খাতায় কলমে তাঁতিদের জন্য সবই আছে! তন্তুজের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে তাঁতিদের থেকে কাপড় কেনা থেকে শুরু করে, তাঁতশিল্পীদের বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন কার্ড, তাঁতিদের সমবায়, তাঁতের সরঞ্জাম কেনার জনা স্বল্প সুদে সমবায়ের ঋণ, সমবায় ভিত্তিক তাঁত কারখানা ও ন্যায্য মজুরি, সমবায়ের মাধ্যমে কাপড় কিনে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। কিন্তু এত সব কিছু থেকেও কিছুই নেই সমুদ্রগড়-ধাত্রগ্রাম অঞ্চলের তাঁতি ও তাঁতশ্রমিকদের। প্রকৃতপক্ষে ছোট ও মাঝারি তাঁতিদের ভাগ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জোটে না এসব সুবিধার ছিটেফোঁটাও। তার উপরে লকডাউন পরিস্থিতিতে কাজ হারিয়ে প্রায় অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন তাঁত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির লক্ষাধিক মানুষ।
এমনিতেই যন্ত্রচালিত তাঁত আসার ফলে হস্তচালিত তাঁতের বাজার দিন দিন খারাপ হয়ে আসছিলো। হস্তচালিত তাঁতে একটি উচ্চ ও মাঝারি মানের কাপড় বুনতে সময় লাগে যথাক্রমে দেড় থেকে দুই দিন। দুই বছর আগে এই কাপড় বুনে শ্রমিকরা মজুরি পেতেন ৪০০-৫০০ টাকা। আর যন্ত্রচালিত তাঁতে দিনে দুইটি কাপড় বোনা যায়, মজুরি মিলত (লকডাউনের আগে) কাপড়প্রতি ১৮০ টাকা। গতবছর লকডাউনের পরে হস্তচালিত তাঁতে ৪০০ টাকার মজুরি কমে হয় ২২০ টাকা। যন্ত্রচালিত তাঁতে কাপড়প্রতি ১৮০ টাকা মজুরি কমে হয় ১৩০ টাকা। এখনও শ্রমিকরা এই মজুরিই পাচ্ছেন। লকডাউনের সময় থেকে হস্তচালিত তাঁত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অথচ এই অঞ্চলের তাঁতশ্রমিকদের প্রায় আশি শতাংশই হস্তচালিত তাঁতশ্রমিক। এই বিপুল সংখ্যক হস্তশিল্পী আজ কর্মচ্যুত! সরকার উদাসীন! তাঁত ও তাঁতশ্রমিকদের জন্য সরকারের না আছে কোনো পরিকল্পনা, না আছে কোনো সদর্থক ভূমিকা! যন্ত্র চালিত পাওয়ারলুম গুলো যদিও ধীরে ধীরে উৎপাদন শুরু করেছে, শ্রমিকরা সপ্তাহে ৪-৫ দিন কাজ পাচ্ছেন। কিন্ত হস্তচালিত তাঁতের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, অদূর ভবিষ্যতেও তাঁতঘরগুলি পুনরায় চালু হবে কিনা তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তাঁতি ও তাঁত শ্রমিকরা।
লকডাউন পরিস্থিতিতে তাঁতিদের মূল সমস্যা কাপড়ের বাজার না থাকা। যদিও সরকার তাঁতিদের থেকে তন্তুজের মাধ্যমে কাপড় কেনার পরিসংখ্যান দেয়! বিশাল অঙ্কের কাপড় ক্রয় ও লাভের তথ্য দেয়! প্রকৃতপক্ষে এই কাপড়গুলো কেনা হয় সমবায়ের মাধ্যমে, যা পরিচালিত হয় ক্ষমতাসীন শাসক দল দ্বারা। এই সব সমবায়ের মাথায় থাকে বড় তাঁত মালিক, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা। এরা ছোটো ও মাঝারি তাঁতিদের থেকে কাপড় না কিনে বড় তাঁতিদের বা ব্যবসায়ীদের থেকে (কমিশনের ভিত্তিতে) কাপড় কেনে, ফলে চিরকাল বঞ্চিত থাকেন ছোটো ও মাঝারি তাঁতিরা। এরা মহাজনী ঋণের জালে জড়িয়ে কম দামে বিক্রিতে বাধ্য হন। এইভাবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পরে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে ছোটো-মাঝারি তাঁতঘরগুলো। কাজ হারিয়েছেন হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক। তার উপরে একের পর এক লকডাউনে হস্তচালিত তাঁত শিল্পটাই পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই মুহুর্তে কাজ হারানো তাঁত শ্রমিকদের প্রতি সরকারের উদাসীনতা ও দায়িত্ত্বজ্ঞানহীনতা ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এই মুহুর্তে সরকারের আশু কর্তব্য হওয়া উচিত – ১) কাজ হারানো সমস্ত তাঁতশ্রমিকদের বিকল্প আয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা; ২) তাঁতশ্রমিকদের হাতে মাসিক নগদ অর্থ তুলে দেওয়া; ৩) সরাসরি তন্তুজের মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি তাঁতিদের থেকে নির্ধারিত মূল্যে কাপড় কেনা; ৪) প্রথম দফার সুতো ও অন্য সরঞ্জাম বিনামূল্যে তাঁতিদের বিলি করা; ৫) তাঁতঘর ও তাঁত সরঞ্জাম কেনার জন্য তাঁতিদের সহজ শর্তে ব্যাঙ্কঋণ দেওয়া। এই সব সুবিধার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে ছোট ও মাঝারি তাঁতিদের। পাওয়ারলুম শ্রমিকদের মজুরি কাপড় প্রতি ২০০ টাকায় বেঁধে দিতে হবে। ছোট ও মাঝারি পাওয়ারলুম মালিকদের বিদ্যুতে ছয় মাসের ভর্তুকি দিতে হবে। সমস্ত তাঁতি ও তাঁত শ্রমিকদের সমাজিক বীমা সুরক্ষা যোজনার আওতায় আনতে হবে। ষাটোত্তীর্ণ তাঁত শ্রমিকদের পেনশনের পরিমান (ন্যূনতম ৫ লক্ষ) বৃদ্ধি করতে হবে।
কিন্তু এসব দাবী সরকারের কানে ততক্ষণ পৌঁছাবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত দাবীগুলি আন্দোলনে পরিণত না হচ্ছে। গণসংগঠনগুলোকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। ভেদাভেদ দূর করে তাঁতি-তাঁতশ্রমিক, ছোট-মাঝারি তাঁতি নির্বিশেষে সকলকে একত্রিত হয়ে দাবিগুলোকে জোরালো আওয়াজে পরিণত করতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
গণতান্ত্রিক আধিকার রক্ষা সমিতি (APDR)-এর কালনা-সমুদ্রগড় শাখা দ্বারা প্রকাশিত, তারিখ – ০৭/০৭/২১
প্রচারপত্রটি আমাদের হাতে এসেছে। গুরুত্ব বিচার করে আমরা প্রকাশ করলাম – সম্পাদক
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার নভেম্বর ২০২১ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.siasat.com/bilkis-bano-challenges-release-of-11-convicts-in-supreme-court-2469148/ [Retrieved On: 20/01/2023]
