দেশভাগ ও সমসাময়িক সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ সৃষ্টিতে বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণীর ভূমিকা

“দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে আগে কখনো এমন ঘটেনি যে এত অল্প কয়েকজনের হাতে এতটা বিরাট সংখ্যক জনগণ এতটা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিভাজিত হয়েছেন।”
– মুশিরুল হাসান, ইতিহাসবিদ

ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজন, বা সংক্ষেপে দেশভাগ হলো এমন একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যা এখনও এই এলাকার ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করে চলেছে। কাশ্মীরে অনুচ্ছেদ-৩৭০ বাতিল করাই হোক বা এনআরসি-এনপিআর-সিএএ – এই ধরনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের শিকড় খুঁজতে গেলেও পৌঁছে যেতে হবে সেই দেশভাগে। লক্ষ লক্ষ নিরীহ প্রাণের বিনিময়ে ভারতীয় উপমহাদেশকে ভাগ করে এই যে ‘ভারত’ আর ‘পাকিস্তান’ নামে দুটো আলাদা রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল সেই বিষয়ে মূলধারার চর্চায় মূলত জিন্না আর তাঁর মুসলিম লীগ-কেই দায়ী করা হয়, খলনায়ক হিসাবে দেখানো হয়। তথাকথিত স্বাধীনতার পর থেকে দেশের শাসক কংগ্রেস এই একতরফা প্রচারই চালিয়ে এসেছে, গোটা প্রক্রিয়ায় নিজের ভূমিকাকে আড়ালে রেখে। অন্যদিকে, উগ্র দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলোর নির্বাচনী মুখ – বিজেপি – নিজেদের পূর্বসূরীদের ভূমিকা চেপে গিয়ে ‘অখণ্ড ভারত’-এর অযৌক্তিক দাবিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। গত দুই বছর ধরে ভারতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ভারতের স্বাধীনতার আগের দিন অর্থাৎ ১৪-ই অগাস্ট দিনটাকে, যে দিনটা পাকিস্তানে স্বাধীনতা দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়, সেই দিনটাকে ‘দেশভাগ বীভৎসতা স্মরণ দিন’ নাম দিয়ে সেটার আড়ালে বিকৃত সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চা শুরু করেছে। সেদিনও যেমন শাসকশ্রেণী লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের তোয়াক্কা করেনি, আজকেও দেশভাগের শিকার সেই মানুষদের স্মৃতিকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে শাসকশ্রেণীর সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে। তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়েও শাসকশ্রেণীর শ্রেণী-চরিত্রের আলোকে দেশভাগের ইতিহাসকে বোঝার প্রয়োজন আছে।

গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম সশস্ত্র প্রতিরোধের একটা বাতাবরণের মধ্যে ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের আবির্ভাব হয়েছিল একটা “সেফটি ভাল্‌ভ” হিসাবে, যেমনটা তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেক্রেটারি তথা কংগ্রেস দলের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালান অক্টাভিয়াস হিউম নিজেই বলেছিলেন –

আমাদের নিজেদের কর্মকান্ডের কারণে যে বিশাল ও ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ তৈরি হয়েছে সেটার নির্গমনের জন্য জরুরীভাবে একটা নিরাপত্তা ভাল্‌ভ প্রয়োজন, এবং আমাদের কংগ্রেস আন্দোলনের থেকে আরও বেশি কার্যকরী কোনও নিরাপত্তা ভাল্‌ভ তৈরি করা সম্ভব নয়।

কিছু ব্যতিক্রমী বিপ্লবী অংশের কার্যকলাপ বাদ দিলে কংগ্রেসের পরবর্তী ইতিহাসটা হলো এই ‘সেফটি ভাল্‌ভ’-এরই ইতিহাস, ‘অহিংস’ প্রতিরোধের মোড়কে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির ইতিহাস। এই কংগ্রেস দল ও তার আদর্শকে প্রভাবিত ও আর্থিক সাহায্য প্রদান করত দেশীয় জমিদার, মহাজন, এবং মাড়োয়ারি-গুজরাটি-পার্সি বৃহৎ পুঁজিপতিদের শ্রেণী। বাংলায় পাটের ব্যবসার একটা বড় অংশ ছিল এই পুঁজিপতিদের হাতে। যে পাটের দামের উপর অসংখ্য বাঙালি কৃষকের জীবন নির্ভর করত সেই দাম নিয়ন্ত্রিত হতো কলকাতার বড়বাজার থেকে; সেখানে পাটের দাম নিয়ে ফাটকাবাজি করতেন এই পুঁজিপতিরা, দাম যথাসম্ভব কমানো হতো, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ত কৃষকদের জীবনে। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের ‘কল্যাণে’ বিশ্বজুড়ে যখন পাটের চাহিদা ভীষণরকম বৃদ্ধি পায় তখন এই পুঁজিপতিরা আকাশছোঁয়া লাভ করেন। তাই সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল তাঁদের স্বার্থ। সেই কারণে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘটনাকে ঘিরে বাংলায় যে ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল কলকাতার মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা, কারণ ব্রিটিশ পণ্য বর্জন মানে তাদের ব্যবসা লাটে ওঠা। এই শ্রেণীটাই আবার ১৯৪০-এর দশকে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পক্ষে গলা ফাটিয়েছিলেন, এবং প্রদেশগুলোর উপর “কর্তৃত্ব ফলানোর ক্ষমতা” ভোগ করা একটা শক্তিশালী কেন্দ্রসমেত “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ” রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁদের ব্যবসার একটা উল্লেখযোগ্য বাজার হিসাবে। তাই এতে খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু নেই যে গান্ধীর আশ্রম ও অন্যান্য সংগঠন, এবং সাথে তাঁর রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক প্রচারে উল্লেখযোগ্যভাবে আর্থিক সাহায্য করতে থাকা প্রখ্যাত পুঁজিপতি জি. ডি. বিড়লা মহাশয় গান্ধী ও কংগ্রেসের উপর দেশভাগে রাজী হয়ে যাওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতেন। এমনকি প্যাটেল-কে তিনি এই পরামর্শও দিয়েছিলেন যে –

হিন্দুস্তান-কে আমাদের হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে এবং হিন্দু ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসাবে বিবেচনা করা উচিত।

বিড়লা-র মতো টাটা ও অন্যান্য মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ারাও ১৯৪৫ সালের মধ্যেই দেশভাগের সমর্থনে নিজেদের মত প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছিলেন।

বাংলাতে দেশভাগের প্রশ্নটা একটা জটিল আকার ধারণ করেছিল, কারণ সেখানে স্বাধীন ও সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলা রাষ্ট্র গঠনের একটা তীব্র দাবি উঠেছিল, যা দেশভাগের পর ভারত বা পাকিস্তান কারো সাথেই যুক্ত হতো না। এমনটা হলে আর কিছু হোক না হোক অন্তত অসংখ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এড়ানো যেত, লক্ষ লক্ষ নিরীহ প্রাণ বেঁচে যেত। জিন্না-র নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ সেই দাবি মেনে নিতে রাজী থাকলেও রাজী ছিল না কংগ্রেস উচ্চ নেতৃত্ব ও তাদের পিছনে থাকা পুঁজিপতি শ্রেণী। মজার বিষয় হলো এই দাবির পুরোধা ব্যক্তিরা ছিলেন শরৎ বসু (সুভাষচন্দ্র বসু-র দাদা), কিরণ শঙ্কর রায় প্রমুখ বাংলা কংগ্রেসের নেতারাই। অতীতে নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের একাধিক জ্বলন্ত উদাহরণ বাংলার বুকে দেখা তো গেছেই, সাথে ১৯২০-র দশক থেকে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি একটা ঝোঁক-ও সেখানে লক্ষ্য করা গেছিল। ‘বামপন্থী’-রা কংগ্রেসকে দখল করে নিতে পারে এমন একটা ভয় ব্রিটিশ রাজ থেকে শুরু করে পুঁজিপতি শ্রেণী ও কংগ্রেস উচ্চ নেতৃত্ব সকলেরই ছিল! সেই আবহে বাংলা কংগ্রেসের নেতারা পুঁজিপতিদের হাতে বাঙালিদের স্বার্থকে পুরোপুরিভাবে বিকিয়ে দিতে পারেননি বলে গান্ধী-নেহরু-র ‘অসহযোগিতা’-র শিকার হতে হয়েছিল বাংলা কংগ্রেসকে। পরিণামে ১৯৩৭ সালের প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনে বাংলা কংগ্রেস সবথেকে বেশি আসন পেলেও জোট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে লীগ-এর থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি প্রগতিশীল কৃষক প্রজা পার্টি-র সাথে জোট করার সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়নি কংগ্রেস উচ্চ নেতৃত্বের তরফ থেকে। কারণ, পুঁজিপতিরা চেয়েছিলেন লীগ-প্রজা জোট সরকারের অধীনে ধীরে ধীরে গোটা বাংলাকে সাম্প্রদায়িক বাতাবরণের মধ্যে ঠেলে দিয়ে মেহনতি জনগণের ঐক্যে চিড় ধরাতে। “ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ”, “কাঁচা পাটের একটা ন্যূনতম মূল্য ঠিক করার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া” ইত্যাদি দাবি ইতিমধ্যেই বাংলার বুকে উঠতে শুরু করে দিয়েছিল। বাংলার মন্ত্রীসভায় থাকলে এই দাবিগুলোতে কিছুটা হলেও সদর্থক ভূমিকা পালন করতে হতো কংগ্রেসকে, যা স্বাভাবিকভাবেই জমিদার ও পুঁজিপতি শ্রেণীর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করত। তার থেকে বাংলাকে সাম্প্রদায়িকতার আগুনে পুড়তে দেওয়াটাই বেশি পছন্দ করেছিলেন কংগ্রেস উচ্চ নেতৃত্ব, এমনকি বাংলা কংগ্রেসের বিবেচনার বিরুদ্ধে গিয়েও। আর এব্যাপারে কংগ্রেস উচ্চ নেতৃত্বকে প্রভাবিত করতে প্রাণপাত পরিশ্রম করছিলেন জি. ডি. বিড়লা ও নলিনী রঞ্জন সরকার-এর মতো গান্ধী-ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতিরা। মজার ব্যাপার হলো এই নলিনী সরকার-এর ঘরেই লীগ-প্রজা মৈত্রী চুক্তি হয়ে বাংলার প্রথম মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, যেখানে অর্থমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেন নলিনী সরকার।

এপ্রসঙ্গে, ১৯৩৮ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের একটা ঘটনাক্রমের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলার সাম্প্রদায়িক বাতাবরণকে দূর করে অবিলম্বে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে এমনকি সুভাষচন্দ্র বসু-ও গান্ধী-কে চিঠি লিখে কৃষক প্রজা পার্টি-র বিদ্রোহী অংশের সাথে জোট সরকার গঠনের কথা বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেন। অনেক আলাপ-আলোচনার পর গান্ধী সম্মতও হয়েছিলেন; কিন্তু বিড়লা, নলিনী সরকার প্রমুখরা গান্ধীর আশ্রমে গিয়ে তাঁকে প্রভাবিত করায় তিনি শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাব খারিজ করেন, এবং বিড়লা-র হাত দিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়ে সুভাষকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। সুভাষচন্দ্র উত্তরে গান্ধী-কে জানান –

আমি ওয়ার্ধা ছেড়ে যাওয়ার পর এমন কি ঘটল যার জন্য আপনি সিদ্ধান্ত বদলালেন সেটা আমার জানা নেই। … তবে বোঝাই যাচ্ছে, তাঁদের [বিড়লা, আজাদ ও নলিনী] সাথে কথা বলার পর আপনি সিদ্ধান্ত বদলেছেন। এথেকে বলা যায় যে ওই তিনজন ভদ্রলোকের বিবেচনাকেই আপনি বেশি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন, যাঁরা বাংলায় কংগ্রেসের সংগঠন চালাচ্ছে তাঁদের বিবেচনাকে নয়…।

শরৎ বসু-র প্রাইভেট সেক্রেটারি নীরদ চৌধুরী-ও লিখেছেন যে “বাংলার হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যাতে ঐক্য না গড়ে উঠতে পারে সেটাই ছিল বিড়লার মুখ্য উদ্দেশ্য। … ইংরেজদের কৌশলই মাড়োয়ারিরা গ্রহণ করেছিল।” বাংলায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্য হলে কলকাতায় মাড়োয়ারিদের অর্থনৈতিক প্রভাব যে ক্ষুণ্ণ হতো সেটা বিড়লা খুব ভালো করেই জানতেন। ভারতে সাম্প্রদায়িক ‘হিন্দুত্ব’ রাজনীতির জনক সাভারকার-এর সভাপতিত্বে ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় যখন হিন্দু মহাসভা-র বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তখন তার পৃষ্ঠপোষক হয়েছিলেন যুগল কিশোর বিড়লা (জি. ডি. বিড়লা-র বড় ভাই), বদ্রীদাস গোয়েঙ্কা, বংশীধর জালান, কানোরিয়া, খইতান এবং অন্যান্য বড় বড় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর দল। আর এই শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই পরবর্তীকালে স্বাধীন-সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলা রাষ্ট্রের দাবিকে খারিজ করে দেয় কংগ্রেসের উচ্চ নেতৃত্ব। বৃহত্তর বাংলা রাষ্ট্রের ব্যাপারে বিড়লা নিজের আপত্তির কথা খোলাখুলিই গান্ধীকে জানিয়েছিলেন; সেই গান্ধী যাঁকে এমনকি ব্রিটিশ পুঁজিপতি এডওয়ার্ড বেন্থাল পর্যন্ত নিজের ডায়েরিতে বিড়লা-র ‘আজ্ঞাবহ ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন!

মুসলিম মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের অবস্থানটাও যে আলাদা কিছু ছিল না সেটা ইস্পাহানি ও অন্যান্য মুসলিম ব্যাবসায়ীদের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়। বাংলায় লীগের সাংগাঠনিক বিস্তার ঘটানোর জন্য মুসলিম লীগ-এর তরফে ইস্পাহানি-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। লীগ ওয়ার্কিং কমিটির একজন সদস্যও ছিলেন তিনি। এছাড়া, বিড়লা যেমন গান্ধী-ঘনিষ্ঠ ছিলেন তেমনই জিন্না-র অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন ইস্পাহানি। “মুসলিমদের স্ব-উন্নয়ন” এবং “মুসলিমদের আর্থিক স্বাধীনতা” ইত্যাদি বুলির আড়ালে এই মুসলিম পুঁজিপতিরা পাকিস্তান তৈরির মধ্যে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখেছিলেন, এমনকি সেই পাকিস্তান “পোকায়-খাওয়া” হলেও। কারণ সেখানে তাঁদের প্রতিপক্ষ মাড়োয়ারি-গুজরাটি-পার্সি ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হতো না। ১৯৪৬ সালের অগাস্ট মাসে লীগ-এর সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলি ভাইসরয় পরিষদের একজন সদস্যের কাছে এই মনোভাবের কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন –

যতদিন ভারতের যেকোনো জায়গায় মাড়োয়ারি ও অন্যান্য হিন্দু পুঁজিপতিদের একচেটিয়া আর্থিক আধিপত্য থাকবে, ততদিন মুসলিমরা কখনই নিজেদের উন্নতি করতে পারবে না।

এমনকি তৎকালীন ভাইসরয় এবং গভর্ণর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া লর্ড ওয়াভেল একজন ব্রিটিশ লেবার দলের রাজনীতিবিদ পেথিক-লরেন্স-কে লিখেছিলেন –

ভারতে শিল্পের উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের গোটা প্রশ্নটা এখানকার রাজনৈতিক সমস্যার সাথে জড়িয়ে আছে… পাকিস্তান প্রদেশের মুসলিমরা মনে করেন যে হিন্দু কেন্দ্রের অধীনে তাঁদের শিল্পের উন্নয়নকে কঠোরভাবে দমিয়ে রাখা হবে।

অর্থ সাহায্যকারী ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতিদের স্বার্থ অনুযায়ী লীগের সাম্প্রদায়িক নেতারাও “ইসলাম খতরেমে হ্যায়” স্লোগান তুলে মুসলিম জনমতকে প্রভাবিত করেন এবং তাঁদের দিক থেকে দেশভাগের রাস্তা প্রশস্ত করেন।

দেশভাগের প্রাক্কালে কংগ্রেস-লীগ-পুঁজিপতি প্রতিক্রিয়াশীলদের সমস্ত সাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টার মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে জনগণ ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে দিকে দিকে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৪৬-এর ফেব্রুয়ারিতে নৌ-বিদ্রোহীদের সমর্থনে বম্বের শ্রমিক শ্রেণী ও বিপ্লবী জনগণ রাস্তায় নেমে পড়লে তার বিরুদ্ধে কংগ্রেস-লীগ নেতারা ভাষণ থেকে শুরু করে ব্রিটিশরাজকে ‘স্বেচ্ছাসেবক’ বাহিনী যোগানো ইত্যাদি সমস্তরকম চেষ্টা করেও কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকেই ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি-র কৃষক সংগঠন অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভা-র নেতৃত্বে কৃষকরা জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের দাবিতে যে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন, তা ১৯৪৬-৪৭ সালে গ্রামীণ বাংলায় তেভাগা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে একটা বিরাট আকার ধারণ করে। “লাঙল যার জমি তার” – এই বৈপ্লবিক দাবি নিয়ে গ্রামবাংলার হিন্দু-মুসলিম কৃষক ঐক্যবদ্ধভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জমিদারদের অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন। একইভাবে, শহরের মিল ও কারখানা থেকে হাজার হাজার শ্রমিক একের পর এক ধর্মঘট সংগঠিত করেছিলেন, নিজেদের ধর্মীয় বিভেদকে দূরে সরিয়ে রেখে। এমনকি বিড়লা-কেও আতঙ্কিত হয়ে বলতে হয়েছিল – “সর্বত্র ধর্মঘট চলছে। … সমস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বসে পড়ে যাবে মনে হচ্ছে।” হিউম-এর ভাষায় “বিশালাকার নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সাবধানে রাজনীতির একটা হালকা ও অহিংসক টীকা লাগানো”-র উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি কংগ্রেস এবং তার মেরুদণ্ড জমিদার-পুঁজিপতি শ্রেণীর স্বার্থের পক্ষে এহেন এক বৃহত্তর বাংলা রাষ্ট্রের দাবি নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর! তাই সেই শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে মেহনতি জনগণের ঐক্যে চিড় ধরাতে হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ – সবাই মিলেমিশে এক হয়ে যায়। তাই শ্যামাপ্রসাদ যখন বলছেন পাকিস্তান হোক আর না হোক বাংলা ভাগ হবেই এবং নেহরু-কে চিঠি লিখে বাংলা ভাগের পক্ষে ওকালতি করছেন তখন নেহরু-ও অকপটে জানাচ্ছেন যে ভারতের বাইরে সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্রের ধারণাটা তাঁরও পছন্দ নয়, তাতে বাংলা ভাগ হয় হোক; সাথে দিল্লীতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মিটিঙয়ে নেহরু তাঁকে আমন্ত্রণও জানাচ্ছেন। তাই কংগ্রেস উচ্চ নেতৃত্ব ও তাঁদের পিছনে থাকা পুঁজিবাদী শক্তি যে পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করতে একেবারে বদ্ধপরিকর সেটা বুঝতে পেরে বাংলাভাগ আটকাতে যখন বাংলা কংগ্রেসের নেতারা ছাড়াও সুরাবর্দি, খাজা নাজিমুদ্দিন, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এগিয়ে এসেছিলেন, তখন উল্টোদিকে কলকাতায় বৃহৎ পুঁজিপতিদের সভায় বাংলা ভাগের প্রস্তাব আনতে ব্যস্ত ছিলেন নলিনী সরকার, বি. এম. বিড়লা, গোয়েঙ্কা, জালান, ভি. সি. ড্রাইভার, এম. এল. শা প্রমুখরা। তাই আমরা দেখতে পাই মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান গ্রহণ করে নেওয়ার জন্য বিড়লা মহাশয় খুশিতে গদগদ হয়ে প্যাটেল-কে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলছেন –

আপনি যা চেয়েছিলেন সেভাবেই সব ঘটেছে সব ঘটেছে… বাংলাকে ভাগ করার প্রশ্নটাও যে আপনি সমাধান করেছেন তার জন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত।

সংযুক্ত বাংলা আন্দোলনের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা আবুল হাসিম সমসাময়িক ঘটনাক্রম সম্বন্ধে সংবাদপত্রে একটা দীর্ঘ বিবৃতিতে যথার্থই বলেছিলেন –

একশো ভাগ বিদেশী-ভারতীয় ও ইঙ্গ-মার্কিন পুঁজি যা বাংলাকে শোষণ করছে তা পশ্চিমবঙ্গে লগ্নি হয়েছে। … মুক্ত ঐক্যবদ্ধ বাংলায় তাদের যে অসুবিধা হবে তা উপলব্ধি করার মতো বিচক্ষণতা তাদের আছে। বিদেশী পুঁজির স্বার্থে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত, পঙ্গু এবং ক্ষমতাহীন করতে হবে যাতে শোষণকে প্রতিহত করার শক্তি বাংলার কোনো অংশের না থাকে। … একটি স্বাধীন দেশের সকল গুণসম্পন্ন ঐক্যবদ্ধ ও সার্বভৌম বাংলা গঠনের জন্য প্রগাঢ় দেশপ্রেমই সমাধান, বাংলার বিভক্তিকরণ নয়।

সিন্ধ, নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স এবং বালুচিস্তানের ক্ষেত্রেও ঘটনাপ্রবাহ একইরকম। সেখানে তাঁদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দু-পার্সি-মুসলিম ব্যবসায়ীদের স্বার্থ অনুযায়ী।এমনকি স্বতন্ত্র পাঞ্জাব ও বাংলা রাষ্ট্রের জন্য গণভোটের দাবিকেও যাতে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা যায় তার জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখটাও প্রথমে ১৯৪৮-এর জুন থেকে এগিয়ে ১৯৪৭-এর ১ অক্টোবর এবং তারপর আরও এগিয়ে ১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ করা হয়েছিল। টেবিলের উপর ম্যাপ রেখে তার উপর লাইন চালিয়ে পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করেছিলেন র‍্যাডক্লিফ, যিনি এলাকাগুলোকে কখনো চোখেই দেখেননি। তাই আজ যখন নেহরু, প্যাটেল ও শ্যামাপ্রসাদ-এর উত্তরসূরীরা দেশভাগ নিয়ে সংসদে একে অপরের দিকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির নাটক মঞ্চস্থ করেন তখন বিড়লা-গোয়েঙ্কাদের উত্তরসূরীরাও যে পর্দার আড়ালে মুচকি হাসেন সেকথা বলাই বাহুল্য!

দেশভাগ কখনই সধারণ হিন্দু ও মুসলিম জনগণের দাবি ছিল না। তাঁরা শুধু যে একে ওপরের সাথে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করতেন তা নয়, পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিকবার ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ ঘোষণাও করেছিলেন। এমনকি ১৯৪০-এর পাকিস্তান প্রস্তাবটাও যে জিন্না-র মস্তিষ্কপ্রসূত কোনো নতুন ধারণা সেকথাও বলা চলে না। ১৮৬০-এর দশকের হিন্দু জাতীয়তাবাদের ঢেউ থেকে শুরু করে ১৯৩০-এর দশকে সাভারকার-এর ভাষণ পর্যন্ত অনেক জায়গাতেই দ্বি-জাতি তত্ত্বের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায়। বরং, একথা উল্লেখ করতে হয় যে ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের সাফল্যের পর, যখন ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রাম একটা বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করছিল, যখন দেশের দিকে দিকে সামন্ত-বিরোধী কৃষক আন্দোলন এবং পুঁজিপতিদের নাড়িয়ে দেওয়ার মতো শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন কিছু উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি করছিল, ঠিক তখনই প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে সামনের সারিতে নিয়ে আসা হয়, জনগণকে ধর্ম-সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভাগ করে তাঁদের উপর একই প্রকার শাসন চালিয়ে যাওয়ার জন্য। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের পিছনে পূর্ণ সমর্থন ও আর্থিক সাহায্য জুগিয়েছিল মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় উপমহাদেশে নয়া-উপনিবেশ স্থাপন করার যে স্বপ্ন তাঁদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা দেখেছিলেন সেটাই পূরণ করা ছিল এই শ্রেণীর উদ্দেশ্য। ঠাকুরদাস-টাটা-বিড়লা কর্তৃক ১৯৪৪ সালে রচিত বম্বে প্ল্যান সেই ইঙ্গিতটাই বহন করে। ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অজুহাতে এই পরিকল্পনাটা আসলে ছিল তাঁদের নিজেদের ও বিদেশী পুঁজিপতিদের, বিশেষ করে ব্রিটিশদের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করার নির্দেশিকা। পরবর্তীকালে বিদেশী পুঁজির জোয়ার ও একাধিক জন-বিরোধী নীতির প্রণয়ন এটাই প্রমাণ করে যে সেই নির্দেশিকার সার্থক রূপায়ন ঘটানো হচ্ছে ‘সার্বভৌম’ ও ‘প্রজাতান্ত্রিক’ ভারতে। সুতরাং, এককথায় বলতে গেলে, দেশভাগ ছিল হিন্দু ও মুসলিম মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের দ্বারা পরিচালিত, কংগ্রেস-মহাসভা-লীগ কর্তৃক অভিনীত একটা প্রোজেক্ট, যে প্রোজেক্টের ‘সুফল’ আজকের দিনেও তাঁদের উত্তরসূরীরা নিজ নিজ রাষ্ট্রে ভোগ করে চলেছেন, মেহনতি জনগণকে ধর্ম-সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভাগ করে শাসন ও শোষণ করার মাধ্যমে।


One thought on “দেশভাগ ও সমসাময়িক সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ সৃষ্টিতে বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণীর ভূমিকা

Leave a Reply