লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৪ সংখ্যায়
দেশ আজ গভীর সংকটে। সর্বত্র কর্পোরেট আগ্রাসনের ছাপ সুস্পষ্ট। মানুষের সমস্ত অধিকার খর্ব করে তার বসতি, তার রুজি রোজগারকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে সরকারি তত্ত্বাবধানে দেশের জল জঙ্গল জমি কে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়াটা আজ সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশকে ধ্বংস করে, জঙ্গল সাফ করে সেই অঞ্চলের মাটির নিচের সম্পদকে কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশকে ধ্বংস করার অর্থ হল, যারা কয়েকশো শতাব্দী ধরে পরিবেশকে রক্ষা করে আসছে, সেই আদিবাসী বনবাসীদের উচ্ছেদ করা।
ফারাক্কার আম-লিচু বাগানের উপর দিয়ে হাই টেনশন তার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – উৎপন্ন বিদ্যুৎ যাতে বাংলাদেশকে বিক্রি করা যায় – তার (wire) নিয়ে যাওয়ার রাস্তায় যে ১১০০ বর্গকিলোমিটারের সুবিস্তৃত ফলের বাগান আছে, তার অধিকাংশ গাছকে কেটে ফেলা হয়েছে। ফল চাষিদের পুত্রসম সেইসব গাছ, যা থেকে ৩৫ হাজার ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিবছর প্রতি গাছ থেকে ফল বিক্রি করে মুনাফা লাভ করতেন, সেইসব ফলচাসীরা আজ রাস্তায়! প্রতিবাদ করে জুটেছে শুধু পুলিশের লাঠি ও কারাবাস, তাতে মহিলারাও বাদ যাননি। জোর করে সই করিয়ে নেওয়া কাগজের বিনিময়ে হাতে এসেছে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ, যা নাকি বাজার মূল্যের থেকে অনেক কম! এমনকি হাইকোর্ট পর্যন্ত গিয়েও ফলচাষিরা সেরকম কোন সুরাহা করতে পারেননি, কারণ বিচার সবসময় ধনীদের অনুকুলেই যায়! ‘উন্নয়নের জন্য সরকার যে কোন জায়গার যে কোন জমি অধিগ্রহণ করতে পারে, তার জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ জমির মালিকের প্রাপ্য’- এমনই নাকি নিদান। গ্রীন ট্রাইব্যুনালে গিয়েও কোন কাজ হয়নি। তাই ফলচাষিরা চোখের সামনে দেখল তাদের গাছগুলি কেমন ভাবে আদানীর লোকেরা পুলিশি পাহারায় যন্ত্র দিয়ে কেটে ফেলল। মেকি উন্নয়নের নামে আদানীদের তুষ্ট করার যে নীতি- সেই নীতির ফলে ক্ষুদ্র ফলচাষিদের নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে পেটের ভাত কেড়ে নেওয়া হলো!
শুধু ফারাক্কা নয়, সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করে সরকারি সংস্থা ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডব্লিউ বি এস ই ডি সি এল) এর তত্ত্বাবধানে ২০২২ থেকে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে বাগমুন্ডি ব্লকে এক হাজার মেগা ওয়ার্ড জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি একটি ক্লোজড লুপ টাইপ পাম্প স্টোরেজ। এর জন্য প্রায় ২৭২ হেক্টর জমিকে কাজে লাগানো হয়েছে, যার মধ্যে ২৩৪ হেক্টর জমি হল বনভূমি। এই বিশাল পরিমাণের জঙ্গলকে কাজে লাগাতে গিয়ে সরকারি এই সংস্থাটি পরিবেশের যেমন ক্ষতি করেছে, তেমনভাবেই এই জঙ্গলে বসবাসকারী আদিবাসী বনবাসী মানুষকে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে উচ্ছেদ করেছে। এর জন্য সংস্থাটি ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট এর কোনো তোয়াক্কা করেনি।
এই প্রকল্পের বিরোধীতা করে অযোধ্যা পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের দ্বারা ‘প্রকৃতি বাঁচাও মঞ্চ’ ও ‘আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ’ গঠিত হয়। কিন্তু তাদের মতের তোয়াক্কা না করেই উচ্ছেদ চলছে। যেখানে গ্রাম সভার ৫০ শতাংশ সদস্যের অনুমতির প্রয়োজন, সেখানে বাঘমুন্ডির ১০ জন ও অযোধ্যা গ্রাম পঞ্চায়েতের ২৮ জনের সম্মতি নিয়ে তারা অযোধ্যা পাহাড়ে বসবাসকারীদের কৃষি জমি, তাদের বাসস্থান, ধর্মীয় স্থান এবং মাসাং বুরু (পাহাড়ি দেবতা)র স্থান দখল করে। সরকারের এই বেআইনী, অনৈতিক, স্বৈরাচারী পদক্ষেপে আদিবাসী সমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ফলে শুরু হয় শোষণ, নিপীড়ন। গত পাঁচ বছরে এক বড় সংখ্যার প্রতিবাদীকে মিথ্যা কেস দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। চলে উপর্যুপরি উচ্ছেদ ও মানসিক অত্যাচার। অর্থাৎ যেখানেই পরিবেশ ধ্বংস করে সরকারি পদক্ষেপে উচ্ছেদ (পুনর্বাসন না দিয়ে) চলছে, সেখানে আক্রান্ত হচ্ছে প্রান্তিক, সমাজের পিলসুজ সেই নীচুতলার মানুষজন।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, তারা দেশ জুড়েই চলছে এই প্রক্রিয়া। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে উচ্ছেদ করে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে আসামের কাছাড় জেলায় ২০০ বছরের পুরনো ডলু চা বাগানে হচ্ছে প্রাইভেট এয়ারপোর্ট। এই ডলু টি স্টেট আসলে চারটে চা বাগানের সমাহার- ডলু, ময়নাগুড়ি, লালবাগ এবং মুরলীধর- যা ১২০২ হেক্টর জায়গা নিয়ে অবস্থিত। এখনো পর্যন্ত ৩২৫ হেক্টর জায়গা নিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেখানে অবস্থিত শ্রমিকদের ও তাদের পরিবারগুলিকে দুরবস্থার মধ্যে ফেলে। কেন্দ্রীয় সরকার ও বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টায় প্রকৃতিকে ধ্বংস করে (প্রায় ৪২ লক্ষ চা গাছ ইতিমধ্যে কাটা হয়ে গেছে) গ্রিনফিল্ড এয়ারপোর্ট বানানোর প্রচেষ্টা চলছে।
এই সমগ্র প্রক্রিয়ার জন্য EIA (Environmental Impact Assessment) বা SIA (Social Impact Assessment) কোনটাই করা হয়নি। এই বাগানে কর্মরত ছিলেন প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক। এই শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের পরিবার সবাই প্রায় আজ ধ্বংসের মুখে। চা বাগান মানে সবুজের সমারোহ- এই সবুজ ধ্বংস করে চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলিকে আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। খুশির খবর এটাই যে অতি সম্প্রতি এপ্রিলের ৮ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের এক নির্দেশে আপাতত এই উদ্যোগ/ উচ্ছেদ বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি জে বি পূরডিওয়ালা ও বিচারপতি মনোজ মিশ্রা এক নির্দেশে বলেছেন, ‘Pending further orders, there shall be a stay of the operation…..’।
ঠিক একইভাবে অরুণাচল প্রদেশে গ্রিনফিল্ড এয়ারপোর্ট বানানোর জন্য সেই অঞ্চলের যারা সুপ্রাচীন অধিবাসী, সেই চাকমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। ন্যাশনাল কমিশন অফ মাইনরিটিস (এন সি এম) সম্প্রতি সেই অঞ্চলে পরিদর্শনে যান এবং দেখেন মাইনরিটি সেলের যে নিয়ম, সেগুলোকে সব বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমাদের বেআইনিভাবে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জল জঙ্গল জমির উপর যে অধিকার, তাকে ধ্বংস করে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আঘাত হেনে সারা দেশে চলেছে এই কর্পোরেট পুঁজিকে আরো বেশি মুনাফা পাইয়ে দেবার হীন চক্রান্ত। এর থেকে বাদ নয় ছত্রিশগড় রাজ্যও। ছত্রিশগড় রাজ্যের হাসদেও হল গভীর শাল বৃক্ষের অরণ্য, এর গভীরতা এতই বেশি যে এখানে দিনের বেলাতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার একযোগে এই সুবিশাল প্রাচীন অরণ্যকে ধ্বংস করে কয়লা/লৌহ আকরিক তোলার কাজে ব্যস্ত, উদ্দেশ্য একটাই আদানীকে তার মুনাফা লোটার কাজে সাহায্য করা। এই কয়লা ও লৌহ চূর্ণ দ্বারা তৈরি হবে বিদ্যুৎ, যা পার্শ্ববর্তী রাজ্য গুজরাট, মহারাষ্ট্রে সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যেই অন্তত পঞ্চাশ হাজার গাছ কাটা হয়েছে। পরিবেশকে ধ্বংস করার যে বেআইনি কাজ তাতে কেন্দ্র থেকে যথাযথ ছাড়পত্র ও অনুমতি পাওয়া গেছে।
কিন্তু প্রতিরোধের আরেক নাম হাসদেও। The Hasdeo movement is a model of Resistance। এই বেআইনী কাজের বিরুদ্ধে ‘হাসদেও অরণ্য বাঁচাও সংঘর্ষ কমিটি’ প্রায় ১৩ বছর ধরে লড়াই চালাচ্ছে। সরকার ও কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এই কমিটির কত মানুষকে যে প্রাণ দিতে হয়েছে তার কোন হিসেব নেই। প্রতিবাদী মানুষ, আদিবাসী বনবাসী মানুষকে থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে illegal detention করিয়ে সেই সুযোগে পুলিশি প্রহরায় গাছ কেটে অরণ্য সাফ করা হচ্ছে। হাসদেও বাঁচাও আন্দোলনের কণ্ঠস্বর বস্তার অব্দি পৌঁছেছে। হাসদেও বাঁচাও আন্দোলনে এখন কৃষক সংগঠনগুলি, কয়লা খনি শ্রমিকরা, পরিবেশবিদ- সকলে যোগদানের ফলে এক ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ছত্রিশগড় বাঁচাও আন্দোলনের একজন সদস্য অলক শুক্লার মতে ওই অঞ্চলের ডাক্তারেরা রায়পুরে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদী মিছিলে ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন- এমনই এই আন্দোলনের তীব্রতা।
শুধুমাত্র সমতলভূমি বা মালভূমি অঞ্চলে এমনটা ঘটছে তা কিন্তু নয়, কর্পোরেটদের দৃষ্টি এখন সুউচ্চ কাশ্মীর উপত্যকায়! লাদাখ- ভারতের মানচিত্রে অতি উত্তরে অবস্থিত অঞ্চলটিতে দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের বাস – বৌদ্ধ এবং সিয়া মুসলিম। ২০১৯ সালে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের পর থেকেই লাদাখ অঞ্চলটি লাদাখ ও কাশ্মীর এই দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। লেহ র জনগণ এই ভেবে ভীত যে এখন এই অঞ্চলের জমি যদি বহিরাগতরা ক্রয় করে, তবে তাদের এতদিনের আইডেন্টিটি নষ্ট হয়ে যাবে। তখন থেকে তারা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপ দিতে থাকে। তাদের দাবিগুলি ছিল আলাদা রাজ্য, সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ ও তাদের সম্পদের রক্ষা। পরবর্তীতে তাদের দাবিগুলির মধ্যে যুক্ত হয় ষষ্ঠ তফশিল (Constitutional Provision) যা লাদাখ অঞ্চলের অধিবাসী মানুষকে ও তাদের অধিকারকে রক্ষা করবে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী সোনাম ওয়াংচুক কেন্দ্রশাসিত লাদাখের জন্য সংবিধানের সুরক্ষা এবং শিল্প ও খনি লবি থেকে লাদাখের সুরক্ষার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন, ২১ দিন পরে তিনি অনশন প্রত্যাহার করেন।
উপরে বর্ণিত অঞ্চলগুলি ছাড়াও পশ্চিমঘাট পর্বতের পাদদেশে কয়েক হাজার মাইল জঙ্গল সাফ করে ওয়াটার টাওয়ার অফ পেনেনসুলার ইন্ডিয়া এন্ড প্রিসিয়াস হেরিটেজ ফর পস্টারিটি হয়েছে। সেখানেও পাহাড়ে বসবাসকারী বনবাসী আদিবাসীদের জীবন জীবিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে। দেউচা পাঁচামিতে কয়লা খনি ও সেখান থেকে কয়লা উত্তোলনে পরিবেশের সমূহ অতি সাধন হচ্ছে। আবার পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে যেখানে কথিত আছে, পাহাড়ের নিচে ডলোমাইট খনি আছে, সেখানেও।
আসলে এটা শুধু এক অঞ্চলের সীমিত প্রতিবাদ নয় – যেখানে যেখানে মাটি/পাহাড়ের নিচে মূল্যবান খনিজের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করে কর্পোরেট পুঁজির হাতে তা তুলে দেবার জন্য সরকার চেষ্টা করছে। তাতে পরিবেশ ধ্বংস হলেও সরকার তার তোয়াক্কা করছে না। অসমর্থিত সূত্রে প্রকাশ, সেই রকম মূল্যবান খনিজ লিথিয়ামের সন্ধান পাওয়া গেছে বলেই লাদাখ পাহাড়ের দিকে আজ চোখ পড়েছে কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের। এই পরিবেশ ধ্বংস যে মূলত সাধারণ মানুষকে উৎখাত উচ্ছেদের মাধ্যমে ঘটে থাকে, তাকে অস্বীকার করা যায় না। পরিবেশ আন্দোলনের মধ্যে থাকে শ্রেণী চেতনার প্রকাশ। তাই রেডিক্যাল পরিবেশবিদ চিকো মেন্ডিস খুব সংগতভাবেই বলেছেন, ‘Environmentalism without class struggle is just gardening’।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://x.com/AAPforNewIndia/status/1802196316807950465 [Retrieved On: 08/11/2024]

One thought on “পুঁজিবাদী ‘উন্নয়ন’- উচ্ছেদ এবং পরিবেশ ধ্বংসের মারণযজ্ঞ”