লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
অগাস্ট ২০২৫ সংখ্যায়
বর্তমানে দেশের একাধিক রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক ও সাধারণ বাঙালি মানুষের প্রতি যে বৈষম্য, হেনস্থা এবং নিপীড়নের অভিযোগ উঠছে, তা শুধু মানবিকতার প্রশ্নই নয়, ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোতেও এক বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি ওড়িশা, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লি, কর্ণাটক, ছত্তিশগড় প্রভৃতি রাজ্যে ঘটেছে একের পর এক ঘটনা, যেখানে বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, বিশেষত বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন বৈধ নাগরিককে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ অবধি করা হয়েছে।
ওড়িশায় ধরপাকড় ও পুলিশি হয়রানি
২০২৪ সালে বিজেপি ওড়িশা রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শত শত বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে পুলিশ আটক করে। অভিযোগ, এদের অনেকেই বৈধ আধার ও ভোটার কার্ড থাকা সত্ত্বেও গ্রেপ্তার হন। এমনকি তাঁদের মধ্যে কিছু লোককে বিনা বিচারে আটকে রাখার অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের হয়েছে। ওড়িশা থেকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসা শ্রমিকরা জানান, ভাষাগত ও জাতিগত ভিত্তিতে তাঁদের নিশানা করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে
হরিয়ানা ও দিল্লিতে পরিকল্পিত হয়রানি
হরিয়ানার গুরগাঁও অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের বিশেষভাবে নিশানা করা হচ্ছে। পরিচয় যাচাইয়ের নামে বিশেষ করে মুসলিম শ্রমিকদের আটক, বৈধ পরিচয়পত্র অস্বীকার এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমনকি অসম থেকে আসা বাংলাভাষী শ্রমিকদেরও একইভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দিল্লির বসন্ত কুঞ্জ এলাকায় বাঙালি শ্রমিকদের উচ্ছেদ, জল-বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া এবং পুলিশের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। চিত্তরঞ্জন পার্ক এলাকায় বাঙালি মাছ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদেরকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
রাজস্থানে “পুশব্যাক” এর অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি এসেছে রাজস্থান থেকে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের বৈধ নথিপত্রধারী নাগরিকদের বাংলাদেশে “পুশব্যাক” করার অভিযোগ উঠেছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের চূড়ান্ত লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কর্ণাটক ও ছত্তিশগড়েও বৈষম্যের শিকার
কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু ও ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করা বাংলাভাষী দৈনিক মজুররা জানান, তাঁদের আইডি চাওয়া হচ্ছে, অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অনেককে কাজ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এর ফলে বহু পরিবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
পরিকল্পিত অভিযানের অভিযোগ
সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস (CJP) নামক মানবাধিকার সংগঠনের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অভিযান, যেখানে বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের “বিদেশি” বলে অভিযুক্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-ও অভিযোগ করেছে, শত শত জাতিগত বাঙালি মুসলমানকে কোনও বিচার ছাড়াই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অসমে বিভিন্ন স্থানে রাস্তার ধারে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাসকারী মানুষদের, যাদের মধ্যে বাংলাভাষী মানুষরাও আছেন, তাদের ঝুপড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ভাবে কয়েক লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। অসমের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা-সহ বেশ কিছু বিজেপি নেতা বাঙালি-বিদ্বেষী হুমকি দিয়ে চলেছেন।
বাঙালিদের ওপর সারা দেশজুড়ে চলা এই আক্রমণের বিরুদ্ধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:
১. জাতীয় পর্যায়ে তদন্ত কমিশন গঠন করে ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। যেসব রাজনৈতিক নেতারা ভাষাগত জাতিগত উস্কানি ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
২. পরিযায়ী শ্রমিকদের রেজিস্ট্রেশন ও সুরক্ষা আইন আরও কড়া ও কার্যকর হোক।
৩. ভাষাগত সংবেদনশীলতা ও প্রশিক্ষণ স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে বাড়াতে হবে। আরএসএস-বিজেপির এক জাতি এক ভাষা এক দেশ নীতিকে বর্জন করে ভারতের ইতিহাসে সুদীর্ঘ সময়কাল ধরে যে জাতিগত ভাষাগত বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য রয়েছে, তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
৪. মানবাধিকার সংস্থাগুলির তদারকি ও হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. সাংবাদিকতা ও মিডিয়ার স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে যাতে এই ধরনের ঘটনাগুলো চাপা না পড়ে।
৬. পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং ব্যক্তিবর্গকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে বাঙালীদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
ভাষা, সংস্কৃতি বা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য বা হেনস্থা শুধু অসাংবিধানিকই নয়, অমানবিক। যে ভারত তার বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে গর্ব করে, সেই দেশের ভেতরেই যদি বিভিন্ন ভাষাভাষীদের বিরুদ্ধে, জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, খাদ্যাভ্যাসের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নিপীড়ন চলতে থাকে, তবে তা গোটা জাতির আত্মপরিচয়ের উপরই আঘাত হানে। এখনই সময়, সকলকে একযোগে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://cjp.org.in/a-targeted-campaign-the-orchestrated-crackdown-on-bengali-migrants-and-the-rising-pushback-from-courts-bengal-government-and-civil-society/ [Retrieved On: 10/08/2025]
