দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক হানাহানি এবং জাতি দাঙ্গা অবিলম্বে বন্ধ করো

২০১৯-এর লোকসভা ভোটের আগে কাশ্মীরের পুলওয়ামা ঘটনার কথা নিশ্চয়ই আমাদের সকলের স্মরণে আছে, যে ঘটনায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ৪২ জন জওয়ান মারা গিয়েছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জাতীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিপুলভাবে জয়যুক্ত হয়। যদিও সেই সময় অনেকেই এই পুলওয়ামা হামলার পিছনে আসল সত্যটা কি, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় জাতীয় উন্মাদনার আড়ালে তাদের সেই আওয়াজ চাপা পড়ে গেছিল। আজ জম্মু-কাশ্মীরের তৎকালীন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক যখন আবার পুলওয়ামা ঘটনার পিছনে আসল সত্যটাকে তুলে ধরেছেন, তখন যারা সেই সময় এই ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জাতীয় ভাবাবেগকে উস্কে দেওয়া এবং নির্বাচনে জেতার জন্য এই ঘটনাকে কাজে লাগানোর কথা বলেছিলেন, তাদের সেই বক্তব্য আজ সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। ২০১৯-এর ভোটের এক-দেড় বছর আগে থেকে আমরা আরো দেখেছি যে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুজাফ্‌ফরনগর সহ উত্তরপ্রদেশের উত্তর অংশে, হরিয়ানা, দিল্লি, এমনকি পশ্চিমবঙ্গেরও বিভিন্ন অংশে, যেমন – বসিরহাট, বাদুড়িয়া, আসানসোল, ধূলাগড়, জগদ্দল প্রভৃতি এলাকায় আরএসএস ও বিজেপির প্রত্যক্ষ মদতে সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিভিন্ন ঘটনা ঘটতে থাকে। এইভাবে মুসলিম বিরোধী এক হিন্দু জিগিরকে চাগিয়ে তুলে নির্বাচনে সেই সেন্টিমেন্টকে খুব ভালো ভাবে ব্যবহার করা হয়।

আবারও একটা লোকসভা ভোট আসতে চলেছে – ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আর মাত্র ৮-৯ মাস বাকি। আমরা যদি দেখি, ঠিক ২০১৯ এর মতনই আবারও দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হানাহানি, জাতিগত সংঘর্ষের এক পরিস্থিতি গত কয়েক মাস ধরে খুব সুন্দর ভাবে তৈরি করা হয়েছে। মণিপুরে গত কয়েক মাস যাবত কুকি ও মেইতেই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বীভৎস গৃহযুদ্ধের মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করলে খুব স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় যে এই পরিস্থিতি তৈরি করার পেছনে সেখানকার রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্র সরকার (উভয়ই বিজেপি দ্বারা পরিচালিত) এর প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। যে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলি ভারতের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কয়েক দশক ধরে সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন, আজ সেই উত্তর-পূর্ব ভারতে জাতিসত্তাগুলির নিজেদের মধ্যেকার আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা প্রধান রূপ হিসেবে সামনে উঠে আসছে। কখনো আসাম, কখনো ত্রিপুরা, কখনো মনিপুর, হয়তো এরপরে মিজোরাম – এইরকম বিভিন্ন রাজ্যে জাতিসত্তাগুলির মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ককে বিষিয়ে দিয়ে, তাদের মধ্যে চিরস্থায়ী দ্বন্দের সৃষ্টি করতে পারাটা ভারত রাষ্ট্র, বিশেষ করে আরএসএস-বিজেপির বড় সাফল্য। এইভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীগুলির মধ্যে আরএসএস-বিজেপির প্রভাব যেমন বাড়ছে, তেমনই সেখানে কর্পোরেট লুণ্ঠন চালানোর উর্বর জমিও তৈরি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কয়েকদিন ধরে দিল্লি-হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ সীমান্তে হিন্দু উগ্রবাদীদের দবদবা চলছে। যেকোনো মানুষজনকে রাস্তাঘাটে আটকে তার ধর্ম পরিচয় দিতে বাধ্য করা, জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানো ইত্যাদি বিভিন্ন ঘটনা আগেই বহুবার সামনে এসেছে। কয়েকদিন আগে থেকে গুরগাঁওয়ে যে সাম্প্রদায়িক হিংসার পরিস্থিতি আরএসএস-বিজেপির প্রত্যক্ষ মদতে তৈরি হয়েছে, তা আবার দেশজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বাঙালি জাতির যে সমস্ত মানুষরা গুরগাঁওয়ে থাকেন বা কাজ করেন, তাদের ওপরও এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বাঙালি মানেই বাংলাদেশি মুসলিম – এইরকম একটা ন্যারেটিভ তৈরি করে তাদের মারধর করা, গালিগালাজ করা, আবাসস্থল থেকে বের করে দেওয়া ইত্যাদি ঘটনা চলছে। গুরগাঁও ভারতের কর্পোরেট সেক্টরের অন্যতম হেডকোয়ার্টার – সেখানে যদি হিন্দুত্ববাদীরা এরকম আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে আরএসএস-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনের উপর কি পরিমান মানসিক চাপ এবং শারীরিক অত্যাচার চলছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। উত্তরপ্রদেশে বেছে বেছে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষদের ঘরবাড়ি বুলডোজার ব্যবহার করে গুড়িয়ে দেওয়ার ‘এক নতুন তথাকথিত ন্যায় নীতি’-র ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং এই ‘বুলডোজার জাস্টিস’ এখন আসাম, হরিয়ানার মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতেও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে ব্যবহার করা হচ্ছে। কলকাতা হাইকোর্ট সাম্প্রতিক এক রায় দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছে যে অন্যায়কারীদের বাড়িঘর রাজ্য সরকার কেন বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতে পারছে না? অর্থাৎ যে আদালতের কর্তব্য ছিল রাজ্য সরকারগুলির এই ধরনের অসংবিধানিক কাজকর্মের বিরোধিতা করা তারাই সরকারগুলিকে ‘বুলডোজার জাস্টিস’ লাঘু করার জন্য উস্কানি দিচ্ছে! এমনকি যেসব রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, সেইসব রাজ্যগুলোতেও নির্বাচনে হিন্দু ভোটকে সংহত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ চালাতে পারে বলে ইতিমধ্যে অনুমান করা যাচ্ছে। সত্যপাল মালিক যেরকম বলেছেন যে ২০২৪ এর নির্বাচনে জেতার জন্য প্রয়োজন পড়লে বিজেপি এমনকি রাম মন্দিরেও বোমা রেখে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে! অভিন্ন দেওয়ানী বিধি লাঘু করবার যে প্রক্রিয়া মোদি সরকার শুরু করেছে তাতে খুব স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তাদের স্বকীয়তা ধ্বংস হবার এক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি জ্ঞানব্যাপী মসজিদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যে সার্ভের কাজ শুরু হয়েছে তার অবধারিত পরিণাম হিসেবে সেখানে ‘মন্দির’ আবিষ্কৃত হবে এবং তার ফলস্বরূপ অযোধ্যার বাবরি মসজিদের মতো আরেকটি ঘটনা ঘটার প্রভূত সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

সংসদীয় বিরোধী দলগুলি (যেগুলি এখন আবার ‘ইন্ডিয়া’ নামক জোট তৈরি করেছে!) কেন্দ্র সরকার এবং বিজেপির দেশজোড়া এই পরিকল্পিত নাশকতার ছকের মৌখিক বিরোধিতা করলেও, যে সমস্ত রাজ্যে তারা নিজেরা ক্ষমতায় রয়েছে, সেখানে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তারা নিজেরাও কখনো নরম হিন্দুত্বের তাস ব্যবহার করে, কখনো বা জাতিগত এবং জাতপাতগত বিভিন্ন সমীকরণকে উসকে দিয়ে বিভেদ, বিরোধ, তিক্ততা এমনকি হিংসার পরিস্থিতিও সৃষ্টি করে। আর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের তো নেলি গণহত্যা থেকে শুরু করে শিখ গণহত্যা – এরকম বহু সাম্প্রদায়িক হিংসা ও দাঙ্গার ঘটনায় হাত পাকানোর পুরনো ইতিহাস রয়েছে।

এরকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সংসদীয় ধারার বাইরের বিভিন্ন দল, সংগঠন এবং ব্যক্তিবর্গকে আরো বেশি করে সক্রিয় হতে হবে এবং দাঙ্গা সৃষ্টিকারী ও তাদের মদত দাতাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একমাত্র এর মধ্যে দিয়েই সাম্প্রদায়িক হিংসা তথা জাতিগত সংঘর্ষের ঘটনাকে বন্ধ করা যেতে পারে।


লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৩ সংখ্যায়


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://scroll.in/article/1026701/data-check-in-seven-years-india-saw-a-500-rise-in-cases-filed-under-its-hate-speech-related-law [Retrieved On: 10/09/2023]

Leave a Reply