রানার ছুটেছে – স্যুইগি, জোমাটো, ব্লিঙ্কিট ‘রানার’দের কথা

ধরা যাক, সোনা ভট্টাচার্য-র (নাম পরিবর্তিত) কথা। বছর চল্লিশের সোনা বাবু জেরক্স, প্রিন্টার মেশিনের পার্টস বিক্রি করতেন, নিজে রিপেয়ারিং করতেন। লকডাউনে ওনার সমস্ত রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বাধ্য হয়ে উবের মোটো চালাচ্ছেন এবং জোমাটো-তে ডেলিভারীর কাজ করছেন। হাই প্রেশার ও ডায়াবেটিসের রুগী হয়েও দিনে ১২-১৪ ঘন্টা তাকে পরিশ্রম করে যেতে হচ্ছে সামান্য উপার্জনের জন্য, পরিবার প্রতিপালনের জন্য। বা ধরা যাক, সৌরজিতের কথা। বছর ৩৭ এর সৌরজিত ফিল্ম মেকিং ও ফটোগ্রাফির স্বপ্ন নিয়ে মফস্বল থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। এখন কোলকাতায় থাকা খাওয়ার খরচ জোগানোর জন্য সাইকেল নিয়ে স্যুইগির খাবার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে হচ্ছে। শুধু সোনা বা সৌরজিৎ কেন, সারা দেশে বেকারত্বের সমস্যা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে দেশের কোটি কোটি যুবসমাজের কাছে আজ প্ল্যাটফর্ম বা গিগ ওয়ার্কারের জীবিকা বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘রানার’ কবিতায় ডাকহরকরাদের জীবনের কাহিনী তুলে ধরেছিলেন। যারা রোদ, জল, ঝড়, বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দুর্গম পথ অতিক্রম করে সময়ের কাঁটাকে হার মানিয়ে গ্রাহকের বাড়িতে চিঠি বা খবর পৌঁছে দেবার কাজ করতেন। আজ সভ্যতার তথাকথিত অগ্রগতি এবং প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে এই প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কাররা সেই রানার-এর স্থান নিয়েছেন। বেকারত্বের জ্বালা বুকে নিয়ে দিন রাত এক করে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ওরা মোটর বাইকে বা সাইকেলে চেপে ছুটে বেড়াচ্ছে। দিনের শেষে ওদের হাতে জোটে নামমাত্র কিছু টাকা, যেটা দিয়েই ওদের পূরণ করতে হয় নিজেদের এবং পরিবারের সমস্ত শখ আহ্লাদ।

কলকাতা শহরের বুকে প্রতিদিন কয়েক হাজার নতুন কর্মী অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিজেদের নথিভুক্ত করাচ্ছে, ডেলিভারী দেবার কাজে। কেউ কেউ ধার করে বা EMI-তে মোটরবাইক কিনছে। কারণ এই প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে গেলে আপনার নিজস্ব বাইক বা নিদেনপক্ষে সাইকেল থাকা আবশ্যিক। এই প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কারদের রোজগার কিভাবে হয়? কোন গ্রাহক যখন নির্দিষ্ট অ্যাপ মারফত কোন খাবার বা দ্রব্যসামগ্রী অর্ডার করছেন, তখন ঐ অ্যাপ গ্রাহকের কাছ থেকে একটা ডেলিভারী চার্জ আদায় করে। তার একটা অংশ সংশ্লিষ্ট অ্যাপ যিনি ডেলিভারীটি করলেন, তাকে দেয়। বাকিটা ঐ অ্যাপের কমিশন। সাধারণতঃ দেখা যায় যে অ্যাপগুলো ডেলিভারী চার্জ হিসাবে যতটাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করে তার অর্ধেকও ডেলিভারীম্যানদের দেওয়া হয় না। কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় যাঁরা এই ডেলিভারীর কাজ করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের উপার্জন তলানিতে এসে ঠেকেছে। অনেক দিনই এইরকম হয় যে বাইকের তেল খরচটাও ওঠে না। একদিকে তাদের মজুরি চুরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে দূরত্বের কিলোমিটারেও তাদের প্রতারিত করা হয়। বিভিন্ন অ্যাপগুলো পিকআপ পয়েন্ট থেকে ডেলিভারী লোকেশনের দূরত্ব অনুযায়ী ডেলিভারী কর্মীদের পারিশ্রমিক দেয়। অনেক সময়েই দেখা যায় অ্যাপে দেখানো হচ্ছে ডেলিভারী লোকেশনের দূরত্ব ৩ কিমি, কিন্তু প্রকৃত দূরত্ব দেখা যাচ্ছে ৪ কিমি। অর্থাৎ ডেলিভারী চার্জও কম পাচ্ছে, বাইকের তেলও বেশি পুড়ছে। অ্যাপগুলো এমনভাবে তৈরি যে এই দূরত্বের কারসাজিটা করে রাখা আছে।

বর্ষাকালে ঝড়, বৃষ্টির মধ্যেও ডেলিভারীর কাজ করে যেতে হয় । স্যুইগির মতো কোম্পানীগুলো বৃষ্টির মধ্যেও যাঁরা ডেলিভারী অক্ষুণ্ণ রাখেন, তাঁদের একটা অতিরিক্ত ভাতা দেয়। যেটার খাতায় কলমে পরিমাণ ডেলিভারী পিছু সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা এবং সর্বনিম্ন ১৫ টাকা। কিন্তু বাস্তবে কখনোই ২০ টাকার বেশি দেওয়া হয় না। কখনও কখনও ১০ টাকাও দেওয়া হয়। আবার বৃষ্টির মধ্যে কাজ করে কেউ ভাতা পেয়েছে, কেউ পায়নি, এমন উদাহরণও প্রচুর আছে। ব্লিঙ্কিট তার বিজ্ঞাপনে ১০ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারীর প্রতিশ্রুতি দেয়। ব্লিঙ্কিট এর আগে নাম ছিল গ্রোফার্স, পরে জোমাটো কিনে নিয়ে নতুন নামকরণ করেছে। এখন এদের রমরমা বাজার। ডেলিভারী প্রতি পেমেন্ট কমিয়ে করে দেওয়া হয়েছে ২০ টাকা। দৈনিক ইনসেনটিভ ৮৫০ টাকা থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৭০০ টাকা (২০ টা অর্ডার দৈনিক ডেলিভারী করলে)। এখন পেট্রোলের দাম যে জায়গায় গিয়েছে, তাতে কিলোমিটার প্রতি বাইকের খরচা পড়ে যায় ৩-৪ টাকা। অর্থাৎ ৫ কিমি দূরে অর্ডার পৌঁছাতে গেলে খরচ পড়বে ১৫-২০ টাকা। সেখানে কোম্পানী দিচ্ছে ২০ টাকা। (আগে ছিল ৫০ টাকা)। ফলে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের ইনকাম তাহলে কত দাঁড়াবে? মোটামুটি, স্যুইগি জোমাটোতে কাজ করে রানারদের মাসিক গড়ে ১২-১৫ হাজার টাকা উপার্জন হতো, কিন্তু যেভাবে কোম্পানীগুলো টাকা কমাচ্ছে, তাতে আগামী দিনে মাসে ৬-৭ হাজার টাকাও হবে কিনা সন্দেহ থাকছে।

গত বছর পুজোর আগে ব্লিঙ্কিট কর্মীরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। একই ভাবে পুজোর আগে স্যুইগির ডেলিভারী কর্মীরাও কাজ বন্ধ করে দেন। তাঁরা মূল দাবি রেখেছিলেন দুটো ডেলিভারী পিছু ৪ কিমি দূরত্ব অবধি ন্যূনতম ৩৫ টাকা করে দিতে হবে। (বর্তমানে দেওয়া হয় ২০ টাকা) এবং অতিরিক্ত প্রতি কিলোমিটারের জন্য ১০ টাকা দিতে হবে (বর্তমানে দেওয়া হয় ৫ টাকা)।

কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনের চক্করে মানুষ আশা করে দ্রুত তাঁর কাছে জিনিস পৌঁছে যাবে। নয়া উদারবাদী অর্থনীতির বিকৃত প্রতিফলনের মাধ্যমে একশ্রেণীর মানুষের হাতে যথেষ্ট পয়সা এসেছে এবং সাথে সাথে তাদের মধ্যে পরজীবি বিকৃত মানসিকতারও জন্ম হয়েছে। অনেকেই এমনকি সিঙাড়া, চপ বা চা আর দোকান থেকে কিনে না নিয়ে এসে বাড়িতে বসে অ্যাপে অর্ডার করে দিচ্ছে। অ্যাপগুলোও মানুষকে বিভিন্ন লোভ দেখাচ্ছে, ডিসকাউন্ট, ১০ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারী ইত্যাদি। কিন্তু সেই চক্করে টাইম রক্ষা করতে গিয়ে ডেলিভারী রানারদের পিঠে বড় বড় বোঝা নিয়ে মরিয়া হয়ে বাইক ছোটাতে হচ্ছে। দুর্ঘটনাও ঘটছে, রানার আহত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন। দুর্ঘটনা ঘটলে, হতাহত হলে কিন্তু কোম্পানির কোন দায় নেই, কারণ রানার’রা প্রচলিতভাবে কেউ কোম্পানির কর্মচারী নয়, সবাই ফ্রিল্যান্সার। এছাড়াও পুলিশী উৎপাত, জরিমানা এগুলোতো আছেই, যার দায় সম্পূর্ণভাবেই রানারদের।

কলকাতা শহরে বর্তমানে রঙ মিস্ত্রী, রাজ মিস্ত্রী, কাঠের মিস্ত্রী, সর্দারদের দৈনিক মজুরি ৬০০-৭০০ টাকা। সেখানে একজন ডেলিভারী রানার দৈনিক ১২-১৪ ঘন্টা লেগে থেকে উপার্জন করেন দৈনিক খুব বেশি হলে ৪০০-৫০০ টাকা। কিন্তু শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি এইরকম সঙ্কটজনক জায়গায় গিয়েছে যে আমাজন, ফ্লিপকার্ট, ই-কার্ট হোক বা স্যুইগি, জোমাটে, ব্লিঙ্কিট, কোনো না কোনো প্ল্যাটফর্মে ডেলিভারীর কাজে নাম লেখানো ছাড়া তাঁদের কাছে আর কোনো রাস্তা এই মূহুর্তে নেই।

তবে আশার কথা ডেলিভারী ওয়ার্কাররা সংগঠিত হবার চেষ্টা করছেন, সংগঠিতভাবে নিজেদের দাবিগুলোকে ওঠাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ের স্যুইগি-জোমাটো-ব্লিঙ্কিট কর্মীদের আন্দোলন আমাদের আশা জোগায়। কলকাতার বিভিন্ন জোন থেকে একত্রিত হয়ে তাঁরা মিছিল করেছেন, কোম্পানীর সাথে দরকষাকষির আলোচনা চালিয়েছেন। অন্তত কিছু দাবি, সাময়িকভাবে হলেও, তাঁরা আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন।


লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার সম্পাদনায় ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত “শ্রমিক বিরোধী লেবার কোড এবং শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি: কিছু খন্ডচিত্র” নামক পুস্তিকায়


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://thewire.in/labour/india-gig-workers-protests-pil [Retrieved On: 02/02/2023]

Leave a Reply