চা শিল্পের উন্নতি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায়নি, ‘সামাজিক দূরত্ব’ থেকেই গেছে – দ্বিতীয় পর্ব

কিংশুক সরকার

দেশের দুই প্রান্তের মজুরির বিস্তর ফারাকের কারণ অনুসন্ধান করলে এটা দেখা যাবে যে দুই জায়গাতে মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতি আলাদা। দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে চা শিল্পের মজুরি ন্যূনতম মজুরি আইনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং সেই মতো মজুরি ঘোষণা রাজ্য সরকারগুলি করে থাকে। মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলির সাথে আলোচনা করা হয়, কিন্তু মজুরি নির্ধারণ ন্যূনতম মজুরি আইন অনুযায়ী করা হয়ে থাকে। ফলে প্রতি ছয় মাস অন্তর মুদ্রাস্ফীতি সূচক অনুযায়ী মহার্ঘ ভাতাও যুক্ত করা হয় এবং মজুরি সেই মতো বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্যদিকে, আসাম আর পশ্চিমবঙ্গে চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ যৌথ দর কষাকষির মাধ্যমে হয়ে থাকে। ৭০-এর দশকেও এই দুই রাজ্যে চা শিল্পের মজুরি ন্যূনতম মজুরি আইনের আওতায় ছিল। পরে তা পরিবর্তন করে যৌথ দরকষাকষির আওতায় আনা হয়। মনে করা হয়েছিল যে, যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত বেশি মজুরিতে পৌঁছানো যাবে। চা শিল্পের শ্রমিকরা সংগঠিত এবং প্রায় সবাই শ্রমিক সংগঠনের সদস্য। নিয়মিত যৌথ দর কষাকষির পরিকাঠামোও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে যে যৌথ দর কষাকষির ফলশ্রুত মজুরি খুবই কম, এমনকি ন্যূনতম মজুরি থেকেও কম।

এই কারণে গত বেশ কিছু বছর ধরে আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক সংগঠনগুলি ন্যূনতম মজুরি চালু করার দাবি করে চলেছেন। পশ্চিমবঙ্গে এই নিয়ে বেশ কিছু ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে। গত তিন বছরে দুই দফা অন্তর্বর্তীকালীন মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে ন্যূনতম মজুরি এখনো প্রণয়ন করা যায়নি। আসামে ন্যূনতম মজুরি ৩৫০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত সেটা করা যায়নি। আসামে সবমিলিয়ে প্রায় ৮ লক্ষের কাছাকাছি চা শ্রমিক রয়েছেন। ২০১৭ সালে ন্যূনতম মজুরি প্রণয়নের জন্য আসাম সরকার কমিটি গঠন করে। সেই উপদেষ্টা কমিটি ৩৫১ টাকা দৈনিক মজুরি ধার্য করার কথা বলে। ২০১৮ সালে আসাম সরকার দৈনিক মজুরি ১৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬৭ টাকা করে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত নূন্যতম মজুরি চালু করা সম্ভবপর হয়নি। যেভাবে ৫০ টাকা মজুরি বৃদ্ধির বিরোধিতা করে চা মালিকরা আদালতে গেছেন, তাতে বলা যায় যে উপদেষ্টা কমিটির ধার্য করা ৩৫১ টাকার ন্যূনতম মজুরি অদূর ভবিষ্যতে চালু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম যদি না সরকার অতি সচেষ্ট হন।

অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে এই দুই রাজ্যে এত কম দৈনিক মজুরি কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। চা শিল্পের সমস্ত রকম অর্থনৈতিক সূচক শিল্পের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি নির্দেশ করে। চা শিল্পের অধীনে থাকা জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, চাহিদা এবং দাম দুয়ের বৃদ্ধি ঘটেছে। সময়ের সাথে সাথে এইসব সূচকের গতিবিধি সারণী ১-এ দেওয়া হলো।

এই সারণী থেকে এটা বলা যায় যে চা শিল্প গত ৪০ বছরে অনেকখানি কলরবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদন ৫৬০ মিলিয়ন কেজি থেকে বেড়ে ১৩২২ মিলিয়ন কেজি হয়েছে। হেক্টর প্রতি উৎপাদন ১৪৬২ কেজি থেকে বেড়ে ২৩৩৩ কেজি হয়েছে। রপ্তানির তেমন কোন বৃদ্ধি হয়নি, কিন্তু তার জন্য উৎপাদকদের অসুবিধে হয়নি। কারণ দেশে আভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে। ৪০ বছরে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ৩৭৬ মিলিয়ন কেজি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১০৮৪ মিলিয়ন কেজি হয়েছে। আভ্যন্তরীণ চাহিদা ৪০ বছরে প্রায় তিনগুণ হয়েছে এবং চা নিঃসন্দেহে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়। দেশের বাজার ক্রমশ বৃদ্ধি পওয়ার জন্য চা উৎপাদকদের বৈদেশিক বাজারে রপ্তানির জন্য নির্ভর করতে হয়নি। নিলামে চায়ের কিলো প্রতি দামও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮১ সালে যা ছিল ১৩ টাকা ৫৪ পয়সা সেটা ২০১৮ সালে হয়েছে ১৩৩ টাকা ১১ পয়সা। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, প্রায় সমস্ত সূচকের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হলেও, শ্রমের ব্যবহার সে হারে বাড়েনি। ১৯৮১ সালে প্রায় সাড়ে আট লক্ষ শ্রমিক নিয়োজিত হলেও, ২০১৮ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লক্ষের একটু বেশি। জমি বা উৎপাদন যে হারে বেড়েছে, শ্রমের ব্যবহার সে হারে বৃদ্ধি পায়নি। এর থেকে এটাও বলা যায় যে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। জমি দ্বিগুণ হলেও শ্রমের ব্যবহার মাত্র ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দুঃখের বিষয় এই যে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেলেও তাদের যে পারিশ্রমিক অর্থাৎ দৈনিক মজুরি সেটা সেই অর্থে বৃদ্ধি পায়নি। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতে যেখানে মোট চা উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ সংগঠিত হয়ে থাকে। এটা আরোই দুর্ভাগ্যের যে প্রায় সব চা শ্রমিক কোনো না কোনো শ্রমিক সঙ্ঘের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এবং যেখানে মজুরি যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে স্থির করা হচ্ছে, সেই অবস্থায় শ্রমিকরা এমনকি ন্যূনতম মজুরি থেকেও বঞ্চিত। সংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক হয়েও, এ মনারিকাটকেও যেটা ক্রমাগত বড় হয়েছে এবং লাভজনক শিল্প, তার অংশ হয়েও আজকের শ্রমবাজারের একদম তলানির দিকে চা শ্রমিক থাকবেন। সংগঠিত ক্ষেত্র, শ্রমিক সংঘের উপস্থিতি, লাভজনক শিল্প সব মিলিয়ে এত উপাদান থাকা সত্ত্বেও চা শ্রমিকরা শোষিত হয়ে চলছেন।

অনেকে বলবেন যে শ্রমের বাজার তো স্বাধীন, তাহলে চা শ্রমিকরা আজকের দিনে চা বাগানে আটকে রয়েছেন কেন? ছেডে যাচ্ছেন না কেন? সাম্প্রতিককালে ছেডে যে যাচ্ছেন না তা নয়, বেশ কিছু সংখ্যায় চা শ্রমিক আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে কেরালাতে কাজ করতে গেছেন। বিশেষত বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকরা। কেরালাতে মজুরি প্রায় দ্বিগুণ এবং সেখানে শ্রমিকরা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। আসাম পশ্চিমবঙ্গে ন্যূনতম মজুরির প্রণয়ন না করা গেলে এই ধরনের মাইগ্রেশন আরো বাড়বে।

স্বাধীনতার ৭০ বছর কেটে যাওয়ার পরও উত্তর পূর্বের চা শ্রমিকদের অবস্থা দেখলে বোঝা যায় এই শোষণের সাথে অনেকগুলি আর্থ-সামাজিক কারণ জড়িত। প্রথম যেটা বলা যায় যে এই শ্রমিকদের এই দুই রাজ্যের মূল স্রোতের সমাজ কখনোই নিজের অংশ মনে করেনি। তাদের চা বাগানের শ্রমিক বলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। ‘সামাজিক দূরত্ব’ এখানে ভীষণভাবে প্রকট। চা বাগান ‘এনক্লেভ’ অর্থনীতি হিসেবে এখনো রয়ে গেছে আর তাতে কাজ করা আদিবাসীরা আজও বাইরে থেকে আসা শ্রমিক হিসেবেই রয়ে গেছে। মূল সমাজ তাদের আপন করে নেয়নি।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় সেটা হলো যে – চা উৎপাদন যেসমস্ত অঞ্চলে হয়ে থাকে, সেখানে অন্য কোনো শিল্প গড়ে তোলার কোনো চেষ্টা স্বাধীনতা উত্তর সময়ে করা হয়নি। সমগ্র অঞ্চলটাই সামগ্রিকভাবে চা অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। এই অবস্থায় চা বাগানে শ্রমিকরা যাদের মানবসম্পদ উন্নয়নের সীমারেখা বেশিরভাগ সময় প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত হয়ে শেষ হয়ে যায়, তাদের কাছে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা ছাড়া আর তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। চাইলেও তারা চা বাগান ছেড়ে যেতে পারেন না। কোনো কারণে বাগান বন্ধ হয়ে গেলে, কিছুদিনের মধ্যেই অনাহারে দিন কাটাতে হয়। আশেপাশে অন্য কোন শিল্প গড়ে না ওঠার জন্য বা শহুরে অসংগঠিত ক্ষেত্র না থাকার জন্য বা নিজেদের জমি না থাকার জন্য এই শ্রমিকরা জীবিকার জন্য পুরোপুরি চা বাগানের উপর নির্ভর করে। তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ খুব কম।

তৃতীয়, যে কথাটি বলা যায় যে, চা শিল্পের উত্তরোত্তর যে শ্রীবৃদ্ধি বা মুনাফা অর্জন তার সাথে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক শোষণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চা মালিকরা প্রায়শই বলে থাকেন যে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতাতে টিকে থাকতে গেলে উৎপাদন ব্যয় কম রাখতে হবে। ওনারা শ্রীলংকা, কেনিয়া ইত্যাদি দেশের তুলনা টানেন যাদের প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ভারতের থেকে কম। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাই উৎপাদন ব্যয় আরও কমাতে হবে বা বাড়তে দেওয়া যাবে না। যেহেতু চা শিল্প শ্রম নিবিড় একটি শিল্প, উৎপাদন ব্যয় কমানোর অর্থ সেই শ্রম ব্যয় কমানো। অন্যান্য যে উৎপাদন দ্রব্য ব্যবহার করা হয় যেমন সার, কীটনাশক ইত্যাদি সেগুলির দামের উপর চা মালিকদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই সব নিয়ন্ত্রণ এসে পড়ে শ্রমিকের ওপর। মজুরি বৃদ্ধির কথা উঠলেই চা মালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং ভারতীয় চা তার প্রতিযোগী বাণিজ্যিক মূল্যে ক্ষতি স্বীকার করবে। প্রকারান্তরে এও বলা যায় ভারতের চা শিল্প মুনাফা করতে পারবে কিনা সেটা অনেকটাই নির্ভর করে চা শ্রমিকদের কতটা শোষণ করা যাচ্ছে তার উপর। এটা দুর্ভাগ্যের হলেও কঠিন বাস্তব।


প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://www.aljazeera.com/gallery/2019/9/18/in-pictures-plight-of-indias-tea-plantation-workers [Retrieved On: 05/04/2024]

One thought on “চা শিল্পের উন্নতি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায়নি, ‘সামাজিক দূরত্ব’ থেকেই গেছে – দ্বিতীয় পর্ব

Leave a Reply