মণিপুর-এর চলমান জাতি-হিংসা ও শাসকশ্রেণীর ভূমিকা

ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ যেমন নতুন কোনো বিষয় নয়, তেমনই মণিপুর রাজ্যের মেইতেই ও কুকি উপজাতির মধ্যে গণ্ডগোলও যে এই প্রথম বার লাগল তেমনটা নয়। তবে হ্যাঁ, এইবার গণ্ডগোলের মাত্রা ও স্থায়িত্ব দুটোই অনেক বেশি। এখন এই গণ্ডগোল রীতিমতো একটা গৃহযুদ্ধের আকার নিয়েছে, এবং তিনমাস পরেও থামার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে চলেছে; শ’য়ে শ’য়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে; মহিলাদের ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শ্লীলতাহানি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাতে পরিণত হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একবারের জন্যও কোনো বিবৃতি না দিয়ে নির্লজ্জতার রেকর্ড গড়েছেন। তবে সম্প্রতি দুই মাস পুরনো একটা ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় শাসকশ্রেণীকেও নড়েচড়ে বসতে হয়েছে। সেই ভিডিওতে দেখা গেছে যে মেইতেই সম্প্রদায়ের কিছু উন্মত্ত পুরুষ ও মহিলা মিলে কুকি উপজাতির দুইজন মহিলাকে নগ্ন করে ঘোরাচ্ছে, শ্লীলতাহানি করছে। এই পৈশাচিক ঘটনার দৃশ্য দেখে গোটা দেশ, এমনকি বিদেশেরও নজর গিয়ে পড়েছে জাতি-দাঙ্গার আগুনে পুড়ে ছারখার হতে থাকা মণিপুর রাজ্যে। এমনকি, এবারে প্রধানমন্ত্রীও কুমীরের কান্না কাঁদতে বাধ্য হয়েছেন; কিন্তু সেখানেও বিরোধী দল-শাসিত রাজ্যগুলোতে ধর্ষণের কথা উল্লেখ করে তিনি নির্লজ্জতার নতুন রেকর্ড গড়েছেন।

মণিপুর রাজ্যে মেইতেই-রা হলেন প্রভাবশালী হিন্দু সম্প্রদায়, যাঁরা রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৫৩%। নাগা ও কুকি-রা হলেন যথাক্রমে দ্বিতীয় (২৪%) ও তৃতীয় (১৬%) বৃহৎ জনগোষ্ঠী। মূলত ইম্ফল উপত্যকায় বাস করা মেইতেই-দের সাথে উপজাতি জনগণের দ্বন্দ্বের উৎস হলো জমিকে ঘিরে। উপজাতি জনগণের বাস ইম্ফল উপত্যকার চারপাশে অবস্থিত পার্বত্য এলাকায়, যা মণিপুরের মূল ভূখণ্ডের প্রায় ৯০% এলাকা। কিন্তু আইন অনুযায়ী ‘হিল এরিয়াস কমিটি’-র অনুমোদন ছাড়া মেইতেই বা অন্যান্য অ-উপজাতীয়রা এই ৯০% এলাকায় জমি কিনতে পারেন না। উপজাতীয় সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য সংবিধান উপজাতিভুক্ত জনগণকে এই সুরক্ষাকবচ দিয়েছে। কিন্তু বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক পাঠানো, শাসনযন্ত্রের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করে থাকা, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সবদিক থেকে এগিয়ে থাকা মেইতেই সম্প্রদায় গত দুই দশক ধরে এসটি মর্যাদার দাবি জানাচ্ছে, যাতে তারাও এই পার্বত্য এলাকায় জমি কিনতে পারে। ২০২২ সালে “ডাব্‌ল ইঞ্জিন” সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এই দাবি আরও বেশি করে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মণিপুর হাইকোর্ট মেইতেইদের এসটি তালিকাভুক্ত করার দাবিটা রাজ্য সরকারকে এক মাসের মধ্যে বিবেচনা করার নির্দেশ দেয়, বিরুদ্ধ বক্তব্যগুলোকে পাত্তা না দিয়ে। একাধিক বিশেষজ্ঞ এই রায়ের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক থংখোলাল হাওকিপ জানান যে একটা সম্প্রদায়কে এসটি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যে নৃতাত্ত্বিক শর্ত মেনে চলা দরকার সেটা হাইকোর্ট একেবারেই এড়িয়ে গেছে। আরেক বিশেষজ্ঞ খাম খান সুয়ান হাওসিং জানান যে মেইতেইরা যদি এসটি তালিকায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে সফল হয় তাহলে তারা ভারতের একমাত্র সম্প্রদায় হবেন যারা একাধারে এসটি, এসসি, ওবিসি, এবং ইডব্ল্যুএস সমস্ত বিভাগের সুবিধাই অর্জন করতে পারবেন! স্বাভাবিকভাবেই, ‘অল ট্রাইবাল্‌স স্টুডেন্ট্‌স ইউনিয়ন মণিপুর’ (এটিএসইউএম) এই রায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলে যে রাজ্যের বিজেপি সরকারের অঙ্গুলিলেহনেই হাইকোর্ট এমন রায় দিয়েছে। এটিএসইউএম-এর পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটা ‘আদিবাসী সংহতি মিছিল’ সংগঠিত করা হয়, এবং অতঃপর বিক্ষিপ্ত হিংসাত্মক ঘটনার মধ্যে দিয়ে গোটা রাজ্য জুড়ে শুরু হয় মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী হানাহানি।

উপত্যকার মেইতেই এবং পাহাড়ের নাগা-কুকি জনজাতির মধ্যে যে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য আছে সেটাকে কোনো শাসকদলই নিজেদের স্বার্থে দূর করতে চায়নি। বর্তমান বিজেপি-শাসিত সরকার এই বৈষম্যের প্রশ্নকে আড়াল করতে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে – রাজ্যের ১০% জায়গায় মেইতেই-রা কেন আবদ্ধ থাকবেন সেই প্রশ্নটাকে। অথচ, দুই তৃতীয়াংশ নির্বাচনী এলাকা থেকে শুরু করে ভালো শিক্ষা কেন্দ্র, চিকিৎসা কেন্দ্র, প্রশাসনিক কার্যালয় ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্তটাই কিন্তু রাজ্যের এই ১০% ইম্ফল উপত্যকা এলাকাতেই আবদ্ধ। উল্টোদিকে জলের অভাব থেকে শুরু করে সামান্য চিকিৎসা পরিষেবার অভাব – এগুলোই হলো ৯০% পার্বত্য এলাকার বাস্তবতা। এছাড়া, বাজেটের মধ্যে পার্বত্য এলাকার উন্নয়নের জন্য অসামঞ্জস্যভাবে কম টাকা বরাদ্দ রাখা, আবার তার মধ্যে থেকেও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতামন্ত্রীদের পকেট ভরা ইত্যাদি তো আছেই। পরিণামে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন পার্বত্য উপজাতির জনগণ, তথাকথিত স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও। এই বৈষম্যকে দশকের পর দশক ধরে শাসকশ্রেণী লালন করেছে। আর ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, স্বাভাবিকভাবে শাসকশ্রেণীর মধ্যে, গোটা শাসনযন্ত্রের মধ্যে মেইতেই সম্প্রদায়ের উপস্থিতিই বেশি। তাই এই বৈষম্যের দায় তাদেরও। অথচ আজকে সেই প্রভাবশালী সম্প্রদায়ই নাকি বৈষম্যের সমস্ত প্রশ্নকে সরাসরি এড়িয়ে গিয়ে ডাব্‌ল ইঞ্জিন বিজেপি সরকারের উস্কানিতে উগ্র মেইতেই জাতীয়তাবাদের স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজেদের এসটি মর্যাদার দাবিতে গলা ফাটাচ্ছে। নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকারের তত্ত্বাবধানে এই জাতি-সঙ্ঘর্ষকে কয়েক জায়গায় হিন্দু বনাম খ্রিষ্টান দাঙ্গার রূপও দেওয়া হয়েছে, যাতে গোদি মিডিয়ার সাহায্যে দেশবাসীর কাছে “হিন্দু খতরেমে হ্যায়” তত্ত্ব পরিবেশন করা যায়।

উপত্যকার শিক্ষিত মেইতেই জনগণ ও বিজেপি সরকার অবশ্য এই হানাহানির জন্য একতরফাভাবে দায়ী করেছে কুকি সম্প্রদায়কে। তাদের বক্তব্য হলো মুখ্যমন্ত্রী বিরেন সিং কুকিদের অবৈধ পোস্ত চাষে সক্রিয়ভাবে বাধা দিয়েছেন, মায়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ আটকানোর ব্যবস্থা নিয়েছেন বলেই নাকি কুকিরা পরিকল্পিতভাবে এই গণ্ডগোল পাকিয়েছে। এপ্রসঙ্গে, উল্লেখ করতে হয় যে প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গৃহযুদ্ধের কবলে পরে সেখানকার চিন প্রদেশ থেকে হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষ ভারতের মিজোরাম আর মণিপুর রাজ্যে পালিয়ে আসে, কারণ তাঁরা জাতিগতভাবে মিজো ও কুকি-জো উপজাতির মানুষদের আত্মীয়। যদিও ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (সমগ্র মানবজাতি একই পরিবার) বুলি আওড়ানো ভারত সরকার তাদের ‘উদ্বাস্তু’ হিসাবে বিবেচনা করেনি, বা এই সমস্যার কোনো মানবিক সমাধানের কথা ভাবেনি। উল্টে তাদেরকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে দেখিয়ে ভবিষ্যতে এই রাজ্যেও এনআরসি বিতর্ক উস্কে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে রেখেছে। ইতিমধ্যেই, সাম্প্রতিক অশান্তি শুরু হওয়ার এক মাস আগেই, এই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে এনআরসি-র দাবিতে মণিপুরের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল। বিজেপি সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী কুকিরা এবং সাথে মায়ানমার থেকে আসা পোস্ত চাষে পারদর্শী এই অনুপ্রবেশকারীরা পার্বত্য এলাকায় অবৈধভাবে পোস্ত চাষ করছে, এবং তার ফলে ড্রাগের একটা বিরাট ব্যবসা সেখানে রমরমিয়ে চলছে। একথা ঠিক যে অনেক গরিব কুকি জনতার কাছে পেট চালানোর অন্য কোনো উপায় না থাকায় তারা পোস্ত চাষের সহজ রাস্তা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু মূল প্রশ্নগুলো হলো – এই বিরাট মাত্রায় পোস্ত চাষের পিছনে লগ্নি হওয়া পুঁজির মালিক কারা? ড্রাগ ব্যবসার মাথায় কারা বসে আছে? রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রশ্রয় ছাড়া এগুলো কি সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে একতরফাভাবে নিরাপত্তা বাহিনী পাঠিয়ে নির্বিচারে কুকিদের চাষজমি নষ্ট করে দেওয়া, পোস্ত চাষ ও ড্রাগ ব্যবসার সাথে শুধুমাত্র কুকি সম্প্রদায়কে যুক্ত করে তাদেরকেই একমাত্র ভিলেন হিসাবে দেখিয়ে সত্য বিকৃত ও আড়াল করা, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা লাগিয়ে সাধারণ গরিব কুকি জনগণের মধ্যে ঢালাও ধরপাকড় চালানো, কুকিরা সংরক্ষিত বন ধ্বংস করে সেখানে গ্রাম তৈরি করছে এই অজুহাতে গ্রাম থেকে তাদের উচ্ছেদ করা – এগুলোর কোনোটাই আসলে সমস্যার সমাধান নয়; বরং সংখ্যাগুরুর পেশীশক্তির প্রদর্শন, যেমনটা বিজেপি সরকার গোটা দেশেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর সাথে করে চলেছে। সাম্প্রতিক অশান্তি শুরুর একমাস আগে থেকেই যখন কুকি নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অসংখ্য কুকি পরিবারের বলপূর্বক উচ্ছেদের প্রতিবাদ জানানো হচ্ছিল তখন সেই প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করতে বিরেন সিং সরকারের তরফে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নাগরিকদের প্রতিবাদ জানানোর বৈধ অধিকারকে অস্বীকার করার জন্য তিনি তার সাথে কুকি সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর যোগাযোগের তত্ত্ব প্রচার করেন, যেমনটা মধ্যভারতের উচ্ছেদ-বিরোধী গণ-সংগ্রামকে অস্বীকার করতে শাসকশ্রেণী মাওবাদী-যোগের তত্ত্ব ফেরি করে। এমনকি, এই অজুহাতে ইম্ফল, দিল্লী ও কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেকার ত্রিপাক্ষিক শান্তি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন মুখ্যমন্ত্রী বিরেন সিং। তাই আজকের এই পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

পোস্ত চাষ নিয়ে এত কথা হলেও, পাম তেল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়ে অবশ্য কারো মুখে খুব একটা কথা শোনা যাচ্ছে না। আগামী পাঁচ বছরে ১১০০০ কোটি টাকা খরচ করে মণিপুরে পাম তেল উৎপাদনের ফন্দি এঁটেছে শাসকশ্রেণী, যে খরচের ৮০% বহন করবে কেন্দ্রীয় সরকার, আর বাকিটা রাজ্য সরকার। এই প্রকল্পের জন্য রাজ্যের উপত্যকা পার্বত্য এলাকা মিলিয়ে ৬-টা জেলা জুড়ে প্রায় ৬৬৬৫২ হেক্টর জমিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কাদের মালিকানায় চলবে এই উৎপাদন? এত বড় একটা প্রোজেক্ট যে স্থানীয় চাষিরা চালাতে পারবেন না সেকথা বলাই বাহুল্য। ফলে, গোদরেজ অ্যাগ্রোভেট, রুচি সোয়া ইন্ডাস্ট্রি, পতঞ্জলি গ্রুপ ইত্যাদি বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজিপতিদের স্বার্থেই এই প্রকল্প। আর গোটা প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতামন্ত্রী, ঠিকাদার, আমলা, কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীদের ভিক্ষার ঝুলিতেও যে কিছু মালকড়ি আসবে সেটা সকলেরই জানা। এছাড়াও, পাম তেল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণ জল, যার একটা ভয়ানক প্রভাব পড়বে মাটির উর্বরতার উপর, সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর। ফলে বন ধ্বংসের পথ আরও সহজ হবে। এসব নিয়ে অবশ্য কারো মাথাব্যাথা নেই। এমনিতেও বন ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করার জন্য সম্প্রতি বন সংরক্ষণ (সংযোজন) আইন পাশ হয়েছে লোকসভায়, যার উদ্দেশ্য হলো সংরক্ষণের রক্ষাকবচগুলোকে শিথিল করে বনজমিকে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নের যুক্তি দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সীমানা থেকে ১০০ কিমি এলাকাকে বন সংরক্ষণের রক্ষাকবচ থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এই বিলে। এই শর্তে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো মণিপুরেরও মায়ানমার সীমান্ত-সংলগ্ন একটা বড় অংশ ভবিষ্যতে বড় পুঁজিপতিদের খেলার মাঠে পরিণত হতে চলেছে। আর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে এগিয়ে থাকা মেইতেই জনগণ এবং শাসকশ্রেনীর হাতের পুতুল দুর্নীতিগ্রস্ত কুকি নেতামন্ত্রীরা সেই খেলায় অংশ নিতে চাইবেন না তা কি হয়?

সুতরাং, মেইতেইদের এসটি মর্যাদার দাবি উস্কে দেওয়া, মায়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর অজুহাতে বিভিন্ন গ্রামে উচ্ছেদ অভিযান চালানো, এবং মেইতেই-কুকি জাতি-সঙ্ঘর্ষ থামানোর জন্য কোনোরকম সদর্থক ভূমিকা না নিয়ে সেটাকে উল্টে প্রশ্রয় দিয়ে চলা – এগুলো প্রতিটাই হয়ে চলেছে আপাত-অদৃশ্য এই কর্পোরেট শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে। ‘মেইতেই লিপুন’ ও ‘আরামবাই তেঙ্গোল’-এর মতো মেইতেই কট্টরপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রভাবাধীন এলাকায় কুকিদের কচুকাটা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভরা ভাষণ দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ আকার দিয়ে চলেছে। বিপরীতে মেইতেই সশস্ত্র গুন্ডাদল, রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের গা-জোয়ারি ইত্যাদির সাথে অসম লড়াইয়ে লিপ্ত কুকিদের সশস্ত্র গোষ্ঠী; নিরীহ মেইতেই জনগণকেও তাদের প্রতিশোধ স্পৃহার শিকার হতে হচ্ছে। কর্পোরেট-প্রেমী সরকার-প্রশাসনের মদত ছাড়া এজিনিস সম্ভব নয়, যেমনটা এদেশে আমরা আগেও বহুবার দেখেছি। বিরেন সিং, যিনি ২০১৬ সালে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপি-তে যুক্ত হন এবং ২০২২ সাল থেকে মণিপুর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বিতর্কিত কথাবার্তার মাধ্যমে আগুনে আরও বেশি করে ঘি ঢেলেছেন। শুধু তাই নয়, যেসমস্ত সাংবাদিক বা সমাজকর্মী সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে কথা বলছেন, তাঁদেরকেও প্রশাসনের হাতে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে; ইন্ডিজেনাস ট্রাইবাল লিডার্স ফোরাম-এর ট্যুইটার অ্যাকাউন্ট অন্যায়ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে যেখানে পান থেকে চুন খসলেই গোদি-মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেখানে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজেপি সরকারের এই ব্যর্থতা, বা বলা ভালো ইচ্ছাকৃত নীরবতা নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে। যেটুকু খবর হচ্ছে সেখানে এটাকে হয় বিজেপি-র প্রচার অনুযায়ী দেখানো হচ্ছে, বা শুধুমাত্র দুটো জাতির সঙ্ঘর্ষ হিসাবে দেখানো হচ্ছে; বৈষম্য ও কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নগুলোকে আড়ালে রেখে।

সবশেষে, দুটো কথা না বললেই নয়। প্রথম কথা হলো, আজ পরিস্থিতির চরম সীমায় কুকিরা যখন ‘আলাদা প্রশাসন’-এর দাবি জানাচ্ছে তখন উপত্যকায় মণিপুরের আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার দাবিতে স্লোগান উঠছে “এক মণিপুর, এক প্রশাসন”। ইতিহাসের এ কি বিদ্রূপ! কংগ্রেসের এঁকে দেওয়া আঞ্চলিক সংহতি রক্ষায় যে স্লোগান উঠছে তার সাথে বিজেপি-র অন্যান্য স্লোগানের কি আশ্চর্য মিল! আসামে যেভাবে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে এনআরসি-কেন্দ্রিক উন্মত্ততা তৈরি করা হয়েছে এখানেও মেইতেই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় উস্কে দেওয়ার সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জাতি-হিংসাকে প্রশ্রয় দিয়ে, নিরীহ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে, এলাকায় আরএসএস-বিজেপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ কর্পোরেট শ্রেণীর আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো খেলারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে মণিপুর রাজ্যে। ভুলে গেলে চলবে না যে এই বিজেপি সরকার জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কর্পোরেট শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মধ্য-ভারতে আদিবাসী জনগণের উপর দ্রোন থেকে বোমা-বর্ষণ করতে বা কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সংবিধান বদলে দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। আর দ্বিতীয় কথাটা হলো, মণিপুরের এই অরাজক পরিস্থিতিতে সবথেকে বেশি লাভ হচ্ছে ভারত রাষ্ট্রের। এমনিতেই ভারত রাষ্ট্র নিজের স্বার্থমতো উত্তর-পূর্বের জনজাতিগুলোর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। তার বাইরেও একটা অন্য বিকল্প হিসাবে মণিপুরের যেসমস্ত জনগণ একদিন ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, ভারতীয় সৈন্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, এমনকি সশস্ত্র লড়াই পর্যন্ত সংগঠিত করেছিলেন, আজ তাঁরা নিজেদের মধ্যেই লড়াইয়ে লিপ্ত। মণিপুরের যে মায়েরা একদিন নগ্ন হয়ে ‘ইন্ডিয়ান আর্মি রেপ আস’ লেখা ব্যানার ধরে থাংজাম মনোরামা-র ধর্ষণ-খুনের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, আজ ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তাঁরাই ‘শত্রু’ উপজাতির সাথে লড়াইতে ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার কথা বলছেন, প্ররোচনা দিচ্ছেন। মণিপুরের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এ এক লজ্জাজনক অধ্যায়। আজকের এই জ্বলন্ত মণিপুর ভবিষ্যতে আধিপত্যবাদী ভারত রাষ্ট্রের কাছে উত্তর-পূর্বের জনজাতিগুলোকে শাসন করার একটা মডেল হিসাবেই বিবেচিত হবে।


লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৩ সংখ্যায়


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://www.newslaundry.com/2023/07/21/crisis-entirely-of-our-own-making-sanjib-baruah-on-china-role-in-manipur-violence-and-more [Retrieved On: 02/08/2023]

Leave a Reply