প্রখ্যাত তথ্যচিত্র সম্পাদক তরুণ ভারতীয়-র অকাল প্রয়াণে তাঁর স্মৃতিচারণ

প্রখ্যাত তথ্যচিত্র সম্পাদক ও ফটোগ্রাফার তরুণ ভারতীয় গতকাল সকালে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মারা গেলেন।

তরুণ কর্তৃক সম্পাদিত তথ্যচিত্রের মধ্যে একটা অন্যতম হলো তথ্যচিত্র নির্মাতা সঞ্জয় কাক পরিচালিত ‘রেড অ্যান্ট ড্রিম’ (২০১৩)। মধ্যভারতে খনিজ সম্পদের অবাধ কর্পোরেট লুঠ, সেই লুঠের বিরুদ্ধে আদিবাসী জনতার প্রতিরোধ, যা দমন করতে রাষ্ট্রের তৎপড়তা, এবং সেই প্রেক্ষাপটে জল-জঙ্গল-জমি রক্ষার লড়াইতে রত মাওবাদী সশস্ত্র বাহিনীর সাথে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর সংঘাতের ছবি ফুটে উঠেছে এই তথ্যচিত্রে। পাশাপাশি এই সংঘাতের ছবিকে যুক্ত করা হয়েছিল বিপ্লবী ভগৎ সিং-এর আদর্শ এবং পাঞ্জাবের বিপ্লবী কবি অবতার সান্ধু ওরফে পাশ-এর কবিতার সাথে। ‘রেড অ্যান্ট ড্রিম’ ছাড়াও সম্পাদক হিসাবে তাঁর আরেকটা উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ‘জশন-এ-আজাদি’ (২০০৮), যেখানে উঠে এসেছে কাশ্মীরি জনগণের জাতিসত্তার সংগ্রামের ছবি।

তরুণ একজন গুণী ফটোগ্রাফারও ছিলেন। ‘জনতার ফটোগ্রাফার’ বললে অত্যুক্তি হয় না। তাঁর তোলা সাদা-কালো ছবির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে শিলং তথা মেঘালয় তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনজাতির দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম, বিভিন্ন গণ-আন্দোলনের কাহিনী। সরকারি প্রশ্রয়ে ইউরেনিয়ামের অবাধ কর্পোরেট লুঠের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনই হোক, অথবা কালো আইন AFSPA-র বিরুদ্ধে আন্দোলনই হোক, বা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে হকারদের জীবিকারক্ষার সংগ্রাম – সমস্তটাই তরুণ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ক্যামেরাবন্দী করতেন।

শুধু ডিজিটাল দুনিয়াতেই নয়, বাস্তবের মাটিতে একজন সমাজকর্মী হিসাবেও তরুণের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট ইতিবাচক। শিলং শহরের মেহনতি জনগণ থেকে শুরু করে সমাজ পরিবর্তনকামী প্রগতিশীল ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘থমা উ রাংলি-জুকি’-এর (সংক্ষেপে টিইউআর, যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় – দরিদ্র জনতার যুদ্ধ) একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। এছাড়াও, শিলং শহরের হকারদের সংগঠিত করে গড়ে তোলা ‘মেঘালয়াস প্রোগ্রেসিভ স্ট্রিট ভেন্ডর্স অ্যাসোসিয়েশান’-এর কাজকর্মের মধ্যেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল, এবং এই সংগঠনের একজন সাম্মানিক সদস্যও ছিলেন তিনি। ২০২২ সালের মেঘালয় বিধাসভা নির্বাচনের আগে ‘কাম মেঘালয়’ (স্থানীয়দের কাছে ‘কাম’ শব্দটা কাজ বা জীবিকা অর্থেই পরিচিত) নামে একটা মঞ্চ তৈরি করা এবং সেই মঞ্চের তরফে তিনজন নির্দল প্রার্থীকে সমর্থন সমেত বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পিছনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় অন্ধত্ব, উগ্র জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি যেসমস্ত দক্ষিণপন্থী চিন্তাভাবনা সামাজিক বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, তার বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াই চালানো ‘শিলং হিউম্যানিস্ট’ গোষ্ঠীরও একজন মুখ্য সদস্য ছিলেন তিনি।

তরুণ-এর যে পরিচয়টা না উল্লেখ করলে তাঁর কাহিনী অসম্পূর্ণ থেকে যায় সেটা হলো – তিনি একজন কবি-ও ছিলেন। তাঁর লেখা হিন্দি কবিতাগুলোতে বর্তমান সময়ের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ছবির স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায়। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতির একজন ক্ষুরধার বিশ্লেষক ছিলেন তরুণ। তাঁর অকাল প্রয়াণ উত্তর-পূর্ব ভারত তথা সমগ্র ভারতের প্রগতিশীল রাজনীতির কাছে একটা বিরাট ক্ষতি। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে লেখা তাঁর এক কবিতার দুটো লাইন দিয়েই তাঁর স্মৃতিচারণা শেষ হোক।

उस देश को भूल जाओ (সেই দেশটা ভুলে যাও)
जैसे उस मस्जिद को भूल गए हो (যেমন করে সেই মসজিদকে ভুলে গেছ)

অবশ্য, এ নিছকই কবির অভিমানের কথা। ২০১৫ সালে যখন তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে চিঠি লিখে নিজের ‘ন্যাশনাল আওয়ার্ড ফর বেস্ট এডিটর নন ফিকশন’ ফিরিয়ে দেন তখন সেই চিঠিতে তিনি মুক্তকণ্ঠে বাবরি মসজিদ, গোধরা গণহত্যা, কালো আইন AFSPA, ছত্তিসগড়ে জনতার উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, মুসলিম-দলিত-খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের উপর দৈনন্দিন নিপীড়ন ইত্যাদির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে এগুলো ভারতীয় গণতন্ত্রের বিচ্যুতি নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় গণতন্ত্রের নামে এভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব, তরুণ দেশকে, দেশের জনগণকে কখনও ভোলেননি। সর্বদা বহুমুখী প্রতিভার মধ্যে দিয়ে নিজের মতো করে চেষ্টা করে গেছেন যাতে একটা শোষণ-নিপীড়নহীন ন্যায্য সমাজ তৈরি করা যায়। আমরাও তাঁকে ভুলব না। তাঁর অজস্র ভিন্নধর্মী কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি আমাদের স্মৃতিতে বিরাজ করবেন।

—————-
আজাদ গণ মোর্চা

Leave a Reply