বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বেসরকারিকরণ আর বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। যার স্বাভাবিক পরিণাম হলো আকাশছোঁয়া ফি-কাঠামো, গুণমানসম্পন্ন শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সমান সুযোগের ব্যবস্থা না করা (বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের গোষ্ঠীর জন্য), এবং সমাজে অসমতা ও বৈষম্যকে আরও প্রশ্রয় দেওয়া। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) ২০২০-তে ঘোষণা করা হয়েছে যে – “জ্ঞান সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনের ভিত্তি তৈরি করতে হবে উচ্চ শিক্ষার দ্বারা, যাতে একটা বিকাশশীল জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা যায়। গুণমানসম্পন্ন উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্য তাই ব্যক্তিগত কর্মসংস্থানের জন্য অধিকতর সুযোগ তৈরির থেকে বেশি।” আবার “স্থানীয় ভাষায় শিক্ষাদান করে এমন উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানের অভাব, বিশেষ করে আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায়” – সেটা নিয়ে আক্ষেপও করা হয়েছে এই নীতিতে। ভারতে উচ্চ শিক্ষার এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কারোরই মতভেদ থাকার কথা নয়। তাই এনইপি ২০২০ থেকে স্বাভাবিকভাবেই আশা থাকার কথা অনেক। কিন্তু খতিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে যে এই ভালো ভালো কথার আড়ালে আসলে বেসরকারিকরণ আর বাণিজ্যিকীকরণের রাস্তাকেই আরও প্রশস্ত করা হয়েছে। তাই এনইপি ২০২০-র সেই দিকগুলো নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। নিচে পয়েন্ট আকারে সেই দিকগুলোকে তুলে ধরা হলো।
১) এনইপি ২০২০-তে বেশ জোরের সাথে বলা হচ্ছে যে – “উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই নীতির সর্বোচ্চ সুপারিশ হলো বড় বড় মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস্টার তৈরি করা”। স্পষ্ট বলা হয়েছে – “একক স্ট্রীমের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সাথে সাথে মুছে যাবে, এবং প্রাণবন্ত মাল্টিডিসিপ্লিনারি প্রতিষ্ঠানে বা সেগুলোর অংশে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে।” কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে যে স্থানীয় কলেজগুলোর বিলুপ্তি ঘটবে এবং পরিণামে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে অনেকেই বঞ্চিত হবে, বিশেষ করে মেয়েরা, সেই ব্যাপারে এই নীতিতে কোনো ভাবনাচিন্তা করা হয়নি।
২) স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে এনইপি ২০২০-তে বলা হয়েছে – “অ্যাক্রেডিটেশানের একটা স্বচ্ছ ব্যবস্থার মাধ্যমে কলেজগুলোকে পর্যায়ক্রমে গ্রেডেড অটোনমি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।” কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে স্বায়ত্তশাসনের আড়ালে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক সাহায্য কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ফি কাঠামো নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষা হয়ে উঠছে ব্যয়বহুল এবং ক্রমেই সেটা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।
৩) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওপেন ডিস্ট্যান্স লার্নিং এবং অনলাইন প্রোগ্রাম চালু করার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে এই নীতিতে। অথচ অতিমারীর সময়ে আমরা দেখেছি যে কিভাবে এই অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে; একদিকে কিছু মুষ্টিমেয় পড়ুয়ার কাছে ভালো মানের ইন্টারনেট সংযোগ থাকার ফলে তারা শিক্ষালাভ করতে পেরেছে, আর অন্যদিকে অধিকাংশ পড়ুয়ার কাছেই সেই সুযোগ না থাকায় শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত থেকেছে।
৪) স্নাতক স্তরের ডিগ্রীর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে সেটা তিন বা চার বছরের জন্য হবে এবং সেই সময়ের মধ্যে যথাযথ শংসাপত্রের সাথে একাধিক এক্সিট পয়েন্ট থাকবে। দাবি করা হয়েছে যে এই পদক্ষেপের ফলে উচ্চ শিক্ষায় তালিকাভুক্তির সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু ডিগ্রী প্রোগ্রাম থেকে ইচ্ছামতো বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিলে পড়ুয়াদের মধ্যে সেই নির্দ্দিষ্ট বিষয়ে সম্যক ধারণার যে একটা অভাব তৈরি হবে এবং সেটা যে তাদের ভবিষ্যতে একটা দীর্ঘকালীন প্রভাব ফেলবে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কোনো ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে না।
৫) উচ্চশিক্ষায় মানুষের সুযোগ এবং সমতা বৃদ্ধি করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রকার উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানেই সোসিও-ইকনমিকালি ডিসঅ্যাডভান্টেজ্ড গ্রুপ্স (এসইডিজি) এর পড়ুয়াদের আরও বেশি করে স্কলারশিপ দেওয়ার উপরেই প্রধানত জোর দেওয়া হয়েছে এনইপি-তে। গ্রামীণ পড়ুয়াদের কাছ পর্যন্ত উচ্চ শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও হোস্টেল সুবিধা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। অথচ, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো সমেত আরও বেশি সংখ্যায় সরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা এবং নিম্ন ফি-কাঠামো নিশ্চিত করলেই যে সকল আর্থিক শ্রেণীর পড়ুয়াই মর্যাদার সাথে বৈষম্যহীন একটা পরিবেশে শিক্ষার সুযোগ পাবে সেই কথাটা এনইপি ভাবতে নারাজ।
৬) এমনকি উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যাপকদের নিয়োগ করার বিষয়েও এনইপি ২০২০-তে বলা হয়েছে যে বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি একটা ‘টেনিওর-ট্র্যাক’ ব্যবস্থাও চলবে যেখানে “উৎকর্ষতা নিশ্চিত করতে” একটা যথাযথ “প্রোবেশান পিরিয়ড” বা শিক্ষানবিস কাল ঠিক করে দেওয়া হবে। বলাই বাহুল্য যে এতে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যাপক পদে স্থায়ী চাকরির সুযোগ যেমন কমবে, তেমনই অধ্যাপকদের কণ্ঠস্বর দমন করতে, তাঁদের আজ্ঞাবহ দাস বানিয়ে রাখার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে এই ব্যবস্থা।
৭) গবেষণার ক্ষেত্রে একটা ন্যশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশান (এনআরএফ) তৈরির কথা বলা হয়েছে, যা সরকারের দখলদারির বাইরে একটা পরিবর্তনশীল বোর্ড অফ গভর্নর মারফৎ স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হবে। অথচ গবেষণার জন্য সরকারি তহবিল বাড়ানোর কোনো কথা বলা হয়নি। বরং উল্টে একটা হায়ার এডুকেশান ফিনান্সিং এজেন্সি (এইচইএফএ) তৈরির কথা বলা হয়েছে, যেখান থেকে ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে ভারতের প্রধান উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিকাঠামো ও গবেষণার উন্নয়ন করা হবে। বোঝাই যাচ্ছে যে এক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য হলো আর্থিক বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ কমিয়ে বেসরকারি খেলোয়ারদের হাতে গবেষণার ক্ষেত্রটাকে তুলে দেওয়া। অর্থাৎ গবেষণা হবে বিশ্ব পুঁজির চাহিদা অনুযায়ী, দেশের সাধারণ মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী নয়।
৮) এনইপি-র মাধ্যমে গেরুয়াকরণের যেসমস্ত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে তা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। এই নীতি অনুযায়ী শিক্ষক অধ্যাপকদের ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা, জ্ঞান, পরম্পরা ইত্যাদির প্রতি বিশ্বস্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় একটা দেশে ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে বর্তমান কট্টর ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী সরকার ঠিক কি বোঝাতে চাইছে সেটা যথেষ্ট স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ অধ্যাপকদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রবীণ/অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের নিয়ে একটা ‘ন্যাশনাল মিশন ফর মেন্টরিং’ তৈরি করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ‘সবই ব্যাদে আছে’ মার্কা যে প্রচার বর্তমান সরকারের নেতামন্ত্রীরা করে থাকেন তাতে বোঝাই যাচ্ছে যে এই মিশনের আসল উদ্দেশ্য কি হবে!
৯) পাবলিক ফিলান্থ্রপিক পার্টনারশিপ এর তত্ত্ব নিয়ে এসে বেসরকারিকরণের রাস্তা প্রস্তুত করে দেওয়া হয়েছে এই নীতিতে। অর্থাৎ, উচ্চ শিক্ষা এখন থেকে আর জনগণের অধিকারও নয়, সরকারের দায়ও নয়। বরং সেটা বড় পুঁজিপতিদের ‘জনহিতকর দায়িত্বের’ উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজেদের ফি নির্ধারণ করার ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হলে সেটা কতটা জনহিতকর হবে, বা বলা ভালো কোন শ্রেণীর জনগণের জন্য হিতকর হবে সেটা বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
মূল্যায়নে বলা যায় যে একটা সত্যিকারের ইনক্ল্যুসিভ বা সকলকে সাথে নিয়ে চলতে সক্ষম উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করাটা এনইপি ২০২০-এর লক্ষ্য নয়। বরং, ভারতে উচ্চশিক্ষায় কিভাবে বেসরকারিকরণ করা যায় তার একটা নির্দেশিকা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে এই নীতির মাধ্যমে। কোনোরকম রাখঢাক না করে তাই স্পষ্টই বলে দেওয়া হয়েছে যে আগামী ১৫ বছরে পর্যায়ক্রমে ভারতের সকল উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হবে স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া। অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ধারণা ধীরে ধীরে তুলে দেওয়া হবে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বলে কিছু থাকবে না। সরকারি নিয়ন্ত্রণ বলতে যেটা থাকবে সেটা হলো ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’-এর নামে প্রাচীন ভারতের ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী মতাদর্শকে তুলে ধরে বর্তমান ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদকে আরও বেশি করে প্রশ্রয় দেওয়া। এককথায়, মার্কেট-মনু আঁতাত তৈরির নীল-নকশা হলো এই এনইপি ২০২০।
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৩ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.newsclick.in/HEFA-NEP-Spell-Doom-Higher-Ed-Especially-Marginalised-Students [Retrieved On: 10/08/2023]
