লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
মে ২০২৫ সংখ্যায়
ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে আমাদের রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ হয়েছে, কিছু জায়গায় সেটা হিংসাত্মক আকার ধারণ করেছে, কিছু মানুষের প্রাণও গেছে। স্বাভাবিকভাবেই, সেই নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের মধ্যে চাপানউতর শুরু হয়ে গেছে। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল নিজেদের অপদার্থতা লোকাতে বহিরাগত তত্ত্ব খাড়া করেছে, অর্থাৎ বিহার-ঝাড়খণ্ড থেকে বহিরাগতরা এসে নাকি গণ্ডগোল পাকিয়েছে। উল্টোদিকে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি-র কাছে এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ। দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে তারা রাজ্যে যে দাঙ্গা-পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে সেই কাজে তারা অল্প হলেও সাফল্যের মুখ দেখতে পাচ্ছে। একাধিক দুর্নীতির পাঁকে নিমজ্জিত শাসকদল তৃণমূল ইডি, সিবিআই-এর কোপ থেকে নিজের পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বাঁচাতে বিজেপিকে আরও সুযোগ করে দিচ্ছে। এদিকে রাজ্যবাসীর মধ্যে বিভ্রান্তি প্রচুর! দুদিন আগে পর্যন্ত যাঁরা চাকরিহারাদের কান্নার ভিডিও শেয়ার করছিলেন, আজ তাঁরা “হিন্দু খতরেমে হ্যায়” ন্যারেটিভে গা ভাসিয়েছেন। সাধারণ মানুষদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি। ওয়াকফ কী? এই ওয়াকফ সংশোধনী কতটা ঠিক, কতটা ভুল এই নিয়ে অনেক গম্ভীর আলোচনা চলছে চারিদিকে। কিন্তু বিষয়টা কি শুধুই ওয়াকফ? গোটা দেশ জুড়ে সংগঠিতভাবে সংখ্যালঘু নিপীড়ন চলছে, বিশেষ করে যেভাবে মুসলিম-বিরোধী একটা ঘৃণার বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে। এগুলোর বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুদের মধ্যে তথাকথিত উদারবাদী অংশটা পর্যাপ্ত আওয়াজ না তোলায় দুইপক্ষের দাঙ্গাবাজ মৌলবাদীরা ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করছে, ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মেহনতি মানুষদের ঐক্যবদ্ধ লড়াইতেও। কিছু ঘটনার দিকে তাকানো যাক।
সম্প্রতি “ছাভা” সিনেমাটা মুক্তি পাওয়ার পর আওরাঙ্গজেব নিয়ে বিতর্ক, এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে কীভাবে অশান্তি সৃষ্টি হয় সেটা আমরা দেখেছি। অশান্তির মূলে ছিল সেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দল, যাদের দাবি ছিল ৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো আওরাঙ্গজেবের কবর “হিন্দু ভারত” থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে! এদিকে গত ৩০-এ মার্চ এই রাজ্যেই বিড় জেলার আরধা মাসলা গ্রামে মক্কা মসজিদে রাত ২:৩০-এর সময় জেলাটিন স্টিক বিস্ফোরণ ঘটায় বিজয় রাম গাভানে (বয়স ২২) এবং শ্রীরাম অশোক সাগড়ে (বয়স ২৪) নামে দুই হিন্দু যুবক। আগেরদিন সন্ধেবেলা একদল মুসলিম যুবকের সাথে গাভানে ও সাগড়ে-র তর্কবিতর্ক হয়, সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ চলে, এফআইআর দাখিল হয়। সেই সময় গাভানে বলে, “এখানে মসজিদ কেন তৈরি হয়েছে? এটাকে ভেঙে দে, নয়তো আমরাই ভেঙে দেব।” একহাতে জেলাটিন স্টিক ও আরেক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে, সম্ভবত বিস্ফোরণ ঘটানোর আগে রেকর্ড করা “বীর” গাভানে-র একটা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরালও হয়। গাভানে-র নিশ্চয়ই এই প্রত্যশাই ছিল যে বিলকিস বানো-র ধর্ষকদের মতো তাকেও এই “বীরত্বপূর্ণ” কাজের জন্য ফুলমালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হবে। এখনও না হলেও, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সত্যিই হবে!
এবার উত্তরপ্রদেশের দিকে তাকানো যাক। এই বছর সেখানে হোলি উদযাপনের নতুন চমক ছিল মসজিদগুলোকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া। প্রায় ২০০-টা মসজিদকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় যাতে হিন্দুরা “অবাধে” রং খেলতে পারেন। ভক্তির জোয়ারে অন্ধ না হয়ে গেলে গত কয়েক বছর ধরে আমাদের একটা প্যাটার্ন চোখে পড়া উচিত। সেটা হলো রাম নবমী বা হনুমান জয়ন্তী উদযাপনের সময় তীব্র আওয়াজে ডিজে বাজিয়ে (বর্তমান পরিভাষা অনুযায়ী H-Pop বা হিন্দুত্ব-পপ গান) মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার মধ্যে দিয়ে মিছিল করে যাওয়া, যাওয়ার সময় মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে প্ররোচনামূলক স্লোগান, গালিগালাজ করা, মাতৃভূমি “রক্ষার” জন্য হিন্দুদেরকে সশস্ত্রভাবে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানানো, ইত্যাদি। আর সেই প্ররোচনায় পা দিয়ে স্থানীয় কোনও মুসলিম যুবক পাল্টা বাকবিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি, মারামারিতে জড়ালে তাদের বিরুদ্ধেই পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এটা দেশের একাধিক রাজ্যে, বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে, প্রতি বছরের একটা ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সেখানে উত্তরপ্রদেশে হোলি উদযাপনের জন্য মুসলিমদের ধর্মীয় স্থানকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়ার এই ঘটনাটা হলো নতুন সংযোজন, এবং আগামী দিনে অন্যান্য রাজ্যেও এই মডেল অনুসরণ করা হবে বলেই ধারণা!
এই প্রসঙ্গে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হওয়া “Routes of Wrath: Weaponising Religious Processions” নামে ১৭৪-পাতার একটা রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই রিপোর্টে দেখানো হয়েছে যে কীভাবে রাম নবমী আর হনুমান জয়ন্তীর মিছিলের অজুহাতে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে গোটা দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় মসজিদ ও মুসলিমদের দোকানপাটের উপর আক্রমণ করা হয়েছিল। ২০১৪, ২০১৬, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের রাম নবমীর মিছিলেও বিক্ষিপ্তভাবে সাম্প্রদায়িক অশান্তি হয়েছিল বটে, কিন্তু এই রিপোর্টে দেখানো হয়েছে যে কীভাবে ২০২২ সালের এপ্রিলে সংগঠিতভাবে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করা হয়, মসজিদের সামনে প্ররোচনামূলক মুসলিম-বিরোধী স্লোগান ও ডিজে গানের মাধ্যমে। মধ্যপ্রদেশ, দিল্লী, গুজরাট, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড, মহারাষ্ট্র, গোয়া, পশ্চিমবঙ্গ সমেত গোটা দেশে অন্ততপক্ষে ১০০ জন আহত হয় এই অশান্তির পরিণামে। এই বছর ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে অশান্তি শুরু হওয়ার আগেও একই রকম অশান্তি ঘটেছে আমাদের রাজ্যে। কিন্তু আমরা যেন প্রতি বছরই নতুন করে অবাক হচ্ছি। বৃহত্তর নাগরিক সমাজ এই নিয়ে যথাযথ সচেতনতা তৈরি করতে লাগাতার ব্যর্থ হচ্ছে।
হেট স্পিচ বা ঘৃণামূলক ভাষণ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আমরা সকলেই অবগত যে কীভাবে খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত “মঙ্গলসূত্র”, “মাটন”, “মুঘল” করে বেরিয়েছেন গতবছর লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে। আমরা বরং কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই। ইন্ডিয়া হেট ল্যাব-এর (আইএইচএল) সমীক্ষা বলছে ২০২৩ সালে ৬৬৮-টা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে ঘৃণামূলক ভাষণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১১৬৫-টা; অর্থাৎ ৭৪.৪ শতাংশ বৃদ্ধি। বলাই বাহুল্য এর মধ্যে ১১৪৫-টাই, অর্থাৎ ৯৮.৫ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে। ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন বা বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের মতো আন্তর্জাতিক বিষয়কে কেন্দ্র করেও মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো একতরফা ঘৃণামূলক প্রচার চালিয়ে গেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। এই ঘৃণামূলক ভাষণগুলোর ২/৩ ভাগের উৎসই হলো বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলো, যার শীর্ষস্থানে আছে উত্তর প্রদেশ (২৪২-টা), দ্বিতীয় স্থানে মহারাষ্ট্র (২১০-টা) এবং তৃতীয় স্থানে (৯৮-টা)। অর্থাৎ এই ভাষণগুলোর ৪৭ শতাংশই এসেছে এই তিন রাজ্য থেকে। সামনের সারিতে থাকা অন্যান্য রাজ্যগুলোও হয় বিজেপি-শাসিত, নয়তো বিজেপি-র কোনও জোটসঙ্গী দলের শাসনাধীন। কট্টর দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক নেতা বা হিন্দু-ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে হিংসার ডাক দিচ্ছেন, মুসলিম ব্যবসাগুলোর অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দিচ্ছেন; এছাড়া মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় স্থানের উপর বুলডোজার চালানোর ঘটনা তো চলছেই, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করেই চলছে।
আর মুসলিম-বিরোধী এই হিংসাত্মক ভাষণগুলোকে প্রচার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, হোয়াট্সঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্মগুলো। এই ব্যাপারে শীর্ষস্থানে রয়েছে ফেসবুক। আইএইচএল-এর ওই রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছর সাধারণ নির্বাচনের সময় এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে বিজেপি নেতাদের দেওয়া সংখ্যালঘু-বিরোধী ২৬৬-টা ঘৃণামূলক ভাষণ ইউটিউব, ফেসবুক এবং এক্স-এ তাদের ও তাদের পার্টির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভ স্ট্রিম করা হয়। বলা যায় যে, নির্দ্দিষ্ট করে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে দেওয়া এই ঘৃণামূলক ভাষণগুলোকে নিজেদের প্ল্যাটফর্মের নিয়মাবলী অনুযায়ী ফ্ল্যাগ করে সেগুলোর প্রচার রোধ করার ক্ষেত্রে তারা চোখ বন্ধ করে রেখেছে। এমনকি এখনও, এতদিন পরেও, অন্ততপক্ষে ৬-ই ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত ৯৩.৫% ভিডিওই বহাল তবিয়তে সেই অ্যাকাউন্টগুলোতে রেখে দেওয়া আছে, সরানো হয়নি। দুঃখের বিষয় হলো উদারপন্থী মনোভাবাপন্ন সচেতন মানুষদের একটা বড় অংশ রাস্তার আন্দোলনের বদলে এই পক্ষপাতদুষ্ট সমাজমাধ্যমকেই বেছে নিয়েছেন লড়াইয়ের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে!
শুধু গুন্ডাগিরি আর হিংসাত্মক ভাষণই নয়, সরকারি নীতি প্রণয়ন করেও মুসলিম সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করে চলা হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশে নিয়ম করা হয়েছে যে রেস্তোরাঁগুলোতে সমস্ত কর্মীদের নাম প্রকাশ্যে লেখা থাকতে হবে। সরকারপক্ষের যুক্তি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিধি যাতে পালিত হয় সেটা নিশ্চিত করতে নাকি এই নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। তবে সকলেই বোঝেন যে এর আসল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম বিক্রেতা, কর্মী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজে চিহ্নিত করা এবং তারপর তাদেরকে ব্যবসার দিক থেকে কোণঠাসা করা। ধর্ম ও জাতপাতে জরাজীর্ণ “বিশ্বগুরু” ভারতের বাস্তবতাটা আসলে এটাই যে সেখানে মুসলিম মালিকানাধীন বা মুসলিম-কর্মী আছে এমন রেস্তোরাঁতে খেতে যেতে হিন্দুরা দুইবার ভাবেন, আর সেই ন্যক্কারজনক ব্যাধিটাকেই আরও প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে এই নীতির মাধ্যমে। এই নতুন নিয়মের কারণে ঝামেলার ভয়ে অনেক রেস্তোরাঁর হিন্দু মালিকরা মুসলিম কর্মীদের তাড়িয়ে দিয়েছে, অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী নিজেদের ব্যবসাটাই বন্ধ করে দিয়ে উপার্জনের অন্য পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
আর এই জঘন্য নীতির পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য আরও ন্যক্কারজনক একটা প্রচার চালানো হয়েছে যে – রেস্তোরাঁতে মুসলিম কর্মীরা নাকি খাবারে থুতু, পানীয়তে মূত্র মিশিয়ে দেন! এই প্রচারের তীব্রতা এতটাই বেশি যে মহারাষ্ট্র বিজেপি সরকার একটা নতুন ওয়েব পোর্টাল চালু করেছে যার মাধ্যমে ছাগল ও মুরগীর মাংস সমেত ‘ঝটকা’ মাংস বিক্রীতে আগ্রহী হিন্দুদেরকে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। যাতে এই ‘ঝটকা’ সার্টিফিকেশান দেখে একজন হিন্দু ক্রেতা সহজেই একজন হিন্দু মাংস বিক্রেতাকে চিনে নিতে পারে। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে মুসলিমদের ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক বয়কটের একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছে সরকার। এই ওয়েব পোর্টালে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবেই “থুতু জিহাদ”-এর উল্লেখ করে এই ‘ঝটকা’ সার্টিফিকেশানের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে! এছাড়া, এইবার কুম্ভ মেলার যে বিরাট আয়োজন করা হয়েছিল তাতে ওই ১৪৪ বছরের গালগপ্পো বাদ দিলেও অন্য একটা বিশেষত্ব ছিল মুসলিম ব্যাবসায়ীদের বয়কট; যাতে তারা দোকান, স্টল ইত্যাদি না দিতে পারে। কারণ খুঁজতে গেলে পাবেন সেই একই অপপ্রচার – মুসলিমরা খাবারে থুতু মিশিয়ে দেয়! এদিকে বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী সঙ্গমের জলে যে বর্জ্য পদার্থের রমরমা উপস্থিতি ধরা পড়েছে – তাতে কারও বিশেষ সমস্যা নেই। হয়তো সেই বর্জ্য “হিন্দু” বর্জ্য, তাই আপত্তি নেই!
মজার ব্যাপার, এমনকি হিমাচল প্রদেশের কংগ্রেস সরকারও হিন্দু ভোট টানতে রেস্তোরাঁগুলোতে সমস্ত কর্মীদের নাম প্রকাশ্যে লেখার এই বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করেছে। শুধু তাই নয়, হিমাচল প্রদেশের “হিন্দু জাগরণ মঞ্চ”-র সদস্যরা তো প্রকাশ্যেই সংখ্যালঘু মুসলিমদের হুমকি দিচ্ছে, বলছে মুসলিমদের উপস্থিতি নাকি “দেবভূমি”-কে অপবিত্র করছে এবং তাই তারা যেন শীঘ্রই রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। খোদ কংগ্রেস বিধায়ককেই হিমাচলে “অবৈধ অভিবাসন” থেকে শুরু করে “লাভ জিহাদ” পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চেঁচামেচি করতে শোনা যায়, যেগুলো সাধারণতঃ বিজেপি-র প্রোপাগান্ডা বিষয় হিসেবেই পরিচিত। গতবছর সেপ্টেম্বর মাসে সিমলা-র সানজাউলি মসজিদকে ঘিরে সমস্যা তৈরি হলে “বিশ্ব হিন্দু পরিষদ”-এর মতো কট্টর দক্ষিণপন্থি সংগঠনের ডাকা মিছিল মসজিদের সামনে এসে “হনুমান চলিশা” পাঠ করে এবং চিরাচরিতভাবে প্ররোচনামূলক স্লোগান দেয়। মান্ডি শহরেও একই ঘটনা দেখা যায়। শুধু হিমাচল-ই নয়, কর্ণাটকের কংগ্রেস সরকারও আলাদা কিছু নয়। বিগত কয়েক মাসে মার্কিন মদতপুষ্ট যুদ্ধবাজ ইজরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতার পক্ষে আওয়াজ উঠিয়ে বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন ছাত্র ও গণসংগঠনের সদস্যরা একাধিকবার পুলিশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন। অবস্থা এমনই যে প্যালেস্তাইনের পতাকা দেখলেই কর্ণাটকের পুলিশ ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো আচরণ করছে। “মহব্বত-কা দুকান” ও ইত্যাদি বড় বড় বুকনি শুনতেই ভালো লাগে। বাস্তবে ভোট বড় বালাই!
এতকিছুর পরেও যে অপপ্রচারটা মূলধারার সংবাদমাধ্যম নির্লজ্জভাবে চালিয়ে যায় সেটা হলো “হিন্দু খতরেমে হ্যায়” এবং অবিজেপি রাজ্যগুলোতে নাকি দেদার মুসলিম তোষণ চলে। অথচ মুসলিম সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক ছবির দিকে তাকালেই এই গল্পের ফানুসটা ফেটে যায়। বিভিন্ন সরকারি সমীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে তৈরি “India Discrimination Report 2022” অনুযায়ী ২০১৯-২০ সালে শহরাঞ্চলে পনেরো ও তার বেশি বয়সী মুসলিমদের মধ্যে নিয়মিত বেতন পাওয়া যায় এমন কাজের সাথে যুক্তদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫.৬ শতাংশ, যে সংখ্যাটা অ-মুসলিমদের ক্ষেত্রে ছিল ২৩.৩ শতাংশ। এই রিপোর্ট অনুযায়ী ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে এর কারণ হলো ধর্মীয় বৈষম্য, যেটা ২০০৪-০৫ সালে ছিল ৫৯.৩ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের পর বছর ধরে চাকরিক্ষেত্রে ধর্মীয় বৈষম্য আরও বেড়েছে। উপার্জনের ক্ষেত্রেও বৈষম্য বর্তমান। নিয়মিত চাকরির সাথে যুক্ত অ-মুসলিমরা মুসলিমদের তুলনায় ৪৯ শতাংশ বেশি উপার্জন করেন। স্ব-উপার্জনের ক্ষেত্রেও অ-মুসলিমদের উপার্জন মুসলিমদের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। কোভিডের সময় প্রথম তিন মাসে বেকারত্ব এক ঝটকায় সবথেকে বেশি বৃদ্ধি পায় মুসলিমদের মধ্যে – ১৭ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে বেতনভোগী কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানোর পরিমাণ ১১.৮ থেকে ৪০.৯ শতাংশ পর্যন্ত ঘোরাফেরা করে। সেই সময়ে উপার্জনের ঘাটতির হিসেবেও ১৩ শতাংশ ঘাটতি সমেত এগিয়ে ছিল মুসলিমরা, যেখানে বাকিদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ছিল ৯ শতাংশ।
দুই বছর আগের স্পেক্ট ফাউন্ডেশান-এর একটা অডিট রিপোর্টের কথাও ধরা যাক। দেশের মুসলিম অধ্যুষিত ১০-টা জেলায়, যেখানে মুসলিমদের উপস্থিতি প্রায় ৫২ শতাংশ, সেখানে সমীক্ষা চালিয়ে এই রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়। এই জেলাগুলোর মধ্যে আছে বিহারের আরারিয়া, পূর্ণিয়া, কিষাণগঞ্জ, কাটিহার, আসামের ধুবরি, কোকরাঝাড়, উত্তরপ্রদেশের শ্রাভাস্তি, বলরামপুর, পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ। এই রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় এই জেলাগুলোতে মুসলিমরা জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাগুলো থেকে বেশি বঞ্চিত। ফলে “মুসলিম তোষণের” যে অজুহাত বারবার বিজেপি দিয়ে থাকে সেটা যে কতটা ভিত্তিহীন তা প্রমাণ হয়ে যায়। বিহারের জেলাগুলোর ক্ষেত্রে স্বাক্ষরতার হার জাতীয় গড়ের থেকে কম, স্কুলগুলোতে পড়ুয়া-শিক্ষক অনুপাত জাতীয় গড়ের থেকে বেশি। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বণ্টনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈষম্য। যেমন, বিহারের এই চারটে গ্রামই কম আয়সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও “প্রধান মন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনা” প্রকল্পের উপভোক্তাদের মধ্যে মাত্র ৩১.২ শতাংশ হলো মুসলিম, যা সেখানে তাদের জনসংখ্যার গড় অনুপাতের তুলনায় ১৭.৫ শতাংশ কম। উত্তরপ্রদেশের শ্রাভাস্তির দিকে তাকালে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে অপপ্রচারটাও ধরা পড়ে যায়। ২০০১-১১ সালের মধ্যে শ্রাভাস্তিতে ডিকেডাল পপুলেশান গ্রোথের (ডিপিজি) পরিমাণ ছিল -৫.০২ শতাংশ; অর্থাৎ বৃদ্ধি তো পায়ই নি, উল্টে আগের দশকের তুলনায় ৩২.২৩ শতাংশ কমেছে। বলরামপুরের ক্ষেত্রে এটা সামান্য বৃদ্ধি পেলেও সেটা অন্যান্য জেলাগুলোর তুলনায় ছিল নগণ্য। বলরামপুর ও শ্রাভাস্তিতে স্বাক্ষরতার হার যথাক্রমে ৪৯.৫১ শতাংশ ও ৩৭.৮৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের (৫৭.২৫ শতাংশ) তুলনায় কম। স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও শ্রাভাস্তির অবস্থা রাজ্যের বাকি জেলাগুলোর তুলনায় অনেকটাই খারাপ। আসামের ক্ষেত্রে কোকরাঝাড় ও ধুবরি – দুটো জেলাতেই কার্যকরী লোয়ার প্রাইমারী স্কুলের সংখ্যা কমেছে, জেলায় পর্যাপ্ত উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নেই, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দশাও বেহাল। পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদের ক্ষেত্রে বিজেপি বরাবর প্রচার চালিয়ে এসেছে যে এই দুই জেলায় মুসলিমদের সংখ্যাধিক্যের কারণ নাকি প্রতিবেশী বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ। কিন্তু এই দুই জেলার ঋণাত্মক ডিপিজি প্রমাণ করে যে ওগুলো বিজেপির অপপ্রচার ছাড়া কিছুই নয়। দুই জেলাতেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অবস্থা অত্যন্ত রুগ্ন। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই রিপোর্টের স্পষ্ট মূল্যায়ন, যেখানে বলা হয়েছে, “মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণ একটা বৃহত্তর নিপীড়নমূলক প্রক্রিয়ার অংশ। যদি একটা সম্প্রদায়কে পরিকল্পিতভাবে অনুন্নত অবস্থায় রাখা হয় এবং তাদের সামাজিক কল্যাণের জন্য গৃহীত ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ও প্রতিহিংসার সঙ্গে বাধাগ্রস্ত করা হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”
অতএব, নতুন ভারতে হিন্দুরা যে কী ভীষণ খতরায় আছে এবং মুসলিম তোষণ যে কী ভীষণ পরিমাণে চলছে তার একটা সামগ্রিক ছবি পাওয়া গেল! এহেন পরিস্থিতিতে বর্তমানের ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে প্রতিবাদটা, বা অতীতে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনটাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা চলে না। এগুলো ওই “বৃহত্তর নিপীড়নমূলক প্রক্রিয়ার”-ই প্রতিক্রিয়া। তবে শাসকশ্রেণী বরাবরই চেয়ে এসেছে যাতে এই প্রতিক্রিয়াগুলো সঠিক খাতে প্রবাহিত না হয়। অতএব সময়ের দাবি হলো প্রতিটা চলমান ও আসন্ন গণআন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। ভারতে এখন যে রাষ্ট্রব্যবস্থা চলছে সেটাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন “নির্বাচনী স্বৈরশাসন”। কদিন পর হয়তো নির্বাচনের নাটকটুকুও আর থাকবে না। ততদিন এভাবেই ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটিয়ে নির্বাচনী স্বৈরশাসন নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবে। এমতাবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে এই নির্বাচনী স্বৈরশাসনকে পরাস্ত করার কথা ভাবার মানে হলো মূর্খের স্বর্গে বাস করা। শক্তিশালী গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://sabrangindia.in/in-ups-mosque-coverings-a-new-chapter-from-the-hindutva-playbook-unfolds/ [Retrieved On: 12/07/2025]
