শিক্ষা কেনাবেচা করার পণ্য নয়, শিক্ষা মানুষের অধিকার

শিক্ষা কোনো বাজারি পণ্য নয়। একে নিয়ে কেনাবেচা বা লাভক্ষতির হিসেব চলে না। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষার ক্রমশ বেসরকারিকরণ করার মধ্য দিয়ে ঠিক এটাই হয়ে চলেছে। শিক্ষার অধিকার একটি সর্বজনীন এবং বুনিয়াদী দাবি। সরকার এর দায় এড়ালে চলে না। যে গতিতে শিক্ষার অধিকার কিছু মুষ্টিমেয়ের হাতে তুলে দিয়ে বাকি জনতাকে শিখর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট। গত দু’বছর ধরে বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার তালা ঝুলিয়ে জোর দেওয়া হয়েছে অনলাইন পঠন-পাঠনের ওপর, যা মূলত গ্যাজেট নির্ভর। অর্থাৎ স্মার্ট ফোন বা ল্যাপটপ না থাকলে যা কোনো মতেই সম্ভব নয়। আমাদের গরীব দেশে প্রথমেই শিক্ষাকে এরকম শর্ত সাপেক্ষ করে ফেললে আসলে বহু ছাত্র ছাত্রীকে শিক্ষার আওতা থেকে বাইরে রাখা হয়। এবং শর্ত পূরণ না করতে পেরে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার ঘটনাও আমরা খুব কম একটা দেখিনি। অন্য দিকে ভাবতে গেলে আমরা জানি ক্লাস ছাড়া সুষ্ঠুভাবে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া এবং নেওয়া অসম্ভব। ক্রমশ স্কুলগুলিকে শিক্ষা বহির্ভূত বিষয়ে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা সরকারি দান খয়রাতের হিসেব রাখছেন। পাড়ার বিদ্যালয়কে টেনে নেওয়ার অজুহাত দিয়ে ক্লাসের বাইরের পঠনপাঠনকেই উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিদ্যালয়েই সমস্ত পাড়া, গোটা এলাকার ছাত্রছাত্রীদের একত্র করার দরকার ছিল। একথা আমাদের জানা যে বিদ্যালয়ের বাইরে টিউশনির একটা সমান্তরাল ব্যবসা চলছে বহুদিন। কোচিং ক্লাস, টিউশনি ইত্যাদি বাচ্চাদের এমনিতেই স্কুলবিমুখ করেছে। সরকারের দায়িত্ব ছিল বিদ্যালয়ের ক্লাস সিস্টেমে পড়াশোনাকে পুরো দমে লাগু করা। যারা টিউশন বা বাইরের সাহায্য নিতে সক্ষম, আর যারা পারে না, সবার জন্য সমানভাবে শিক্ষাকে নিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়ের ক্লাসকে কেন্দ্র করে।

আমরা উল্টে দেখলাম সরকারের প্রাথমিক দায় থাকলো শিক্ষা ব্যবসায়ীদের প্রতি। স্কুল কলেজের পঠনপাঠন সিস্টেমকে লঘু করা হলো। বিকল্প হিসাবে টিকে থাকলো পয়সা দিয়ে খরিদ করা শিক্ষা ব্যবস্থা। এবং করোনা কালীন সময়ে আরও বেশি বেশি করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সামনে রাখা হলো বিভিন্ন অনলাইন শিক্ষার অ্যাপ। যেহেতু বেশিরভাগ স্কুল কলেজগুলি অনলাইন মাধ্যমে সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার আওতায় আনতে পারল না, অনলাইন অ্যাপগুলোর সামনে খুলে গেল এক রমরমা ব্যবসার সুযোগ। প্রাথমিকভাবে ইংরিজি মাধ্যমের বেসরকারি স্কুলগুলিতে অনলাইন শিক্ষাকেই উৎসাহিত করা হলো এবং তাদের জন্য আগে থেকেই রইল বাইজুস-এর মতো অনলাইন শিক্ষার বেসরকারি প্ল্যাটফর্ম। ২০২২ সালে বাজেটেও অনলাইন শিক্ষার ওপর প্রভূত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হওয়া কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকলে বলা হলো অনলাইনে সরকারের তৈরি করা অনলাইন পোর্টাল থেকে কোর্স করে নেওয়ার কথা। এবং তাকে বৈধতা দেওয়া হলো সারা ভারত জুড়ে। সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে বিপুল সংখ্যায় অনলাইন পড়াশোনার জন্য মালমসলা প্রস্তুত করে রাখা হলো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে, শিক্ষক নিয়োগ না করে কেবলমাত্র অনলাইন মাধ্যমেই শিক্ষিত হয়ে ডিগ্রি পাওয়ার জায়গা প্রস্তুত হলো। এখন আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের অবকাশ বুঝে নিজের প্রয়োজন বুঝে আমরা কোর্স ঠিক করতে পারার স্বাধীনতা পেলাম। উল্টোদিকে প্রাইভেট কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে এমনিতেই শিক্ষার খরচ আকাশছোঁয়া সেখানে শিক্ষাকে সুযোগ বুঝে বাজারি করে তোলা হলো। এমনিতেই সবাই যদি শিক্ষার সুযোগ নিত সরকারি স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা তাহলে কমই পড়ত। এর সাথে ফেলো কড়ি মাখ তেল দর্শনে যারা পারল অনলাইনি পাঠ নিতে, তারা শিক্ষা পেল, বাকিরা তলিয়ে গেল জীবন সংগ্রামে। আর বাকি রইল সরকারি স্কুলগুলি যার আওতায় এখন বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে তাদেরকে বাতিল করে দেওয়ার প্রক্রিয়া।

এমনিতেই সাম্প্রতিককালে কয়েক হাজারের ওপর সরকারি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, শিক্ষক শিক্ষিকাদের সংখ্যাও যথেষ্ট নয়, শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ বহুদিন ধরে বন্ধ। স্কুল কলেজগুলি সরকারি সেবাদান কেন্দ্র হিসেবেই বেশি পরিচিত, এবং পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক-শিক্ষিকারা এখন প্রায় গণশত্রুতে পরিণত। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে যেহেতু ছাত্রছাত্রীদের অভিমুখেই সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, তারাই মূল দাবিদার, শিক্ষক-শিক্ষিকারা শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম কল মাত্র; স্কুল কলেজে ক্লাস বন্ধ করে দিয়ে, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শিক্ষা বহির্ভূত কাজে নিয়োজিত করিয়ে বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষা প্রদানকেই বাতিল করার পরিকল্পনায় রত সরকার। শিক্ষার কেন্দ্র এখন কেবল সরকারি দান প্রকল্পের অফিসে পরিণত হয়েছে। যদিও স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের জন্য খুলেছে। কিন্তু আগের মতন আর কোনো কিছুই নেই। এবং ভবিষ্যতে নতুন শিক্ষা নীতি লাগু হলে আরও পরিবর্তন কার্যকর হবে। শুরুতে যদিও আপেক্ষিকভাবে মনে হচ্ছে নতুন শিক্ষা নীতি পড়ুয়াদের পড়াশোনার মাধ্যমকে অনেক নমনীয় করেছে। যখন যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই তারা শিখবে। কিন্তু এর সাথে শিক্ষার বাজারিকরণের একটা যোগাযোগ আছে। শিক্ষা কেবল চাকরি বা অর্থকরী কাজের উপযুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। এর গুরুত্ব ভবিষ্যতের মানুষ তৈরি করার জন্য অসীম। সমাজে, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে পড়ুয়াদের অবস্থান শিক্ষা সুনিশ্চিত করে, দায়বোধ তৈরি করে। শিক্ষার দাম এখন ঘণ্টা হিসেবে ধার্য হবে। শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ এখন আর প্রয়োজন নেই। উল্টে টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে যদি শিক্ষা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে ইলেকট্রনিক বোতামের মতো ব্যবহার করতে দেওয়া হয় কিছু দাম দিয়ে, তাহলেই শিক্ষাকে দাম দিয়ে কিনতে হবে এমন পণ্যে পরিণত করা যায়। যেমনভাবে টিউটোপিয়া নামক বেসরকারি অনলাইন অ্যাপ শিক্ষক-শিক্ষিকার জায়গা পূরণ করবে, বদলে ছাত্রছাত্রীদের পকেট থেকে কিছু খেসারতের বিনিময়ে বিদ্যালয় শিক্ষাই উঠে যাওয়ার উপক্রম হবে। প্রশ্ন হলো শিক্ষার বেসরকারিকরণ হলে আমরা কি হারাবো? অবশ্যই শিক্ষার সার্বজনীন অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। পয়সা যার শিক্ষা তার – এমন সমীকরণ লাগু হবে। এবং শিক্ষার মান অবধারিতভাবে কমবে। আমরা জানি ভারতবর্ষে এখন সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে সরকারি শিক্ষা কেন্দ্রগুলিকেই বোঝায়। পঠনপাঠন থেকে শুরু করে শিক্ষা নিয়ে বিবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা স্বাধীনভাবে করার ছাড়পত্র এযাবৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতেই মেলে। যেহেতু আর্থিক লাভ উদ্দেশ্য নয়, বৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক গবেষণা করার ক্ষেত্রে উচ্চতম জায়গা ছোঁয়া যায়। এবং সর্বোপরি এখনও তাদের আর্থিক সামাজিক অবস্থা নিরপেক্ষভাবে ছাত্রছাত্রীরা সরকারি সাহায্যে পড়াশোনা করতে পারে। সাম্প্রতিক অতীতে যদিও আমরা এর বিপরীত ঘটনাই ঘটতে বেশি দেখেছি। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার ফি বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণের পাঠক্রম, শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগে অনীহা এবং গবেষণায় নজরদারি এসবই ঘটেছে। শিক্ষা এখন আর আবশ্যিক নয়, বুনিয়াদী শিক্ষা কিছু মাত্র হলেই শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে পারবে, এমনটাই রাষ্ট্রের ভাবনা। এখন তার কাছে শিক্ষিত সচেতন নাগরিক নয়, মুখ বুজে অমানবিক শিফ্‌টে কাজ করা বাধ্য শ্রমিক তৈরি করাই মূল লক্ষ্য। ফলত ক্লাসে হাতে কলমে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে, জিজ্ঞাসু মনন তার কাছে এখন বিপজ্জনক।

আমরা কোনমতেই শিক্ষার অধিকার থেকে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত হতে দিতে পারি না। প্রথমেই দাবি জানানো উচিত স্কুল কলেজগুলিতে আবার ক্লাসে পঠনপাঠন ফিরিয়ে নিয়ে আসার। যেসব ছাত্রছাত্রীরা অনলাইন ক্লাস আর স্কুল কলেজ বন্ধের চক্রে হারিয়ে গেল, তাদের ফিরিয়ে আনার আন্তরিক চেষ্টার সাথে বিনামূল্যে শিক্ষাব্যবস্থা সবার জন্য লাগু করা দরকার। প্রাইভেট স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সরকারি মদতে উচ্চ মানের প্রায়োগিক এবং বুনিয়াদী শিক্ষাকেন্দ্র দরকার। এবং সবার জন্য শিক্ষা একটি বুনিয়াদী দাবি, তা অস্বীকার করে কোনো সরকার আপাতভাবে ভাড়াটে সৈন্য এবং অর্ধশিক্ষিত মানসিকতার নাগরিক নিয়ে কিছুদিন নিজের ভাবনায় শাসন কায়েম করতে পারে; তবে আখেরে তাতে দেশের ও দশেরই ক্ষতি।


লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার মে ২০২৩ সংখ্যায়


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://www.youthkiawaaz.com/2020/10/jo-padh-sakta-hai-woh-hi-padega-nep-social-hierarchy-and-labour-in-india/ [Retrieved On: 21/05/2023]

Leave a Reply