হিংসার খবরে আমরা কম বেশি অভ্যাস করে ফেলেছি। ইন্টারনেট থেকে খবরের কাগজে হিংসার বিবরণ শিহরিত করছে না ইদানিং। গনপিটুনিতে অন্য ধর্মের মানুষ মরছে, চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে, জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দলিত শিশু কিশোর মহিলাদের উঁচু জাতের ছোঁয়া বাঁচিয়ে না চলার কারণে পিটিয়ে মেরে দেওয়া হচ্ছে, বিচার ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে পুলিশ আর্মির সন্দেহ বশে হত্যা, বিশেষ করে ধর্ষণ-খুন, মেয়েদের ওপর অত্যাচারের চেনা-জানা পুরনো সংবাদ পড়তে পড়তে সয়ে গেছি আমরা। আমরা ভুলতে বসেছি প্রদীপের কৃত্রিম আলোর নিচে থাকা অন্ধকারের কথা। যে অন্ধকারে সাধারণ, সংখ্যালঘু, দলিত, গরীব মানুষের নিত্য বাস। নিরাপত্তা বা পরিত্রাণ হোক, বিচার দূর অস্ত। থানা কিংবা কোর্ট, পুলিস অথবা জাজ, ক্ষমতায় থাকা সরকারি দল, বা বিরোধী পক্ষ সবার কাছেই এরা জঞ্জাল, এদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। মাঝে মাঝে খবরের শিরোনাম, কিছু মুহূর্তের হতাশা, রাজনৈতিক তরজা ছাড়া আর কোন প্রাপ্য নেই।
ঢাকঢোল পিটিয়ে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি হলো। বিপুল খরচের প্রচারে পালিত হলো অমৃত উৎসব। আমরা নির্দ্বিধায় দিব্যি গিলে ফেললাম কিছু সত্যি। বিজেপি আসার পর মেয়েদের ওপর অত্যাচার যে বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ, পৃথিবীর অন্যতম জন ঘনত্বের এলাকা, উত্তর প্রদেশে লাফিয়ে বেড়েছে ধর্ষণ খুনের ঘটনা, সরকারি ঢক্কানিনাদে সেইসব হারিয়ে গেল। পরিসংখ্যান অনেক সময় ঘটনার তীব্র হিংসা ভোঁতা করে দেয়। কিছু কিছু ঘটনা যদিও অবচেতনে থেকে যায়। বিচারের পরিহাস, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতিহিংসা ম্লান করে দেয় বাকি সব কিছু। আমরা ভুলতে পেরেছি কি উন্নাও-এর মেয়েটির কথা? সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট তো বটেই, তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। অপরাধ? অভিযুক্ত ছিল এক সরকারে থাকা মন্ত্রী। কিংবা হাথরাস? লখিমপুর খেরীর ধর্ষিত মৃত দলিত দুই বোন? অথবা আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গার সময়কার বীভৎসতা?
এই সমস্ত ঘটনার একটা নির্দিষ্ট বিন্যাস আছে। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই হিংসার লক্ষ্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, বা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হওয়া দলিত গোষ্ঠী। কম-বেশি প্রতিটা উদাহরণেই নিপীড়কদের পিছনে থেকেছে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল, বিশেষত সাম্প্রদায়িক বিষ ওগরানো বিজেপি। বিশেষত দেশভাগের পর হিংস্রতায় ছাপিয়ে যাওয়া ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গায় তা স্পষ্ট। ৭ দিন ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চলা নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ সাধারণ বিচারে বর্ণনা করা মুস্কিল। সরকারি হিসেবে ১০০০ জন নিহত এবং লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। গুজরাতের বিজেপি সরকার মোদীর নেতৃত্বে পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ ভাবে ঘাতকদের পাশে ছিল। বিচার ব্যবস্থাও রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ফলতঃ দ্রুত এবং নিরপেক্ষ বিচার অনেক সময়েই পাওয়া যায়নি। গেলেও পেছনে থাকা প্রভাবশালী মন্ত্রণাদাতারা সুষ্ঠু বিচারের আওতায় আসেনি। যাঁরা সেইসময় নির্বিচার হত্যালীলার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন এবং পরে সাক্ষ্য দেন দাঙ্গায় সরকারের ভূমিকাকে সমালোচনা করে তাঁরা রাষ্ট্রীয় রোষের থেকে রেহাই পাননি আজও। মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগে তারা অভিযুক্ত। বিজেপি প্রচারিত দেশপ্রেমের সংজ্ঞার বাইরে তারা, তারা দেশদ্রোহী নামে চিহ্নিত। কেউ কেউ বলেন ২০০১ সালে বিজেপি গুজরাতে রাজনৈতিক জমি হারাচ্ছিল। সেই সময় গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি পর্যুদস্ত হয়। মুখ্যমন্ত্রী পদে কাশুভাই পটেল-কে সরিয়ে মোদী আসেন। তার ঠিক তিন মাস পরে গোধরা কাণ্ডে ৫৬ জন অযোধ্যা ফেরত করসেবককে মুসলিমরা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে, এই অভিযোগে শুরু হয়ে যায় মুসলিম হত্যালীলা। গুজরাতে দাঙ্গার পরেও ২০ জনকে জঙ্গি সন্দেহে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এগিয়ে আসা গুজরাত বিধানসভায় বিজেপি পুনরায় নির্বাচিত হয়। ধর্মীয় জিগির তুলে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার এই কর্মকাণ্ডকে অনেকে আবার গুজরাত মডেল বলেও বিশেষিত করেন।
যাঁরা মূল ভূমিকায় ছিলেন, তাঁরা আজ মুক্ত। নিরন্তর সাম্প্রদায়িকতার বিষ সমাজের পরতে পরতে ছড়িয়ে চলেছেন। এবং অল্প সংখ্যক কিছু যাঁরা বিচারের ছিটে ফোঁটা পেয়েছেন, তাঁদের আপাত স্বস্তি এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আজ তলানিতে। ৭৫-তম স্বাধীনতা দিবসে, গুজরাত দাঙ্গায় ধর্ষিত বিলকিস বানো-র ১১ জন ধর্ষক ১৫ বছর জেল খাটার পর গুজরাত সরকারের বদান্যতায় ছাড়া পেয়ে যায়। অথচ ইন্ডিয়ান পেনাল কোড অনুযায়ী ধর্ষণ খুনের ঘটনায় শাস্তি প্রাপ্তদের আজীবন বন্দী থাকার কথা। যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রকৃতই তাদের জন্য। যারা ধর্মের ধুয়ো তুলে ঘৃণ্য অপরাধ করল, বিলকিসের সাথে থাকা ১৪ জনকে যারা খুন, ধর্ষণ করল, ৩ বছরের শিশু থেকে তিন দিনের শিশুর মাথা পাথরে আছড়ে মারল, তারা ওদের প্রতিবেশী ছিল। প্রত্যেকে ছিল মৃত ধর্ষিতদের চেনা মুখ। বিলকিসের বিচার চাওয়ার কাহিনি মর্মান্তিক। থানার অপরাধীদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুল অভিযোগ নেওয়া থেকে শুরু করে হাসপাতালের ধর্ষণের প্রমান লোপাট তো ছিলই, বিলকিস কখনওই নিজের ভিটেয় ফিরে যেতে পারেননি পুরোটা সময়। পরিচয় লুকিয়ে এক বাসা থেকে অন্য বাসা বদল করে টিকে থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১১ জন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও এখনো তাকে স্থিতাবস্থা দিতে পারেনি ভারতীয় বিচারব্যবস্থা। যারা ছাড়া পেলো, তাদের জন্য জেল গেটে মালা মিষ্টি ছিল। বীরের অভ্যর্থনা পেয়ে বিলকিসের গ্রামে ফেরত গেলো তারা। বিলকিস ঘর ছাড়া। ন্যায় বিচার উনি পাননি। ভবিষ্যতে আদৌ পাওয়া যাবে কিনা, তাও নিশ্চিত নন।
বিলকিসের ঘটনা, ইশরাত জাহান, সোহরাবউদ্দিনের রাষ্ট্রীয় হত্যা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতিত্ব। রাষ্ট্র ধর্মীয় অন্ধত্বের আড়ালে, পিছিয়ে থাকা সংস্কার রক্ষার হিড়িক তুলে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বার্থ পুষ্ট করছে, এবং গত কয়েক দশক, বিশেষ করে বিজেপি শাসনকালে এটাই চলতি রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা, সংখ্যালঘু এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের বাসস্থান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, বা নির্বাচনের আগে মেরুকরণের জন্য দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি এগুলো সবই বিজেপি-আরএসএস এর কর্ম পদ্ধতির মধ্যে পড়েছে। লোকমানসে অপর ধর্মের প্রতি ঘৃণা, অবিশ্বাস, এবং অসূয়া, স্বাভাবিক লৌকিক সংস্কৃতিতে গভীরে শেকড় গেড়েছে। ফলে আধুনিকতার খোলা হাওয়া মুক্তি আনে না, বরং বাহুবলি সংস্কৃতির দোসর হয়ে দাঁড়ায়। অশুভ এই জোট একদিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে যেমন মিডিয়াকে কাজে লাগায়, তেমনই মানুষের চোখে হিংসার ঠুলি পরিয়ে দেশীয় সম্পদ বাঁটোয়ারা করে ফেলে উঠতি আদানি আম্বানি টাটার মত শোষণমূলক শক্তিগুলোর মধ্যে। টাটার হাতে অত্যন্ত কম মূল্যের বিনিময়ে সরকারি এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি, মুনাফাখোর বেসরকারি ক্ষেত্রের সাথে রফা করে ভারতীয় রেলের বেসরকারিকরণের উদ্যোগ, লাভজনক সরকার পরিচালিত কারখানা বেচে দেওয়া এসব তথ্য আর গোপন নয়। এটাও জানি যে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের কাজে লাগে না আর। বাজারের চাইতে কম মূল্যে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে, স্থানীয় মানুষের জীবনের তোয়াক্কা না করেই দেশের বাইরে তা কিভাবে যেন চালান হয়ে যায়। আমরা প্রতিদিন টের পাই আমাদের জীবন-জীবিকা কেমন করে যেন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বোঝা যায় জীবনের দায় সরকার ঝেড়ে ফেলেছে, জীবিকা নির্বাহের নিরাপত্তা রাষ্ট্র আর দেবে না। অথচ নীতিগত ভাবে এর ঠিক বিপরীতটাই হওয়ার কথা। প্রতিনিয়ত আমাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে অসম প্রতিযোগিতার ময়দানে। যেখানে আমার শত্রু আমারই ক্ষইতে থাকা শক্তি, ক্ষুধার্ত পেট এবং আমারই মতন আর এক ভুখা পেট নিয়ে লড়তে আসা আরেকটা মানুষ। আমরা নির্লিপ্ত চোখে তখনও ৫৬-ইঞ্চি চওড়া বুক চাপড়ানির খবর দেখি। অতিরঞ্জিত, মিথ্যের পালিশ দেওয়া সমৃদ্ধির খবরে পুলকিত হই। অথবা রগরগে উত্তেজক বিনোদন খুঁজি। সরকারি প্রচারের সত্যতা, যে বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখেই সম্ভব আমরা তা ভুলে গেছি। কৃত্রিম এক রঙিন বুদবুদে আমাদের আটকে ফেলা গেছে।
ঐতিহাসিক ভাবে ক্ষয়ে যাওয়া প্রাচীন মূল্যবোধ, যা আসলে নারী পুরুষের পায়ে শেকল পরিয়ে রাখে, বাড়তে দেয় না, মুক্তির ভাবনাকে গলা টিপে মারে, বহু এগিয়ে থাকা মানুষের গণআন্দোলন এবং গণদাবীর ফলে তাকে আংশিক ভাবে খতম করা গিয়েছিল। কিন্তু আঁধার ঘুচলো কই? আমাদের দেশে অসাম্য শুধু মানুষের রোজগারেই সীমাবদ্ধ নয়, তা সমাজ সংস্কৃতিতেও রয়ে গেছে। ভারতীয়ত্ব শুধু একটি মাত্রাতেই অস্তিত্ব রাখে, এমনটি নয়। দেশের মাটিতে বহু দেশ বিরজমান। জায়গায় জায়গায় বহু ধর্ম, সংস্কৃতি তো বটেই, অর্থনৈতিক তারতম্য রয়েছে, রয়েছে বিকাশের ফারাক। আরএসএস এবং বিজেপি-র রাজনীতি যেহেতু জোর খাটানোর নীতি এবং বল প্রয়োগ করে সমস্ত ফারাক মিশিয়ে দেওয়ার কৌশল, তাই তার বলে সে প্রতিষ্ঠা করতে চায় তার প্রচলন করা একটিই ধর্ম, একটিই ভাষা, একটিই সংস্কার। কারণ তার একদিকে যেমন প্রয়োজন, শোষণ করা যাবে এমন শ্রমিক বাহিনী, যার কাছে পেটের দায়ে নিজের শ্রমের মূল্যের দরাদরি করা রাষ্ট্রের লাগু করা নিয়মে নিষিদ্ধ হবে, তেমনি দরকার এই বিপুল শ্রমিক বাহিনীকে বল প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনে সেরকম বল প্রয়োগ করতে সক্ষম ও প্রশ্নহীন ভাবে অনুগত লেঠেল শ্রেণী। ফলতঃ সার্বিক আর্থ-সামাজিক বিকাশ বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরোয়া না করে জাত, শ্রেণী, ধর্মের, লিঙ্গের বিভাজন ইচ্ছাকৃত ভাবে পোষণ করা হলো। কারণ পুরনো পচে যাওয়া, শোষকের পক্ষে থাকা সংস্কৃতি কার্যকর করার আশু প্রয়োজন আছে বর্তমান রাষ্ট্রের আছে। গণতন্ত্রের খোলা হাওয়ায় প্রশ্ন করবার মৌলিক অধিকার তার জন্য ক্ষতিকারক, বিরোধিতার পরিবর্তে নির্বিবাদ আনুগত্য, তার টিকে থাকার জন্য আবশ্যিক শর্ত। প্রশ্নহীন আনুগত্য সে আদায় করবেই সংস্কারের দোহাই দিয়ে, কখনও বা বল প্রয়োগ করে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে, বা অন্ধ কুঠুরিতে নির্বাসন দিয়ে। প্রথানির্ভরতা, জীর্ণ সংস্কারের সাথে তাই বর্তমান রাষ্ট্রের সঘন বন্ধুত্ব। এমন এক ব্যবস্থা তার চাই যেখানে প্রবৃত্তিই শেষ কথা বলবে, খিদে মেটানো এবং নির্বিচার ভোগ করা ছাড়া মানুষের আর কোন চালিকা শক্তি অবশিষ্ট থাকবে না, ক্রমশ ফিরে যাব আমরা হিতাহিত শুন্য পশুর দশায়।
এবং তা ছাপ ফেলেছে নারীপুরুষের সম্পর্কেও। নারীকে পুরুষ দমন করবে এবং নিজের প্রয়োজনে রক্ষা করবে, এটাই বিজেপির উদ্দিষ্ট সামাজিক লক্ষ্য। এর গোড়ায় প্রতিক্রিয়াশীল মনুবাদী ভাবনা কাজ করছে, তা আমরা জানি। আমরা এটাও বুঝতে পারি, সম্পর্কের মূল জায়গা যে সমতা তা দিব্যি গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্যই মেয়েরা শ্রম বাহিনীর অংশ। এবং দরকার পড়লে তারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে লাঠি ধরতেও পারে। কিন্তু মননে এবং সামাজিক ভাবে পুরুষের চেয়ে তারা নিচুতলার বাসিন্দা। পুরুষ রাষ্ট্রের পোশাকে ধর্ষণ করে গাছে ঝুলিয়ে দিতে পারে তার লাশ। বা পুলিশ হয়ে হত্যা করতে পারে তার ধর্ষক হিসেবে চিহ্নিত সুবিধাজনক মিথ্যে অপরাধীকে। তাই ক্ষমতার বলকে মহিমান্বিত করে যে সমাজ সেখানে বিলকিস অনন্যা। এবং একথাও মনে রাখতে হবে, বিলকিসের লড়াই শুধুই ১১ জন ধর্ষককে শাস্তি দেওয়ায় শেষ – এই জাতীয় ধারণা আসলে সুবিধাজনক সরলীকরন। ঐতিহাসিক ভাবে নিপীড়ক রাষ্ট্রের ভূমিকা বকলমে পুরুষ ঘরে বাইরে পালন করে এসেছে, কারন বৃহত্তর অর্থে পুরুষ রাষ্ট্রীয় শোষণ ব্যবস্থার অন্যতম চালক এবং বাহক। বিশেষত বিজেপি-আরএসএস ব্যপকতর অর্থে দমন পীড়নের বৈধতা দিয়েছে। মেয়েদের ওপর চলতে থাকা হিংসা, তা আসলেই রাষ্ট্রের দ্বারা স্বীকৃত। এবং সংখ্যালঘু খতম রাষ্ট্রের স্বঘোষিত এজেন্ডা। ফলে বিলকিস যেমন রাষ্ট্রীয় হিংসার শিকার, যেমন রাষ্ট্রের পোষা পুরুষ দাঙ্গাবাজরা ঠিক এভাবেই মুসলিম মেয়েদের ক্ষমতা দেখাবে, দমন করবে, ঠিক তেমনি দেশের এক কোণ থেকে অন্য কোণে অবাধ ধর্ষণ-খুন আসলেই মেয়েদের দমন কৌশল ভিন্ন আর কিছু নয়। এখানে অত্যাচারী পুরুষ রাষ্ট্রীয় দমন নীতিকেই পরোক্ষে লাগু করছে। জনমানসেও ধর্ষণ বা লিঙ্গ হিংসাকে উত্তেজক খবর করে দেখানো হয় বিনোদনের অন্যতম উপায় হিসেবে। পরোক্ষ নির্লিপ্ততা আরোপ করা হয়, পটভুমিকায় রাষ্ট্রের হিংসার পক্ষে থাকা নীতিগত অবস্থানকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বিলকিস যখন লড়েন, তখন তা আসলে রাষ্ট্রের অবস্থানকেই প্রশ্ন করে, তার ভুমিকাকে স্পষ্ট করে। তা আমাদের সবার লড়াই। এই লড়াই জারি থাকুক। পুরুষের আধিপত্যকামী রিরংসা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণের পেছনে থাকা জনবিরোধী, অশুভ জোটকে আমাদের লড়াই করেই পরাজিত করতে হবে। এই ভরসাই আমরা বিলকিসের লড়াইয়ে রাখি।
লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার অক্টোবর ২০২২ সংখ্যায়
কভার ফটো সৌজন্যে – https://www.siasat.com/bilkis-bano-challenges-release-of-11-convicts-in-supreme-court-2469148/ [Retrieved On: 20/03/2023]
