আনন্দ তেলতুম্বে
প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় The Wire পত্রিকায়, ২৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে।
লিঙ্ক – https://thewire.in/caste/the-rss-was-also-a-reaction-to-early-dalit-mobilisation
কভার ফটো – PTI, মূল প্রবন্ধ থেকেই নেওয়া।
প্রবন্ধটির গুরুত্ব অনুধাবন করে আমরা তার একটা বাংলা তর্জমা প্রকাশ করলাম।
ভাষান্তর – বিতান দে
প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে বিশ শতকের গোড়ায় নাগপুর শহরটা হয়ে ওঠে নিচুজাতের জনগণের জাগরণ ও দলিত আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। আমরা দেখেছি কীভাবে ভিতর থেকে জ্যোতিবা ফুলে-র ‘সত্যশোধক সমাজ’ ব্রাক্ষ্মণ্য আধিপত্যকে অস্বীকার করে শিক্ষায় সমানাধিকার, মন্দিরে প্রবেশাধিকার ইত্যাদি দাবি তোলার পাশাপাশি এক সাম্যবাদী সমাজের কথা প্রচার করতে থাকে। আবার অন্যদিকে একই সময়ে ব্রিটিশ ভারতের আইনসভা সংস্কারের মাধ্যমে বাইরে থেকে তৈরি হয় মুসলিমদের রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার চাপ। বৈধতা পায় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ধারণা, যা শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে ডিপ্রেস্ড ক্লাসেসদের মধ্যেও – পরিণামে, দলিত আন্দোলনের একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চেতনা গড়ে ওঠে। আরএসএস-এর আবির্ভাবকে বুঝতে গেলে এই দুটো বিষয়কেই বোঝা প্রয়োজন।
দলিত আন্দোলনে উদ্বিগ্ন ব্রাহ্মণ্যবাদী শিবির
ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে যে কীভাবে নাগপুর—যে শহরটা পরবর্তীকালে আরএসএস-এর ধাত্রীভূমি হতে চলেছিল—১৯২০ সালের মধ্যে জাত-সংঘাতের এক দহনে পরিণত হয়েছিল। মূলত চিতপাবন ও দেশস্থ ব্রাহ্মণদের দ্বারা গঠিত নাগপুরের অভিজাত সমাজ যে কারণে বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। সেন্ট্রাল প্রভিন্সেস ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট (১৯২১–২৩)-এর দলিলগুলোতে দেখা যায় যে তারা ডিপ্রেস্ড ক্লাসেসদের সংগঠনগুলোর মধ্যে “বৈপ্লবিক কার্যকলাপ” নিয়ে যারপনাই উদ্বিগ্ন ছিল। তাদের মতে এগুলো “মিশনারি ও অ-হিন্দু প্রভাবের দ্বারা উৎসাহিত” হচ্ছিল। এই উদ্বেগ কোনো ধর্মীয় সংশয় থেকে নয়, বরং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় থেকে এসেছিলো। ‘হিন্দু মহাসভা’ ও ‘সেবা সমিতি’-র মতো ব্রাহ্মণ-নেতৃত্বাধীন হিন্দু সংস্কারমূলক সংগঠনগুলো “অস্পৃশ্যদের পুনরায় হিন্দু সমাজে সংযুক্ত করার” উদ্দেশ্যে পাল্টা সভা আয়োজন করতে শুরু করে।
এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় হিন্দু মহাসভার সক্রিয় সদস্য কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার ১৯২৫ সালে নাগপুরে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২২–২৩ সালে তিনি যে বক্তৃতাগুলো দিয়েছিলেন তাতে দেখা যায় যে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন হিন্দু সমাজের শক্তি নিহিত আছে “শৃঙ্খলা ও ঐক্য”-র মধ্যে এবং তাঁর মতে “জাত-বিভাজন ও বিদেশি ধর্ম দেশকে দুর্বল করছে”। স্পষ্টতই এই মনোভাবকে কেবলমাত্র মুসলমানবিরোধী মনোভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়না, বরং দলিতদের বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে একটা প্রতিক্রিয়ার মনোভাবও এখানে ফুটে ওঠে।
সাংগাঠনিকভাবে আরএসএস ছিল সামরিক শিক্ষাপ্রাপ্ত, শ্রেণিবিন্যস্ত, এবং শারীরিক শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ব্রহ্মচারী হিন্দু পুরুষদের একটা দল। শুধু সাম্প্রদায়িক হিংসার বিরুদ্ধে একটা প্রতিক্রিয়া নয়, বরং প্রকারান্তরে হিন্দু সমাজকে নিয়মের মধ্যে বেঁধে রাখার একটা পরিকল্পনামাফিক কৌশল ছিল এটা। “শাখা” মডেলটার উদ্দেশ্যই ছিল প্রতীকী ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে জাতভেদকে অতিক্রম করার ভান করা, কিন্তু বাস্তবে পর্দার আড়ালে মতাদর্শ ও নেতৃত্বের ব্রাহ্মণ্যবাদী নিয়ন্ত্রণকেই অক্ষুন্ন রাখা।
এই দুমুখো ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে বি. এস. মুঞ্জে-র সঙ্গে হেডগেওয়ারের চিঠি মারফত আলাপচারিতায়। মুঞ্জে ছিলেন হিন্দু মহাসভার একজন প্রবীণ নেতা এবং পরে নাসিকের ‘সেন্ট্রাল হিন্দু মিলিটারি এডুকেশন সোসাইটি’-র সভাপতি। ১৯২৫ সালের এক চিঠিতে মুঞ্জে নবগঠিত আরএসএস-এর প্রশংসা করে লিখেছিলেন যে, এই সংগঠন “হিন্দুদের মধ্যে শৃঙ্খলার সঞ্চার করছে” এবং উল্লেখ করেন যে “এখন এমনকি নিচু শ্রেণির লোকেরাও দৈনিক কসরতে যোগ দিচ্ছে” (উদ্ধৃত: Andersen & Damle, 1987: 30)। এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা স্পষ্ট – দলিত সংগঠন ও চেতনার যে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল, সেটাকে উচ্চবর্ণ নেতৃত্বাধীন হিন্দু কাঠামোর মধ্যে এনে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা, যাতে দলিতরা আত্মনির্ভর ও স্বতন্ত্র একটা রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত না হতে পারে।
পরবর্তীকালে দেশব্যাপী হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা জাতভিত্তিক সংহতির একটা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছিল। “হিন্দু ঐক্য” নিয়ে জনসমক্ষে ঘোষিত স্লোগানের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক নিয়ন্ত্রণের গভীর চক্রান্ত। যেখানে পড়িয়ে-লিখিয়ে কংগ্রেস জাতসংস্কারের বিষয়ে দোটানায় ছিল, সেখানে আরএসএস অনুক্রমিক জাতবিন্যাসকে একটা একক সভ্যতার ভিতরে “কর্মভিত্তিক বৈচিত্র্য” হিসেবে দেখিয়ে হিন্দুধর্মের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোকে একটা মতাদর্শগত উপাদানে রূপান্তরিত করা শুরু করে।
দ্বৈত হুমকি মোকাবিলার কৌশল
আরএসএস-এর আবির্ভাব নিয়ে মূলধারার ইতিহাসচর্চায় ঐতিহাসিকদের নীরবতা এক তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। এই সংগঠনের প্রাথমিক ইতিহাসকাররা—যেমন এইচ. ভি. শেশাদ্রি (১৯৮৮) ও সি. পি. ভিশিকার (১৯৭৯)—হেডগেওয়ারকে “বিদেশি আগ্রাসনের” বিরুদ্ধে হিন্দুদের ঐক্যসাধক হিসেবে দেখিয়েছিলেন। নাগপুরের জাত-সংঘাতের প্রেক্ষাপটটাকে তাঁরা সচেতনভাবে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালের গবেষকেরা তুলনামূলকভাবে সমালোচনা করেছেন বটে, তবুও তাঁরা মোটের উপর সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই মান্যতা দিয়েছেন, এর সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তিটাকে বিশ্লেষণ না করেই। অথচ, আরএসএস-এর উত্থানের স্থান-কাল সবকিছুই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে এটি মূলত জাত-বিরোধী দলিত আন্দোলনের প্রবল উত্থানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নিয়েছিল।
১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে নাগপুরে দলিত শিক্ষা, মিশনারি শিক্ষাপ্রচেষ্টার দ্রুত বিস্তার, সেন্ট্রাল প্রভিন্সেস কাউন্সিল-এ রাজনৈতিক স্বীকৃতি দাবি করা জাতভিত্তিক সংগঠনগুলোর গঠন, এবং স্থানীয় স্বশাসনে অ-ব্রাহ্মণদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ দেখা যায়। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই হেডগেওয়ারের আরএসএস-এর রূপায়ণ ঘটে; বৃহত্তর হিন্দু ঐক্য, আনুগত্য, ও শৃঙ্খলার উপর জোর প্রদান করা হয়—যে মূল্যবোধগুলো দলিত আন্দোলনের নিম্নবর্গীয় রাজনৈতিক চেতনাকে ভোঁতা করার জন্য যথেষ্ট ছিল। ফলে এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে আরএসএস-এর আবির্ভাব ঘটেছিল একটা সম্ভাব্য জাত-বিপ্লবকে প্রতিরোধের প্রচেষ্টা হিসেবে। উঁচু জাতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে নয়, বরং মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য “হিন্দু” পরিচয়ের নামে সংগঠিত করা হয়েছিল নিচু জাতের জনগণকে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ১৯২৫ সালে আরএসএস-এর জন্মের কারণ নিছক তৎকালীন সাম্প্রদায়িক অশান্তির প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এর কারণ দুটো। প্রথমত, লখনউ চুক্তি ও খিলাফত আন্দোলনের পর মুসলিম রাজনৈতিক উত্থানের ভয়; এবং দ্বিতীয়ত, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব দাবি করা ডিপ্রেস্ড ক্লাসেসদের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধি। উদ্ভাবনী শব্দটাকে যদি কেউ গভীরভাবে প্রতিক্রিয়াশীল কোনও সংস্থার জন্য ব্যবহার করে, তাহলে হেডগেওয়ার-এর উদ্ভাবনী ছিল এই দুটো উদ্বেগকে একটা একক মতাদর্শগত কাঠামোতে বাঁধা। এই মেকি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্মিত হয়েছিল নিচু জাতের জনগণকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করার জন্য এবং একই সঙ্গে জাত-কেন্দ্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে তাদের আটকানোর জন্য। এই দুই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে আরএসএস-এর মধ্যে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে, যেমন – স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে এর দূরত্ব, জাতভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়াই “হিন্দু ঐক্য”-র উপর একচেটিয়া মনোযোগ, এবং এর গোপনীয়, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সংগঠন—যা বাইরে ঐক্যের ভাবমূর্তি প্রচার করলেও অভ্যন্তরীণভাবে জাতকে নিয়ন্ত্রণ করত।
বাস্তবতা হলো বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতের ব্রাহ্মণ অভিজাতদের কাছে, ক্রমবর্ধমান জাতবিরোধী আন্দোলন মুসলিম রাজনৈতিক উত্থানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছিল। মুসলমান “হুমকি”-র মোকাবিলা করার জন্য ছিল চিরাচরিত পরিচিত কৌশল—ধর্মীয় পরিচয় জাগিয়ে, বাইরের শত্রুর ভয় দেখিয়ে, এবং ধর্ম ও জাতির রক্ষার নামে হিন্দুদের সংগঠিত করে। কিন্তু জাতের প্রশ্নটা ছিল একদম ভিন্ন; সেটা এইভাবে সামলানো যেত না। এখানে “শত্রু” ছিল হিন্দু সমাজের ভেতরেই—সেই মানুষরা, যাদের শ্রম ও সামাজিক বর্জন ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী বিশেষাধিকারের ভিত্তি। ক্রমেই উচ্চবর্ণের কাছে এই দেওয়াল লিখনটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী ধারণায় প্রভাবিত সময়ে জাতব্যবস্থার অনুক্রমিক ধারণাকে প্রকাশ্যে রক্ষা করা আর সম্ভব নয়। উচ্চবর্ণের সংখ্যা এতটাই অল্প ছিল যে দলিতদের সামাজিক বর্জনের মাধ্যমে উচ্চবর্ণের আধিপত্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। তাই কৌশল পাল্টাতে হয়—প্রতিস্পর্ধা বদলে যায় সহযোগিতায়, সংঘাতের জায়গা নেয় সহাবস্থান।
দলিতদের হিন্দুত্বের কাঠামোয় আনার জন্য ব্রাহ্মণ্য নেতৃত্ব চতুরভাবে “হিন্দু ঐক্য”-র ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। জাতপাতের অনুক্রমিক বিন্যাসটা থাকবে, কিন্তু নিপীড়িতদের মধ্যে গড়ে ওঠা জাত-চেতনাকে ধ্বংস করে দলিত আন্দোলনকে নিস্তেজ করে দিতে হবে – এই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। পরিবর্তে ধর্মীয় প্রতীক, নৈতিক শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের ভাষা হয়ে উঠবে সামাজিক সংহতির অস্ত্র। মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সংগ্রাম ছিল রাজনৈতিক; কিন্তু নিপীড়িতদের ক্রমবর্ধমান জাত-চেতনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছিল সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। এর জন্য প্রকাশ্য বিতর্ক নয়, বরং প্রয়োজন ছিল সামাজিকভাবে ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করা; প্ররোচনা নয়, বরং নৈতিক শাসন ও মানসিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলা; এবং গোটা বিষয়টাকে এমন একটা সাংগাঠনিক রূপ দেওয়া যা জনগণের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম।
এই ফর্মুলা মেনেই আরএসএস-এর নকশা তৈরি করা হয়; যাতে করে একটা শৃঙ্খলাপরায়ণ, অনুক্রমিক হিন্দু সংগঠন তৈরি করা যায়; যেখানে একদিকে যেমন থাকবে না কোনও জাত সংঘাত, আবার অন্যদিকে ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যও বজায় থাকবে। এভাবেই জাতীয় পুনর্গঠনের আড়ালে ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যকে রক্ষা করা হয়েছিল আরএসএস-এর মাধ্যমে। দৈনিক কসরত, ইউনিফর্ম পরিহিত শৃঙ্খলা, এবং গৌরবময় হিন্দু অতীতের পৌরাণিক স্মরণের মাধ্যমে জাতপাতের শিকল থেকে মুক্তির রাজনীতিকে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিল “হিন্দু জাতি”-র আবেগঘন ঐক্যের গল্প দিয়ে। আর এটা করতে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের অভ্যন্তরীণ সংকটের একটা নিখুঁত সমাধান প্রদান করেছিল আরএসএস – জবরদস্তির বদলে মতাদর্শগত সম্মতির মাধ্যমে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
উপসংহার: জাত, সাম্প্রদায়িকতা, এবং প্রতি-বিপ্লব
পরিশেষে এটাই বলার থাকে যে দ্বৈত-হুমকির তত্ত্বটি (Dual-threat thesis) আরএসএস-এর গঠনের প্রচলিত সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক বেশি পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করে। এর সামরিকধর্মী কাঠামো উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমটা সরবরাহ করেছিল—বাহ্যিকভাবে “মুসলিম হুমকি”-র মোকাবিলা এবং আভ্যন্তরীণভাবে জাত-প্রশ্নকে দমন করা। এইভাবে, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাই হয়ে উঠেছিল জাত সংহতির এক ‘সম্মানজনক মুখোশ’। এই সংগঠনটি আসলে ছিল একটা ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রতিবিপ্লবী প্রকল্প।
এই উৎপত্তিকে বুঝতে পারলে তবেই এটা স্পষ্ট হয় যে হিন্দু ঐক্য নিয়ে এত কথা বললেও জাত নিপীড়নের বিষয় নিয়ে আরএসএস-এর এই হিরণ্ময় নীরবতা কেন, এবং কেন তাদের জাতীয় সংহতির ধারণা বারবার নতুন নতুন শত্রু খুঁজে পায়—প্রথমে মুসলমান, তারপর খ্রিষ্টান, আর এখন “আরবান নকশাল”। জাত-কেন্দ্রিক নিপীড়নের বিষয়কে অস্বীকার করাটাই তাদের রাজনীতির গোপন ভিত্তি। এই চেপে রাখা ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করা তাই নিছক ঐতিহাসিক সংশোধন নয়, বরং একটা রাজনৈতিক আশু প্রয়োজন—কারণ এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রকৃত বিপ্লবী চ্যালেঞ্জটা সবসময় এসেছে ভেতর থেকেই—সেইসব মানুষের কাছ থেকে, যারা অচ্ছুত থাকতে অস্বীকার করেছিল।
মূল প্রবন্ধ এবং কভার ফটো সৌজন্যে – https://thewire.in/caste/the-rss-was-also-a-reaction-to-early-dalit-mobilisation [Retrieved On: 29/11/2025]

One thought on “প্রারম্ভিক দলিত আন্দোলন ও আরএসএস-এর আবির্ভাব: এক অনালোচিত ইতিহাস – পর্ব ২”