লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
অগাস্ট ২০২৫ সংখ্যায়
গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনের উত্থান ঘটেছে, যা রাজ্যের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এইসব গণআন্দোলন নানা ক্ষেত্র থেকে তৈরি হয়েছে – শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শ্রম, জমি অধিগ্রহণ, ধর্মীয় ও আইনী সংশোধন, এবং নারীর প্রতি হিংসা ইত্যাদি। এই প্রবন্ধে আমরা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক আন্দোলনের চরিত্র, জনসমর্থনের মাত্রা, তাদের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, এবং ভবিষ্যতের লড়াইয়ের দিশা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করব।
১. সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য গণআন্দোলনসমূহ
শিক্ষাক্ষেত্রের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন : পিএসসি, এসএসসি, টেট ইত্যাদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালাচ্ছেন। অনেকেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, দিনের পর দিন রাজপথে অবস্থান করেছেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যে ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের চাকরি চলে গেল, তারাও লাগাতার আন্দোলন চালাচ্ছেন। কখনও কখনও আন্দোলনগুলো প্রচলিত আইনী সীমাকে অতিক্রম করছে, পুলিশী আক্রমণের মুখেও পড়ছে।
আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুন : ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজ্যের অন্যতম নামকরা হাসপাতালের মধ্যে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। চিকিৎসক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মিছিল, প্রতিবাদ সভা, লালবাজার, স্বাস্থ্য ভবনে ধর্ণা, দূর্গাপূজার সময় ধর্মতলায় অনশন অবস্থান – প্রায় দুই মাস ব্যাপী এক প্রবল গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলন নারীর নিরাপত্তা, দূর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, এবং সরকারি দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদের রূপ নেয়। সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশার চিত্রকে পুরোপুরি উন্মোচন করে দেয়।
জমি অধিগ্রহণ বিরোধী গণআন্দোলন : ভাঙ্গড় থেকে শুরু করে ভাবাদিঘী, ঠুরগা, দেউচা-পাঁচামি, মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুর – এইসব অঞ্চলে সরকার ও কর্পোরেটদের যৌথ উদ্যোগে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কৃষক ও আদিবাসীদের প্রবল প্রতিবাদ দেখা গেছে। বিশেষ করে ভাঙ্গড় এবং দেউচা পাঁচামী-তে সরকারকে যথেষ্ট প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। ভাঙ্গড় আন্দোলনে বেশ কয়েকজন শহীদ হয়েছেন, অনেক মানুষকে ইউএপিএ-র মতো দানবীয় আইনে জেল বন্দী করা হয়েছিল।
পরিবেশ ও নদী রক্ষার আন্দোলন : যশোর রোডের গাছ কেটে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের বিরুদ্ধে গাছ বাঁচাও আন্দোলন, বিভিন্ন নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশপ্রেমীরা গড়ে তুলেছেন ‘নদী বাঁচাও’ আন্দোলন।
শ্রমিক আন্দোলন : বিভিন্ন জুট মিল, দার্জিলিং ও ডুয়ার্স অঞ্চলের চা বাগান, বিভিন্ন ছোট ছোট কারখানা ও বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরা, তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের কর্মীরা, ওলা, উবের, জোমাটো, সুইগি, ব্লিঙ্কিট এর মতো অ্যাপ নির্ভর প্ল্যাটফর্মের কর্মীরা – বিভিন্ন সময় ন্যায্য মজুরি, স্থায়ী কাজ, এবং সামাজিক সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকারের জন্য গণআন্দোলন : এনআরসি ও সিএএ বিরোধী আন্দোলন, ওয়াকফ আইন সংশোধনের প্রতিবাদ – ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নে সংগঠিত আন্দোলনগুলো বিগত কয়েক বছরে সমাজে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সরকারী কর্মচারীদের আন্দোলন : বকেয়া ডিএ-র দাবিতে এবং শূন্য পদে স্থায়ীভাবে কর্মী নিয়োগের দাবিতে সরকারী কর্মচারীদের একটা অংশ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালান, শহীদ মিনারে অবস্থান মঞ্চ স্থাপন করে অনশন, মিছিল, মিটিং, পেন ডাউন, গণ ছুটি, আইনী লড়াই চলতে থাকে।
ছাত্র আন্দোলন : কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের একচেটিয়া দাদাগিরির বিরুদ্ধে এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র ছাত্রীরা প্রতিবাদে সামিল হয়। এইরকমই এক প্রতিবাদ চলাকালীন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু ছাত্রদের শরীরের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়, একজন ছাত্র গুরুতর জখম হয়। এর প্রতিবাদে বেশ কয়েকদিন লাগাতার আন্দোলন চলে। সরকার, পুলিশ ও তৃণমূল দল প্রতিবাদী ছাত্র ছাত্রীদের নানা ভাবে হেনস্থা করে, জেল খাটায়, মারধর করে।
২. জনসমর্থনের চেহারা
এইসব আন্দোলনগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বতঃস্ফূর্ত হলেও জনবিচ্ছিন্ন নয়। বরং এগুলির পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও বাস্তব সংকট। চাকরিপ্রার্থী, কৃষক, নার্স, শ্রমিক, নারী – প্রত্যেকেরই নিজস্ব যন্ত্রণা থেকে এই প্রতিবাদগুলির জন্ম। তবে সমস্যাটি এখানেই – আন্দোলনগুলির চরিত্র প্রায়শই ‘সেকশনাল’, অর্থাৎ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীভিত্তিক। ফলে সমাজের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যথেষ্ট সংহতি গড়ে ওঠে না। শিক্ষাক্ষেত্রের আন্দোলন শ্রমিক আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায় না, পরিবেশ আন্দোলন নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে না।
৩. আন্দোলনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
এই আন্দোলনগুলির কিছু তাৎক্ষণিক সাফল্য রয়েছে। অনেক নিয়োগ প্রক্রিয়া আদালতের হস্তক্ষেপে স্থগিত হয়েছে বা পুনঃমূল্যায়িত হয়েছে। কিছু জায়গায় জমি অধিগ্রহণের প্রকল্প বাতিল বা পুনর্বিবেচিত হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অধিকাংশ আন্দোলন প্রশাসনিক দমন পীড়ন, মতাদর্শগত দৈন্যতা, দিশাহীনতা, মিডিয়া-প্রভাবিত বিভ্রান্তি, এবং নেতৃত্বের সংকটে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশেষত আর জি করের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর তৈরি হওয়া আন্দোলনটি সমাজের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করলেও সরকার তার তদন্ত ও বিচারের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দ্রুততা দেখায়নি। অন্যদিকে আন্দোলনের নেতৃত্বও আন্দোলনকে পরবর্তী ধাপে কিভাবে উন্নীত করা যায় বা তার জন্য যে আত্মত্যাগ ও দৃঢ়তার প্রয়োজন – সেই বিষয়ে দোদুল্যমানতার স্বীকার হয়ে পড়েন। ফলে একটা সময়ে গিয়ে আন্দোলন দিশা ও গতি হারায়, যা সাধারণ জনগণের মনোবলের ওপরও এক বড় প্রভাব ফেলে, আন্দোলনের প্রতি নিস্পৃহতা বাড়িয়ে তোলে।
৪. সেকশনাল সংগঠন ও নেতৃত্বের দুর্বলতা
বর্তমানে অধিকাংশ সংগঠন কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগঠনের অংশ নয়। তারা স্বল্পমেয়াদী সংকট সমাধানের লক্ষ্যেই গঠিত, এবং দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের কাঠামো বা মতাদর্শগত ভিত্তি তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। এর ফলে কোন কোন মুহুর্তে আন্দোলনের তীব্রতা থাকা সত্ত্বেও তা রাজনীতির মূল স্রোতে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে এখন যে সংস্কৃতি চলছে—সব রাজনৈতিক দল খারাপ, আমরা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যাব না, আমরা না-রাজনীতির ধারক ও বাহক—এটা ছাত্র-যুবদের মধ্যে বিশেষ করে একটা প্রভাব ফেলেছে। মতাদর্শের প্রতি অনাস্থা, সংগঠনের প্রতি অবিশ্বাস, বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুভিত্তিক সংস্কারমূলক কাজের মধ্যে স্বল্পসময়ের জন্য নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা এবং রাজনীতি – সংগঠিত মার্কসবাদী রাজনীতির যথেষ্ট ক্ষতি করেছে।
৫. রাজনৈতিক বিকল্পের অভাব ও জনগণের মানসিকতা
সর্বোপরি, এই আন্দোলনগুলির সামনে এক বড় সংকট – রাজনৈতিক বিকল্প ও ভাবনার অভাব। যারা শাসকের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছেন, তারা ঠিক জানেন না কাদের পক্ষে কথা বলবেন। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উপরও বিশ্বাস নেই, এবং প্রকৃত জনস্বার্থবাহী গণসংগঠনের সংখ্যা নগণ্য এবং তাদের গণভিত্তিও প্রায় শূন্য। সেই সঙ্গে, জনসাধারণের এক অংশের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা ও সুবিধাবাদী মানসিকতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রতিবাদকে অনেক সময় ‘অন্যের বিষয়’ বলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
৬. উত্তরণের দিশা
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ – আন্দোলনের ঐক্য এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের পুনর্গঠন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম, কর্মসংস্থান, নারী, কৃষি, পরিবেশ, দলিত ও সংখ্যালঘু অধিকার, জল জঙ্গল জমি ইজ্জত অধিকার রক্ষা – এই বিষয়গুলোকে ভিত্তি করে যৌথ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলনগুলির মধ্যে পারস্পরিক সংহতি, একে অপরের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলনগুলিকে একটি একক বিপ্লবী কেন্দ্রের মধ্যে সংগঠিত করার চেষ্টা করতে হবে। এটা করতে গেলে মতাদর্শগত কাজ ভীষণ প্রয়োজনীয় – মতাদর্শগত স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তা ছাড়া আন্দোলনগুলির সংগঠকদের পক্ষে আন্দোলনকে সঠিক দিশা দেখানো এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। জনগণের সামনে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন এবং তার রূপরেখা তুলে ধরতে হবে। এই দায়িত্ব সকল বামপন্থী এবং গণতান্ত্রিক শক্তির।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের গণআন্দোলনসমূহ প্রমাণ করে – মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের শক্তি আজও কিছুটা মাত্রায় জাগ্রত। নন্দীগ্রাম, লালগড় আন্দোলনের পর্যায়ে যে বিদ্রোহী চেতনার সঞ্চার জনগণের মধ্যে ঘটেছিল, আজ তা থেকে পিছু হঠলেও, জীবন জীবিকা অস্তিত্ব আত্মমর্যাদার সংকট থেকে মুক্তি পেতে জনগণের বিভিন্ন অংশ মাঝে মধ্যেই বিদ্রোহের পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই শক্তিকে সংগঠিত করে একটি নতুন দিশা দিতে না পারলে, তা নিছক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়েই থাকবে। আন্দোলনের ঐক্য, নেতৃত্বের বিচক্ষণতা, এবং মতাদর্শগত স্পষ্টতা – এই তিনের সংমিশ্রণেই গড়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের এক শক্তিশালী গণআন্দোলন, যা কেবল তাৎক্ষণিক সঙ্কট নয় – সমাজের মৌলিক বস্তুগত পরিবর্তনের পথ দেখাতে সক্ষম হবে।
মূল প্রবন্ধ এবং কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.bbc.com/news/articles/crmwj4z1xpko [Retrieved On: 15/11/2025]
