মানবাধিকার ও রাষ্ট্র

সাধারণভাবে মানবাধিকার বলতে বোঝায় জন্ম থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সমূহকে, যা জাতি, লিঙ্গ, জাতীয়তাবাদ, ভাষা, ধর্ম বা অন্য যে কোনো পদবী নির্বিশেষে সকল মানুষের আইনি অধিকার হিসেবে সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু বর্তমানে সারা দেশে যে সব ঘটনা ঘটে চলেছে বা রাজ্যগুলির তাতে যা ভূমিকা – তার দিকে দৃষ্টি রেখে বলা যায় বর্তমান ভারতে মানবাধিকারের ধারণাটি লঙ্ঘিত, পদদলিত। সরকারী বদান্যতায় যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) গঠিত হয়েছে তা কোনোভাবেই সেই অর্থে মানবাধিকারের ধারণাটির পূনর্জন্ম লাভে সহায়তা করে না এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এই কমিশনের ভূমিকা নগণ্য।

অতীতের বিভিন্ন ঘটনা যা ঘটেছে তা আলোচনা না করেও বর্তমানে এই দেশে যে সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলেছে- তাতে মানবাধিকার ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে ছত্তিসগড়-তেলেঙ্গানা সীমান্তে নকশাল দমনের নামে সিআরপিএফ ও ভারতীয় বায়ুসেনা এক বিশাল অঞ্চলে আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ করে চলেছে। বাস্তবে এই হামলা সাধারণ নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপরেই হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, নকশাল দমনের নামে গণহত্যা করা হচ্ছে। কেন্দ্র এবং ছত্তিসগড় রাজ্য সরকার তার নাগরিকদের জীবন জীবিকা ও সম্পত্তির ওপর এই যে প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। মানুষের বাঁচার অধিকার সবথেকে বড় অধিকার, যা রাষ্ট্র “নিজের সন্তানের” থেকে এইভাবে কেড়ে নিতে পারে না। কিছু গণতান্ত্রিক ও অধিকার সংগঠন এর বিরোধিতা করলেও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এই বর্বরতম আক্রমণের কথা এখনও পর্যন্ত কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি এবং বৃহত্তর নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক মহল থেকে তেমন কোন প্রতিবাদ দেখা যায়নি। ১১-ই জানুয়ারি ছত্তিসগড় সীমান্তে বোমা বর্ষণে নিহত আদিবাসী রাজনৈতিক কর্মী পোটটাম হুনগি-র মৃতদেহ সরকারের এই বর্বরতার সাক্ষ্য বহন করছে।

শুধু কেন্দ্র সরকার বা পড়শি রাজ্য নয়, বর্তমানে এই রাজ্যেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা হামেশাই ঘটে চলেছে। জানুয়ারী মাসে নদীয়া জেলার নবদ্বীপে আটজন সাংবাদিকের ওপর জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের “অপরাধ” মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানকে তারা জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। তারা নাকি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভূয়া খবর পরিবেশন করেছেন!

যদি ধরে নেওয়া হয় যে চেয়ারম্যানের অভিযোগ সত্য, তথাপি অন্য কোন ব্যবস্থা না নিয়ে চেয়ারম্যান তার সরকারী ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঐ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করলেন – এটা কি ধরণের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি? গোটা রাজ্য তথা দেশজুড়ে যে সমস্ত সাংবাদিকরা শাসকের মনপছন্দ খবরের বাইরে অন্য কোন খবর কভার করার চেষ্টা করছেন, তাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে আঘাত নামছে, এমনকি জেলবন্দী এবং হত্যাও করা হচ্ছে। সত্য সাংবাদিকতার ওপর এই আক্রমণ গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত। সরকারের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার সংবাদপত্রের আছে। ১৯৫১ সালে গঠিত প্রেস অ্যাক্টে সংবাদপত্রের এই স্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়েছে। এর পরে এই আইন ১৯৫৬ সালে সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে এই আইনটি নতুন করে বিঞ্জপিত হয় এবং ১৯৭৬ সালে Provision of Publication of Objectionable Matter Act 1976 আইন রূপে মান্যতা পায়। এতে ১১-টি সেকশন আছে এবং এই আইন মোতাবেক জনস্বার্থে গণতান্ত্রিকভাবে সাংবাদিকদের কোন বক্তব্য বা লেখার স্বাধীনতা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কোন পৌরসভার চেয়ারম্যানকে জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন করায় জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা মনে হয় স্বাধীন ভারতে এই প্রথম।

শাসকের এই রক্তচক্ষু যে শুধু সংবাদপত্র বা সাংবাদিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে তা নয়, পরিবেশবিদ বিবর্তন ভট্টাচার্যের সাথে সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে, তাও আর একবার শাসক কর্তৃক মানুষের অধিকার হরণ করার দৃষ্টান্ত কে সামনে নিয়ে এসেছে এবং মানুষের মত প্রকাশের অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। গত ১০-ই জানুয়ারী, ২০২৩ তারিখে চাকদহের বাসিন্দা পরিবেশ কর্মী বিবর্তন ভট্টাচার্যের কাছে রাত ১১-টার সময়ে একটি ফোন কল আসে, শাসক ঘনিষ্ঠ জনৈক মাটি মাফিয়া তাকে হুমকি দিয়ে বলে যে জলাভূমি ভরাটের বিরোধিতা করলে বিবর্তন বাবুর অসুবিধা হয়ে যাবে। তিনি ঐ ব্যক্তির ফোন নম্বর সহ থানায় অভিযোগ করলে থানা এটিকে জেনারেল ডায়রি হিসেবে মান্যতা দেয়, যদিও এখনও পর্যন্ত কেউই গ্রেফতার হয়নি। বিবর্তন বাবু চাকদহ অঞ্চলের বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার সভাপতি এবং সবুজ মঞ্চের সহ সম্পাদক। জেলার গণতান্ত্রিক স্বর ও মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর এই লাগাতার আক্রমণ, বিরোধী স্বরকে থামিয়ে দিতে রাজ্য পুলিশের তৎপরতা রাজ্য প্রশাসনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

গণতন্ত্রের ওপর, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর রাজ্য সরকার যে আক্রমণ নামিয়েছে তারই আরও একটি ঘটনার সংযোজন হল, পূর্ব কলকাতার বেলেঘাটায় বিদূষক নাট্যগোষ্ঠীর ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনা। বড়দিনের ঠিক আগে আগে বিদূষক নাট্যগোষ্ঠী একটি নাট্য মেলার আয়োজন করেছিল এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্হাপনা ও অনুমতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তৃণমূলের স্হানীয় কাউন্সিলরের শখ জাগে যে ঐ একই স্থানে কেক উৎসব পালন করবে। বিদূষক নাট্যগোষ্ঠীর অন্যতম উদ্যোক্তা অভিনেতা ও নির্দেশক অমিত সাহা ও অরূপ খাঁড়া নাট্য মেলা শুরুর আগের দিন প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে গেলে তৃণমূল কাউন্সিলরের চেলা চামুন্ডা ও গুন্ডা বাহিনী তাদের মারধর করে, হুমকি দেয় এবং নাটকের মঞ্চ ভেঙে দেয়, ফ্লেক্স ছিঁড়ে দেয়। বিদূষক নাট্যগোষ্ঠী বাধ্য হয় তখনকার মতো নাট্য উৎসব বাতিল করতে। পুলিশ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নেয়। আজ অবধি এই ঘটনায় কারুর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। নেহাত নাট্য জগতের বিশিষ্টজনেরা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথীরা এবং এপিডিআর এর মতো সংগঠন এই ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন বলে সামাজিক মাধ্যমে ও মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। অভিনেতা ও নাট্যকার অনির্বাণ ভট্টাচার্য বলিষ্ঠ ভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদে এগিয়ে আসেন। চাপে পড়ে তৃণমূলের নেতারা ঢোঁক গেলেন, অনভিপ্রেত ঘটনা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে।

ফলে সবমিলিয়ে বলা যায় যে আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্র সরকার হোক বা মা-মাটি-মানুষের নামজপকারী তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকার হোক, সাধারণ মানুষের অধিকার, বাক স্বাধীনতা এবং বিরোধী মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর খড়্গহস্ত সব শাসকেরাই। জনগণ যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে সংগঠিত ভাবে এর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায় তাহলে কি মৌলিক অধিকার, কি জীবনের অধিকার, কি নাগরিক অধিকার বা কি মানবাধিকার – সমস্ত কিছুই আরও আরও বেশি ভুলুণ্ঠিত হবে।


কভার ফটোhttps://www.thenews.com.pk/latest/718020-oic-urges-un-to-ask-india-to-end-human-rights-violations-in-kashmir [Retrieved On: 15/03/2023]

Leave a Reply