লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
কভার ফটো – Akhilesh Pandey/The Caravan
অগাস্ট ২০২৫ সংখ্যায়
এই পুঁজিবাদী দুনিয়ায় শ্রমিকশ্রেণীর ওপর নানান রকম দমন-পীড়নের অন্যতম হাতিয়ার বিপদগ্রস্ত শ্রমিক সুরক্ষা। যেমন – কয়লাখনিতে বিষাক্ত গ্যাসের প্রকোপে মারা যাওয়া, উঁচু বিল্ডিংয়ে জোগাড়ের কাজ করতে করতে পড়ে গিয়ে মারা যাওয়া, কারখানার যন্ত্রপাতি থেকে আঘাত পেয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হওয়া, বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়া, বিষাক্ত রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে আসা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সংক্রামক রোগের সংস্পর্শে আসা (যার বড় অংশ করোনাকালে দেখেছি আমরা) যেখানে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা চরম ভাবে বিঘ্নিত। দমকল-কর্মীদের ক্ষেত্রে আগুনের থেকে সুরক্ষার সবসময় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে জেলে, মধুসংগ্রহকারী শ্রমিকদের মৃত্যু হচ্ছে। আর কর্মক্ষেত্রে যৌন হিংসার শিকার মহিলা শ্রমিকদের তো সমস্ত জায়গায় প্রতিনিয়ত হতে হচ্ছে; স্বাস্থ্যকর্মী থেকে কারখানার শ্রমিক থেকে তথ্যপ্রযুক্তি থেকে গৃহপরিচারিকা, সব ক্ষেত্রেই। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা তো আছেই, যেমন কর্মক্ষেত্রে চূড়ান্ত কাজের চাপ থেকে সৃষ্টি হওয়া মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপ, অবসাদ রয়েছেই। যার ফলস্বরূপ আমরা সাম্প্রতিক অতীতে তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরে আত্মহত্যার খবরও পাচ্ছি। এর সাথে জড়িয়ে আচ্ছা শরীরের জৈবিক সাইকেল নষ্ট হয়ে যাওয়া, খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম থেকে উদ্ভূত সমস্যাবলী।
সেরকমই একটি অত্যন্ত ভয়ংকর বিপদ হলো সিলিকোসিস। যেটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নির্মাণ শিল্পের শ্রমিকদের মধ্যে। দীর্ঘসময় ধরে প্রচন্ড ধুলোবালির সংস্পর্শে আসার ফলে ফুসফুসে এই রোগ বাসা বাঁধে।
সিলিকোসিসের কারণ অনেকগুলি। এক, সিলিকা ধুলোর সংস্পর্শে আসা। সিলিকোসিস রোগের প্রধান কারণ এটাই। এই ধুলো সাধারণত বালি, পাথর এবং কোয়ার্টজে পাওয়া যায়। নির্মাণ, খনন, পাথর ভাঙা, কাঁচ তৈরি, এবং সিরামিক শিল্পের মতো পেশায় যাঁরা কাজ করেন তাঁরা সিলিকা ধুলোর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিতে থাকেন। যখন এই সূক্ষ্ম কণাগুলি ফুসফুসে প্রবেশ করে, তখন তারা প্রদাহ এবং স্কারিং (ফাইব্রোসিস) সৃষ্টি করে, যা শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে। দুই, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাস-প্রশ্বাস। সিলিকা ধুলোর দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে সিলিকোসিস হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তিন, উচ্চ ঘনত্বের সিলিকা, যে পরিবেশে সিলিকা ধুলোর ঘনত্ব বেশি, সেখানে কাজ করলে সিলিকোসিস হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ে, যেমন যেকোনো নির্মাণ শিল্পের সাইট।
তিনটি প্রধান ধরণের সিলিকোসিস রয়েছে: তীব্র, ত্বরান্বিত, ক্রনিক। তীব্র সিলিকোসিস অল্প সময়ের মধ্যে উচ্চ ঘনত্বের সিলিকা সংস্পর্শে আসার কারণে হয়, যেখানে ত্বরান্বিত বা ক্রনিক সিলিকোসিস দীর্ঘ সময় ধরে কম ঘনত্বের সিলিকা সংস্পর্শে আসার কারণে হয়। ১৯৬১ সালের আদমশুমারির সময়, গুজরাটের নির্বাচিত কারুশিল্পের উপর বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে অ্যাগেটও ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “… এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধুলোর কণা নির্গত করে যা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিশ্বাস করা হয় যে শ্বাস নেওয়ার সময়, পাথরের গুঁড়ো ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং যক্ষ্মা সৃষ্টি করে।”
ভারতে যে রাজ্যগুলিতে সিলিকোসিসের আক্রমণ তীব্র তার মধ্যে অন্যতম হলো গুজরাত। গুজরাতে, বিভিন্ন ধরণের পেশা থেকে সিলিকোসিসের খবর পাওয়া যায়: অ্যাগেট পাথর শিল্প (খাম্বাট এবং জাম্বুসার), কোয়ার্টজ ক্রাশিং ইউনিট (গোধরা এবং বালাসিনোরে অবস্থিত, যার শিকার দাহোদ এবং ছোট উদেপুর জেলা, রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশ থেকে এসেছেন), কাচ তৈরি (বদোদরা এবং আনন্দ), কাচের খোদাই (রাজকোট), তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (গান্ধীনগর, আহমেদাবাদ এবং সিক্কা), অনুকরণ গহনা (রাজকোট), ময়দার কল (রাজকোট), ফাউন্ড্রি (আহমেদাবাদ, গান্ধীনগর, রাজকোট, জুনাগড়, পঞ্চমহল), পাথর খোদাই (ধ্রঙ্গধ্র), পাথর খনন (সুরেন্দ্রনগর), সিমেন্ট উৎপাদন (গির সোমনাথ), সিরামিক (সুরেন্দ্রনগর এবং মোরবি), অবাধ্য ইট তৈরি (ওয়াঙ্কানের), এবং নির্মাণ (মোরবি)। যাঁরা শ্রমিক নন, তাঁদের মধ্যেও এই রোগের উপস্থিতির খবর পাওয়া গেছে।
২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট-নিযুক্ত একটি কমিটি বিভিন্ন ফাউন্ড্রিতে সিলিকোসিসের ২৫টি ঘটনা চিহ্নিত করেছে। একটি জনস্বার্থ মামলার (পিআইএল ১১০/২০০৬) জবাবে, সুপ্রিম কোর্ট একটি কমিটি নিযুক্ত করে যারা ২০১৬ সালে ১৬৪টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিট পরিদর্শন করে। ফ্লাই অ্যাশ এবং সিমেন্টের ধুলো উভয় ক্ষেত্রেই সিলিকার উপস্থিতি খুঁজে পায় কমিটি এবং দুটি সিমেন্ট কারখানা থেকে দুটি সিলিকোসিসের ঘটনা নিশ্চিত করে।
সুরেন্দ্রনগর, ওয়াধওয়ান, হিম্মতনগর এবং আহমেদাবাদের সিরামিক ইউনিটগুলি থেকে কেস রিপোর্ট করা হয়েছে। গুজরাটের সিরামিক শিল্প কাদি, হিম্মতনগর, মোরবি, থান এবং ভদোদরা জেলায় কেন্দ্রীভূত। পিটিআরসি ২০১৮ সাল থেকে মোরবি এবং সুরেন্দ্রনগরে সক্রিয় রয়েছে এবং ১৮২টি কেস সনাক্ত করেছে, যার মধ্যে ৮০ জন মারা গেছে।
শুধুমাত্র নির্মাণ শিল্পেই থেমে থাকেনি। ময়দা কলগুলিতে এমেরি হুইল ব্যবহার করা হয় এবং পাথর সাজানোর সময় শ্রমিকরা সিলিকা ধুলোর সংস্পর্শে আসেন। মুম্বাইয়ের কেইএম হাসপাতালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে এই শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিসের ঘটনা ৩০ শতাংশ। আমরা রাজকোট থেকে দুটি মামলা রেকর্ড করেছি – উভয় শ্রমিকই মারা গেছেন। কাচের খোদাই সাধারণত ছোট, দুর্বল বায়ুচলাচলযুক্ত পিছনের ঘরে বালির ব্লাস্টিং ব্যবহার করে করা হয়।
সিলিকোসিস সম্পর্কিত একটি সরকারী নীতি আছে, তবে সেটা ওই নামেই। সরকারের সদিচ্ছার অভাব, পুঁজিবাদী মালিকপক্ষকে তোষণ ও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে রোগীরা এখনও ভোগান্তিতে পড়ছেন। আমাদের রাজ্য অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গেও তার ব্যতিক্রম নেই। বরং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ত্রুটি এতখানিই যে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৫৩ জন সিলিকোসিস রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে, মৃত সিলিকোসিস রোগীর উত্তরাধিকারী ৪ লক্ষ টাকা পাবেন। জীবিত থাকলে রোগ নির্ণয়ের পর্যায়ে তারা ২ লক্ষ টাকা পাবেন। পশ্চিমবঙ্গে এককালীন ক্ষতিপূরণ ছাড়া মাসিক পেনশন নেই। তাছাড়া, পশ্চিমবঙ্গ সরকার রোগীদের সিলিকোসিস সনাক্ত করার জন্য কোনও পরীক্ষা করে না। ফলস্বরূপ, মাত্র ৫৩ জন রোগী রয়েছেন।
বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠন এবং আক্রান্ত শ্রমিকদের পরিবারের বক্তব্য হল, বস্তুতঃ সারা দেশে কোনও রাজ্যই সিলিকোসিস রোগীদের রোগ নির্ণয় করছে না; পশ্চিমবঙ্গে কাজটি আরও ভয়াবহ। পশ্চিমবঙ্গে অনেক ঘোষিত রোগী মৃত বা জীবিত রোগী – কোনো হিসেবেই ক্ষতিপূরণ পাননি। হরিয়ানা বা রাজস্থানে একজন ব্যক্তিও পেনশন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাননি।
যেসব এলাকায় ধুলো-দূষণ ঘটে, সেখানে কোয়ার্টজ বা অন্যান্য পাথরের ক্রাশার ইউনিটের কোনও সংশোধন বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করা হয়নি, এবং পর্যায়ক্রমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামের কোনও ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ ক্রাশার ইউনিট অবৈধভাবে চলছে। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে, এমনকি রোগ নির্ণয় করা রোগীরাও জীবিত রোগীদের জন্য ৪০০০ টাকা এবং মৃত রোগীদের উত্তরাধিকারীদের জন্য ৩৫০০ টাকা পেনশন পাননি।
সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের দীর্ঘদিন ধরে প্রধান কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন চলছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো –
ন্যায্য ক্ষতিপূরণ: শ্রমিকরা যাতে তাদের অসুস্থতার কারণে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায়, তা নিশ্চিত করা। তার চিকিৎসার খরচ, হারানো আয়ের ক্ষতিপূরণ, এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক খরচ দিতে হবে। কোম্পানিকে, সরকারকে। সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকের চিকিৎসা চলাকালীন মাইনে কাটা বন্ধ করতে হবে।
উন্নত চিকিৎসা সুবিধা: শ্রমিকদের জন্য উন্নত মানের চিকিৎসা পরিষেবা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
নিরাপদ কাজের পরিবেশ: কর্মক্ষেত্রে সিলিকা ধুলোর সংস্পর্শ কমাতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেমন উন্নত বায়ুচলাচল ব্যবস্থা, সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ, এবং শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সিলিকোসিস এবং এর ঝুঁকি সম্পর্কে শ্রমিক এবং নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
পুনর্বাসন প্রকল্প: সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিস্তারিত পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করা, যা তাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুরক্ষায় সহায়তা করবে।
রাজনৈতিক স্বীকৃতি: সিলিকোসিসকে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এর সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করা। এবং তা না হলে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলা।
আইন প্রণয়ন: সিলিকোসিস প্রতিরোধ ও আক্রান্ত শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা। যেই সংস্থা শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবেনা তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় পদক্ষেপ নেওয়া, লাইসেন্স বাতিল করা, আইনের আওতায় আনা।
সংগঠিত প্রচেষ্টা: সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা এবং তাদের দাবিগুলি সরকারের কাছে তুলে ধরা। গণআন্দোলনে পথে নামা। এই বিষয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলির পাশাপাশি নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলিকেও এগিয়ে আসতে হবে আরও বেশি করে।
এই দাবিগুলি আদায়ের জন্য শ্রমিক সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। যার ফলে কিছু দাবিদাওয়া আদায় সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু আরো বৃহত্তর ও ব্যাপক গণআন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যাতে করে সরকার দ্রুত এই বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়। তবেই সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকরা তাদের অধিকার ফিরে পাবে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবে।
মূল প্রবন্ধ এবং কভার ফটো সৌজন্যে – https://pulitzercenter.org/stories/choking-death-silica-dust-indias-industries-killing-its-workers [Retrieved On: 21/10/2025]
