TheWire পত্রিকায় প্রকাশিত, মধুসূদন চ্যাটার্জী-র লেখা “A Silent Exodus: Bengal’s Education Crisis is Forcing Students Out of Schools and Into Labour” শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষের সারাংশ
গত দশকে ছাত্রভর্তি হ্রাস পাওয়া:
গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্রভর্তির হার উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা পরিষদের (WBCHSE) তথ্য অনুযায়ী, এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রায় ৫,০৯,৪৪৩ জন ছাত্রছাত্রী অংশ নিচ্ছে, যার মধ্যে ৫৫% ছাত্রী। অথচ গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৭,৫৫,৩২৪—অর্থাৎ এবছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২,৪৬,৩২৪ জন। এই হ্রাসের কারণ হিসেবে ভর্তি-বয়স সংক্রান্ত নীতির পরিবর্তনকে দায়ী করছে WBCHSE। ২০১৩ সালে রাজ্য সরকার নিয়ম করে যে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ন্যূনতম বয়স হতে হবে ছয় বছর। ফলে এই বছর যারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে, তারা আগের ব্যাচগুলোর তুলনায় এক বছর পরে স্কুলজীবনে প্রবেশ করেছে, যার ফলে এই পতন আপাতদৃষ্টিতে সাময়িক। তবে অনেক শিক্ষাবিদ এই ব্যাখার সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, ছাত্রছাত্রীদের ড্রপআউট রেটটাই এই হ্রাসের মূল কারণ। ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৬,৯৮,৬২৭ জন অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে ৫,৬৫,১২০ জন পাস করেছে। অথচ এবার উচ্চমাধ্যমিকে অংশ নিচ্ছে মাত্র ৫,০৯,৪৪৩ জন। তাহলে বাকি ৫৬,০০০ জন কোথায় গেল? ছাত্রীদের সংখ্যা বেড়েছে — এই দাবিও ভুল। ২০২৩ সালে ৩,২০,০০০ জন ছাত্রী মাধ্যমিক পাস করেছিল। অথচ এবার উচ্চমাধ্যমিকে অংশ নিচ্ছে মাত্র ২,৭৭,০০০ জন। তাহলে বাকি ছাত্রীরা কোথায়?
বিদ্যালয়গুলোর ক্রমাবনতি:
২০২০ সালের কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতির অনুসরণে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার চালু করে ‘বাংলা শিক্ষা’ পোর্টাল। এই নীতিমতে, একবার কোনো ছাত্র বা ছাত্রী প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হলে, উপস্থিতি যাই হোক না কেন, তাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উত্তীর্ণ করা হবে। অথচ ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত স্কুলে আনার জন্য কোনও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কিছু শিক্ষক নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে আনার চেষ্টা করছেন। আগে গ্রাম শিক্ষা কমিটি (VEC) সক্রিয়ভাবে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার নজরদারি করত, কিন্তু এখন তা বাতিল হয়েছে। গত ১৪ বছর ধরে উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির নির্বাচন হয়নি, বরং সরকার মনোনীত সদস্যদের দিয়েই পরিচালনা হচ্ছে—যা শাসকদল ঘনিষ্ঠদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে অভিযোগ উঠছে। ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী আদর্শ শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩০। ২০০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে এটি ছিল ১:৩৫, কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে এখন তা বেড়ে হয়েছে ১:৭০। ২০১৮ সালে রাজ্য সরকার বহু মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত করলেও, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করেনি। এর ফলে বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্কুলেই বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব স্কুলে এখনো বিজ্ঞান বিভাগ চালু আছে, সেখানেও মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক রয়েছেন, এবং ল্যাব সহকারী নেই। অনেকেই পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, কারণ প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তা মিলছে না।
বিদ্যালয় বন্ধ ও ছাত্রছাত্রী ড্রপআউটের হার:
ঝাড়গ্রাম জেলায় শিক্ষক সংকটের কারণে ৩২টি উচ্চবিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে গেছে। স্থানীয় কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকে শ্রমিক হিসেবে অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছে, আর বহু কিশোরী বাধ্য হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে করতে। সরকার বাংলা শিক্ষা পোর্টালে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেখাচ্ছে যে ড্রপআউটের হার নেই। বাস্তবে অনেক স্কুলে মাত্র এক-দুজন শিক্ষক ও খুব অল্পসংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিয়ে চলছে। যেমন—আয়োধ্যা হিলসের তেলিয়াভাসা জুনিয়র হাই স্কুল গত ১৪ বছর ধরে মাত্র একজন শিক্ষক নিয়ে চলছে। অন্যদিকে, মুসলিম-প্রধান এলাকার পুনিসোল বোর্ড হাই স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩,০০০-এর বেশি, কিন্তু শিক্ষক মাত্র ২৬ জন। ফলে শ্রেণিভেদে নির্দিষ্ট দিনে ক্লাস হয়। বর্তমানে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ৩,৯৮,১৫০টি শিক্ষকমণ্ডলী ও অশিক্ষক কর্মী পদের শূন্যতা রয়েছে। রাজ্যে শিক্ষক সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি:
২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগ করা হয়। এর আগে, ২০১৭ সালে প্রাথমিক স্তরে ২০,০০০-এর বেশি শিক্ষক নিয়োগ পান। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর, বহু প্রার্থী অভিযোগ তোলেন যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে—যার ফলে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হন। এই অভিযোগের পর কলকাতা হাই কোর্ট সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। তদন্তে বিশাল দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে, যার সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা ছিল প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে ২০ কোটি টাকা নগদ উদ্ধার, যার ফলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও গ্রেফতার করা হয়েছে একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে। অনেকের মতে, এটি স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারি। ফলে, অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার বর্তমান অবস্থা:
পশ্চিমবঙ্গের ৬১৪টি মাদ্রাসায় বর্তমানে প্রায় ১০,০০০টি শিক্ষক ও অশিক্ষক পদের শূন্যতা রয়েছে। বহু বছর ধরে কোনও নতুন নিয়োগ হয়নি। শিক্ষক ও কর্মচারীর অভাবে অনেক মাদ্রাসার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। সংখ্যালঘু দপ্তরকে বারবার জানানো সত্ত্বেও সরকার কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি। দশ বছর আগে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে সরকার ১০,০০০ অনুদানবিহীন মাদ্রাসাকে অনুমোদন দেবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ২৩৫টি মাদ্রাসা অনুমোদিত হয়েছে। নতুনভাবে অনুমোদিত এসব মাদ্রাসায় ২,৩৫০ জন শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা মাসে মাত্র ৬,০০০ টাকা বেতন পান। এই সামান্য ভাতার অনুমোদনের দাবিতে আন্দোলনের সময় তাঁদের একাধিকবার পুলিশের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
ছাত্রাবাস বন্ধ ও পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার হার বৃদ্ধি:
বিশেষ করে জঙ্গলমহলের অন্তর্গত বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বহু দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা আগে ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করত। আগে সরকার সরাসরি স্কুলের অ্যাকাউন্টে ছাত্রাবাস খরচ পাঠাত, কিন্তু কয়েক বছর আগে সেই পদ্ধতি বদলে টাকা সরাসরি ছাত্রদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো শুরু হয়। এই ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হওয়ায় এখন অধিকাংশ ছাত্রাবাস বন্ধ হয়ে গেছে বলে। ফলে বহু ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। শুধু বাঁকুড়া জেলাতেই ২০৯টি ছাত্রাবাসের মধ্যে ১৭৩টি ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
ছাত্রী সংখ্যা হ্রাস ও আরএসএস-ঘনিষ্ঠ স্কুলের প্রসার:
কন্যাশ্রী প্রকল্পে অষ্টম শ্রেণি থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত ছাত্রীদের বছরে ১,০০০ টাকা এবং ১৮ বছর পর্যন্ত অবিবাহিত থাকলে এককালীন ২৫,০০০ টাকা দেওয়া হয়। তবে চলতি বছরে এই প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে ১,৩৮৪.৫৬ কোটি টাকা থেকে ৮১৬.৩১ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই বাজেট ছাত্রী সংখ্যার হ্রাসকে প্রতিফলিত করে। শহর ও গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব এবং গত চার বছর ধরে MGNREGA প্রকল্প বাস্তবায়নে খামতি থাকার কারণে বহু পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। রাজ্য সরকারের নজরদারিতে থাকা কর্মশ্রী প্রকল্পেও এবারে বাজেটে কোনও বরাদ্দ হয়নি। ফলে বহু ছাত্রী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। বর্তমানে রাজ্যে ড্রপআউটের হার ১৮.৭৫%, এবং পশ্চিমবঙ্গ শিশু বিবাহের হারেও শীর্ষে। এই প্রেক্ষাপটে, রাজ্যে বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রসার ঘটছে, বিশেষ করে জঙ্গলমহলে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ স্কুলগুলির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যেগুলিকে তৃণমূল সরকার অনুমোদনও দিচ্ছে।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://thewire.in/education/a-silent-exodus-bengals-education-crisis-is-forcing-students-out-of-schools-and-into-labour [Retrieved On: 26/03/2025]
