আসছে বছর আবার হবে!

– অজেয় পাঠক

দুর্গাপূজা শেষ, জনগণের করের টাকায় কার্নিভ্যালও হয়ে গেছে। কালীঘাটসহ গোটারাজ্যে শ্যামাপুজাও হয়ে গেছে। আমাদের ধর্মপ্রাণ মুখ্যমন্ত্রী কার্নিভালে আদিবাসী নাচে পা মিলিয়েছেন। এমনটা যে তিনি বছরবছর করবেন তা তিনি ২০২০ সালেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। অতিমারীর বছরে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন – ‘পুজো হচ্ছে। হবে। এবার শুধু বিসর্জনের কার্নিভ্যালটা রেড রোডে করতে পারলাম না। পরের বার ডবল করে হবে।’ তারপর আপন গৃহে কোজাগরী লক্ষ্মীদেবী ও শক্তির আরাধনা করেছেন, টিভি চ্যানেলগুলি সেসব নিষ্ঠাভরে গোটা রাজ্যের মানুষকে দেখিয়েওছে। ভক্তিরসে টইটম্বুর হয়ে বাঙালি হয়তো ভুলে গেছে – ২০১১ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময়ে রাজ্যের ঋণের পরিমাণ ছিল, ২ লক্ষ ৭ হাজার কোটি টাকা; ২০২২ সালে সেই ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়ে গিয়েছে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা। এই ঋণগ্রস্ত রাজ্যের কোষাগার থেকেই প্রত্যেক দুর্গাপূজা কমিটিকে ৬০ হাজার টাকা সরকারি অনুদান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ৬০০০০ টাকা করে রাজ্যের প্রায় ৪০০৯২ টি পূজা কমিটিকে দিতে অক্লেশে রাজ্যবাসীর করের টাকা থেকে মোট ২৪০ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা খয়রাতি করা হল। আসলে এমন খয়রাতির মূল কারণ হল – সব শাসকই ধর্মীয় তোষণে সমান।

ধর্মভীরু আর ধর্মান্ধতাকে হাতিয়ার করে ভোট নেওয়ার দৌড়ে মোদী, যোগী বা মমতা, কেউ পিছিয়ে নেই। দুর্গা পুজো তো নিছক ধর্মীয় উৎসব ছাড়া কিছু নয়, জোর করে সেটাকে “সামাজিক” রূপ দিলেই সেটা সামাজিক উৎসব হয়ে যাবে না। কাল্পনিক ঈশ্বরের মূর্তি বানিয়ে তার সামনে কোটি কোটি টাকার নৈবেদ্য সাজানোর নামে পরজীবী পুরোহিত আর ব্যবসাদার-পুঁজিপতিদের মুনাফার প্রক্রিয়াই হল পুজোআর্চা, দুর্গাপুজোও ব্যতিক্রম বা আলাদা নয়। পূজো কমিটিগুলিকে এই টাকা দিলে সেই টাকায় মদ্যপান-মোচ্ছব ইত্যাদি করে খুশি হয়ে দুর্গাদেবীর ভক্ত-সন্তানরা আগামী নির্বাচনে ভোট দেবে, আবার লুঠও করবে। সেইসঙ্গে ধর্মভিরু আর ধর্মান্ধরা ধন্য ধন্য করবে, আহা সনাতন ধর্মের উন্নতিতে দান-ধ্যান তো করছে, কাজেই আরও বেশ কিছু ভোটও নিশ্চিত হল। এতে আবার শাসক দলের নেতা-মন্ত্রী, “কেষ্ট”-বিষ্টুদের কোটি কোটি টাকার চুরি-লুঠ-দুর্নীতির পাপ ঈশ্বর ক্ষমাও করে দিতে পারেন। তাই তো গত বছরের তুলনায় পুজো কমিটির জন্য অনুদান বাড়ল ১০ হাজার টাকা করে, সব মিলিয়ে মোট ৩৯ কোটি টাকা। এবার সিইএসসি ও রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি এলাকায় কমিটির জন্য বিদ্যুৎ বিলে ৬০ শতাংশ পুজো ছাড়ের ব্যবস্থা করেছে সরকার। সঙ্গে জনগণের করের টাকা নিয়ে পুজো কমিটির কাজে ‘পুজো সেল’-এর আরও কিছু উপহার নিয়ে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। গত ২ বছরের মত চলতি বছরে পুজো করার জন্য কর্পোরেশন, পঞ্চায়েতকে কোনও কর দিতে হয়নি। মকুব করে দেওয়া হয়েছিল ফায়ার লাইসেন্স ফি-ও। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়,‘টোটালটাই ফ্রি।’

এদিকে অস্বাভাবিক বেশি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে রাজ্যবাসী চরম দুর্ভোগে। গত ২ বছরে মানুষ তাঁদের জীবিকা হারিয়েছেন, পরিবারের জন্য আহারই যোগাড় করতে পারছেন না, বিদ্যুতের বিল মেটাবেন কিভাবে? তাদের জন্য কোনও ছাড় নেই। এদিকে পুজো কমিটির জন্য দেদার ছাড়। কারণ ধর্ম আর ঈশ্বর সবার আগে, তারপর তো জনগণ! সেই একই ধর্মীয় তোষণের কারণেই গতবছর পুরোহিতদের মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। গঠিত হয়েছিল “রাজ্য পুরোহিত কল্যাণ প্রকল্প”। ভাতার সাথে আবার ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকার অনুদান ঘোষিত হয়েছিল। সমাজে পুরুত ছাড়া কেউ দরিদ্র নেই, গৃহহীন নেই! কি নির্লজ্জ ব্রাহ্মণতোষণ! বৈদিক বর্ণাশ্রম প্রথাকে হাতিয়ার করে ভোটের রাজনীতি। রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের সমস্ত পাওনা মহার্ঘ্যভাতা মিটিয়ে দিতে বলেছে মহামান্য আদালত, অথচ পুজোকমিটিকে টাকা দিতেই কোষাগারের সব টাকা শেষ ! ঈশ্বর নামক কাল্পনিক কুসংস্কারই তো বারবার ধর্মভীরু সমাজে ভোট এনে দেবে। তাই জনগণের করের টাকায় ঈশ্বর পুজো হবে। লেখক ভিক্টর হুগো বলেছিলেন “প্রতিটি গ্রামে যেমন একটি আলোর মশাল আছে: শিক্ষক, তেমনি সেই আলো নিভিয়ে দেবার মত একজন আছে: পুরোহিত।” পুরোহিতরা জ্ঞানের আলো নেভালে তো শাসকেরই সুবিধা। হীরক রাজার সেই সংলাপ কে না জানে “যত পড়ে, তত জানে, তত কম মানে।” তাই তো সরকারি অনুদানে পরগাছা পুরোহিতের পেট মোটা হবে, জনগণের টাকায় পাকাবাড়ি বানিয়ে আয়েশ করবে, আর পুজোর নামে ধর্মান্ধতা ছড়াবে। ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন “সকল পুরোহিত ভন্ড বা প্রতারক, অলৌকিক বলে দাবীকৃত সব বাণী বেসাতি মাত্র এবং প্রত্যাদেশ বা ঐশ্বরিক বাণী মানুষের উদ্ভব।” তাঁর আরেকটি উক্তি “যারা আপনাকে অদ্ভুত অলীক কিছুতে বিশ্বাস করাতে পারবে,তারা আপনাকে দিয়ে যে কোনো নৃশংস কাজও করিয়ে নিতে পারে।” এক্ষেত্রে হয়ত পুরুতমশাই এসে পুজো সেরে দক্ষিণা নেওয়ার পর যজমানকে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাবেন, ভাতা আর বিনি পয়সায় ঘরের অনুদানের প্রতিদান স্বরূপ!

সর্বকালের সেরা গুজব আর কুসংস্কার হল “সর্বশক্তিমান ঈশ্বর”! ভগত সিং “কেন আমি নাস্তিক” বই এ লিখেছেন ” আমি বলতে চাই, ঈশ্বর ইচ্ছা করেন বলেই ব্রিটিশ রাজ এখানে আছে এমন নয়। বরং বলা যায় তারা এখানে আছে কারণ তাদের ক্ষমতা আছে এবং তাদের বিরোধিতা করার মত সাহস আমােদর নেই। ঈশ্বরের সাহায্যে নয়, বন্দুক ও রাইফেল , বোমা, গুলি, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সাহায্যেই তারা আমাদের অধীন রেখেছে এবং আমাদের অনীহার জন্যই এক জাতি কর্তৃক অন্য জাতির জঘন্য রকমের শোষণের মতো একটি নগ্ন সমাজবিরোধী পাপ তারা সার্থকভাবে করতে পারছে। কোথায় ঈশ্বর? কী করছেন তিনি? মানবজাতির এই দুর্দশা কি তিনি উপভোগ করছেন? তিনিও তো এক চেঙ্গিস, এক নিরো, নিপাত যান তিনি।” ঠিকই তো, পঞ্চাশের মন্বন্তর থেকে আজকের করোনা, কিছুতেই তো ঈশ্বর কাজে আসছেন না! সেই মানুষকেই মরতে হচ্ছে, আবার লড়তেও হচ্ছে। অথচ কাল্পনিক ঈশ্বরকে তুষ্ট করতেই সরকারের এত ব্যস্ততা। কারণ ধর্মীয় তোষণ। একই কারণে গ্রিন ট্রাইব্যুনালের রবীন্দ্র সরোবরে ছটপূজা নিষিদ্ধ করার রায়ের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ ভাবে উচ্চ আদালতে গিয়েছিল এই সরকার। “ছট” এ আবার সূর্যকে ঈশ্বর বানিয়ে পুজো করা হয়। এই বিজ্ঞানবিরোধী, অযৌক্তিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসকে তোষণ করছে রাজ্য সরকার, বিনিময়ে মিলবে হিন্দিভাষীদের ভোট। তাতে পরিবেশ চুলোয় যাক, জলে বিষ মিশুক। ধর্মান্ধতা প্রচারে সঙ্ঘপরিবারের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই এরাজ্যের শাসক দল। সেই কবে রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববাসীর কাছে আহ্বান করেছিলেন “যে পূজার বেদী রক্তে গিয়েছে ভেসে, ভাঙো ভাঙো আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে। ধর্ম কারার প্রাচীরে বজ্র হানো, এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলো আনো।” শরৎচন্দ্র বলেছিলেন “সমস্ত ধর্মই মিথ্যা, আদিম যুগের কুসংস্কার। বিশ্বমানবতার এত বড় পরম শত্রু আর নেই।” কিন্তু, বঙ্গবাসীরা তাঁদের আহ্বানে কান দেন না। তাঁরা “দুর্গাপূজা”, “কালিপুজায়” মেতে থাকেন। এদিকে শাসক দলের নেতা, মন্ত্রী আর পুঁজিমালিক ও তার ফড়ে ব্যবসাদারদের পকেট ভারী হয়, আর জনগণের থেকে সম্পদের উচ্ছিষ্টে পুরোহিতের মতো পরগাছারা সমাজে বহাল তবিয়তে ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার ছড়ায়।

যাদের এই ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা ছিল, সেই বামপন্থীদের ভূমিকাটি ঠিক কি? হ্যাঁ, তাঁরা এই অপচয় আর খয়রাতির সমালোচনা করেছেন বটে, কিন্তু এই খয়রাতির মূল কারণ ধর্মীয় তোষণ বা ধর্মান্ধতা নিয়ে এঁরা সবসময় চুপ থাকেন। চৌত্রিশ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালীন “বামফ্রন্ট প্রার্থীকে এই চিহ্নে ছাপ দিন“ ছিল তাঁদের একমাত্র স্লোগান, জনগণকে বিজ্ঞানভিত্তিক মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদের আলোয় আলোকিত করার কোনও বলিষ্ঠ কর্মসূচী ছিল না। ভোটে জেতা একমাত্র লক্ষ্য হওয়ায় দুর্গা পূজা, কালী পূজা, শনি পূজা, ঈদ বা মহরমে পার্টি কর্মী ও নেতাদের দেদার অংশগ্রহণ চলত। এবিষয়ে তাঁদের প্রশ্ন করলে বলতেন “জনসংযোগ করছি”। “সমাজতন্ত্র ও ধর্ম” প্রবন্ধে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন লিখেছিলেন “ধর্ম আধ্যাত্মিক পীড়নের অন্যতম প্রকার বিশেষ। চিরকাল অন্যের জন্য খাটুনি, অভাব ও নিঃসঙ্গতায় পীড়িত জনগণের উপর সর্বত্রই তা চেপে বসে। শোষকদের বিরুদ্ধে শোষিত শ্রেণির সংগ্রামের অক্ষমতা থেকেই অনিবার্যভাবে উদ্ভুত হয় মৃত্যু-পরবর্তী উত্তম জীবনের প্রত্যয়, যেমন প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে আদিম মানুষের অক্ষমতা থেকে উদ্ভূত হয় ঈশ্বর, শয়তান, অলৌকিকত্ব, ইত্যাদিতে বিশ্বাস। যারা সারা জীবন খাটে আর অভাবে নিমজ্জিত থাকে, ধর্ম এ পৃথিবীতে তাদের নম্রতা ও সহিষ্ণুতার শিক্ষাদান করে স্বর্গীয় পুরস্কারের সান্তনা দেয়। কিন্তু যারা অন্যের শ্রমশোষক, ধর্ম তাদের পার্থিব জীবনে বদান্যতা অনুশীলনের নির্দেশ দেয়। এভাবেই শোষক হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বের নায্যতা সপ্রমাণের জন্য ধর্ম খুবই সস্তা সুযোগ দেয় ও পরিমিত মূল্যের টিকিটে স্বর্গবাসে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যবিধানের ব্যবস্থা করে। ধর্ম জনগণের পক্ষে আফিমস্বরূপ। ধর্ম এক প্রকার আধ্যাত্মিক সুরাবিশেষ এবং এরই মধ্যে পুঁজিদাসদের মনুষ্য-ভাবমূর্তি এবং অল্পবিস্তর মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার দাবি নিমজ্জিত। “এরাজ্যের কমিউনিস্টরা এই লেনিনীয় নীতিতে বিশ্বাস করেন না। তাঁদের কাছে ধর্ম কোনও “শ্রেণীশোষণের যন্ত্র” নয়, বরং ভোট পাওয়ার উপায়। তাই তাঁরা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বললেও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে রক্ষা করে চলেন। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই যে সমস্ত ধর্মীয় মৌলবাদের পিতা, তাঁরা মানেন না। তাঁরা কখনই তাঁদের কর্মী বা ক্যাডারদের সেই চতুরঙ্গ উপন্যাসের শচীশের জ্যাঠামশাই জগমোহনের মত ঈশ্বরবিশ্বাসীদের সঙ্গে এই পদ্ধতিতে তর্ক করতে শেখান না “ঈশ্বর যদি থাকেন তবে আমার বুদ্ধি তারই দেওয়া; সেই বুদ্ধি বলিতেছে যে, ঈশ্বর নাই; অতএব ঈশ্বর বলিতেছেন যে, ঈশ্বর নাই; অথচ, তোমরা তাঁর মুখের উপর জবাব দিয়া বলিতেছ যে, ঈশ্বর আছেন। এই পাপের শাস্তিস্বরূপে তেত্রিশ কোটি দেবতা তোমাদের দুই কান ধরিয়া জরিমানা আদায় করিতেছে”, কারণ তাহলে তাঁরা ধর্মভীরু মানুষের ভোট হারাবেন। এই আপোষকামী মনোভাবের জন্যই তাঁরা ধর্মীয় মৌলবাদেকে প্রতিহত করতে পারেন না।

কাজেই, পূজা আর্চা- ধর্মীয় পরব-মোচ্ছব- কার্নিভাল চলছে–চলবে, আর ৫ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাঙালি ৫০০ টাকা অনুদানের লাইনে দাঁড়াবে। বাংলা উত্তাল হয় না! নিস্তরঙ্গ বাঙালি! আসছে বছর আবার হবে!


লেখাটি প্রকাশিত হয় আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সংখ্যায়


কভার ফটো সৌজন্যেhttps://www.dnaindia.com/india/report-no-court-stay-on-durga-puja-doles-but-mamata-banerjee-told-to-explain-2674803 [Retrieved On: 22/02/2023]

Leave a Reply