লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শাসকশ্রেণীর ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হোক!

লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৪ সংখ্যায়

রাজ্য স্তরে যেমন সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি প্রমাণ করেছে যে বর্তমান তৃণমূল-শাসিত রাজ্য সরকার দুর্নীতিটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, তেমনই জাতীয় স্তরে একই কথা বলা চলে বিজেপি-শাসিত কেন্দ্র সরকারের ক্ষেত্রে। একের পর এক জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় বিভিন্ন রকম দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসে চলেছে এবং সেই প্রেক্ষাপটে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) এর নাম। গত ৪-ঠা জুন ২০২৪ তারিখে জাতীয় স্তরে ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা বা NEET-UG পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল ১৪-ই জুন। কিন্তু দেখা যায় যে NTA হঠাৎ করে তার দশ দিন আগেই, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরোনার দিনই পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করে দেয়। এই ফলাফলকে ঘিরে যখন একের পর এক সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে তখন স্পষ্টই বোঝা যায় যে এই বছরের NEET-UG পরীক্ষাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে অন্যান্য বিভিন্ন রকমের দুর্নীতি আর কারচুপি থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্যই NTA এমনটা করেছে। প্রথম কদিন জনগণ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও NEET-UG পরীক্ষার ফলাফলকে ঘিরে এমন সমস্ত বিষয় উঠে আসতে থাকে যে এই দুর্নীতির খবরকে বেশিদিন ধামাচাপা দেওয়া যায় না; বিশেষ করে ২৪ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে জড়িয়ে। এমনকি গোদি মিডিয়া থেকে শুরু করে বিজেপি-র ছাত্র সংগঠন ABVP, কেউই এটাকে উপেক্ষা করতে পারে না। এই আবহেই কয়েকদিন যেতে না যেতেই UGC-NET পরীক্ষা নিয়েও সংশয় তৈরি হয় এবং পরীক্ষার পরদিনই সেই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। পাশাপাশি NEET-PG ও CSIR-NET পরীক্ষাকেও পিছিয়ে দেওয়া হয়। এহেন ‘অমৃতকাল’-এর আবহে দেশজোড়া লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী, যারা এই দেশের ভবিষ্যতের রূপকার, তারা নিজেরাই নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

২০১৮ সালে সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশান অ্যাক্ট এর অধীনে একটা স্বয়ংক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই NTA-কে তৈরি করা হয়। প্রথমে “এক দেশ, এক পরীক্ষা”; তারপর তার সাথে “এক পরিচালক” – এই মডেল অনুসরণ করে ধীরে ধীরে এই NTA হয়ে ওঠে জাতীয় স্তরে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার একচেটিয়া হর্তা-কর্তা-বিধাতায়। কিন্তু ৪-ঠা জুনের পর থেকে যেসমস্ত তথ্যপ্রমাণ সামনে আসছে তাতে এই সংস্থার গ্রহণযোগ্যতাই এখন বিরাট বড় প্রশ্নের মুখে! প্রথমে সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক যে NEET-UG পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সন্দেহ জাগলো কীভাবে। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল যে গোটা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছে ৬৭ জন পরীক্ষার্থী, যারা ৭২০ নম্বরের মধ্যে পুরো ৭২০ নম্বরই পেয়েছে। তার মধ্যে হরিয়ানার একটা সেন্টারের মধ্যেই এমন ছয়জন পরীক্ষার্থীকে খুঁজে পাওয়া যায়। এদিকে বিগত বছরগুলোতে প্রথম স্থান অধিকার করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২/৩/৪ এর বেশি হয়নি কখনই। স্বাভাবিকভাবেই এটা দেশের একাধিক জায়গায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়; আর সেই ধরনের খবর ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছিল দেশের কিছু জায়গা থেকে, এবং কিছু অপরাধীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। মজার বিষয় হলো কিছু পরীক্ষার্থী ৭২০ নম্বরের মধ্যে ৭১৮ ও ৭১৯ নম্বর পেয়েছে, যা NEET পরীক্ষার নম্বর দেওয়ার নিয়ম অনুযায়ী কখনও হতে পারে না। এই বিষয়টা সামনে আসায় NTA এর উত্তরে একটা অদ্ভুত জবাব দেয় যা সন্দেহ আরও বাড়ায়। NTA জানায় যে পরীক্ষা চলাকালীন সময় কোনও কারণবশত সময় নষ্ট হওয়ায় ১৫৬৩ জন পরীক্ষার্থীকে ক্ষতিপূরণমূলক নম্বর দেওয়া হয়েছে! অথচ এই ধরনের ক্ষতিপূরণমূলক নম্বর দেওয়ার কোনও গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের কথা পরীক্ষার আগে বা পরীক্ষা চলার সময় বলা হয়নি। সেইসব কিছু পরীক্ষার্থীকেই এই নম্বর দেওয়া হয়েছে যারা পরীক্ষা সংক্রান্ত অব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে কোনও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন, একথা বলাই বাহুল্য যে গ্রামগঞ্জ থেকে উঠে আসা, সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা, এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের পড়ুয়ারা এইসব ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপের কথা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিপূরণমূলক নম্বর দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটা একটা বিরাট সংখ্যক পরীক্ষার্থীর সাথে অবিচার ছাড়া আর কিছুই নয়। আকর্ষণীয় বিষয় হলো এই ক্ষতিপূরণমূলক নম্বর দেওয়ার ব্যাপারে NTA সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশিকা অনুসরণ করার কথা উল্লেখ করেছে সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে যে ডাক্তারি আর ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমনটা করা চলবে না! এছাড়াও, ক্ষতিপূরণমূলক নম্বর দেওয়া হবে কি হবে না সেটা কিসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে? এবং এই খাতে কাকে কতটা নম্বর দেওয়া হবে সেটার হিসেবই বা কিভাবে হয়েছে? – ইত্যাদি প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর NTA এর থেকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এমন সমস্ত দুর্নীতির হদিশও পাওয়া গেছে যেখানে দেখা গেছে যে নিজের ঠিকানা থেকে বহু দূরে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিয়ে অনেকে পরীক্ষা দিয়েছে; কারণ আগে থেকে পরিকল্পনা-মাফিক কিছু নির্দ্দিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্র নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে পরীক্ষার পর উত্তরপত্র ‘ঠিকঠাক’ করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা করা হয়েছিল লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে।

এমন নয় যে এই প্রথমবার NTA-এর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অতীতেও এমনটা হয়েছে। গত বছরের CUET পরীক্ষা এবং PG অর্থাৎ স্নাতকোত্তর স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষার সময়েও NTA-এর একাধিক ভুলের মাশুল গুনতে হয়েছিল পরীক্ষার্থীদের। এই বছরও NEET-UG পরীক্ষাকে ঘিরে এইসমস্ত কেলেঙ্কারি সামনে আসার পর একাধিক পরীক্ষা বাতিল করেছে বা পিছিয়ে দিয়েছে NTA। গত ১৮-ই জুন UGC-NET পরীক্ষা পরিচালনা করে NTA। অধ্যাপনার চাকরি এবং PhD প্রবেশিকার জন্য এই পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশজুড়ে প্রায় ৯ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু হায়! পরীক্ষা দেওয়ার পরের দিনই শিক্ষামন্ত্রক থেকে ঘোষণা করে এই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। কারণ গৃহমন্ত্রক থেকে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে নাকি এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে কেন পরীক্ষা বাতিল হলো, NEET-UG এর ক্ষেত্রে কেন হলো না – এই ব্যাখ্যা এখনও কেউ দিতে পারেনি। এই আবহে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে NEET-PG আর CSIR-NET এর মতো পরীক্ষাও। কিন্তু প্রশ্ন হলো একটা পরীক্ষার ক্ষেত্রে যেখানে ডার্ক ওয়েবের মতো প্রযুক্তির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আরেকটা পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন ভান দেখানো হচ্ছে যেন আমরা প্রস্তর যুগে পড়ে আছি, যেখানে দেশের একস্থানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সেটা যেন মুহুর্তের মধ্যে অন্যস্থানে যেতে পারে না! এসবেরই মধ্যেই গত ১২-ই জুলাই খবর প্রকাশিত হয়েছে যে CBI তদন্ত অনুযায়ী UGC-NET পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল সেটা হলো জাল! তাহলে ভেবে দেখুন অব্যবস্থার মাত্রা! এদিকে জাল প্রমাণের ভিত্তিতে UGC-NET পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার ঠিক পরের দিনই সেটা বাতিলও হয়ে গেল, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের একাধিক সঠিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও NEET-UG ২০২৪ বাতিল ও পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে NTA আর শিক্ষা মন্ত্রক এখনও ধানাই পানাই করে চলেছে! তাদের বিভিন্ন স্ববিরোধী ব্যাখ্যা গোটা ব্যবস্থা সম্বন্ধে সন্দেহ আরও বাড়াচ্ছে। RTI-এর তথ্য অনুযায়ী NTA তৈরির ছয় বছর পরেও এই সংস্থার স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা মাত্র ১৫ জন; সেখানে নেই কোনও পরীক্ষা বিশেষজ্ঞ, নেই এমন কেউ যারা গোটা প্রক্তিয়াটার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করবেন, সেগুলো নিয়ে গবেষণা করবেন। প্রশ্ন জাগছে গোটা দেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষা, যেমন – JEE Main, NEET-UG, CUET-UG, CUET-PG, UGC-NET, CSIR UGC-NET – যেগুলোর সাথে প্রতি বছর ৫০ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে, সেইসমস্ত পরীক্ষাকে পরিচালনা করার মতো দক্ষতা কি আদৌ এই সংস্থার আছে? এগুলো কি শুধুই অব্যবস্থা? নাকি, একটা হিমশৈলপ্রমাণ একটা দুর্নীতির চূড়াটা সবে দেখা গেছে, আর সেটা ঢাকতেই এতো তোড়জোড়? বিশেষ করে এই প্রশ্ন তো উঠবেই যে – এহেন গুরুত্বপূর্ণ একটা সংস্থাকে কেন শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনের একটা সংস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়নি? কেন এটাকে সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশান অ্যাক্ট এর অধীনে একটা সোসাইটি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে? CAG অডিট এড়িয়ে যাওয়াই কি এর আসল উদ্দেশ্য? NEET-UG কেলেঙ্কারি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলেও সেই মামলার রায়ে শেষ পর্যন্ত পুনরায় পরীক্ষার আর্জিকে খারিজ করে দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার এই সুপ্রিম কোর্টই ২০১৩ সালের জুলাই মাসে NEET পরীক্ষাকেই অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক ইত্যাদি তকমা দিয়ে সেটাকে বাতিল করেছিল, এবং দেশজোড়া রাজনৈতিক পালা বদলের পর ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সকলকে অবাক করে, এই প্রশ্নে নিজের অতীত সিদ্ধান্তকে “তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত” বলে বাতিল করে দিয়ে, CBSE-এর অধীনে (যেহেতু তখনও NTA তৈরি হয়নি) এই পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাস্তব এটাই যে, NEET প্রত্যাশীরা শুরুর দিকে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করলেও, পরবর্তী সময়ে তাদের যাবতীয় প্রত্যাশা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছিল। পরিণামে স্বাভাবিকভাবেই তাদের হতাশ হতে হয়েছে।

এবার আসা যাক কেন্দ্রীকতার প্রশ্নে। ভারতের মতো এতো বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বৈষম্যপূর্ণ একটা দেশে পরীক্ষার কেন্দ্রীকরণ কেন করা হবে? এই প্রশ্নটা কেউ তুলছেন না। আমাদের দেশে যেখানে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো ভেঙে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠছে, যেখানে ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষা কেনাবেচা চলছে, অর্থাৎ শিক্ষাদানের গোটা ব্যবস্থায় যেখানে সরকারি হস্তক্ষেপে বৈষম্য দূর করার বিষয়ে কেন্দ্রীকতা দেখানোর ছিটেফোঁটা খুঁজে পাওয়া যাবে না, সেখানে সমস্ত কেন্দ্রীকতা শুধুমাত্র এই ধরনের জাতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার ক্ষেত্রে মানার যৌক্তিকতা কী? কেন একক কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং সেটা পরিচালনার দায়িত্বও একটা একক কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে? এসবের উত্তর আসলে লুকিয়ে আছে শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে। NEET-UG পরীক্ষার কথাই ধরা যাক। একদিকে সিলেবাস কাটছাঁট করা হচ্ছে, পরীক্ষার মানকে নামিয়ে আনা হচ্ছে; বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কাট-অফ নম্বর; এই বছর NEET-UG পরীক্ষার কাট-অফ ছিল ২২.৭৮%, যা গত দুই বছরে ছিল যথাক্রমে ১৯.০৩% ও ১৬.৩৬%; আর এই কাট-অফ নম্বর বাড়ানোর ফলে এই বছর একই নম্বর পেয়ে গোটা দেশের মধ্যে একই স্থান দখল করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা NEET ২০২৩-এর তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, সরকার নতুন কলেজ তৈরি না করে, বা বিদ্যমান সরকারি কলেজের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি আর পরিকাঠামোর উন্নয়ন না করে উল্টে মুড়ি-মুড়কির মতো বেসরকারি কলেজ স্থাপনের ছাড়পত্র দিয়ে চলেছে। গরীব, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা পরীক্ষার্থীরা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পর, ভালো নম্বর পাওয়ার পরেও যখন সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না তখন হয় সে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ; নয়তো পরিবারের কিছুটা আর্থিক সম্বল থাকলে ঘটিবাটি বন্ধক রেখে বেসরকারি কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছে। অতএব, “আপনি ক্রোনোলজিটা বুঝে নিন।” মোট আসনের ৫১.৬৭% সরকারি; বাকিটা বেসরকারি। আর সরকারি জায়গায় যেখনে ডাক্তারি পড়ার খরচ ৩.৬৪ লক্ষ টাকা থেকে ৬.২ লক্ষ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে; সেটাই বেসরকারি ক্ষেত্রে হলো ৭৮.২ লক্ষ টাকা থেকে ১.২২ কোটি টাকা। এভাবেই জনগণের উচ্চাকাঙ্ক্ষার আবেগকে কাজে লাগিয়ে, তাদের কষ্টার্জিত উপার্জনকে বেসরকারি পুঁজিপতিদের পকেটে স্থানান্তর করার একটা সুব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বিগত কয়েক দশক ধরে উদ্ভব হয়েছে ছোটো-বড় বিভিন্ন মাপের বেসরকারি কোচিং সেন্টারের। তথ্য বলছে এই বিশাল কোচিং ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক আয় যেখানে ২০১৫ সালে ছিল ২৪,০০০ কোটি টাকা, সেটাই ২০২২ সালে বেড়ে হয়েছে ৫৮,০০০ কোটি টাকা; এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন ২০২৮ সালে এটাই পৌঁছাবে ১,৩৩,৯৯৫ কোটি টাকায়। আর পরীক্ষার কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এই কোচিং ইন্ডাস্ট্রিটাকেও বড় বড় খেলোয়াড়দের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যা একদিকে যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ গরীব, মধ্যবিত্ত জনতাকেও শিক্ষাব্যবস্থা দূরে সরিয়ে দেওয়ার কাজও করছে, তেমনই অন্যদিকে এই পরীক্ষাগুলোকে কেন্দ্র করে বড় বড় দুর্নীতির পথও প্রশস্ত করে দিচ্ছে। হয় কোচিং সেন্টারের পিছনে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ নাও, নয়তো দালাল চক্রের সন্ধান চালিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র তাদের থেকে কিনে নাও! যে রাস্তাই আপনি নিন না কেন, মোদ্দা কথা হলো উচ্চশিক্ষা ‘ক্রয়’ করতে গেলে আপনাকে বিত্তশালী হতে হবে।

আর এই ধরনের একটা ব্যবস্থাকেই পাকাপোক্ত স্থায়ী আকার দেওয়া হয়েছে জাতীয় শিক্ষা নীতি বা NEP ২০২০ এর মাধ্যমে। বলাই বাহুল্য যে এই ব্যবস্থা প্রান্তিক ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা পরীক্ষার্থীদের জন্য নয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন যে বেকারত্বের এইরকম এক চরম অবস্থায় বিভিন্ন পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফলাফল করার পরেও শিক্ষার্থীদের আসন না পাওয়া, বিশেষ করে এই ধরনের দুর্নীতির কারণে, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর একটা বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তাদেরকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বা কখনও এমনকি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিচ্ছে! NTA, NEP এগুলোর কয়েক বছর যেতে না যেতেই এখন থেকেই এগুলোর বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গোটা শিক্ষাব্যবস্থাটার বেসরকারিকরণ ঘটিয়ে, শিক্ষাকে কেনাবেচার সামগ্রীতে পরিণত করে, আগামী প্রজন্মের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে, তাদের শাসক শ্রেণীর তাঁবেদারে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে। এখনও সময় আছে। এগুলোর বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে, এগুলো বাতিলের দাবিতে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে তার পরিণাম হবে মারাত্মক। আর এই কাজে ছাত্রছাত্রীদেরকেই সামনের সারিতে এগিয়ে আসতে হবে।


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://thefederal.com/category/explainers-2/neet-scam-who-are-solver-gangs-where-and-how-do-they-operate-129407 [Retrieved On: 03/08/2024]

Leave a Reply