লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অগাস্ট ২০২৪ সংখ্যায়
যতই আরএসএস নেতারা ‘পাত্তা’ পাচ্ছে না, ‘প্রচারের সব আলো মোদি খেয়ে নিচ্ছে’ বলে তাদের গোঁসা হোক না কেন, বিজেপি- আরএসএসের আর কোন নেতারই মোদীর মতো জনপ্রিয়তা, শাসকশ্রেণীর কাছে সব থেকে উজ্জ্বল ইমেজ ও ভোট ক্যাচিং ক্ষমতা নেই। তবে মোদীর সেই ইমেজও মলিন হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি, বেরোজগারি, বেকারী, সঞ্চয়হীনতা এবারের ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে। মোদী বিরোধীরা প্রাথমিক অনৈক্য কাটিয়ে শেষে একজোট হওয়ায় তারা কিছু সুবিধা অবশ্যই পেয়েছে। যদিও হিন্দুত্ব, মন্দির, মুসলিমবিদ্বেষ, পাকিস্তান বিরোধী প্রচারের কোনও গ্রহণযোগ্যতা ছিল না – একথা বলা যাবে না। কী সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে, কী এরাজ্যে বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক অটুট আছে। ভোটে বিজেপি তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার জন্য লড়ছিল। এবার ৪০০ আসন পারের স্লোগানও দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠান-বিরোধী চোরা হাওয়ার কারণে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া হলো না। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। যদিও প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস বিজেপির আসনের ধারেকাছেও নেই। সাত দফা ভোটের মাঝখানেই মোদী তা বুঝতে পেরেছিল। তাই হঠাৎ করে প্রায় অস্তিত্বহীন ও গুরুত্বহীন এনডিএ জোটের কথা মোদীর মনে পড়ে গেল এবং শেষ দুই পর্যায়ে এনডিএ সরকারের কথা প্রচার করা শুরু হলো। ফলাফল বেরোতে দেখা গেল যে পাঞ্জাবের কৃষক আন্দোলনের ফলে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশে মোদীর ফলাফল হতাশাজনক হয়েছে। তামিলনাড়ু বাদ দিলে বিজেপির সর্বভারতীয় উপস্থিতি রয়েছে। একসময় শাসক শ্রেণীর চোখের মনি ও প্রায় ৫০ বছর ধরে ভারত শাসন করা কংগ্রেস এই নিয়ে তৃতীয়বার ১০০ আসন পার করতে পারল না। অর্থাৎ ভালো বক্তৃতা দিতে শিখলেও রাহুল গান্ধী এখনো শাসকশ্রেণীর আস্থা অর্জন করতে পারেনি। গতবারের মতো এবারেও সংসদীয় বামপন্থীরা (নামেই বামপন্থী, কিন্তু অন্তরঙ্গে বা বহিরঙ্গে দক্ষিণপন্থী) নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য কিছুই করতে পারেনি। জনগণের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ ভোটের শতাংশে, বা আসনে কোনওটাতেই পরিলক্ষিত হয়নি। এমনকি পাঞ্জাবেও না!
আমরা জানি, সরকার পরিবর্তন হয় দুটি কারণে। শাসকশ্রেণীও আর পুরনো মুখ দিয়ে শাসন চালাতে পারছে না এবং জনগণও আর পুরনো মুখের দ্বারা শাসিত হতে চাইছে না। তখন শাসকশ্রেণীর নতুন মুখ আনার দরকার পড়ে। ভারতবর্ষে এরকম পরিস্থিতি ছিল না। পশ্চিমবাংলাতেও নয়। কেউ কেউ ভোটের ফলাফল দেখে আশান্বিত হয়ে প্রচার করে বসলো তৃতীয়বারের মোদি সরকার প্রথম দুবারের মতো হয়তো অত তীব্র ফ্যাসিস্ট আক্রমণ চালাবে না। বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ না করে মনোমত আকাশ কুসুম ভেবে নিলে লোক হাসানোর কারণ হয় – এটা এরা বোঝে না। এটুকু বলাই যথেষ্ট।
ফ্যাসিবাদ শাসকশ্রেণীর শক্তি বৃদ্ধির লক্ষণ, নাকি দুর্বলতার। ভারতে ফ্যাসিবাদ কি মোদীই নিয়ে এলো? মোদী চলে গেলেই কি ভারতে ফ্যাসিবাদ দূর হয়ে যাবে? ভারতে ফ্যাসিবাদ কি খুবই শক্তিশালী? একেবারে হিটলারের জার্মানির মতো? কেমন ফ্যাসিবাদ যে পার্লামেন্ট বজায় রেখে দিল? পার্লামেন্টীয় নির্বাচনে ফ্যাসিবাদ দূর হয়ে যেতেও পারে? এই মোদীর রাজত্বেই আমরা দুটো বড় গণ আন্দোলন প্রত্যক্ষ করলাম। এনআরসি বিরোধী গণ আন্দোলন এবং পাঞ্জাবের কৃষক আন্দোলন! এটা কিভাবে সম্ভব হলো? এগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া দরকার।
আমাদের ধারণা ভারতবর্ষে দুর্বল ধরণের ফ্যাসিবাদ স্বৈরতন্ত্রের রূপ নিয়ে বহুদিন ধরেই রয়েছে। এটা কখনো প্রবল হয়, কখনও প্রচ্ছন্ন হয়। আমাদের বাংলার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। এখন বাংলাদেশের উদাহরণও দেওয়া যেতে পারে। বাংলায় বিজেপিও ফ্যাসিস্ট, তৃণমূলও তাই। অতীতে সিপিএম এবং কংগ্রেস শাসনও একইরকম ছিল। কেউ কম কেউ বেশি। ভোট মিটতেই বাংলার বিজয়ী তৃণমূলী শাসকরা সাপের পাঁচ পা দেখলো। বিরোধী দলগুলিকে পিটিয়ে, ভয় দেখিয়ে, অপহরণ করে পঞ্চায়েত দখল চলছে। যেখানে সেখানে সালিশি সভার নামে জনগণকে পেটানোর ভিডিও সামনে আসছে। যোগীরাজের অনুকরণে হকার ও ছোট দোকানদারদের উপর বুলডোজার চলছে। বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনরত গ্রামবাসীদের উপর গুলি চলছে। পুলিশ লকআপে বন্দি পিটিয়ে মারছে। সেই নিয়ে পরিবার-পরিজনরা বিক্ষোভ দেখালে তাদের উপর লাঠিচার্জ হচ্ছে। বাংলার মানুষের এটা বোঝা মুশকিল হচ্ছে যে কে বড় ফ্যাসিস্ট – বিজেপি, না তৃণমূল? দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় বড় গণ-আন্দোলন না হওয়ায় পরিস্থিতি অগ্রণীদের পক্ষে কঠিন হয়েছে।
আবার কেন্দ্র প্রসঙ্গে ফেরা যাক। বিজেপি এবার এমন দুটি দলকে নিয়ে সরকার গড়েছে যারা আপাদমস্তক চোর বলে পরিচিত। চন্দ্রবাবু নাইডু একাধারে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ফ্যাসিস্ট। অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নয় বছরের শাসনকালে ২৫০০ নকশাল কর্মী ও সমর্থককে সাজানো সংঘর্ষে হত্যা করার রেকর্ড রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেই সঙ্গে একাধিক দুর্নীতি। কেন্দ্রীয় সরকারের জোট সঙ্গী হচ্ছে ও চন্দ্রবাবু বিভক্ত অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছে শুনেই চন্দ্রবাবু ও তার স্ত্রীর কোম্পানী একদিনে ৫৭৬ কোটি টাকার অতি মুনাফা অর্জন করেছে! নীতিশ কুমার দুকানকাটা চোর। কয়েক দিনের মধ্যেই বিহারের ১৫-টা সেতু ভেঙে পড়েছে। চুরির নমুনা বোঝানোর জন্য এই তথ্যই যথেষ্ঠ। তারা করবে ফ্যাসিস্ট মোদির রথের চাকাকে নিয়ন্ত্রণ! এটা যারা আশা করে তাদের জন্য একটা কথাই বলা যায় – রাজনীতির পাঠশালার শিশু!
মোদীর তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসার পরের ঘটনাবলী একথাই প্রমাণ করছে। ছত্তিশগড়ে আদিবাসীদের গণহত্যায় কোনো ছেদ পড়েনি। সারাদেশ জুড়ে হকার ও ছোট দোকানদারের উচ্ছেদ চলছে। জিএসটি নামক করের বোঝা বেড়েই চলছে। মূল্যবৃদ্ধি আকাশ ছুঁয়েছে। পরিবেশ ধ্বংস অব্যাহত। উচ্চশিক্ষায় দুর্নীতি চরমে। প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী ও গণ আন্দোলনের কর্মীদের ওপর নির্যাতন ও চাপে রাখার রাজনীতি জোরকদমে চলছে। সরকারি চাকরিতে আরএসএস-এর খুল্লামখুল্লা অন্তর্ভুক্তিতে সরকারী সিলমোহর পড়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধি সংস্কারের নামে এমন আইন আনা হয়েছে যাতে পুলিশি রাজ কায়েমের আরো সুবিধা হয়। যতদিন যাবে আমাদের আরো নতুন নতুন দমনপীড়ন দেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
আমাদের দেশে জনগণের সর্বস্ব শুষে নিয়ে কর্পোরেটরা যে অতি মুনাফা করছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট নয়। তাদের আরো মুনাফা চাই। সেটা তারা বের করতে পারছে না। একে তারা সংকট বলছে। তা এই সংকট যত বাড়ছে, সারা বিশ্বেই ফ্যাসিবাদের প্রবণতা আরো বাড়ছে। বিভিন্ন দেশে শাসকশ্রেণী ফ্যাসিবাদ কায়েম করছে, যদিও তাদের মাত্রা বিভিন্নরকম। কিন্তু মোটের উপর জনগণের উপর ফ্যাসীবাদী দমনপীড়ন বেড়েছে। এখনো পর্যন্ত সারা বিশ্বেই জনগণ বিক্ষিপ্তভাবে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে। গত শতাব্দীর বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এবং বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি আজকের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। ক্ষমতায় না থাকলেও বেশ কিছু দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমানে সমানে টক্কর দিয়েছে। সর্বোপরি স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হিটলারের জার্মানিকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে এবং বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্টরা হয় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে, না হয় ক্ষমতা দখলের কাছাকাছি চলে আসে। নিপীড়িত জনগণ দুনিয়া জুড়ে কমিউনিস্টদেরকেই তাদের স্বাভাবিক নেতা ও মুক্তিদাতা হিসেবে দেখেছিল।
আজকে এ পরিস্থিতি নেই। বেশিরভাগ দেশে কমিউনিস্টদের নামোনিশান নেই। যেখানে তারা আছে, সেখানে প্রচন্ড দুর্বল। লাইনের প্রশ্নেও বিভ্রান্তি প্রচুর। ফলে আমাদের এখন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মুখ চেয়েই থাকতে হচ্ছে।
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.thehindu.com/elections/lok-sabha/election-results-2024-live-updates/article68246702.ece [Retrieved On: 25/08/2024]
