ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এনআইটি) মেঘালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সম্প্রতি জানুয়ারি মাসে শিলং-এর অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে সোহরা-তে (চেরাপুঞ্জির স্থানীয় নাম) তাদের নতুন স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। পঠনপাঠনের প্রক্রিয়া সোহরা-তে পুরোদমে শুরু হয়ে গেলেও পড়ুয়াদেরকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার, অপরিষ্কার জল সরবরাহ, অপ্রতুল হোস্টেল পরিকাঠামো, অন্যায্য ফি এবং অনিয়মিত ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ পরিষেবা। বহুবার অভিযোগ জানানোর পরও কর্তৃপক্ষ এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে গতকাল ১৭-ই মার্চ পড়ুয়ায়দের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে, এবং তারা সমস্যার নিষ্পত্তির দাবিতে অ্যাডমিন বিল্ডিং ঘেরাও করে এবং অনশন কর্মসূচী পালন করে। সমস্যাগুলোকে একটু বিশদে জেনে নেওয়া যাক।
১) খাদ্যের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি : পড়ুয়াদের অভিযোগ অনুযায়ী হোস্টেলের মেসে পরিবেশিত খাবার অত্যন্ত নিম্নমানের এবং স্বাস্থ্যকর নয়। মেস হলের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। খাবারের চারপাশে মাছি ওড়া, মাঝেমধ্যে খাবারের মধ্যে মৃত মাছির উপস্থিতি তার উদাহরণ। খাবারের গুণমান ও পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ জানাতে গেলে উল্টে মেস কর্মচারীরাই পড়ুয়াদের সাথে বাজে ব্যবহার করে। কিছুক্ষেত্রে তাদের আচরণ হুমকির পর্যায়েও চলে যায়। এছাড়া, বিভিন্ন হোস্টেলের মধ্যে খাবারের মানে পার্থক্যও লক্ষ্য করা গেছে।
২) অনিরাপদ পানীয় জলের সরবরাহ : হোস্টেলে থাকা পড়ুয়ারা পানীয় জলের মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন, এবং সরবরাহকৃত জলে ডিজেলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই যা পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের সামনে একটা বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্যাঙ্কার থেকে সরাসরি জল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং তা কোনো সঠিক পরিশোধন ছাড়াই রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
৩) অপ্রতুল হোস্টেল পরিকাঠামো : নতুন তৈরি হোস্টেলগুলো খুবই নিম্নমানের, একদিনের বৃষ্টিতেই ছাদ ও দেয়াল থেকে তীব্রবেগে জল পড়ার ঘটনা দেখা গেছে। প্রতিটি তলায় জল জমে যাচ্ছে, এমনকি পড়ুয়াদের ঘরের ভেতরেও জল ঢুকে পড়ছে, যার ফলে তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে এবং বসবাসের জন্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের ওয়েরিং এর কাজ এতই নিম্নমানের যে বিদ্যুতের তার, প্লাগ পয়েন্ট, সুইচবোর্ডের ভিতর থেকেও জল চুঁইয়ে পড়ছে, এবং পড়ুয়ারা একাধিকবার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সাঙ্ঘাতিক অভিজ্ঞতা পেয়েছে। বলাই বাহুল্য, পড়ুয়ারা একপ্রকার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হোস্টেলে থাকছে।


৪) অন্যায্য ফি এবং ইন্টারনেটের সমস্যা : এর আগে শিলং-এ অস্থায়ী ক্যাম্পাসে থাকার সময় পড়ুয়ারা হোস্টেল সিট ভাড়া, হোস্টেল প্রতিষ্ঠা ফি এবং পরিবহন ফি প্রদান করত। তবে, স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের পরও এই চার্জগুলি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ফি কাঠামোর কোনো আনুষ্ঠানিক সংশোধন করা হয়নি। পড়ুয়ারা আগেও এই অন্যায্য ফি-কে ঘিরে আন্দোলন করেছে এবং ফি কমানোর দাবি জানিয়েছে। কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও পর্যন্ত এই নিয়ে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। পড়ুয়ারা দাবি জানিয়েছে যে এইসমস্ত অতিরিক্ত চার্জ অবিলম্বে বাতিল করা উচিত। পড়ুয়ারা আরও অভিযোগ জানিয়েছে যে, সোহরা ক্যাম্পাস এবং শিলং ক্যাম্পাসের মধ্যে পরিবহন ব্যবস্থা বাবদ সকলের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি ধার্য করা হয়েছে, যা অন্যায্য, এবং পরিবর্তে এই ফি পড়ুয়াদের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত বলে দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়াও, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বিদ্যুতের ব্যাকআপের সুবিধার অভাব ছাত্রদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। প্রতি রবিবার ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে যায় এবং অন্যান্য দিনেও এটি অত্যন্ত অনিয়মিত।
৫) চিফ ওয়ার্ডেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ : পড়ুয়ারা চিফ ওয়ার্ডেনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও বাজে ব্যবহারের অভিযোগ জানিয়েছে। বহুবার অভিযোগ জানানোর পরও কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বরং, অভিযোগ উঠেছে যে চিফ ওয়ার্ডেন, যাঁর দায়িত্ব হলো পড়ুয়াদের সমস্যার সমাধান করা, সেই তিনিই উল্টে পড়ুয়াদের হুমকি দিয়েছেন, হয়রানি করেছেন, এবং এমনকি শারীরিক নিগ্রহেরও চেষ্টা করেছেন। যা স্বাভাবিকভাবেই পড়ুয়াদের মধ্যে একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
পড়ুয়াদের দাবিসমূহ :
- সমস্ত হোস্টেলে সমান, উচ্চ-মানের ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- রান্না ও পানের জন্য নিরাপদ ও পরিশোধিত জল সরবরাহ করা।
- হোস্টেলের নিরাপত্তা ও পরিকাঠামো সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধান করা।
- অপ্রয়োজনীয় ফি বাতিল করা।
- নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা।
- চিফ ওয়ার্ডেনের পদত্যাগ ও তাঁর পরিবর্তে দায়িত্বশীল কোনও ব্যক্তিকে ওই পদে নিয়োগ করা।
গতকাল পড়ুয়াদের এই অনশন আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে তাদের ক্রমবর্ধমান হতাশাকেই প্রতিফলিত করে। এনআইটি মেঘালয়ের পরিস্থিতি অবিলম্বে সংশোধন করা প্রয়োজন যাতে ছাত্রদের সুস্থ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা যায় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়। পড়ুয়ারা জানিয়েছে যে যতক্ষণ না তাদের দাবিগুলি পূরণ করা হয়, তারা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবে। গতকাল সন্ধ্যায় এনআইটি মেঘালয়ের ডিরেক্টর, রেজিস্ট্রার এবং ডিনরা পড়ুয়াদের সাথে বৈঠক করেন, এবং তাদের সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে সমস্যাগুলির সমাধানে কর্তৃপক্ষ শীঘ্রই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পড়ুয়ারাও মনে করে যে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই তাদের সংকট ও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
পরিশেষে যে কথার উল্লেখ করাটা একান্ত প্রয়োজন সেটা হলো – শিক্ষা যে আজ কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়েছে সেকথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তার পরেও, লক্ষ লক্ষ টাকার ফি দেওয়ার পরেও এনআইটি-র মতো “ইন্সটিটিউট অফ ন্যশনাল ইম্পর্ট্যান্স” তকমা প্রাপ্ত শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্রটা এইরকম। একদিকে যেমন গোটা দেশজুড়ে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বৈরাচারী ঢঙে “জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০”-র মতো কর্পোরেট-বান্ধব মডেল চালু করা হচ্ছে, তেমনই একাধিক প্রতিষ্ঠানে ফি-বৃদ্ধির বিরোধিতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ন্যায্য দাবিতে সরব হওয়া ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠরোধ করার যাবতীয় চেষ্টার ছবি আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের রাজ্যেই কয়েকদিন আগে আমরা দেখেছি কীভাবে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে না হওয়া ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিচ্ছেন খোদ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী। যাদবপুরের পড়ুয়াদের আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করতে রাজ্যের শাসক দলের নেতামন্ত্রীরা এবং কেন্দ্রের শাসক দলের পোষা মিডিয়া হাতে হাত মিলিয়েছে। গোটা দেশেই আজ একই রকম ছবি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজন নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, এবং দেশের কোনো প্রান্তে যদি ন্যায্য দাবিতে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধে তাহলে তার সাথে সংহতিতে পাশে দাঁড়ানো।
