ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ – যিনি তাঁর ছাত্রের গবেষণাপত্র থেকেই করেছিলেন চুরি!

Round Table India-তে প্রকাশিত “Dr. Sarvepalli Radhakrishnan: The teacher who stole from his student’s thesis” শীর্ষক প্রবন্ধের অবলম্বনে

ভাষান্তর – স্নেহাশিস ব্যানার্জি

১৯২৯ সাল, জানুয়ারীর মাঝামাঝি, মীরাট কলেজের কোনও এক অখ্যাত বাঙালি তরুণ লেকচারার যদুনাথ সিংহ হঠাৎ লেখা চুরির অভিযোগ করে বসলেন ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ-এর নামে। যদুনাথ দাবী করলেন, তাঁর দুইখন্ডের গবেষণাপত্র ‘ইন্ডিয়ান সাইকোলজি অব পারসেপশন’, যেটি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্টুডেন্টশিপের জন্যে ১৯২২ ও ১৯২৩ সালে দুই কিস্তিতে জমা দেন, সেখান থেকে চুরি হয়েছে লেখা।

যদুনাথ সিংহ, ‘ফিলিপ স্যামুয়েল স্মিথ’ সম্মান ও ‘ক্লিন্ট মেমোরিয়াল’ সম্মানের সাথে ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক হন এবং ১৯১৭ সালে স্নাতকোত্তর পান। এরপরই তিনি ১৯২২ সালে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্টুডেন্টশিপের আবেদন করেছিলেন। যদুনাথ সিংহ তাঁর গবেষণা পত্রের বাকি কিস্তিগুলি ১৯২৫ সালে গবেষণা সম্পূর্ণ হওয়া অবধি ধাপে ধাপে জমা দিতে থাকেন এবং এই গবেষণা পত্রের জন্যেই তিনি ১৯২৩ সালে গ্রিফিথ সম্মান ও ১৯২৫-এ মুয়াট পদক পান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সেইসময় স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ সীল এবং ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ-কে যদুনাথ সিংহ-র প্রথম খন্ডের পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করে। স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ সীল, মাইশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বদলি হয়ে গেলে রাধাকৃষ্ণণ তাঁর জায়গায় ১৯২১ সালের মার্চ মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দি ফার্স্ট জর্জ ভি প্রফেসর অব মেন্টাল এন্ড মোরাল ফিলজফি’ হিসাবে নিযুক্ত হন। যদুনাথ-এর গবেষণা পত্রের দ্বিতীয় ও অন্যান্য খন্ডের পাঠ করার দায়িত্ব পান ডঃ রাধাকৃষ্ণণ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কৃষ্ণ চন্দ্র ভট্টাচার্য। যদুনাথের বক্তব্য অনুযায়ী, ডঃ রাধাকৃষ্ণণ-এর বই ‘ইন্ডিয়ান ফিলজফি ভলিউম ২’ ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হলেও, স্বত্ত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টা তিনি জানতে পারেন ১৯২৮ সালের নভেম্বর মাসে। ওই বছরেরই ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখ তিনি একটি চিঠি লিখে ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় এই প্রসঙ্গে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। চিঠিটি ওই পত্রিকার ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

ডঃ রাধাকৃষ্ণণ ১৯২৮ সালে আর একটি বই প্রকাশ করেছিলেন, ‘দি বেদান্ত অ্যাকর্ডিং টু শঙ্কর অ্যান্ড রামানুজ’ নামে, যেটি আসলে প্রফেসর যদুনাথ-এর বই ‘ইন্ডিয়ান ফিলজফি ভলিউম ২’-র অষ্টম ও নবম অধ্যায়ের পুনর্মুদ্রণ ছিল। এই মূল বইতেই তাঁর গবেষণা পত্র থেকে প্রচুর অনুচ্ছেদ হুবহু নেওয়া ছিল। সৌভাগ্যক্রমে, যদুনাথ সিংহ নিজের গবেষণা পত্রের কিছু অংশ ইতিমধ্যেই ১৯২৪ ও ১৯২৬ সালে মীরাট কলেজের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত করে ফেলেছিলেন।

প্রফেসর যদুনাথ সিংহ এই বিষয়ে মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় পরপর আরো তিনটি চিঠি লেখেন যেগুলি পত্রিকার ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারী, মার্চ ও এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তিনি নিজের দাবীর স্বপক্ষে তাঁর গবেষণা পত্র থেকে বিভিন্ন অংশ তুলে ধরেন যেগুলি ডঃ রাধাকৃষ্ণণ-এর চৌর্যবৃত্তি প্রমান করে চলেছিল। এদিকে ডঃ রাধাকৃষ্ণণও মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় পর পর দুটি চিঠি লিখে অভিযোগের উত্তর দেন, যেগুলো প্রকাশিত হয় সেই বছরেরই ফেব্রুয়ারী ও মার্চ সংখ্যায় কিন্তু তাঁর যুক্তি অনেকের কাছেই যুতসই লাগেনি। ফেব্রুয়ারী মাসে প্রকাশিত চিঠিটিতে ডঃ রাধাকৃষ্ণণ মডার্ন রিভিউ পত্রিকার সম্পাদক শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও যদুনাথ সিংহের নামে তাঁকে অপদস্থ করার অভিযোগ আনেন।

এলো ১৯২৯-এর আগস্ট মাস। যদুনাথ সিংহ এবার কলকাতা হাইকোর্টে স্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে, কুড়ি হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবী করে মামলা করে বসলেন ডঃ রাধাকৃষ্ণণ-এর নামে। বিপরীতে ডঃ রাধাকৃষ্ণণ এবার যদুনাথ সিংহ আর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়-এর নামে এক লক্ষ টাকার মানহানির মামলা করে বসলেন ১৯২৯-এর সেপ্টেম্বর মাসে।

ছাত্রাবস্থায় যদুনাথ, শিক্ষকদের এতটাই প্রিয় পাত্র ছিলেন যে, এম.এ. পরীক্ষার ফল বেরনোর আগেই রিপন কলেজে সহকারী অধ্যাপকের চাকরি পান। তিনি ১৯৩৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট পান। ভারতীয় ও হিন্দু দর্শন সংক্রান্ত তাঁর বহুমুখী লেখা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রকাশনা থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে।

যদুনাথ সিংহ-র ওপর বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসতে থাকে এই মামলা আদলতের বাইরেই আলোচনা করে মিটিয়ে ফেলার জন্য। অনেক প্রখ্যাত অধ্যাপক এই স্বত্ব লঙ্ঘনের বিষয় জানলেও যদুনাথ-এর পক্ষে দাঁড়িয়ে কোর্টে সাক্ষী দিতে রাজি হননি। যদিও এর একটা বড় কারণ ছিল ডঃ রাধাকৃষ্ণণ-এর ব্যাক্তিগত প্রভাব। রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-এর অভিন্নহৃদয় বন্ধু। শ্যামাপ্রসাদ-এর পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-ই ডঃ রাধাকৃষ্ণণ-কে ব্যাঙ্গালোর থেকে ডেকে এনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার টাকা মাইনের সম্মানীয় প্রফেসর পদে বহাল করেন। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ বারবারই এই মামলাটিকে নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে চেপে দিতে চেয়েছিলেন।

শেষমেশ হার মেনেছিলেন যদুনাথ। এই প্রবল চাপ ও লড়াই করার মতো তেমন আর্থিক সঙ্গতি না থাকার কারণে বাধ্য হলেন ‘আউট অফ কোর্ট’ সেট্‌লমেন্ট করতে। সম্ভবতঃ ১৯৩৩ সালে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির সামনে দুটো মামলারই ‘ডিক্রি’ জারি করে নিষ্পত্তি করা হয়। তবে কোন কোন শর্তে এই মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল তা আজও জানা যায়নি।

Leave a Reply