কর্ণাটক গিগ কর্মী বিলের সমস্যা

কিংশুক সরকার

এই প্রবন্ধটি ‘দ্য হিন্দু’-তে গত ১৫-ই জুলাই, ২০২৪ তারিখে প্রকাশিত হয়। লেখক কিংশুক সরকার গোয়া ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট-এর একজন অধ্যাপক এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন প্রাক্তন লেবার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।


ভাষান্তর – নীলকণ্ঠ মণ্ডল

লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৪ সংখ্যায়

গত জুলাই মাসে, কর্ণাটক সরকার একটা নতুন খসড়া বিল চালু করেছে, যার নাম কর্ণাটক প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক গিগ কর্মী (সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ) বিল, ২০২৪। প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক গিগ কর্মীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা এবং কল্যাণমূলক ব্যবস্থা প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে এই বিলটা চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি, রাজস্থানেও একই ধরনের একটা আইন কার্যকর হয়েছে, যার নাম রাজস্থান প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক গিগ কর্মী (নিবন্ধন ও কল্যাণ) আইন, ২০২৩। রাজস্থান সরকারের আইনটার সাথে এই কর্ণাটক বিলের একটা সাদৃশ্য রয়েছে, কারণ উভয়ই কল্যাণমূলক ব্যবস্থার মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্পর্ককে (যেমন – শ্রমিক মালিক) এই মডেল সেভাবে বিবেচনা করে না এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত স্বনির্ভর কর্মীদের জন্যই এটা বেশি উপযুক্ত। গিগ কাজের ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্পর্ককে ঘিরে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলোকে সমাধানের প্রয়োজন আছে।

গিগ কাজের উত্থান বনাম কাজের সমস্যা –

গত দশক থেকে, বিশেষ করে অ্যাপ-ক্যাব এবং রিটেল ডেলিভারি ক্ষেত্রের বিকাশের সাথে সাথে গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গিগ অর্থনীতি নিয়ে নীতি আয়োগ তাদের কার্যকরী নীতিপত্রে পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে গিগ কর্মীবাহিনীর সংখ্যা ২৩.৫ মিলিয়ন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। সামগ্রিকভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হতাশাজনক পরিস্থিতিকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, গিগ কাজের ক্ষেত্রটা হলো এমন একটা ক্ষেত্র যা ক্রমবর্ধমান সংখ্যক চাকরি প্রার্থীকে জীবিকা প্রদান করছে। এই ধরনের একটা প্রবণতা অন্যান্য দেশেও দৃশ্যমান।

সম্প্রতি, লভ্যাংশের ভাগ, কর্মঘণ্টা ও কাজ সংক্রান্ত অন্যান্য বিভিন্ন পরিস্থিতি, এবং কর্মসংস্থানের শর্তকে ঘিরে গিগ কর্মীদের প্রতিবাদ ও আন্দোলন দেখেছে ভারত। বর্তমান আইনি কাঠামোর মধ্যে এই সমস্যাগুলি সমাধান করা কঠিন, কারণ গিগ অর্থনীতিতে কর্মক্ষেত্রের সাধারণভাবে প্রচলিত বিভিন্ন সম্পর্কগুলো প্রায় নেই বললেই চলে, বা থাকলেও সেগুলো অত্যন্ত জটিল। শ্রম আইনগুলির আইনি কাঠামোটি মূলত নিয়োগকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। কিন্তু গিগ অর্থনীতিতে কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কগুলো রহস্য আর ঘুরপ্যাঁচে ভরা। যারা প্ল্যাটফর্মটি চালান তারা নিজেদেরকে ‘এগ্রিগেটর’ হিসেবে ভাবতে পছন্দ করেন এবং গিগ কর্মীদের স্বাধীন কন্ট্রাক্টর/কর্মী হিসেবে বিবেচনা করেন। এগ্রিগেটররা বিশ্বাস করেন যে তারা প্রযুক্তি সরবরাহ করছেন এবং তার মাধ্যমে স্বাধীন কর্মী ও গ্রাহকদের একত্রিত করছেন। এগ্রিগেটরদের মতে, এই স্বাধীন কর্মীরা নিজেরাই নিজেদের কাজের মালিক।

অন্যদিকে, গিগ অর্থনীতির কর্মীরা তাদের নিয়োগকর্তা হিসাবেই এগ্রিগেটরদের বিবেচনা করেন। কারণ কর্মসংস্থানের শর্ত, মেয়াদ ইত্যাদি এগ্রিগেটরদের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটা অ্যাপ-ক্যাব পরিচালনায়, রাইডের দাম অ্যাপ/এগ্রিগেটর ঠিক করে দেয় এবং রাইডের জন্য কাজের শর্ত ও মেয়াদের পুরো ব্যবস্হাপনাটা কেবলমাত্র অ্যাপ/এগ্রিগেটর কোম্পানি দ্বারাই নির্ধারিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, গিগ কর্মীরা ন্যায্য ব্যবস্থা, উন্নত কাজের শর্ত এবং সামাজিক সুরক্ষাকে আইনি অধিকার হিসাবে অর্জন করতে চায়।

ইউনাইটেড কিংডম (ব্রিটিশ) আদালতের রায় –

একই ধরনের পরিস্থিতিতে, ব্রিটেনে, ইউনাইটেড কিংডম সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে উবার হলো নিয়োগকর্তা এবং ইউ.কে-র বিদ্যমান শ্রম আইনগুলো উবার চালকদের জন্য প্রযোজ্য। ভারতে, গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীরা সোশ্যাল সিকিউরিটি ২০২০ কোডে অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষার নিয়মের অধীনে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত এক ধরনের স্বনির্ভর কর্মী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু অন্য তিনটে নতুন শ্রম আইনে, যথা মজুরি নিয়ম, শিল্প সম্পর্ক নিয়ম, এবং পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কাজের শর্তের নিয়মে এই ধরনের কর্মীদের কোনও উল্লেখ নেই। রাজস্থান এবং কর্ণাটকের আইনগুলো এই আইনি প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সংযোজন।

রাজস্থানের আইনটার মতো, কর্ণাটকের বিলটাও গিগ কাজের মধ্যে কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কগুলোকে সংজ্ঞায়িত করার সমস্যাটা এড়িয়ে গেছে। এটা অ্যাপ কোম্পানিগুলোর জন্য নিয়োগকর্তার পরিবর্তে ‘এগ্রিগেটর’ শব্দটাই পছন্দ করেছে। কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কের স্বীকৃতি ছাড়া, সুরক্ষামূলক শ্রম আইনগুলো, যেগুলো একটা ন্যূনতম মজুরি, পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য, কাজের সময় এবং ছুটির অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় সেগুলোকে, এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকারকে প্রয়োগ করা যায় না। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গিগ কাজের ক্ষেত্রে এখনও অমীমাংসিতই থেকে গেল।

গিগ কাজ থেকে কর্মীদের জন্য ন্যূনতম আয়ের কোনও নিশ্চয়তা নেই, এমনকি একজন কর্মী যদি গোটা দিনের বেশিরভাগ সময়টা নিজেকে কাজের জন্য উপলব্ধ রাখে, তাহলেও নয়। কাজের ঘন্টাকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও কোনও নিয়ম নেই। অতিরিক্ত কাজ করা অ্যাপ ক্যাব ড্রাইভাররা ভোররাতের দিকে বা ভোরবেলা দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে- এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটে চলেছে। যাত্রীর জীবনের পাশাপশি এগুলো তাদের নিজস্ব জীবনের জন্যও বিপজ্জনক।

কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কগুলো গিগ কাজের মধ্যে বিদ্যমান এবং নিয়মনীতির মধ্যে সেগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এগ্রিগেটররা প্রকৃতপক্ষেই নিয়োগকর্তা, কারণ তারা কর্মসংস্থানের শর্ত ও মেয়াদকে নির্ধারণ করে। প্ল্যাটফর্মকে কর্মী ও গ্রাহকদের সংযুক্ত করার একটা উপকরণ হিসাবে তারা উপস্থাপন করলেও, একমাত্র তারাই এটা ডিজাইন করা এবং এর শর্তগুলোকে তৈরি করার একমাত্র হকদার। প্ল্যাটফর্ম নিছক একটা উপকরণ মাত্র এবং এর কোনও স্বাধীন সত্তা নেই। যারা নিজেদের ‘এগ্রিগেটর’ বলে দাবি করে, তারাই প্রকৃতপক্ষে নিয়োগকর্তা বা মালিক।

মূল সমস্যা –

রাজস্থান এবং কর্ণাটক রাজ্য কর্তৃক গৃহীত কল্যাণমূলক ব্যবস্থার এই মডেল গিগ কর্মীদের জন্য কিছু কল্যাণমূলক প্রকল্প দিয়েছে বটে, কিন্তু সেগুলো কোনওভাবেই নিয়মিত কর্মীদের আইনি অধিকার হিসাবে প্রাপ্য সামাজিক সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাগুলোকে, যেমন প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, বা মাতৃত্বের সুবিধা ইত্যাদিকে প্রতিস্থাপন করে না। ঐতিহাসিকভাবে, কল্যাণমূলক ব্যবস্থার মডেলগুলো বরাবরই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করা হয় নি। যেমনটা নির্মাণ শ্রমিকদের কল্যাণ আইন, ১৯৯৬ এবং অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা আইন এর ক্ষেত্রে দেখে গেছে, যেখানে তহবিলে টাকা থাকলেও সেটা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি।

কর্ণাটক সরকারের বিলটা গিগ কর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বা কাজের সময়ের সমস্যাগুলোকে সমাধান করে না। অনুচ্ছেদ নং ১৬-তে আয়ের নিরাপত্তা সম্পর্কে আলোচনা করা হলেও, ন্যূনতম আয়, মজুরির অধিকার, বা এগ্রিগেটর আর গিগ কর্মীদের মধ্যে লভ্যাংশের ভাগাভাগি নিশ্চিত করে না। অনুচ্ছেদ ১৬(২) কেবলমাত্র সাপ্তাহিক অর্থপ্রদানকে নিশ্চিত করে, কিন্তু সেখানেও ন্যূনতম পরিমাণকে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা নেই।

প্রস্তাবিত কর্ণাটক বিল, সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ম ২০২০ এবং রাজস্থান আইন ২০২৩-এর মতোই, গিগ অর্থনীতিতে কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কের সমস্যাকে সমাধান করে না। এই বিল কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কগুলোকে বিভ্রান্ত করে এবং নিয়োগকর্তাদের আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয়, যা কর্মীদের অধিকারগুলোকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করার কাজটাকে কঠিন করে তোলে।


মূল প্রবন্ধ এবং কভার ফটো সৌজন্যেhttps://www.thehindu.com/opinion/op-ed/the-problem-with-the-karnataka-gig-workers-bill/article68403672.ece [Retrieved On: 23/11/2024]

One thought on “কর্ণাটক গিগ কর্মী বিলের সমস্যা

Leave a Reply