২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী আসাম রাজ্যের শিলচরে একটি নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেন নরেন্দ্র মোদী, তখন তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। সেই ভাষণে মোদী বলেন “কেন্দ্রে আমরা এলেই যেসব ডিটেনশান ক্যাম্পে বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু উদ্বাস্তরা বন্দী আছেন, সেগুলি বন্ধ করে দেব। সেইসঙ্গে আসামের যে ১ লক্ষ ৪৩ হাজার সরকার দ্বারা চিহ্নিত ডি-ভোটার বা সন্দেহজনক ভোটার আছে তাঁদের নামের পাশ থেকে ‘ডি-ভোটার’ তকমাটি উঠে যাবে।” এই ভাষণের ভিডিওটি মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক মাধ্যমে। শিলচরের প্রবীণ বাসিন্দা চন্দ্রধর দাস এই ভাষণের ভিডিওটি দেখেছিলেন তাঁর ছেলে গৌরাঙ্গ দাসের মোবাইল ফোনে। চন্দ্রধর বাবু ঐ ভিডিওটি বার বার দেখতেন আর বলতেন “মোদিবাবা হলেন ঈশ্বরের অবতার এবং তিনিই আমাকে আবার ভারতের নাগরিক বানাবেন।” তখন চন্দ্রধর দাসের বয়স ৯৮ বছর। ১৯৬৫ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লা জেলা থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের তেলিয়ামুরাতে পালিয়ে আসেন। বেঁচে থাকার জন্য রাজমিস্ত্রীর কাজ থেকে সব্জি বিক্রি – সবই করেছেন। তাঁর তিন সন্তান ভারতের মাটিতে জন্ম গ্রহণ করে। কয়েকবছর পর চন্দ্রধর আসাম রাজ্যের শিলচরে জেলার আমরাঘাট এলাকার বরাইবস্তি গ্রামে এসে বসবাস এবং সব্জি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। তিনি তাঁর তিন কন্যার বিবাহ দেন এবং তাঁর পুত্র গৌরাঙ্গ একটি ব্যাঙ্কে পিয়নের চাকরি পান। চন্দ্রধরের নিজের বা পরিবারের ভারতীয় নাগরিকত্ব সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ছিল না, কারণ তাঁর কাছে একটি সরকারী শংসাপত্র ছিল, যে শংসাপত্রে তাঁকে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ভারতের নাগরিক বলে চিহ্নিত করা ছিল। ১৯৬৬ সালের ত্রিপুরার আগরতলা থেকে তিনি এই সরকারী শংসাপত্রটি পেয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে হওয়া “আসাম চুক্তি” -তে মার্চ ২৫, ১৯৭১ বা তার পরে বাংলাদেশ থেকে আসা সকলের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চন্দ্রধরবাবু নিশ্চিন্ত ছিলেন কারণ তিনি সেই তারিখের বহু আগেই ভারতের মাটিতে বসবাস শুরু করেন। তিনি ও তাঁর পরিবারের সকলেরই ভোটার পরিচয়পত্র, আধার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড সবই আছে। ২০১৯ সালের আগে অবধি তিনি সপরিবারে ভোট দিয়ে একজন ভারতীয় নাগরিকের মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ২০১৯-এ দেখা গেল তাঁর নামটি আর ভোটার তালিকায় নেই। তার দুই বছর আগে থেকে তাঁর রাষ্ট্রের হাতে লাঞ্ছনা শুরু হয়। ২০১৭ সালে মে মাসে আসাম পুলিশ তাঁকে বেআইনি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী সন্দেহ করে তাঁর ১৯৭১ সালের আগে ভারতে আসার নথি চায়। কাছাড় জেলার এসপি তাঁর সমস্ত নথি একটি বিদেশী ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেন, যে ট্রাইব্যুনালগুলি তখন বিভিন্ন পরিচয়পত্রে নামের বানান ভুলের মত সামান্য ভুলের জন্য সাধারণ বঙ্গভাষী আসামবাসীদের “বাংলাদেশী” বলে হেনস্থা শুরু করেছিল। বিদেশী ট্রাইবুন্যাল চন্দ্রধর দাস-কে তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে চারবার শমন পাঠায়। শতায়ু চন্দ্রধর তখন ডিমেনশিয়া ও অন্যান্য বার্ধক্যজনিত রোগে কাবু। তাঁর পরিবার ট্রাইব্যুনালের কাছে তাঁর অসুস্থতার জন্য কিছুদিন সময় চায়, কিন্তু কোনও চিকিৎসকের শংসাপত্র দেখাতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাসে ট্রাইব্যুনাল চন্দ্রধর দাস-কে “অবৈধ বিদেশী অনুপ্রবেশকারী” বলে ঘোষণা করে এবং ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়। ১০২ বছর বয়সী চন্দ্রধর ডি-ভোটার ঘোষিত হন এবং তাঁকে শিলচর জেলের ভিতর একটি ডিটেনশান শিবিরে নিয়ে বন্দী করা হয়। তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বিদেশী ট্রাইব্যুনাল একতরফা রায় দেয়, কারণ তিনি নাকি একবারও ট্রাইবুনালের সামনে সশরীরে আসেননি। কিন্তু আসল ঘটনা হল ঐ ৬ নম্বর বিদেশী ট্রাইব্যুনালে কোনো সরকারী কৌসুলি না থাকায় আদালত কোনো শুনানিই করেনি। তখন তাঁর সেই ২০১৪ সালের “মোদীবাবা” ভরতের প্রধানমন্ত্রী। চন্দ্রধরের কাছে যে নাগরিকত্বের শংসাপত্র ছিল তার সত্যতা যাচাই করতে একাধিকবার আগরতলার ত্রিপুরা সরকারের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। ১৯৪৭-এর ক্ষমতা হস্তান্তরের পর জন্মানো বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের গর্ভজাত এই খন্ডিত ভারতের চেয়েও যে মানুষটা ৩১ বছরের অগ্রজ, তাঁকেই রাষ্ট্র দাগিয়ে দিল “বিদেশি” বলে। ২০১৮-এর জুন মাসে তিনি জেলেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় প্রায় এক বছর ডিটেনশান শিবিরে বন্দী থাকার পর ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ১০৪ বছরের প্রবীণ চন্দ্রধর দাসের সাধ ছিল নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করে তারপর দুচোখ বোজার, তাই গত দুই বছর তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের “বিদেশি” অপবাদ ঘোচাতে। বহুবার উপস্থিত হন ট্রাইব্যুনালের সামনে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ২০১৯ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের লোকেরা ভেবেছিলেন, এবার চন্দ্রধর ও তাঁর পরিবার নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু অল্পসময়েই তাঁদের সেই ভ্রান্তধারণা ঘুচে যায়। গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০ ভারতীয় নাগরিকত্ব অর্জনের লড়াই শেষ হওয়ার আগেই ১০৪ বছর বয়সে থেমে গেল চন্দ্রধর দাসের জীবন, ভারত রাষ্ট্রের খাতায় “বিদেশী” হয়েই দেহপাতে সমাহিত হলেন, তবে চিরশান্তিতে নয়, বরং জাতীয় নাগরিক পঞ্জী নামক রাষ্ট্রীয় কালমৃগয়ায় অভিশপ্ত হয়ে। এই অভিশাপ আসামে “বাঙাল খেদাও” আর ১৯৮৫ সালের রাজীব গান্ধীকৃত “অসম চুক্তি”র গর্ভজাত, যা বর্তমান হিন্দুত্ববাদী শাসকরা ব্যবহার করছে জাতিঘৃণা আর ধর্মীয় মেরুকরণকে তীব্রতর করতে।
শতায়ু চন্দ্রধর দাসের মৃত্যু কোনো বিছিন্ন ঘটনা নয়। ২০১৮ সালেই আসামের ওদালগুড়ি জেলার বাঙালি সাইকেল মেকানিক দীপক দেবনাথ আত্মহত্যা করনে। এন আর সি তে নাম ছিল, কিন্তু Foreigners Tribunal তাঁকে ডি-ভোটার সাজিয়ে বিদেশী বলে দাগিয়ে হেনস্থা করছিল। একদিন বাড়ির অদূরে এক গাছে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মিলল। ঘটনাস্থল ওদালগুড়ির ঘাগরা গ্রাম। ডি-ভোটারের নোটিস পাওয়া ও নাগরিকত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তখন থেকেই আত্মহত্যা ঘটেই চলেছে অসমে। ২০১৮-এর জুলাইয়ে এই ওদালগুড়িতেই আত্মঘাতী হন গোপাল দাস। ২১ অক্টোবর আত্মহত্যা করেন খারুপেটিয়ায় আইনজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিরোদবরণ দাস। সেই রাষ্ট্রহীন বাঙালী মৃত্যুমিছিল চলছে নির্মল পাল, দেবেন বর্মণ, মিঠুন রায়, অবলা রায়, ছোটকি দেবী, বিনয় চন্দ, গোপাল চন্দ্র দাস, বিমল চন্দ্র ঘোষ, নীরদবরণ দাস, দীপক দেবনাথ, চন্দ্রধর দাস।
আসাম জুড়ে চলা ৬ টি ডিটেনশন ক্যাম্পে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে স্বাধীন দেশের হতভাগা “বেনাগরিকরা”। নাৎসি জার্মানির কুখ্যাত কষাইখানা আউশউইচ কনসেন্ট্রেশন শিবিরের বীভৎসতা আমরা দেখেছি ফরাসি চিত্র পরিচালক আলা রেনোয়ার “নাইট অ্যাণ্ড ফগ” ছবিতে। আজ বেঁচে থাকলে ঐ পরিচালক হয়তো ছবির সিকুয়াল বানাতেন। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য তাঁর ‘ভাষা রাজনীতি – আসামে বিপন্ন বাঙালী’ প্রবন্ধে লিখেছেন “আর্যাবর্তের ধর্মান্ধজনেরা বৈদিক আর্যদের সম্প্রসারণের যুগ থেকেই ‘সদানীরা’ নদীর পূর্বপ্রাস্তিকজনদের ‘বহায়সি’ বলেছে। পাখির মতো কিচিরমিচির করা অর্থাৎ অবোধ্য ভাষায় কথা বলা লোকদের আর্যরা ঘৃণা করে এসেছে। এই এলাকাই প্রত্ন বাংলা যা পরবর্তীকালে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুগ্ন, গৌড় ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত হয়েছে। আর্যাবর্তের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী কোনো দিনই তুলনামূলক ভাবে আলোকিত প্রাচ্যদেশীয় জনদের সহ্য করতে পারেনি। ক্রমে তা ‘মছলিখোর’ বাঙালির প্রতি নিরাময় অযোগ্য ঘৃণা ও বিদ্বেষে রূপান্তরিত হয়েছে। ঐ পুঞ্জীভূত অসূয়া, ও ঘৃণা উদভূত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক শক্তি তাদের শতাব্দীপ্রাচীন পরম্পরাকে মান্যতা দিয়েই বাঙ্গালি নির্মুলিকরণের প্রধান হোতা।” এই মেরুকরণ আর জাতিঘৃণাই এখন আবার হাত বদল হয়ে হিন্দু মৌলবাদীদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মেরুকরণের উদ্দেশ্য নিয়েই তারা নয়া ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯’ হাজির করেছে যার মধ্যে সমস্ত অমুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার টোপ দেওয়া হচ্ছে। অথচ আইনটি পড়লেই বোঝা যাবে ঐ আইনে একজন অভিবাসীও নাগরিকত্ব পাবে না, বরং শরনার্থী হয়ে দাসশ্রমিকের জীবন পাবে। ইতিমধ্যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দিয়েছেন যে জানুয়ারী ২০২১ থেকেই বাংলা সহ গোটা দেশে এই ধর্মভিত্তিক আইন লাগু হবে। বারবার বাংলা সফরে এসে বিজেপি সভাপতি জগৎপ্রসাদ নাড্ডাও একথা বলে গেছেন।
জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) এবং নয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী লড়াইয়ে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রীয় রোষের শিকার হয়ে কারারুদ্ধ হয়েছেন উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম সহ বহু ছাত্রছাত্রী, যুবক যবতী ও মানবাধিকার কর্মী। তবু আন্দোলন দমেনি, দিল্লির শাহীনবাগের স্ফুলিঙ্গ থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মতো। শাহীনবাগের দাদি বিলকিস বেগম আজ গোটা দেশের কাছে এক আলোকবর্তিকা, যাঁর নয়া মুক্তিযুদ্ধের মশাল এই বাংলায় তুলে নিতে চাই আমরাও। তাই আজ সেই মুক্তিবন্দনা গাইতে গাইতে মুখরিত গণমিছিল ধরে এগিয়ে চলি আমরা –
“মুক্তিযুদ্ধ ডাকে আগামীর দিকে হেঁটে চলো / এ যদি আমার দেশ না হয় তো কার দেশ বলো?”
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার মার্চ ২০২১ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://scroll.in/article/947458/the-caa-and-nrc-together-will-reopen-wounds-of-partition-and-turn-india-into-a-majoritarian-state [Retrieved On: 27/07/2023]
