লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
মে ২০২৫ সংখ্যায়
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র, যা একসময় মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত সন্তানদের কাছে “ড্রিম সেক্টর” হিসেবে বিবেচিত হত, আজ এই শিল্পের কর্মীদের জন্য একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ভারতের আইটি সার্ভিস কোম্পানিগুলি থেকে আগামী ছয় মাসে ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার কর্মচারী ছাঁটাই হবার সম্ভাবনা রয়েছে। টেকনিকালার ইন্ডিয়ার আকস্মিক বন্ধ হওয়া থেকে শুরু করে ইনফোসিসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফ্রেশারদের বেতন না দিয়ে ছাঁটাই – প্রতিটি ঘটনা এই সেক্টরের ক্রমাগত অবনতির চিত্র তুলে ধরে। মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুতে টেকনিকালার ইন্ডিয়ার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে যেখানে ২,৫০০-এরও বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। ইনফোসিসের ৩২৯ জন ফ্রেশারকে ২.৫ বছর অপেক্ষা করানোর পর ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ঘটনা আইটি সেক্টরে শ্রমিক অধিকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবহেলাকে তুলে ধরেছে। এই পদক্ষেপগুলি শুধুমাত্র শ্রম আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ মূর্তির মতো কর্পোরেট প্রভুদের শোষণমূলক এজেন্ডাকেও উন্মোচিত করে, যিনি সম্প্রতি ৭০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহের পক্ষে মত দিয়েছেন, অথচ তার নিজস্ব কোম্পানিই বেকারত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি বর্তমান কর্মীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
শিল্প বিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ধারা ২৫-ও অনুযায়ী সরকারি অনুমতি ছাড়াই টেকনিকালার ইন্ডিয়ার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন, ফেব্রুয়ারির বেতনও তারা পাননি, যা তাদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। একইভাবে, ইনফোসিসের প্রশিক্ষণকালে উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও ফ্রেশারদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত কর্মী ব্যবস্থাপনায় একটি নির্মম দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে।
নারায়ণ মূর্তির মতো কর্পোরেট মালিকরা যখন দীর্ঘ কর্মঘণ্টার পক্ষে প্রচার করছেন, তখন আইটি কর্মীদের বাস্তব অবস্থা ইতিমধ্যেই ভয়াবহ। ভারতের অর্ধেকেরও বেশি টেক পেশাদার সপ্তাহে গড়ে ৫২.৫ ঘণ্টা কাজ করেন, যা জাতীয় গড় ৪৭.৭ ঘণ্টার থেকে অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত কাজের চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তার সাথে যুক্ত হয়ে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে, যেখানে ৪৩% কর্মী চাপ, মানসিক অবসাদ এবং শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন। মধ্যরাত পর্যন্ত অফিসে থাকা, সাপ্তাহিক ছুটির অনিশ্চয়তা নতুন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণ মূর্তির ৭০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহের দাবি শুধু অবাস্তবই নয়, বরং আধুনিক দাসপ্রথার সমতুল্য, যেখানে দাসদের জীবনধারণের অধিকারও দেওয়া হতো না। শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করে ও তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন থেকে আইটি সেক্টরের একমাত্র ফোকাস হলো মুনাফা সর্বাধিক করা – এটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ছাঁটাই এবং বর্ধিত কাজের চাপ একটি বিষাক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে, কর্মীদের তাদের পরিশ্রম ও সহ্যের চরম সীমায় ঠেলে দেয়, অন্যদিকে কর্পোরেট মালিকরা সুপার প্রফিট উপভোগ করেন।
ভারতের আইটি সেক্টরে স্থায়ী নিয়োগের বদলে কোম্পানিগুলি এখন ‘কন্ট্রাক্ট বেসিসে’ কম বেতনে কর্মী নিচ্ছে। ইনফোসিসের মতো কোম্পানিগুলি ফ্রেশারদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে শেষে ছাঁটাই করছে। অনেক কোম্পানি ২-৩ বছরের বাধ্যতামূলক সার্ভিস বন্ড চাপিয়ে দিচ্ছে, যা আইনত অবৈধ। যেখানে সরকার ও শ্রম দপ্তরগুলির উচিত এই ধরনের শোষণমূলক অনুশীলন থেকে কর্মীদের রক্ষা করতে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করা, কর্পোরেট লোভের উপর শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, অধিকার ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সেখানে ২০২০ সালের নতুন শ্রম কোড কোম্পানিগুলিকে আরও সহজে ছাঁটাই করার সুযোগ দিয়েছে। ইনফোসিস, টিসিএস-এর মতো বড় আইটি কোম্পানিগুলিকে কোনো শাস্তি না দেওয়া সরকারের দুর্বল অবস্থানকে উন্মোচন করে।
রাজ্যের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় পশ্চিমবঙ্গের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র -ও আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। রাজ্য সরকার ‘বাংলার আইটি হাব’ গঠনের স্বপ্ন দেখানো সত্ত্বেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সল্টলেক বা নিউটাউনের আইটি পার্কগুলির ফাঁকা চেয়ার, বেকার যুবকের দীর্ঘশ্বাস এবং দক্ষ পেশাদারের রাজ্যত্যাগ – এই হলো বাংলার আইটি ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান চিত্র। প্রতিবছর ১৫-২০% দক্ষ কর্মীরা উচ্চতর বেতন ও সুযোগ-সুবিধার খোঁজে ব্যাঙ্গালুরু, পুনে, হায়দ্রাবাদে পাড়ি দিচ্ছে। বিগত ৫ বছরে টিসিএস, ইনফোসিসের মতো সংস্থাগুলির ৩০% সিটিসি (কস্ট টু কম্পানি) হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় স্টার্টআপগুলি মাসিক ৮-১২ হাজার টাকায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করছে। ২০২৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজ্যের ৬৫% আইটি স্নাতক বেকার ।
ভারতের আইটি ক্ষেত্রে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা আসলে পুরো বিশ্বের আইটি শিল্পের সমস্যারই একটা ছবি।
আইটি ক্ষেত্র অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি, যা প্রকাশ পাচ্ছে ব্যাপক চাকরি ছাঁটাই (২০২৩ সালে ৩ লক্ষেরও বেশি চাকরি গেছে), মুনাফার হার কমে যাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগামহীন ব্যবহারের মাধ্যমে। গুগল, মেটা এবং অ্যাকসেনচারের মতো কোম্পানিগুলি রেকর্ড আয় করা সত্ত্বেও তাদের কর্মীবাহিনী ছাঁটাই করছে, কারণ জেনারেটিভ এআই টুলগুলি এন্ট্রি-লেভেল কোডিং এবং কাস্টমার সাপোর্টের কাজগুলো দখল করে নিচ্ছে। বাড়তি সুদের হার প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে, গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৪ সালে আইটি খরচ বৃদ্ধির হার মাত্র ৪.৩%। ডেলয়েট এর ২০২৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ৫২% আইটি কর্মী চাকরি ছাড়ার কথা ভাবছেন।
বিশ্বজুড়ে আইটি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠন অবশ্য প্রয়োজন। আইটি সেক্টরে ইউনিয়ন প্রয়োজন কর্মীদের অধিকার রক্ষা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং কাজের পরিবেশ উন্নত করতে, বিশেষত এমন একটি শিল্পে যেখানে অত্যধিক কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা ও অনৈতিক শ্রমিক ব্যবস্থাপনা আজ সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণ ছাঁটাই এবং AI-চালিত চাকরি হ্রাসের এই যুগে, ইউনিয়নগুলি চাকরির নিরাপত্তা, AI বাস্তবায়ন এবং চাকরি ছাড়ার যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের পক্ষে লড়াই করতে পারে, যা একটি ন্যায্য ও স্থিতিশীল তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীবাহিনী বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.financialexpress.com/india-news/chief-of-cruelty-corporate-greed-it-workers-union-slams-tcs-over-layoffs-of-12000-employees/3952230/ [Retrieved On: 12/10/2025]
