বাংলার নোংরা জাতিবাদের গোপন কথা

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য


গত ১৬ই এপ্রিল ২০২৫ তারিখে Outlook পত্রিকায় এই প্রবন্ধটা প্রকাশিত হয়।
বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করে, লেখকের অনুমতি নিয়ে আমরা প্রবন্ধটার বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করলাম।

মূল লেখা https://www.outlookindia.com/national/bengals-dirty-casteist-secrets
কভার ফটো সৌজন্যে – সন্দীপন চ্যাটার্জ্জী, আউটলুক

দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সৌমেন দে দাবি জানাল যে – চামাররা হিন্দু নয়। এই যুবকের বয়স কুড়ির কোঠায়। বেশ উত্তেজিতই মনে হলো তাকে। সে নিজে একজন কায়স্থ। সৌমেনের অভিযোগ – তাদের শিব মন্দিরে চামার জাতির মানুষকে প্রবেশ করতে ও তাদের দেবতার পুজো করতে দেওয়ার অনুমতি দিয়ে প্রশাসন তাদের গ্রামের বহু পুরনো ঐতিহ্যের পবিত্রতাকে নষ্ট করেছে।

চামারদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণে তাদের আপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সৌমেন বলল, “ওদের পূর্বপুরুষরা মৃত গরুর চামড়া ছাড়াত। শুধু মুসলিমরাই মৃত গরু নিয়ে কারবার করে। একজন হিন্দু কখনো গরুর দুধ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করে না।” কায়স্থদের যে ভিড়টা তার চারপাশে জড়ো হয়েছিল তারা সবাই সমর্থনে মাথা নাড়ল।

এপ্রিলের শুরুতে গরম ও আর্দ্র এক সন্ধ্যার ঘটনা। কলকাতা থেকে প্রায় ১৭০ কিমি উত্তরে, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বৈরামপুর গ্রামের পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ। গাছের পাতাগুলো সেখানে যেমন নিশ্চল, তেমনি পুকুরের জলও স্থির। কায়স্থদের মধ্যে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। তারা বাংলার তিনটে উচ্চবর্ণের মধ্যে একটা, ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যের পাশাপাশি। বৈরামপুরে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। চামাররা, যাদের ‘মুচি’ বলেও ডাকা হয়, তারা একটা তফসিলিভুক্ত জাতি (এসসি) গোষ্ঠী, যাদের এমনকি অন্য কিছু এসসি গোষ্ঠীও ‘নিচু’ হিসেবে গণ্য করে।

দিন পনেরো আগে, ২০শে মার্চ, প্রশাসন ওই এলাকায় পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে, যাতে চামার জাতির লোকেরা স্থানীয় শিব মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন—যেখানে এতদিন পর্যন্ত তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এখন, বাংলা ক্যালেন্ডারের শেষ মাস চৈত্রের (৮-১৪ এপ্রিল) শেষ সপ্তাহে গাজনের উৎসব যখন আসন্ন, তখন সেই উৎসবে চামার সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কায়স্থদের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কলকাতা হাইকোর্ট ১৭ই মার্চ পুলিশকে নির্দেশ দেয় যাতে বৈরামপুরে শিব মন্দিরে প্রবেশ করতে বা গাজনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে কেউ বাধা না পায়। এই নির্দেশের কারণে গ্রামের কায়স্থরা নিজেদের অসহায় এবং উপেক্ষিত মনে করছেন। গাজন হলো শিবের প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের উৎসব। গাজনে ‘ভক্ত’ বা ‘সন্ন্যাসী’ হওয়া মানে অনেক কষ্ট স্বীকার করা। এক সপ্তাহ নির্জন সাধুর মতো জীবন কাটাতে হয়, দিনে উপবাস করতে হয়, রাতে শুধু ফল খেতে হয়, মন্দির চত্বরে থাকতে হয়, নদী বা পুকুরে স্নান করতে হয়, আর সর্বোপরি—শরীরে হুক বিঁধিয়ে আত্ম-কষ্ট সহ্য করতে হয়। ‘অপবিত্র’ চামারদের সঙ্গে একই মন্দির চত্বরে থাকা এর সবটাকেই কলুষিত করে দেবে।

পুকুরের ধারে একটা বাঁশের মাচার ওপর খালি গায়ে বসে সন্ন্যাসী দত্ত নামে একজন মাঝবয়সী কৃষক বললেন, “তুমি মানুষের ধর থেকে মুণ্ডু আলাদা করে ফেলতে পারো, কিন্তু জাতিভেদ মুছে ফেলতে পারো না।” তাঁর চারপাশে জড়ো হওয়া কায়স্থদের ভিড়, যেখানে পুরুষ ও মহিলা সকলেই আছেন, তাঁর কথায় একমত। তিনি আরও বললেন, “আমরা আইন অমান্য করতে পারি না। কিন্তু প্রশাসন যদি জোর করে ওদের গাজনে নিয়ে আসে, তাহলে আমরা কায়স্থরা হয়তো দূরেই থাকব।”

যে শিব মন্দিরটা এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রে, সেটা কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে। একটা ছোট, খুবই সাধারণ আকৃতির মন্দির—চ্যাপ্টা ছাদের একটামাত্র ঘর, যেখানে দুই-তিন ডজন লোক জড়ো হতে পারবে। ঘরটার পূর্বদিকের দেওয়ালের সাথে লাগোয়া একটা একই রকম ঘর আছে, যেটা কালী মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কালী মন্দিরটা নিয়ে যদিও কোনও বিতর্ক নেই। চামাররা সেখানে যায় না। এই ছোটখাটো যমজ মন্দির দুটো থেকে কয়েকশো মিটার দূরে, মুচিদের পাড়ায় একটা কালী মন্দির রয়েছে, যেটা আকারে অনেক বড় এবং তার ত্রিকোণ চূড়াটা বিশাল একটা শিবমূর্তি দিয়ে সাজানো।

প্রতিটা পাড়াতেই একাধিক ছোট ছোট মন্দির রয়েছে। কিন্তু গোটা গ্রামে মাত্র একটাই শিব মন্দির আছে এবং সেখানেই গাজনের অনুষ্ঠানটা হয়। পুরো সপ্তাহ জুড়ে বোলান লোকগান পরিবেশিত হয়। ‘শ্মশান খেলা’ গাজনের অন্যতম মূল আকর্ষণ—যেখানে ভক্তরা ভূতের মতো সেজে মানুষের খুলি নিয়ে নাচে।

কালীগঞ্জ ব্লকের একটা হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম হলো এই বৈরামপুর। চারপাশের গ্রামগুলো মুসলিম-প্রধান। মাঝারি আকারের এই গ্রামে ১,৩৭৪ জন ভোটার আছে এবং গ্রামের মোট জনসংখ্যা ৪,০০০-এরও বেশি। কায়স্থ পরিবার আছে প্রায় ২৫০-টা, মুচি পরিবার প্রায় ২০০-টা, নমশূদ্র পরিবার প্রায় ৭০-টা এবং অন্যান্য জাতের প্রায় ২০-টার মতো পরিবার আছে। এই গ্রাম নবদ্বীপের ঠিক ৫০ কিমি উত্তরে অবস্থিত—সেই নবদ্বীপ, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পঞ্চাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব আধ্যাত্মিক নেতা ও সমাজ সংস্কারক চৈতন্য ‘মহাপ্রভু’, যিনি জাতভিত্তিক শ্রেণিবিভাগের তীব্র নিন্দা করেছিলেন এবং সেটার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন।

গ্রামে কায়স্থ এবং নমশূদ্র ও চামারের মতো তফসিলি জাতি সম্প্রদায়গুলোর জন্য আলাদা পাড়া আছে। নমশূদ্ররা হলেন পশ্চিমবঙ্গের তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী তফসিলি জাতি গোষ্ঠী। তাঁরা এই গ্রামের কায়স্থ ও চামার পাড়ার মাঝামাঝি অংশে থাকেন। শিব মন্দিরটা কায়স্থ ও নমশূদ্র পাড়ার সীমানায় অবস্থিত। গ্রামের মধ্যে নমশূদ্রদের (এখানে যাদের উপাধি মূলত হালদার) শিবলিঙ্গে পূজা করা ও গাজনে অংশগ্রহণ করার অনুমতি রয়েছে। নমশূদ্ররা মুচিদের (এখানে তাদের উপাধি দাস, আসলে রুইদাস) দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল।

দাস পাড়ায় কালী মন্দিরের উল্টো দিকে একটা ছোট কমিউনিটি হলে, সমাজিক ন্যায় মঞ্চ (SNM)-এর সমাজকর্মীরা চামার জাতের মানুষদের বোঝাচ্ছেন, কীভাবে উঁচু জাতের মানুষরা কয়েক শতক ধরে তাদেরকে ঠকিয়ে তাদের সমাজচ্যুত করাকে স্বাভাবিক ঘটনা বানিয়ে তুলেছে। কলকাতা হাইকোর্টে তাদের মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এই SNM, যা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা CPI(M)-এর একটা শাখা সংগঠন।

এই SNM-এর এক বক্তা বলছিলেন, “অস্পৃশ্যতা ও জাতভিত্তিক বৈষম্য হলো বেআইনি।” আশেপাশে যারা শুনছিলেন তাদের মধ্যে মূলত মুচি সম্প্রদায়ের লোকজন ছিলেন। তিনি তাদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। উনিশ শতকের মহারাষ্ট্রের সমাজ সংস্কারক জ্যোতিবা ও সাবিত্রীবাই ফুলে এবং বাংলার হরিচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে পরিচালিত জাত-বিরোধী সংগ্রামের কথা, বিশ শতকের জাত-বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু নেতৃত্ব বি. আর. আম্বেদকর ও ই. ভি. রামাসামি পেরিয়ার—প্রমুখদের কথা তিনি তাদের বলছিলেন।

আশেপাশে জড়ো হওয়া মানুষদেরকে উদ্দেশ্য করে এসএনএম-এর নদীয়া জেলা শাখার প্রধান কাল্যাণ গুপ্ত বলছিলেন – “ওরা যেভাবেই তোমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করুক না কেন, যারা গাজনে অংশ নিতে চাও, অবশ্যই অংশ নেবে। প্রশাসনকে আমরা চাপ দিয়ে রাখব, যাতে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে। ভুলে যেও না, আদালতের রায় তোমাদের পক্ষে আছে।”

দলিত জনসংখ্যার নিরিখে ভারতের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের পরেই দ্বিতীয় স্থানে আসছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ, যা ঐতিহ্যগতভাবে জাতভিত্তিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার অভিশাপ থেকে অনেকটাই মুক্ত বলে পরিচিত ছিল। প্রকাশ্যে জাতবিদ্বেষের প্রদর্শন এখানে কমই দেখা যায়, যার কৃতিত্ব বর্তায় চৈতন্য মহাপ্রভুর নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন, ‘বাংলার নবজাগরণ’-এর প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, উনিশ শতাব্দীতে হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্ব দলিতদের সামাজিক আন্দোলন, বিশ শতকের বাম আন্দোলন ও আরও অন্যান্য ঘটনাক্রমের উপর।

বামপন্থীরা বিশ্বাস করতেন যে শ্রেণিভিত্তিক সংগ্রামের মাধ্যমেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটিয়ে উন্নত করা সম্ভব। তারা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, ১৯৮০ সালে দুজন বামপন্থী সাংসদ—জ্যোতির্ময় বসু ও গীতা মুখার্জি—মণ্ডল কমিশনের সামনে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে জাতভেদ অপ্রাসঙ্গিক এবং অতীতের বিষয়। পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলেও দেখা যাবে যে ভারতের তফসিলি জাতির মোট জনসংখ্যার এক-দশমাংশ পশ্চিমবঙ্গে ব্যাস করা সত্ত্বেও, দেশে গত কয়েক বছরে জাতভিত্তিক বৈষম্য ও নির্যাতনের যতগুলো মামলা হয়েছে, তার মধ্যে প্রতি ৫০০-টার মধ্যে মাত্র ১-টা মামলা পশ্চিমবঙ্গের। স্পষ্টতই, বৈষম্য এখানে প্রকাশ্যে হয় না। যদিও, বিয়ের পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনগুলোই জাতগত পরিচয়ের গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।

অস্পৃশ্যতা অনুশীলন করার খবর বারবার প্রকাশ পেয়েছে, যেমন একবিংশ শতকের শুরুতেই করা প্রতীচী ট্রাস্টের একটা সমীক্ষায়। তবে সেগুলোকে সাধারণত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়েছে। এমনকি CPI(M)-ও SNM তৈরী করে ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর। কিন্তু ২০২৫-এর এই বসন্তকাল যেন পশ্চিমবঙ্গের অনেক জাতভিত্তিক গোপন সত্যের পর্দা ফাঁস করে দিয়েছে।

পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার গিধগ্রাম গ্রামে শিবরাত্রি (২৪ ফেব্রুয়ারি) উপলক্ষে গিধেশ্বর শিবমন্দিরে প্রবেশের অধিকার নিয়ে মুচি সম্প্রদায়ের আন্দোলন একের পর এক প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত করেছে। প্রশাসনের আশ্বাস সত্ত্বেও উঁচু জাতের লোকজন মুচিদের মন্দিরে ঢুকতে দেয়নি। পরবর্তী দুই সপ্তাহে অন্তত দু’বার দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এই খবর পার্শ্ববর্তী নদীয়া জেলার বৈরামপুর গ্রামের বাসিন্দাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। অবশেষে ১২ই মার্চ গিধগ্রামে ও ২০শে মার্চ বৈরামপুরে মুচি পরিবারগুলো মন্দিরে প্রবেশ করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও অনেক গ্রাম থেকেই মুচি সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের পুজোর অধিকার দাবি করতে শুরু করে—যেমন বিল্লেশ্বর, গঙ্গাটিকুরি, ঝামটপুর, নিরোল, আগরডাঙ্গা, ধানডালসা, রসুই, কাসুটিয়া, কেউগুড়ি, দত্তবাটি, সীতাহাটী, দত্তবাটিয়া, নলিয়াপুর, বালুটিয়া এবং বাহারান গ্রাম, যেগুলো সবই পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম এলাকার অন্তর্গত। এছাড়া, পূর্ব বর্ধমান জেলার বর্ধমান ১ ব্লকের ভিটাগ্রাম, কাটোয়ার চন্দ্রপুর, আউশগ্রাম ব্লকের আউশগ্রাম, ভাতারের নাসিগ্রাম; মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুরের এরেরা এবং সালার এলাকার সিমুলিয়া ও জলসুটি; এবং বাঁকুড়ার ইন্দাসের বামোনিয়া থেকেও একই রকম ঘটনার খবর সামনে এসেছে।

৩৩ বছর বয়সী শিক্ষক ঋষি রাম প্রসাদ বলেন, “এখনও পর্যন্ত যেসব গ্রামে সাংবিধানিক অধিকারের দাবি জানিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে, সেগুলোতে মুচি বা চামার সম্প্রদায়ের প্রায় ১০০-টার মতো পরিবার আছে। যেসব গ্রামে তারা সংখ্যায় কম এবং আর্থিকভাবে দুর্বল, সেখানে তারা প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। তারা ভয় পায় যে উঁচু জাতের লোকজন তাদের সামাজিক বয়কটের ডাক দেবে, যারা তাদের জীবিকানির্বাহের মালিক।” তিনি এটাও বলেন যে, অস্পৃশ্যতার অনুশীলন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কলকাতা থেকে দূরে বিভিন্ন স্থানে এখনও প্রচলিত। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রবিদাসিয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক তিনি। এই সংগঠনটা মুচি-চামার সম্প্রদায়ের একটা ছাতাসংগঠন, যা সম্প্রদায়ের মানুষজনকে সংগঠিত করার কাজ করছে। যাদের উপাধি রবিদাস, রুইদাস, রুহিদাস, ঋষিদাস, বাইন, মাহালদার, চর্মকার, চামার ও মুচি, তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে এই সংগঠন।

গিধগ্রাম ও বৈরামপুরে চামার সম্প্রদায়কে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে SNM ভূমিকা রাখলেও, অন্যান্য গ্রামগুলোর মধ্যে অধিকাংশতেই এই বিষয়টা তুলে ধরার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে চলেছে রবিদাসিয়া মহাসঙ্ঘ।

পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম ব্লকের বিল্লেশ্বর গ্রামে, লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ নামে একজন মাঝবয়সী কৃষক ঐতিহ্য আর আইনের মাঝখানে পড়ে গেছেন। কিছুটা অসন্তোষের সাথে তিনি বলেন, “প্রশাসন বলছে কাউকে পুজো বা উৎসবে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া বেআইনি, কিন্তু দাস সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়া তো শতাব্দীপ্রাচীন রীতি।” বিল্বনাথ মন্দিরের সেবায়ত (মন্দিরের ম্যানেজার) পরিবারের সদস্য উজ্জ্বল দয়াসিংহ ঐতিহ্যের উদাহরণ দিয়ে বলেন – গোয়ালা, কামার, ধোপা ও ছুতোর জাতের লোকেদের এই গ্রামে বসবাস করার অনুমতি নেই। কেন অনুমতি নেই সেটা বলতে না পারলেও, গ্রামের বাসিন্দারা এই জাতগুলোর কাউকে জমি বা সম্পত্তি বিক্রি না করার বিষয়ে একমত।

বিল্লেশ্বর গ্রামেও জাতভিত্তিক পাড়ার বিন্যাস দেখতে পাওয়া যায়। মুচিপাড়ায় একটা ছোট মন্দির রয়েছে, যেখানে তারা দূর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও অন্নপূর্ণার পূজা করেন। কালী ও মনসার জন্য সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো দুটো থানও আছে। কায়স্থ ও সদগোপ (জেনারেল কাস্ট) পাড়ায় ব্যক্তিগত ও নিজেদের সম্প্রদায়ের কালী ও জগদ্ধাত্রী মন্দির আছে। তবে গোটা গ্রামে কেবলমাত্র একটাই শিবমন্দির, যেখানে গ্রামের একমাত্র গাজন উৎসবটা অনুষ্ঠিত হয়। খেতমজুর সুভাস দাস জানালেন, “আমরা যে ওদের চেয়ে কম ধার্মিক তেমনটা নয়। কিন্তু গাজনের শেষে যখন শিবঠাকুরের বলদটাকে গোটা গ্রামে ঘোরানো হয়, তখন দাসপাড়াকে বাদ রাখা হয়।”

বিল্লেশ্বর থেকে প্রায় ১৩ কিমি উত্তরে গঙ্গাটিকুরি গ্রামে এখনো উত্তেজনা রয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক যাদব দাস, যিনি দাস সম্প্রদায়ের শিবমন্দিরে প্রবেশ ও গাজনে অংশগ্রহণের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি আশঙ্কা করছেন যে বিক্ষুব্ধ উঁচু জাতের লোকেরা তাঁর ওপর শারীরিক আক্রমণ চালাতে পারে। ইতিমধ্যে দাস সম্প্রদায়ের ২০০-র বেশি মানুষ স্থানীয় থানায় যাদব দাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।

যাদব বলেন, “আমাদের গ্রামে ব্রাহ্মণরা আমাদের অংশগ্রহণে আপত্তি করছে না; আপত্তি জানাছে চাষা সদগোপ সম্প্রদায়ের একটা অংশ।” এখানে ব্রাহ্মণ পরিবার কম, কিন্তু কৃষিকাজে যুক্ত সদগোপরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাটোয়া মহকুমার চন্দ্রপুর গ্রামে উঁচু জাতের অনেক বাসিন্দা হুমকি দিয়েছেন যে, প্রশাসন যদি জোর করে দাস পরিবারগুলোকে ধর্মরাজ মন্দিরে ঢোকার ও গাজনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়, তাহলে তারা নিজেরাই মন্দির বয়কট করবেন।

এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকগুলোর মধ্যে একটা হলো—প্রায় সবক্ষেত্রেই এটা শিব মন্দিরকে ঘিরেই ঘটে। স্থানীয়রা এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, অন্য দেবদেবীর মন্দির তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ, কারণ শুধু একটা মূর্তি তৈরি করালেই হয়। মুচি সম্প্রদায়, দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসার কারণে, তারা নিজেরাই নিজেদের পাড়ায় কালী, দূর্গা ও মনসার আলাদা মন্দির নির্মাণ করেছে। অনেক গ্রামে প্রতিটা জাতের পাড়ায় নিজস্ব দূর্গাপুজো হয়। কিন্তু শিব মন্দির নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয় শিবলিঙ্গের, যা মূর্তির মতো সহজলভ্য নয়। এই গ্রামগুলোর শিব মন্দিরগুলো যে তুলনামূলকভাবে পুরনো তার একটা কারণ এটা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, একটা গ্রামে মাত্র একটাই শিব মন্দির থাকে এবং সেখানেই গাজন অনুষ্ঠিত হয়।

লেখক ও দলিত-বিষয়ের গবেষক কুমার রানা বলেন, বাংলায় চামার ও ডোমরা হলো দলিতদের মধ্যে সবচেয়ে কম ক্ষমতাসম্পন্ন গোষ্ঠী, এবং বর্ধমান, হুগলি, বীরভূম ও বাঁকুড়ার মতো দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোর কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এখনো তাদেরকে এই ধরনের বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয়। এই বৈষম্য সাধারণত গ্রামস্তরে অর্থনৈতিক আধিপত্যের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, উত্তর ভারতে—বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে—শক্তিশালী আন্দোলনের মাধ্যমে চামার সম্প্রদায় সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে সংঘবদ্ধ হয়েছে, কিন্তু সেই আন্দোলনের ঢেউ কখনোই বাংলায় এসে পৌঁছায়নি। তবে তিনি মনে করেন, হয়তো সেই উত্তর ভারতের আন্দোলনগুলোর একটা প্রভাব অবশেষে বাংলায় পড়তে শুরু করেছে।

কিছু স্থানীয় মানুষ এই নতুন চেতনার পেছনে কাজসংক্রান্ত অভিবাসনকে কারণ হিসেবে দেখছেন। এইসব গ্রামে মুচি বা চামার সম্প্রদায়ের জনগণের অধিকাংশই খেতমজুর হিসেবে কাজ করেন, আর নতুন প্রজন্মের অনেকেই কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দিনমজুরির কাজে। এই অভিবাসী শ্রমিকরাই গত কয়েক বছরে বৈষম্যের বিষয়টা তুলে ধরেছেন। কোভিড-১৯ এর কারণে হওয়া লকডাউনের এক্ষেত্রে একটা ভালো ভূমিকা ছিল।

২০২১ সালে, এই অভিবাসী শ্রমিকদের অনেকেই গ্রামে আটকা পড়েন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ শিবরাত্রি ও গাজনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। গিধগ্রামে তারা প্রশাসনের কাছে একটা স্মারকলিপি জমা দেন, কিন্তু উঁচু জাতের লোকজনদের থেকে প্রবল বাধার কারণে বিষয়টা মীমাংসা করা যায়নি। বৈরামপুরে ২০২১ সালের শিবরাত্রি ও গাজনের আগে পঞ্চায়েত একটা জনসভা ডাকে, কিন্তু সেখানে কায়স্থরা ঐতিহ্য লঙ্ঘনের তীব্র বিরোধিতা করেন। বিল্লেশ্বরেও অভিজ্ঞতাও ছিল একই রকম। কিন্তু এই বছর গিধগ্রামে ঘটে যাওয়া সঙ্ঘর্ষটা যেন বাঁধ ভেঙে দিলো।

(প্রতিবেদন: পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া ও পূর্ব বর্ধমান থেকে)


মূল লেখা https://www.outlookindia.com/national/bengals-dirty-casteist-secrets [Retrieved On: 14/06/2025]
কভার ফটো সৌজন্যে – সন্দীপন চ্যাটার্জ্জী, আউটলুক

Leave a Reply