লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৪ সংখ্যায়
রাষ্ট্রসঙ্ঘের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের প্রতি পাঁচ জন শিশুর মধ্যে একজন অপুষ্টিতে ভোগে। এই শিশুদের অপুষ্টি দূরীকরণের লক্ষ্য নিয়েই ১৯৭৫ সালের ২ অক্টোবর ICDS (সুসংহত শিশু বিকাশ সেবা প্রকল্প) বা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলো চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেও এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হয়। আজ এই প্রকল্পের বয়স হল প্রায় ৫০ বছর। এই প্রকল্পে প্রধান দায়িত্ব পালন করেন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা। তাদের যে সাম্মানিক দেওয়া হয়, সেটা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিতভাবে প্রদান করেন। বর্তমানে এই রাজ্যের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কেন্দ্র সরকার দেয় মাসিক সাড়ে চার হাজার টাকা এবং রাজ্য সরকারও দেয় মাসিক সাড়ে চার হাজার টাকা। অর্থাৎ সবমিলিয়ে মোট ৯০০০ টাকা। অন্যদিকে সহায়িকাদের কেন্দ্র সরকার দেয় মাসিক ২২৫০ টাকা এবং রাজ্য সরকার দেয় ৪৫৫০ টাকা। অর্থাৎ সবমিলিয়ে মাসিক ৬৮০০ টাকা। প্রত্যেকদিন চার ঘন্টা ডিউটি দেওয়ার পরও বিডিও এবং এসডিও অফিস থেকে বিভিন্ন রকমের কাজের দায়িত্ব এসে পড়ে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ওপর, সেটা সঠিকভাবে পালন করতে হয়। তার মধ্যে প্রত্যেক মাসের সাম্মানিক কর্মী ও সহায়িকারা সঠিক সময়ে পান না।
এই প্রকল্পের বেনিফিশিয়ারি অর্থাৎ সুবিধা-ভোগীরা হলেন প্রাক-প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা, গর্ভবতী মায়েরা এবং সদ্য প্রসবা মা এবং তাদের শিশুরা।বেনিফিশিয়ারিদের যে রেশন চার্ট অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয় তাতে সবজি, ডিম, কাঠের দাম বাজার মূল্য হিসেবে দেওয়া হয় না। অনেকটাই কম মূল্য দেওয়া হয়। যাতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোতে পরিষেবা দেওয়া খুবই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন – জ্বালানি ছাড়া রান্না সম্ভব নয়, তাতে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। প্রত্যেকদিন ১০০-২০০ জনের রান্না করার জন্য অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দেওয়া হয় মাথাপিছু ২৩ টাকা। ডিমের দাম বেড়ে সাত টাকা – সাড়ে সাত টাকা প্রতি পিস হয়ে গেছে ,তখনও সরকারি বরাদ্দ ৬.৫০ টাকা প্রতি পিস! তাছাড়া খিচুড়িতে যে হলুদ দেওয়া হয়, বাসন মাজার সাবান, জালি সমস্ত কিছু অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের নিজেদের পয়সা দিয়ে কিনতে হয়। সরকার এইসবের জন্য কিছু দেয় না।
বর্তমানে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোতে যে রেশন চার্ট চলছে সেটা হল – সোম, বুধ, শুক্র শিশুদের সাদা ভাত, গোটা ডিম সেদ্ধ আর মায়েদের আলু দিয়ে ডিমের ঝোল আর ভাত। এটা কি ধরনের রেশন? গর্ভবতী মা, প্রসূতি মা ডিম আলুর ঝোল পাবে ; বাচ্চারা পাবে না? মায়েদের জন্য যে আলু বরাদ্দ তার জন্য দাম দেওয়া হয় মাথাপিছু ৮৪ পয়সা। ঐ পয়সায় কতটুকু আলু পাওয়া যেতে পারে? আর মঙ্গল বৃহস্পতি এবং শনিবার বরাদ্দ হলো সবজি দিয়ে খিচুড়ি আর বাচ্চাদের অর্ধেক ডিম এবং মায়েদের জন্য গোটা ডিম।
অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা দুমাস নিজেদের ট্যাঁক থেকে টাকা খরচ করে ডিম, সবজি, জ্বালানি কাঠ কিনে সেন্টার চালানোর পর সরকারের কাছ থেকে এক মাসের সবজি বিল পায়। তাও কোন কোন সময় তিন মাস – চার মাসও সবজি বিল আটকে থাকে। সেক্ষেত্রে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী সেন্টার বন্ধ রাখতে পারবেন না। ধার করে হোক বা গয়নাগাটি বন্ধক দিয়ে হোক, তাকে সেন্টার চালিয়ে যেতে হবে। তার ওপর সমস্ত প্রজেক্টেই পর্যাপ্ত কর্মী এবং সহায়িকা নেই। প্রায় অর্ধেক সেন্টার ফাঁকা পড়ে আছে। একজন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীকে দুটো করে সেন্টার চালাতে হচ্ছে। তার জন্য তারা কোন অতিরিক্ত পরিশ্রমিক পান না। আবার যে সমস্ত সেন্টারে সহায়িকা নেই, সেখানে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীকে নিজের টাকা দিয়ে এলাকা থেকে কোন রান্নার লোক রেখে সেন্টার চালাতে হয়।
এইভাবে একজন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী সারাটা জীবন এলাকায় শ্রম দিচ্ছেন, অথচ অবসর গ্রহণের পর তাদের জন্য না আছে কোন পেনশন, পিএফ, গ্রাচুইটি বা মেডিকেল সুযোগ সুবিধা। অথচ তাদের চোর অপবাদ নিয়ে সারা জীবন চলতে হয়, ‘চাল চোর’, ‘ডিম চোর’ ইত্যাদি শুনতে হয়। বর্তমানে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের সমস্ত কাজ করতে হয় পোষণ অ্যাপের মাধ্যমে। প্রতিটা মা, শিশু’র সমস্ত তথ্য এই অ্যাপের মাধ্যমে কেন্দ্র সরকারের কাছে পাঠাতে হয়। তার জন্য অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কোন স্মার্টফোন বরাদ্দ করা হয়নি এবং ফোন রিচার্জ এর জন্য যে টাকা দেওয়া হয় তা খুবই কম। ১৬৬ টাকা প্রতি মাসে – যাতে পুরো মাস কাজ করাই সম্ভব নয়।
এই অবস্থার মধ্যে আমাদের রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি চলছে – এখানে না শিশুরা, না প্রসূতি মায়েরা সঠিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার পাচ্ছে, না শিশুরা পড়াশোনার সঠিক সুযোগ পাচ্ছে। অধিকাংশ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের নিজস্ব কোন বাড়ি নেই। যেগুলোতে নিজস্ব বাড়ি রয়েছে, সেগুলিও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থার মধ্যে পড়ে আছে। আর এই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোতে যারা কাজ করছেন সেই কর্মী দিদি বা তাদের সহায়িকাদের অবস্থাও তথৈবচ, তারা যে শ্রম দেন, তার উপযুক্ত পারিশ্রমিক বা সাম্মানিক, তারা কিছুই পান না।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.anandabazar.com/west-bengal/purulia-birbhum-bankura/asha-and-anganwadi-workers-face-problems-in-birbhum-during-survey/cid/1389925 [Retrieved On: 08/01/2025]
