পাহাড়ের মতন ভারী যে মৃত্যু – ড: জি এন সাইবাবা স্মরণে

লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার
জানুয়ারি ২০২৫ সংখ্যায়

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে কোনো এক মামলার সময়ে বিচারক বলেছিলেন, “প্রজাতান্ত্রিক ভারতরাষ্ট্র তার সন্তানকে হত্যা করতে পারে না”। কিন্তু বাস্তবে ভারতরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নরবধ সংঘটিত করে চলেছে। দেশের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারকের আবেদন ভারত রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণীর কাছে মূল্যহীন বলে প্রমাণ হচ্ছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ডক্টর গোকারাকোন্ডা নাগা সাইবাবা (জি এন সাইবাবা) তার এক সংযোজন মাত্র। ড: জি এন সাইবাবা [১৯৬৭ – অক্টোবর ২০২৪] ছিলেন একজন “আমূল রাজনৈতিক (Radical) পরিবর্তনের” পক্ষপাত করা ব্যক্তি। নিপীড়িত মেহনতী জনগণের ন্যায্য অধিকার রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ভারতীয় সমাজে তিনি এক শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। কে এই ‘সাইবাবা’ – সংক্ষেপে সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রবন্ধে।

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের পূর্ব গোদাবরীর আমলাপুরমের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ১৯৬৭ সালে এক গরিব কৃষকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন জি এন সাইবাবা। জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে তিনি প্রতিবন্ধী, প্রায় আশি শতাংশ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অচল ছিল। হামাগুড়ি দিয়ে হাতের সাহায্যে হাওয়াই চটির দস্তানাতে ভর দিয়ে চলাফেরা করতেন। ভীষণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে স্কলারশিপ বাঁধা ছিল। সাইবাবার যখন দশ বছর বয়স, তখন লোভী মহাজনের ফাঁদে পড়ে তাদের পরিবারের সম্বল সামান্য চাষের জমি খোয়া যায়। দারিদ্রতা চরমে, তখন সামান্য স্কলারশিপের পয়সা ছিল পরিবারটির ভরসা। কলেজে ভর্তির ফিস দিয়েছিলেন বসন্তা কুমারী নামে সাঁইবাবার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, যার সাথে তিনি ১৯৯১ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০০৩ সালে দিল্লিতে আসার পরেই প্রথম তিনি হুইল চেয়ার ব্যবহার করা শুরু করেন।

হায়দ্রাবাদে মাস্টার ডিগ্রী এবং এম.ফিল করবার সময় র‍্যাডিক্যাল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সঙ্গে তার প্রথম রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০০৪-এ মুম্বাই প্রতিরোধ এবং ইন্টারন্যাশনাল লীগ অফ পিপলস স্ট্রাগল (ILPS)-এ তিনি অংশগ্রহণ করেন। ২০০৫-এ AIPRFএবং SFPR যুক্ত হয়ে RDF গঠন হলে, তিনি তার সক্রিয় সদস্য হন। শুধুমাত্র AIPRF কর্মী হিসেবে কাশ্মীর, উত্তর পূর্বাঞ্চলের মুক্তি আন্দোলনের সমর্থনে এবং দলিত ও আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার বিষয় প্রচারের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় দুই লক্ষ কিলোমিটার পথ পরিক্রম করেছিলেন। মানুষের উপর ঘটে চলা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের ও সন্ত্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সাল থেকে সাইবাবা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন শুরু করেন। তার বক্তব্য ছিল অপারেশন গ্রিন হান্ট হলো মধ্য ভারতে সরকারের প্রয়োগ করা জঘন্যতম ঘৃণ্য গণহত্যার নীল নকশা। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার কাছে খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলি সস্তা দরে তুলে দেওয়া। সেই কারণে ব্যাপক সন্ত্রাস সৃষ্টি করে অঞ্চলের অধিবাসীদের উচ্ছেদ করা, গ্রেপ্তার করা, মহিলাদের ধর্ষণ করা, প্রতিবাদীদের সন্ত্রাসবাদী বা মাওবাদী তকমা দিয়ে পুলিশি এনকাউন্টার করে হত্যা করে সমগ্র বনাঞ্চল খালি করে মাইনিং কোম্পানিগুলিকে দেশের অমূল্য সম্পদ লুট করতে মদত করা হলো যার মূল উদ্দেশ্য। ফলস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রের চক্ষুশূল হলেন। খবরে উল্লেখ সরকারি উকিলের বয়ান যে ‘ওনার আশি শতাংশের অধিক শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে কী হবে, ওনার মস্তিষ্ক ১০০% এর বেশি সতেজ ও সচল’ – এই অজুহাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বারবার মহারাষ্ট্রের ফৌজদারী আদালত তার জামিন নাকচ করে দেয়।

সাইবাবার উপর দমন পীড়নের খেলা শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে। খবরে প্রকাশ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি অধ্যাপক ড: জি এন সাইবাবার দিল্লির বাড়িতে কেন্দ্রীয় এজেন্সির গোয়েন্দা এন আই এ সহ দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল, লোকাল পুলিশ এবং মহারাষ্ট্র পুলিশের ৫০ জনের একটি দল হানা দেয়। তদন্তকারীরা পরিচয় গোপন রেখে বেআইনীভাবে খানা-তল্লাশি চালায় এবং পরিবারের লোকজন ও সাইবাবাকে হেনস্থা করে। যাবার সময়ে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক, ল্যাপটপ, পেন ড্রাইভ, বইপত্র ইত্যাদি সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করে বিনা রশিদে নিয়ে চলে যায়। পুনরায় তাকে ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি জিঞ্জাসাবাদ করা হয় এবং ৯ মে মহারাষ্ট্র পুলিশ সাইবাবাকে অপহরণ করে নাগপুর নিয়ে যায়। পুলিশের দাবি ড: সাইবাবা নিষিদ্ধ সংগঠন সিপিআই (মাওবাদী)-র একজন সক্রিয় সদস্য, যার নাম পাওয়া গেছে জে এন ইউ-র চীনা ভাষার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হেম মিশ্রকে জেরা করার সময়। হেম মিশ্র গ্রেফতার হন ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট। সাইবাবাকে নাগপুর জেলের ভিতর ডিম্বাকৃতি একটি হাই সিকিউরিটি পরিসরের আলো বাতাসহীন কূপের মতন অস্বাস্থ্যকর সেলের মধ্যে বন্দী করে রাখা হয়। ঐ সময়ে অমানবিক অত্যাচারের ফলে ওনার কর্মক্ষম হাত দুটিও বিকল হয়ে যায়। পরিবারের লোকেদের সঙ্গেও জেলে দেখা করা কঠিন ছিল।

পরবর্তীকালে বোম্বে হাইকোর্টে আবেদন করলে বিচারক ২০১৫- র ৩০ জুন শারীরিক অসুস্থতার জন্য সুষ্ঠু চিকিৎসার জন্য অস্থায়ীভাবে জামিন দেন। কিন্তু সরকারী উকিলের আবেদনে সাড়া দিয়ে উচ্চতর কোর্ট জামিন বাতিল করে দেয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে ২০১৬-র ১৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট জামিন মঞ্জুর করে। কিন্তু নাগপুরের ফৌজদারি আদালত ২০১৭-র ৭ মার্চ সাইবাবা সহ আরো ৬ জন সমাজকর্মীকে যাবজ্জীবন সাজা শোনায় এবং অন্য একজনকে ১০ বছর সাজা দেয়।

২০১০-র ১৮ সেপ্টেম্বর ‘তহেলকা’ পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে সাইবাবা বলেন, “পুলিশ হত্যা বিপ্লবীদের মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে না। গ্রীনহান্ট পরবর্তী সময় মাওবাদীদের নির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করা উচিত, নচেৎ শান্তির প্রশ্নটা কল্পনাতেই থেকে যাবে”। পাশাপাশি তিনি এটাও উল্লেখ করেন, “ভারত রাষ্ট্র জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, অবিলম্বে এর পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। একটা শক্তিশালী গণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বোঝাতে হবে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বদলে শান্তি প্রয়োজন”। এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন আমূল রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষপাত করা একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি মেহনতী ও নিপীড়িত জনগণের কথা জোরেশোরে প্রচার করতেন। তাই সাইবাবা ভারত রাষ্ট্রের চক্ষুশূল ছিলেন।

২০২২ সালে বোম্বে হাইকোর্ট ২০১৭-র ৭ মার্চের অর্ডার খারিজ করে, বিচারক উল্লেখ করলেন “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অভূতপূর্ব বিপদ”- এর ভিত্তিতে কোন ব্যক্তিকে বলি দেওয়া যায় না এবং ড: সাইবাবার মুক্তি ঘটে। কিন্তু পুনরায় সরকারী আবেদনে সাড়া দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ওই আদেশ স্থগিত করেন। পরে আইনগত ত্রুটির কারণে ২০২৪-র মার্চ মাসে বোম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চের বিচারকগণ ড: জি এন সাইবাবা সহ ৫ জন সমাজকর্মীকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করেন। বিচারকগণ উল্লেখ করেন, “প্রমাণ ও প্রযুক্তিগত অনিয়মের কারণে অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস করে মুক্তি দেওয়া হলো”। এবারও সরকার পক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পূর্বের মতন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু তা আইনে গ্রহণযোগ্য হয় না। কারণ, সরকারপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের আদেশ প্রকাশের আগেই সুপ্রিম কোর্টে বিরোধিতা করে স্থগিতাদেশের আবেদন করেছিল। জেল যন্ত্রনা থেকে দীর্ঘ ১০ বছর পর স্থায়ীভাবে সাইবাবা মুক্তি পেলেন।

দীর্ঘ ১০ বছরের জেল যন্ত্রণার মুক্তি হলো বটে, কিন্তু জেলের নির্মম দুর্ব্যবহার, নির্যাতন, ওষুধপত্র দিতে অস্বীকার ইত্যাদির ফলে ওনার স্থায়ী পোলিও প্যারালাইসিস হয়েছিল। মৃত্যুকালে বয়স মাত্র ৫৮ বছর ছিল। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২৪-র ১২ অক্টোবর অর্থাৎ জেল মুক্তির মাত্র সাত মাস পরে নিজামস ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স (NIMS) হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সমাজকর্মী ড: সাইবাবার মৃত্যুতে সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যে ইউ এ পি এ আইনে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হল, সেই আইনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ফের প্রশ্ন দেখা গেল। যেমন এই কালাকানুন ইউ এ পি এ তে বাস্তবে তিন শতাংশ ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তির বিধানের সামান্য সম্ভাবনা আছে। কারণ যেখানে এই মামলার অর্ধেকের বেশি তদন্ত স্থগিত অথচ অভিযুক্তরা বিনা বিচারে জেলে বন্দী আছেন। আবার যেখানে কিছু ক্ষেত্রে মামলাই শুরু হয়নি – যেমন ভীমা কোরেগাঁও মামলা। নির্বাচিত সরকারগুলি ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলিকে মান্যতা না দিয়ে দেশের সংবিধানকে অপমান করে প্রতিহিংসামূলকভাবে সমস্ত ধরনের ন্যায্য গণদাবীর প্রতিবাদীদের কণ্ঠস্বর রোধ করতে ব্রিটিশ আমলের মত কালা আইন প্রয়োগ করে থাকে। তাই সাইবাবার এই মৃত্যু এক প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা বলেই গণ্য হওয়া উচিত।

জেলের ‘আন্ডা’ কক্ষে জেল জীবন, কোভিড ১৯, সোয়াইন ফ্লু, হৃদযন্ত্রের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ব্যাক পেইন, নার্ভ ড্যামেজ, ব্রেন সিস্ট, শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা ইত্যাদি বিষয়গুলির সুষ্ঠু চিকিৎসা জেলে হয়নি। জেল জীবনের কিছুকাল পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ওনার বেতন বন্ধ করে দেয়, যা আজও চালু হয়নি। ভীষণ অর্থনৈতিক সমস্যার কবলে পড়ে ড: জি এন সাইবাবার অকাল মৃত্যু ঘটে। এই মৃত্যু পাহাড়ের মতন ভারী। এই মৃত্যু ভারতীয় সমাজের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে এক জলন্ত উল্কাপিণ্ড যা ভবিষ্যতের পাথেয় হয়ে উঠুক। ড: সাইবাবা চির অমর থাকবেন।


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://caravanmagazine.in/literature/gn-saibaba-poems-from-confinement [Retrieved On: 06/04/2025]

Leave a Reply