুদ্ধিজীবীদের জব্দ করার জন্য ভীমা কোরেগাঁও মামলা শুরু হয় – প্রায় ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। যদিও আজ অবধি সেই মামলার বিচারও শুরু হয়নি। ছত্রিশগড়ের বস্তারেও আকাশপথে বোমা বর্ষণ শুরু হয়।
২০১৯ এর লোকসভা ভোটে আরও বড় ব্যবধানে জেতার পর মোদী-শাহ’রা ঘোষণা করে যে ২০২৪-এর মধ্যে মাওবাদী-মুক্ত ভারত গড়া হবে। ২০২৩ সালে ছত্রিশগড়ের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জেতার পর অপারেশন কাগার-এর পরিকল্পনা করা হয় এবং ২০২৪ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে অপারেশন কাগার শুরু হয়। বিভিন্ন রাজ্যে, যেমন – তেলেঙ্গানা, ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশে মাওবাদী সমর্থকদের জেলবন্দী করার জন্য, ভয় দেখানোর জন্য এনআইএ মামলা চালু করা হয়, বিভিন্ন জনের বাড়িতে ধারাবাহিক ভাবে রেইড করা হয়। মাওবাদীদের প্রতি শহরের সমর্থন নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালানো হয়।

একদিকে ছত্রিশগড়ে একের পর এক গণহত্যা চলতে থাকে, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে যাতে শহরগুলোতে কোন আওয়াজ না ওঠে তার জন্য “কলমধারী নকশাল”, “আর্বান নকশাল”দের টার্গেট করে হুমকি দেওয়া, গ্রেফতার করা শুরু হয়। সাংবাদিক, আইনজীবী, কবি, গবেষক, অধ্যাপক, লেখক, পাদ্রী, সাংস্কৃতিক কর্মী, মহিলা, দলিত, শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী – কেউ বাদ যায়নি ভারত রাষ্ট্রের এই বর্বর আক্রমণ থেকে। গড়চিরোলী, মালকানগিরি, বস্তারে বড় বড় রাস্তা, ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। লয়েড স্টিল, জিন্দাল, আদানী, টাটা, বেদান্ত ইতিমধ্যে বহু গ্রাম খালি করে, জঙ্গল ধ্বংস করে তাদের প্রজেক্ট শুরু করতে চলেছে। মাড়ে ৫৪-টা গ্রাম উচ্ছেদ করে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হবে।
এভাবে কি জনগণের কণ্ঠরোধ সম্ভব?
আজ মাওবাদীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ খুবই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। কিন্তু অমিত শাহ’রা খুব ভালো করেই জানে যে বন্দুকের জোরে শোষিত মানুষের কন্ঠস্বর বেশী দিন দাবিয়ে রাখা যায় না। নয়া উদারবাদী নীতির যে রথে ভারতের শাসকশ্রেণী গত ৩০-৩৫ বছর ধরে চেপে বসেছে, তাতে দিন দিন সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে, মানুষের কাজের সুযোগ কমছে, অর্থনৈতিক দূরাবস্থা আরো তীব্র হচ্ছে, প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের জন্য জমি দখল করার জন্য কোটি কোটি মানুষ নিজের বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন। ফলে সামাজিক বিদ্রোহের পটভূমি দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। শুধু হিন্দু-মুসলমান, পাকিস্তান, হিন্দু রাষ্ট্র বা তার সঙ্গে মানুষের কাছে যৎসামান্য নগদ অনুদান পৌঁছে এই সামাজিক অসন্তোষকে ঢেকে রাখা কঠিন।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও একের পর এক গণ অভ্যুত্থান ঘটছে। যদিও মতাদর্শগত দিশাহীনতার কারণে সেগুলো শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে, চলতি ব্যবস্থাকে উচ্ছেদের দিকে চালিত হচ্ছে না। এইজন্যই অমিত শাহ’রা “কলমধারী নকশাল”দের নির্মূল করতে চাইছে। অর্থাৎ যদি ভারতেও এইরকম কোনও গণ অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা দেখা যায় – সেখানে যেন নকশালপন্থী মতাদর্শ, মার্ক্সবাদী মতাদর্শ যেন সেই আন্দোলনের দিকনির্দেশ করার জায়গায় না থাকে; নতুন করে কোনও প্রতিরোধ সংগ্রাম, বিপ্লবী সংগ্রাম যাতে গড়ে না উঠতে পারে।
উপসংহার
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ—যাকে কার্ল মার্কস বর্ণনা করেছিলেন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে—তারপর থেকে গত ১৭০ বছরে ভারতের নিপীড়িত জনগণ বারবার বিদ্রোহ করেছেন, শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, পরাজিত হয়েছেন, আবার নতুন লড়াই গড়ে তুলেছেন। ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের ইতিহাসও যদি দেখা যায় তাহলে সেখানেও দেখা যাবে রক্ত দিয়ে লেখা আছে জনগণের একের পর এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস। সাময়িক পরাজয়, পিছু হঠার পর জনগণ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, নতুন উদ্যমে লড়াই গড়ে তুলেছে, শাসকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। জনগণ যেমন অতীত থেকে, পরাজয় থেকে, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়, তেমনি শাসকরাও অতীতের ইতিহাস থেকে এটা স্পষ্টভাবে জানে যে আজকের বিজয় চূড়ান্ত জয় নয়; আবারও জনগণের লড়াইয়ের ঢেউ তৈরি হবে। সেই লড়াই যাতে তাড়াতাড়ি না গড়ে উঠতে পারে, সেটাকে নিশ্চিত করবার জন্যই তারা সশস্ত্র প্রতিরোধকে ধ্বংস করার সাথে সাথে মতাদর্শ প্রচারকদের কলমকেও বন্ধ করতে চাইছে।

