বহু স্বরের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্রের চালু ধারাকে ধাক্কা দিয়েছে | পর্ব – ১

নজরুল আহমেদ জমাদার
গবেষক, সাংবাদিক

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান প্রায় আট মাস অতিক্রান্ত। প্রতিবেশী পরাশক্তির সাহায্যে বলিয়ান ফ্যাসিস্ট শক্তিকে উৎখাত করেছে এই গণঅভ্যুত্থান। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা বিলোপেরও শর্ত তৈরি করেছে এই গণঅভ্যুত্থান। সেই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিলোপ হবে কি, হবে না, সেইটা নিয়ে এখন দ্বন্দ্ব চরমে। পুরনো সংবিধান বাতিলসহ পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার ও নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের দাবি নিয়ে আলাপ আলোচনা, তর্ক ও বিতর্ক চলছে। শুধু তাই নয়, সমস্ত পরিচয়বাদী, গোত্রবাদী, জাতিবাদী, ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদেরকে একটা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে তৈরি করতে তৎপর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ। হ্যাঁ, বিষয়টা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন সরকারে এবং সরকারের বাইরে নানারকম ধারার, নানারকম মতের, শক্তি বিরাজ করছে। কিন্তু যারা গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র মঞ্চ ও পরবর্তীকালে তাদেরই সহযোগিতায় তৈরি জাতীয় নাগরিক পার্টি বাংলাদেশকে নতুনভাবেই দেখতে চায়। শুধু নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্র নয়, সার্বিকভাবে গণঅভিপ্রায় প্রতিফলিত হয় এমন গণতন্ত্র চাইছে তারা। এই উদ্দেশ্যে নিয়ে তারা নতুন গঠনতন্ত্র তৈরির জন্য প্রথমে গণপরিষদ নির্বাচন চাইছে। গণপরিষদে গঠনতন্ত্র তৈরি হলে সেটা গণভোটের জন্য পাঠানো হবে। জনগন এই গঠনতন্ত্রের পক্ষে সায় দিলে তবেই সেটা গৃহীত হবে। যে গণপরিষদে নতুন গঠনতন্ত্র তৈরি হবে পরবর্তীকালে সেই গণপরিষদই সংসদের আকার নেবে। তারপরে সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোট হবে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্রমঞ্চ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির এই পদক্ষেপ কে মানতে নারাজ বিএনপি। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই বিএনপি’র সঙ্গে বৈষম্য বিরোধী ছাত্রছাত্রী ও নতুন দলের আদর্শগত লড়াই শুরু হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং তার অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যেন একটা ভূমিকম্প। কেননা ভারত রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দলসমূহ, সংবাদ মাধ্যম, ও বিভিন্ন এজেন্সিকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী ঘটনা ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনে একটা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। জনজীবনে এই প্রভাবটা মূলত মনস্তাত্ত্বিক। সংবেদনশীল মানুষের মনে তৈরি হয়েছে একটা “anxiety” (উৎকণ্ঠা), আর সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে একটা বিশদ ঘৃণা ও হিংসার চাষ। সংবেদনশীল মানুষদের একটা বড় অংশের উৎকণ্ঠার কারণ মূলত দুটি। একটি কারণ হলো পছন্দের হাসিনা সরকারের বিদায়। যে পছন্দের মূল কারণ হলো ভারত রাষ্ট্রের তৈরি করে দেওয়া একটা বয়ান – “হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকারের হাতেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত এবং এবং সেখানকার হিন্দুসহ সমস্ত সংখ্যালঘুরা সুরক্ষিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে দল হিসাবে আওয়ামী লীগ এবং পরিবার হিসেবে শেখ পরিবারই সমস্ত কৃতিত্বের অধিকারী” ভারত রাষ্ট্রের তৈরি করা এই বয়ানকেই অবচেতন মনে দীর্ঘদিন ধরেই লালন-পালন করে আসছে সংবেদনশীল মানুষদের ওই অংশটি। ফলে হাসিনার বিদায়টাকে তারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ওই সংবেদনশীল মানুষদের উৎকণ্ঠার দ্বিতীয় কারণ হল একটা আশঙ্কা। সে আশঙ্কটা হল বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা মনে হয় জামাতের মতো ইসলামপন্থীদের হাতেই চলে গেল। যদিও সংবেদনশীল মানুষদের একটা ক্ষুদ্র অংশ অবশ্যই মনে করছেন, ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতন হয়ে ঠিকই হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারাও কিছুটা দোলাচলে। সাধারণ মানুষের মনে বাংলাদেশ নিয়ে যে ঘৃণা ও হিংসার চাষ হয়েছে তার অন্যতম কারণ ভারতের মূল শ্রেণীর সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ও ভুয়া খবরের দাপট। কিন্তু যে দেশের মানুষ গণঅভ্যুত্থান করল, সেই দেশ কোন পথে যাবে সেটা যে সেই দেশের মানুষই ঠিক করবে, এই বাস্তব ও গণতান্ত্রিক যুক্তিটা মেনে নিতে পারছে না পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষ। তারা ধরেই নিয়েছেন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাতে ভারতের অন্যতম ভূমিকা ছিল। অতএব বাংলাদেশকে ভারতের বশীভূত হয়েই থাকতে হবে। বাংলাদেশ যে একটা স্বাধীন এবং সার্বভৌম দেশ, ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের মানুষজন সেটা হয়তো বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। তাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশকে মেনে নিতে তাদের একটু কষ্টই হচ্ছে।

শুধু তাই নয় বাম প্রগতিশীলদের একাংশ প্রথম থেকেই বাংলাদেশের এই গণঅভ্যুত্থানকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। যেহেতু এই গণঅভ্যুত্থান কোন নির্দিষ্ট বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে হয় নি তাই এটাকে তারা গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের মতে আমেরিকার সাহায্যে নিয়ে জামাতের মত ইসলামিক দল হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছো মাত্র। তাদের এই ধারণা ও মূল্যায়ন মোটেও মার্কসবাদী লেলিনবাদী চিন্তা চেতনার সমর্থক নয়। তার কারণ হলো দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনে বিধ্বস্ত প্রকৃত গণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনতার ন্যূনতম অর্জনকেও তারা নস্যাৎ করে দিচ্ছেন। বরং তাদের বোঝা উচিত এই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বিপ্লবের দ্বন্দ্বকে আরো তীব্র করে এবং ভবিষ্যতের বিপ্লবের শর্তকেও প্রস্তুত করে।

যদিও স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যে ছাত্র জনতার আন্দোলন হয়েছিল সেটা ছিল একান্ত ভাবেই ‘pro-people’। কোন দলীয় ফ্ল্যাগ নিয়ে এই আন্দোলনে কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হয় নি। কোন বড় দলের নেতৃত্বে আন্দোলন সংঘটিত হয় নি। ফরাসি দার্শনিক ও চিন্তক জিল দ্যোলুজ বর্তমান যুগের রাজনীতি বা আন্দোলন কে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একটা হল মলিকিউলার রাজনীতি আর একটা হল মোলার রাজনীতি। মলিকিউলার রাজনীতি হলো অনেক ছোট ছোট গোষ্ঠী বা এজেন্সি দ্বারা পরিচালিত রাজনীতি বা আন্দোলন। যে আন্দোলন বা রাজনীতি কোনও দলের কেন্দ্রিকতা দ্বারা পরিচালিত হয় না। আর এক ধরনের রাজনীতি বা আন্দোলন হল মোলার রাজনীতি। যেটা হলো কোন বড় পলিটিকাল পার্টির কেন্দ্র দ্বারা পরিচালিত এবং সংগঠিত। অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের অংশগ্রহণ থাকলেও বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন চরিত্রের দিক দিয়ে ছিল মলিকিউলার। এবং আন্দোলনের কাঠামোগত চরিত্রটাও “টপ-ডাউন” ছিল না, বরং ছিল “হরাইজন্টাল”। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক দলের উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোন আন্দোলন নয়। কারণ রাজনৈতিক দল বহির্ভূত সাধারন মানুষের স্বর সবসময়ই শক্তিশালী হয়। এবং এই স্বর গণতান্ত্রিকভাবে অনেক বেশি লেজিটিমেট। বহু মানুষের স্বর এই গণঅভ্যুত্থানে প্রতিফলিত হয়েছে। বাম, গণতান্ত্রিক শক্তির অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলমদের পাশাপাশি মেঘমল্লার বসু, উমামা ফাতিমদের মতো বাম প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরাও গণঅভ্যুত্থানের একদম প্রথম সারিতে ছিল।

কিন্তু কেন বাংলাদেশে সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান তৈরি হলো? কোন জাদুবলে এই গণঅভ্যুত্থান সফল হলো? বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৬ বছর বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল। পরাশক্তি ভারতের সমর্থন তার পক্ষে পুরোপুরি ছিল। বিএনপি’র মত বড় দল প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, হাসিনার স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট দমনের সামনে তারা দাঁড়াতেই পারেনি। ভারতের সহযোগিতায় পরাক্রমী হয়ে শেখ হাসিনা দু-দুবার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হরণ করেছিল। মানুষকে কোনও ভোট তারা দিতে দেয়নি। মানুষের বাক স্বাধীনতাও কার্যত ছিল না। ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশের ছাত্র জনতা বুঝতে পেরেছিল ভোট সর্বস্ব সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে সরানো যাবে না। তাই গণঅভ্যুত্থানের পথেই রাষ্ট্রশক্তিকে উৎখাত করতে হবে। এক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, এবং তাত্ত্বিক চর্চা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ফরাসি মার্কসবাদী দার্শনিক লুইস আলথুসার বিপ্লব সংঘটিত করার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক, আদর্শগত ও তাত্ত্বিক চর্চাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, পুঁজিবাদী সমাজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের (Repressive State Apparatus) মাধ্যমে টিকে থাকে না, বরং এটি আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রের (Ideological State Apparatus) মাধ্যমে মানুষের চিন্তাধারা ও বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বিপ্লব সংঘটিত করার ক্ষেত্রে আদর্শগত লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলথুসার Repressive State Apparatus বলতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালতের মত প্রতিষ্ঠানগুলিকে বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে Ideological State Apparatus বলতে শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, গণমাধ্যমের মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুঝিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক বিরুদ্ধে স্বরকে দমন করতে Repressive State Apparatus এর প্রতিষ্ঠানগুলিকে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ব্যবহার করেছে। এগুলি ব্যবহার করেই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ২০০০ ছাত্র জনতা কে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে তারা Ideological State Apparatus এর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমান ভাবে কাজে লাগিয়েছে। আওয়ামী লীগের আদর্শগত ভিত্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সমস্ত পূর্ববঙ্গের মানুষের সমবেত লড়াই হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কার্যত হাইজ্যাক করেছিল আওয়ামী লীগ। এবং শেখ মুজিবর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র আইকন হিসেবে তুলে ধরেছিল। এক্ষেত্রে তাদের অন্যতম আদর্শিক ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তাদের এই আদর্শকে চ্যাম্পিয়ন করতে তারা তাদের বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি জামাতকে দাঁড় করিয়েছিল। এবং তাদের রাজনৈতিক স্বার্থেই তারা জামাতকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। ঠিক সেই কারণেই যখন বাংলাদেশের সমবেত মানুষ কোটাবিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিল সেটাকে জামাতের আন্দোলন বলে দাগিয়ে দিয়েছিল হাসিনা বাহিনী। আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাকে রাজাকার বলেও আক্রমণ করেছিলেন হাসিনা। হাসিনার হয়ে আদর্শিক লড়াইয়ে সহযোগিতা করেছে ভারত রাষ্ট্র ও ভারতের মিডিয়া। ভারত রাষ্ট্রের বয়ান ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি করতে সহযোগিতা করেছে ভারত। এবং মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ তৈরীর ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবুর রহমানই একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী। বৈষম্য বিরোধী ছাত্ররাও সমভাবে পাল্টা আদর্শিক লড়াই লড়েছে হাসিনা ও ভারত রাষ্ট্রের এই ন্যারেটিভ এর বিরুদ্ধে। তাদের ন্যারেটিভ ছিল যে কোন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, কিন্তু বহুত্ববাদের পক্ষে। তাদের আদর্শিক লড়াই ছিল ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।

নির্বাচন কেন্দ্রিক গণতন্ত্রের যে অন্তঃসারশূন্যতা, সেইটা নিয়ে যেমন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে খুব আলোচনা চলছে, ভারতে সেই ভাবে আলোচনা না হলেও নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্রের দুর্বলতা ভারতেও বেশ প্রকট। হ্যাঁ নির্বাচন গণতন্ত্রের একটা অংশ। কিন্তু ভারত, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে নির্বাচনকেই গণতন্ত্রের সব বলে ধরে নেওয়া হয় এবং মানুষও বোঝে গণতন্ত্র মানে নির্বাচন। ভারতে নির্বাচনকে তো রীতিমত গণতন্ত্রের উৎসব বলা হয়। প্রতি পাঁচ বছর পরে কারা জনগণকে শাসন করবে তাদের নির্বাচনটাকেই আমাদের এখানে মোটামুটি একটা মোটা দাগে গণতন্ত্র বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু দেখা গেছে এই নির্বাচনে পরিচিত দু একটা দলই কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচিত হয়। সামনের ৫ বছর কার্যত জনগণকে সমস্ত দিক দিয়ে তারা লুট করে। এবং যে নির্বাচনী ব্যবস্থা সেটাও কার্যত টাকার দ্বারা ম্যানিপুলেটেড। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিযোগিতাই দেখা যায় এই নির্বাচনে। এর পিছনে আসলে রয়েছে বাজার ব্যবস্থার একটা দীর্ঘ প্রতিযোগিতা। বাজারের প্রতিযোগিতাই পরিণত হয় রাজনৈতিক দলগুলির ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাই। এই যে গোটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটাই বাজারি প্রতিযোগিতার সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে এটা আসলে নিওলিবারেলিজমের একটা রোগ। কিন্তু গণতন্ত্র মানে কি শুধু নির্বাচন? বিষয় টা ঠিক সেরকম নয়। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হলে নির্বাচন নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চর্চার একটি দিক। কিন্তু রাষ্ট্রই যদি গণতান্ত্রিক না হয়, তাহলে নির্বাচন শুধু গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া এবং টিকিয়ে রাখার অধিক কিছু হতে পারে না। গণতন্ত্রের আসল মর্মবস্তু হলো জনগণের অভিপ্রায়। জনগণের সামষ্টিক অভিপ্রায়ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার উৎস ভিত্তি। আসলে সঠিক গণতন্ত্রের জন্য একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিসর দরকার, যেখানে জনগণ বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা, মতাদর্শিক তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে তাদের সামষ্টিক অভিপ্রায় কে তুলে ধরতে পারে। এই রাজনৈতিক পরিসরকেই জার্মান দার্শনিক জার্গেন হ্যাবারমাস বলেছেন ‘পাবলিক স্ফিয়ার’।‌ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের এই বিভিন্ন দিক নিয়ে এখন জোর কদমে আলাপ-আলোচনা চলছে বাংলাদেশে।


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://potheprantore.com/hot-news/ছাত্র-জনতার-গণ-অভ্যুত্থা/ [Retrieved On: 17/05/2025]

One thought on “বহু স্বরের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্রের চালু ধারাকে ধাক্কা দিয়েছে | পর্ব – ১

Leave a Reply